বিশ্বকাপ ফুটবল এবং বাঙালির খেলাপ্রীতি

শুক্রবার, ১৩ জুলাই ২০১৮

** ফরিদ আহমদ দুলাল **

বিশ্বকাপ ফুটবল থেকে এক-এ এক-এ ঝরে যাচ্ছে বড় বড় সব তারকা দল, গতবারের চ্যা¤িপয়ন জার্মানি প্