স্বপ্নগোলক

শুক্রবার, ১৩ জুলাই ২০১৮

** অমিত গোস্বামী **

টুটুলের পাড়ায় বিস্তর প্রতিপত্তি। বয়স এখনো বারো ছোঁয়নি। তাতেই তাকে এক ডাকে সবাই চেনে। ঢাকা শহরের নিউ এস্কাটনের একটু ভেতরের দিকে তাদের বিরাট বাড়ি। সৈয়দ বাড়ি বললে যে কোনো রিকশওয়ালা নিয়ে যাবে। বাড়ির সামনে বিরাট খালি জায়গা। আগে এখানে ফুলের বাগান ছিল। কিন্তু টুটুলের দাদা যেদিন টের পেলেন যে নাতির দুই পা সামান্য শীর্ণ এবং ডাক্তার বলেছেন যে টুটুলকে দিনে যতটা সম্ভব হাঁটাতে হবে তিনি ফুলের বাগান তুলে দিলেন। সব সমান করে ঘাস পুঁতে ছোটখাটো একটা মাঠ বানিয়ে ফেললেন। নিজেই উদ্যোগ করে নিয়ে এলেন একটি ফুটবল আর টুটুলের সাথে নিজেই নেমে গেলেন সেই মাঠে। পারিবারিক ব্যবসা মধ্যপ্রজন্মের হাতে দিয়ে দুই প্রজন্ম মেতে উঠলেন ফুটবল খেলায়। কিন্তু নাতি টুটুলের পায়ের রুগ্ণতা কিছুতেই পুরো যাচ্ছে না। চিন্তিত দাদাজান শুনলেন পারলে একমাত্র স্পোর্টস মেডিসিনের কোনো নামি ডাক্তার এই সমস্যার জন্য নিদান দিতে পারেন। সে খোঁজ করতে গিয়ে জানতে পারলেন তাঁর ছোটবেলার স্কুলের এক বন্ধু ভারতে স্পোর্টস মেডিসিনের বিরাট ডাক্তার। তিনি থাকেন দিল্লিতে। বহু কষ্টে তার ক্লিনিকের ফোন নম্বর পেলেন। মহাব্যস্ত এই ডাক্তার বন্ধুর সাথে সরাসরি কথা বলার সুযোগ এক হপ্তার মধ্যেও না পেয়ে ভীষন রেগে টুটুলের দাদাজান কিছু আকথা কুকথা শুনিয়ে দিলেন ক্লিনিকের রিসেপশনিস্টকে। সেও হিন্দিতে প্রত্যুত্তর দিয়েছিল। নিজের নাম বলে দাদাজান বলেছিলেন- তুমারা বসকো বোলো উসকা বাপ ফোন কিয়া থা। নাম হ্যায় বক্সার। ছোটবেলায় তাঁকে ক্লাসের ছেলেরা বক্সার বলেই ডাকত। কারণ ঘুঁসোঘুঁসিতে তিনি ছিলেন এক নম্বরে। উঁচু ক্লাসের ছেলেরা তাঁকে ভয় পেত।

সেদিনই বেশ রাতে টুটুলদের টেলিফোন বাজতেই বাসার এক নোকর ফোন তুলল। ওদিক থেকে কেউ বলল, বক্সারকে দিন তো।

বক্সার টক্সার বলে এখানে কেউ থাকে না।

উল্টোদিকের গলা তখন বলল, ঠিক আছে মহীয়ূল আলমকে দিন। টুটুলের দাদাজানকে ডাকা হলো। ব্যস, তারপর ফোনে কথা চলল প্রায় বিশ মিনিট। দাদাজান বেশ গুছিয়ে নাতির পায়ের সমস্যা তাঁকে বললেন। উল্টোদিকের বন্ধু যাকে মাউলা বলে ডাকা হতো তিনি বললেন, শোন শালা, তোর মাউলা যখন বেঁচে আছে তোর নাতির পা ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু তোকে নাতিকে নিয়ে একবার দিল্লি আসতে হবে। চিন্তা নেই। আমার বাড়িতে থাকবি। আমি দেখে দেব।

পাঁচ বছরের নাতিকে নিয়ে বিমানে উঠলেন দাদাজান। ছেলেটির মা জন্মের সময় মারা গেছে। বাবা ব্যবসা ও নতুন সংসার নিয়ে ব্যস্ত। কাজেই টুটুলের দাদাই ভরসা। দিল্লিতে বিমান থেকে নেমে বাইরে আসতেই এক প্রৌঢ় কাছে এসে জড়িয়ে ধরলেন। বক্সার বক্সার করে দাদাজানকে নিয়ে সে কী হৈ চৈ। তারপরে কোলে তুললেন নাতিকে। কি নাম তোমার? মইদুল টুটুল। বাহ, কি সুন্দর নাম তোমার। চলো, চলো। এরপরে কাউকে ফোন করতেই একটা গাড়ি এসে দাঁড়াল। টুটুল মাউলাদাদার গাড়িতে উঠে বসল দুই দাদার মাঝখানে। দিল্লি শহরটা বেশ সাজানো গোছানো। চারদিকে গাছের সারি। হু হু করে গাড়ি যাচ্ছে। কিন্তু জ্যাম নেই কোথাও। কত খোলা জায়গা। বল নিয়ে নেমে পড়লেই হলো। দুই দাদা চুটিয়ে গল্প করছে। মাউলা দাদা দিল্লি শহরের গল্প বলছে। লাল কেল্লা, হুমায়ূন সমাধি, কুতব মিনার, জামা মসজিদ, বাহাই টেম্পল। মাউলা দাদা বলছে, এখানে প্রায় সবই তো মোগল আমলের মুসলমানদের তৈরি। একটু অন্যরকম। বেশ আভিজাত্য আছে। আমার যাওয়া হবে না। তোদের গাড়ি আর একটা লোক দিয়ে দেব। ঘুরে ঘুরে সব দেখে নিবি। আগ্রাও ঘুরিয়ে আনব। আজমীরও যেতে পারিস।

টুটুলের দাদাজান মহীয়ূল আলম ভাবছিলেন মাউলা সব গল্প করছে কিন্তু তার পরিবারের কথা বলছে না। সে একটা দামি জামদানি নিয়ে এসেছে মাউলার বউকে দেবে বলে। বাকি কিছু কাঁথা এনেছে যে কজনকে দেয়া যায়। মহীয়ূল জিজ্ঞাসা করে ফেলল, আচ্ছা তোর বাসায় কে কে আছেন? তুই তো তোর পরিবারের কথা একবারও বললি না! মাউলা হেসে উত্তর দিলেন, যাচ্ছিস তো। এখুনি ঢুকব। দেখতেই তো পাবি। আলাপ হবে। কিছুক্ষণের মধ্যে গাড়ি ঢুকে গেল একটা আলিশান বাংলোয়। গেটে দারোয়ান বিশাল গেট খুলে দিতেই প্রশস্ত লন চেরা রাস্তা দিয়ে গাড়ি এগোল। কিছু দূরে বাংলো। মহীয়ূল দেখল যে ভুটানের রাজবাড়ির যেন রেপ্লিকা। চাকর এসে সামানপত্র নিয়ে গেল। ওরা প্রবেশ করল বসার ঘরে। মহার্ঘ কাউচে শরীর ডোবাতেই মহীয়ূলের সামনে এক পোশাক পরা লোক চা ও কিছু খাবার রেখে গেল। মাউলার পোশাকি নাম অমরনাথ বসু। গেটে জ্বলজ্বল করে লেখা ছিল।

বক্সার, আয় একটু চা খেয়ে নেই। তোরা এরপরে তোদের ঘরে গিয়ে বিশ্রাম কর। সময়মতো স্নান খাওয়া করে নিস। এই ছেলেটাকে বললেই হবে। বিপুল ওর নাম। বাঙালি। আমি এখুনি চেম্বারে যাব। তোরা বিশ্রাম নিয়ে ঠিক পাঁচটাতে দাদুভাইকে নিয়ে আমার চেম্বারে হাজির হবি। বিপুলকে বললেই হবে। তারপরে রাতে তোর অনারে ক্লাবে পার্টি।

সে তো বুঝলাম। কিন্তু ম্যাডাম কই? পরিবারের অন্যরা?

অন্যান্য কেউ নেই আর ম্যাডাম তো তোর পিছনে।

মহীয়ূল ঘাড় ঘুরিয়ে দেওয়ালে যে তেলচিত্রটা দেখল তাতে তার চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠল, সে বাকরুদ্ধ। সে সামনের দিকে দৃষ্টি ফেরাতেই দেখল অমরনাথ মিটিমিটি হাসছে।

এ তো কনা। আমার ফুফাতো বোন। ওর তো অন্যখানে বিয়ে হয়েছে। ওর মেয়ের সাথে আমার ছেলের বিয়ে হয়েছিল। তার ছেলে এই টুটুল। সে তোর স্ত্রী কি করে হলো?

আমি কখন বলেছি যে কনা আমার বিবাহিত স্ত্রী? তুই ম্যাডামের কথা জিজ্ঞাসা করেছিস। সেটাই দেখালাম।

আমি কিছু বুঝলাম না।

তুই গাড়োল তাই কোনোদিনই কিছু বুঝিসনি। কনা আমার সাথে পরে ঢাকায় পড়ত। তোদের বাসায় থাকতো। আমাদের গভীর প্রেম হলো। তোদের বাসা থেকে টের পেল। আমার ফাইনালের সাথে সাথে আমাদের দেশছাড়া করল। তোর বাবার অগাধ ক্ষমতা ছিল। তার বোনের মেয়েকে এক হিন্দু ছেলের হাতে তুলে দেবেন? কিছুতেই না। কনা কিছু জানল না। তুই কিছু জানলি না। রাতারাতি আমি ও মা দেশছাড়া হলাম।

তারপরে?

অভিমানে আমি পশ্চিমবঙ্গে থাকলাম না। চলে এলাম দিল্লিতে। সের পড়াশোনা এখানেই। কনার সাথে যোগাযোগ পুরোপুরি ছিন্ন হয়ে যায়। বিয়ে করার ইচ্ছেও হলো না। বিয়ের কথা বলতে বলতে মা চলে গেলেন। আমি আমার মতো একা জীবন কাটাচ্ছি। একবার সিঙ্গাপুরে এক কনফারেন্সে কনাকে দেখলাম। আমি কথা বলিনি। কিন্তু সে দৌড়ে এল। জানলাম ওর কথা। মেয়ের কথা। তোর ছেলের সাথে বিয়ে হয়েছিল। ওর স্বামীও তখন আর নেই।

কতদিন আগের ঘটনা এটা?

প্রায় পাঁচ বছর। ওর মেয়ে মানে তোর পুত্রবধূ মারা গেল ছেলে রেখে। কনা আরো একা হয়ে গেল। সে তোর নাতিকে রেখে মানুষ করতে চেয়েছিল। তুই দিসনি।

তারপরে?

তার আর পর কই? তোর সাথে আবার যোগাযোগের কথা ওকে বললাম। তুই নাতি নিয়ে আসছিস। শুনে বলল, আমি যেতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু আমার ছেলের ছেলে এখন ঢাকাতে আমার কাছে, পুত্রবধূও আছে। ওরা মাসখানেক বাদে আমেরিকা ফিরে যাবে। তখন আসবে।

ও আসে এখানে?

কেন আসবে না? বন্ধু বন্ধুর বাসায় আসবে না? বিয়ে হয়নি তো কী! এখানে এসে অনেকদিন থাকে। ওর আলাদা ঘর, সব কিছু আছে। অনেকটা লীভ টুগেদার। পুরোটা নয় যদিও। কনা আমাকে তোদের পরিবারের সব খবর দেয়। কিন্তু নাতির এই অসুস্থতা ও জানত না। তুই বলিসনি। আমার থেকে শুনেছে।

মহীয়ূল আর কথা বাড়াল না। বিপুলকে ডেকে গেস্টরুমে এল। গোসল করতে হবে। নাতিকে সব দেখিয়ে স্নান করিয়ে নিতে হবে। খেয়ে সামান্য ঘুমিয়ে নিতে হবে। তারপরে অমরনাথের চেম্বারে যেতে হবে। কিন্তু অমরনাথের সাথে কনার যোগাযোগ মহীয়ূলকে বিস্মিত করেছে।

শোনো বক্সার, টুটুলের পায়ের বেশ কিছু পেশি কোনো কারণে ডেভেলপ করেনি। সেই জন্য ওর পায়ের জোর কম। এই পেশিগুলোতে অ্যানাবলিক স্টেরয়েড ইনজেকশন দিতে হবে। পেশি ধরে ধরে। বেশ কিছুটা সময় লাগবে। অন্তত আগামী দুমাস। আমার বাসায় থাকতে হবে।

টুটুলের পা ঠিক হবে তো?

মারাদোনার ছোটবেলায় একই সমস্যা হয়েছিল। তারপরে এই চিকিৎসা। এখন ফুটবলের রাজপুত্র।

টুটবল ছাড়। হেঁটে চলে বেড়াতে পারলেই হলো।

মাস দুয়েকের মধ্যে টুটুলের সব ইনজেকশন দেয়া হয়ে গেল। পায়ে যে সে আগের থেকে বেশি জোর পাচ্ছে সেটা সে বেশ বুঝতে পারছে। তার সাথে এই প্রথম নানীর আলাপ হলো। মায়ের মা। তিনি দিল্লি এসেছেন। ডাক্তারদাদার বাসায় উঠেছেন। পায়ের ইনজেকশন দেয়ার সময় ছাড়া সময় কেটে গেল খুব আনন্দে। ডাক্তার দাদার ব্যবস্থায় দিল্লি আগ্রা ঘোরা হলো খুব আনন্দে। আজমীর ওরা গেল না। মহীয়ূলের আবার পীর দরগায় বিশ্বাস কম। কনা অমরনাথের এই অন্যরকম লিভ টুগেদার ওর খুবই ভালো লাগল। মহীয়ূলেরও স্ত্রী বিয়োগ ঘটেছে প্রায় আট বছর আগে। কিন্তু আজ সে প্রথম অনুভব করল তার কথা বলার লোক নেই।

দিল্লি থেকে ফিরে ক্রমে সুস্থ হয়ে উঠল টুটুল। পায়ের পেশির স্বাস্থ্য ক্রমে ওর ক্লাসের সকলের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে উঠল। মহীয়ূল দারুণ খুশি। কনাও খুশি সে এখন আসেন মাঝে মাঝে। নাতির প্রতি একটা টান তো আছেই। টুটুলের এখন পড়াশোনা ছাড়া একটাই কাজ। ফুটবল পেটানো। পাড়ার ক্লাবের কোচিং ক্যাম্পে ভর্তি হয়েছে। সেখানে শেখে আর বাড়ির সামনে লনে প্রয়োগ করে। একধারের উঁচু দেওয়ালে বারপোস্ট আঁকা। তার মধ্যে আবার নানা রঙ। একজনকে রঙের নাম বলতে হয় আর সেই অনুযায়ী সেই রঙে বল মারে টুটুল। একদিন টিভিতে কার্লোস রবার্তোর বাঁকানো ফ্রি কিক দেখে কোচিং ক্যাম্পের স্যারকে বলেন যে মেরে দেখিয়ে দিন। কোচ বেচারী পড়লেন মহাফাঁপরে। চেষ্টা করেও তিনি পারলেন না। আরেকদিন বেকহ্যামের কলার মতো বাঁকানো শট দেখে স্যারকে বললেন। এবারেও তিনি পারলেন না। মাসখানেক প্র্যাকটিস করে টুটুল শট দুটি রপ্ত করল। এখন বেশ মারে সে বল বাঁকিয়ে। কোচ দেখে থ। একদিন মহীয়ূলকে ডেকে বললেন যে আবাহনী ক্রীড়া চক্রে নিয়ে যেতে। ওরা যদি জুনিয়র টিমে সুযোগ দেয়। মহীয়ূল খোঁজ নিলেন। আবাহনীর ট্রাইয়াল হয়। তার কিছু দেরী আছে। টুটুল ক্রমে হাইটের টুর্নামেন্টে পরিচিত নাম হয়ে উঠল। আজ এ হায়ার করছে কাল ও হায়ারে নিয়ে যাচ্ছে। টুটুলের তাই মহাব্যস্ততা। সে খেলতে ভালোবাসে খেলতে পেলেই হলো। বাড়িতে সারাদিন বল পেটানোর ধাই ধপাধপ শব্দ বাসায় আর বিকেল হতেই তাকে।

আবাহনী জুনিয়র দলে টুটুল সুযোগ পেতেই মহীয়ূলের মনে হলো যে তার নাতি ফুটবল তাহলে ভালোই খেলে। একদিন সে টুটুলের একটি ম্যাচ দেখতে গেল স্টেডিয়ামে। দাদাজানকে সবাই মাঠের পাশে খাতির করে বসালো। ম্যাচটা দেখতে দেখতে মহীয়ূলের মনে হলো এ তো টুটুল বনাম অন্য দল। স্পিড, স্কিল, স্ট্যামিনা, দৌড়ে জায়গা কভার করা সব মিলিয়ে টুটুলের মতো অত ক্ষিপ্র কেউ নেই। খোলা পা দুটো দেখে মহীয়ূল বুঝল এই কল্কাগাছের মত পা টুটুলের হয়েছে পায়ে ইনজেকশন দেওয়ার কারনে। অমরনাথের প্রতি সে কৃতজ্ঞ বোধ করল। মোবাইল বার করে সে টুটুলের খেলার টুকরো টুকরো ভিডিও করে নিল। অমরনাথকে পাঠিয়ে দিল হোয়াটস অ্যাপের মাধ্যমে। বাসায় ফিরতে ফিরতেই অমরনাথের ফোন পেল সে।

বক্সার, তোর পাঠানো ভিডিও দেখলাম। একজন পেশাদার ভিডিও ফটোগ্রাফারকে দিয়ে ওর খেলার কিছু টুকরো দিয়ে আধঘণ্টার ক্যাপস্যুল করে আমাকে ক্যুরিয়রে পাঠিয়ে দে। টুটুলের জন্য দেখি কিছু করতে পারি কি না।

সব বুঝে নিয়ে মহীয়ূল সাতদিনের মধ্যে টুটুলের খেলার ক্যাপস্যুল পাঠিয়ে দিল অমরনাথের কাছে। তারপরে প্রায় মাস খানেকের নীরবতা। এক রাতে অমরনাথের ফোন এল।

বক্সার, ব্রাজিল যেতে হবে। ওখানে কয়েকটা অ্যাকাডেমিতে ট্রায়াল দিতে হবে। সুযোগ পেলে টুটুল হবে পেশাদার ফুটবলার।

এ জন্য কি কি করতে হবে? কি কি হবে? টাকা পয়সা কি লাগবে সব বলবি তো।

তোকে কিছু করতে হবে না। তোদের পাসপোর্ট দুটো কাল সকালে কনার কাছে পৌঁছে দিবি। বাকি ব্যবস্থা আমার।

ব্রাজিলের সাওপাওলোতে যখন মহীয়ূল, টুটুল, অমরনাথ ও কনা পৌঁছল তখন ভরা বিকেল। ওরা পূর্ব নির্দিষ্ট হোটেলে উঠল। এই প্রথম টুটুল রুম শেয়ার করল নানীর সাথে। দুই দাদা পাশের ঘরে। পরদিন ট্রায়াল স্যান্টোস ক্লাবে। পেলের ক্লাব। নেইমারের ক্লাব। স্যান্টোসের প্র্যাকটিশ এরিনাটার নাম পেলের নামে। সিটি রেই পেলে। ‘রেই’ শব্দের অর্থ স¤্রাট। পাহাড়ের কোলে একটা বিরাট জায়গা ঘিরে চারটে আলাদা মাঠ। মাঠে ঢোকার মুখে বিরাট একটা টাওয়ারে পেলের ছবি। গোল করার পর পেলের সেই চেনা ভঙ্গিমায়। মাঠে ঢোকার মুখেই একটা ছোট স্যান্ড ট্র্যাক। ওখানে ভলিবল কিংবা ফুটবল খেলতে পারেন ফুটবলাররা। ভিতরে চারটে মাঠ অসাধারণ রক্ষণাবেক্ষণ করা। অন্তত দুটো রোয়িং মেশিন মাঠের ঘাস ছেঁটে চলেছে। মাঠের পাশেই প্যাভিলিয়ন। ওখানেই জিম, সুইমিং পুল। স্যান্টোসের সবক’টা টিম এখানেই অনুশীলন করে। প্রথমে ফিজিকাল স্টেবিলিটি ট্রায়াল হলো, তারপরে স্পিড চেক। দ্বিতীয় দিনে বেশ কিছু স্কিল গেম খেলানো হলো। তারপরে জানানো হলো যে প্রথমে তিরিশ জনকে রাখা হবে তারপরে এদের দুভাগ করে বাইরের একটি দলের বিরুদ্ধে আগামী কাল পঁয়তাল্লিশ মিনিট করে ম্যাচ খেলানো হবে। বিকেলে নাম টাঙানো হলো। টুটুলের নাম প্রথম তিরিশে এখনো আছে। কাল ম্যাচ খেলার সুযোগ পাবে। এখানে সুযোগের প্রতীক্ষায় থাকে প্রতিটি ফুটবলার। অ্যাকাডেমিতে সুযোগ পেলে সব খরচ যেমন এদের তেমনি ফুটবলারদের পেশাদার ফুটবলে এন্ট্রির দায়িত্ব এরাই নেয়।

পরদিন মাঠে এসে টুটুলের তো চোখ গোলগোল হয়ে গেল। উলটো টিমে নেইমার, কুটিনহো, উইলিয়াম কে নেই? বেশিরভাগই বিশ্বকাপ দলের ফুটবলার। নির্বাচিত তিরিশ জনের বেশিরভাগই ব্রাজিলের কিছু ইউরোপের কিছু অন্যান্য দেশের আছে। তবে এশিয়ার কেউ নেই টুটুল ছাড়া। বিপক্ষ দলের সাথে প্রথম পঁয়তাল্লিশ মিনিট যে টিমটা খেলল তাতে টুটুল ছিল না। সে পরের পঁয়তাল্লিশ মিনিট খেলবে। সে বসে খেলা দেখছে। প্রায় না খেলেই বাচ্চাদের পাঁচ গোল দিয়ে দিল বিপক্ষ টিম। সেকেন্ড হাফে টুটুল মাঠে নামল। ওর হঠাৎ মনে হল যে উলটো দিকে যেই থাকুক ওর কি? ওদের দেখে অমনোযোগী হলে চলবে না। ট্যাকলও করব। মারবও দরকার হলে। স্কিল দিয়ে পারলে নাচাবো। খেলা শুরু হলো। উইলিয়ামের পায়ে বল। আসছে সামনে। দারুণ স্কিল পায়ে। একটু এদিক-ওদিক হলে মাটি ধরিয়ে দেবে। পায়ের থেকে নজর সরিয়ে বলের ওপর দৃষ্টি রাখল টুটুল। ওকে কাটিয়ে বেরোনোর চেষ্টা করতেই কড়া ট্যাকল করল সে। বল গেল মাঠের বাইরে। উইলিয়াম ছিটকে পড়ল মাঠে। উঠে তাকে ভালো করে মেপে নিল। কিছুক্ষণ বাদে বল পেল সে। সামনে যেতেই নেইমার। সাপের মতো দুলতে লাগল সে। হিলের এক টোকায় বল আড়াআড়ি পাস দিয়ে জায়গা নিল সে। বল এল। ডিফেন্ডারটা এগিয়ে আসছে। ওকে একটা আউটসাইড ডজে ছিটকে দিয়ে বক্সে ঢুকে পড়ল টুটুল। কিন্তু ওদের এক ডিফেন্ডার কাঁচা ল্যাং মেরে দিল টুটুলকে। পেনাল্টি। পেনাল্টি মারতে এল একটি ব্রাজিলীয় ছেলে। কোচ চেঁচিয়ে বললেন- গিভ ইট টু ব্যাংলাডেশ। অর্থাৎ টুটুলকে পেনাল্টি মারতে বলছেন। টুটুল বল স্পটে বসিয়ে হালকা করে মারল কোনাকুনি। গোলকিপার উল্টোদিকে ডাইভ দিয়েছে। বল হেঁটে হেঁটে গোলে ঢুকে পড়ল। কিছুক্ষণের মধ্যে খেলার গতির বিরুদ্ধেই টুটুল একটা বল পেল। আশপাশে কেউ কোথাও নেই। সে দাঁড়িয়ে আছে বিপক্ষের হাফ লাইন অঞ্চলে। কিছু দূর থেকে দুজন বিপক্ষীয় ডিফেন্ডার দৌড়ে আসছে। টুটুল দেখল এমনিও কিছু সে করতে পারবে না অমনিও পারবে না। বলটা ডেড স্টপ করিয়ে নিজে কিছুটা পিছিয়ে গিয়ে সে চেষ্টা করল কলার মতো বাঁকানো কিক মারার। পায়ে বলে ঠিক ঠাক হলো। দুই ডিফেন্ডার আর গোলকিপারের মাথার ওপরে রঙধনু এঁকে গোলপোস্টের কোনা দিয়ে বল জড়িয়ে গেল জালে। দৌড়ে এলেন কুটিনহো। কিছু জিজ্ঞাসা করলেন। বোধ হয় পরিচয়। টুটুল বলল টুটুল ফ্রম বাংলাদেশ। কুটিনহো দৌড়ে গেল নেইমারের কাছে। তারপরে ওরা বাইরে ওদের কোচকে কিছু বললেন। তিনি মাইকে কিছু বললেন। সবাই হৈ হৈ করে উঠল। সে শুধু শুনল হান্ড্রেড ডলার আর ব্যাংলাডেশ। সবাই হাততালি দিচ্ছে। টুটুল খেয়াল করল মাঠে এলেন আরেক কিংবদন্তি রোনাল্ডিনহো। কিন্তু তিনি এই অ্যাকাডেমিতে কেন? সে শুনেছে অ্যাটলেটিকো মিনেইরো রোনাল্ডিনহোর ক্লাব। বেলো হরাইজন্তে শহরের বাইরে পাহাড়ের গায়ে ক্লাবটা। খেলা আবার শুরু হলো। বাইরে সবাই চেঁচাচ্ছে ব্যাংলাডেশ ব্যাংলাডেশ বলে। বল সবাই তুলে দিচ্ছে তার দিকে। একটা গোল এবারে টুটুলরা খেল। বল এল সেন্টারে। একজন টুটুলকে বল ঠেলল। টুটুল সরে গেল ডানদিকে। ইনসাইড ডজে একজনকে কাটাল। এবারে বাচ্চা বলে কোন খাতির নেই তাকে। পেছন থেকে কড়া ট্যাকল করল সে। টুটুল আর বল একসাথে ছিটকে পড়ল সামনে। পড়তে পড়তে টুটুল বল ভাসিয়ে দিল বক্সে। লম্বু ইউরোপীয় ছেলেটা তীব্র গতিতে আসছে বলের নাগাল পেতে। বল তার কপালে। সামান্য পুশ। বল জড়িয়ে গেল জালে। সবাই এগিয়ে এসে টুটুলের ঘাড়ে চেপে উঠল। অনেকে অনেক ভাষায় তাকে অনেক কিছু বলছে। টুটুল মাটির ঘ্রাণ নিচ্ছে আর শুধু মাঠ জুড়ে উঠে আসা চিৎকার শুনছে। ভিডা লংগা ব্যাংলাডেশ। ভিডা লংগা ব্যাংলাডেশ।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj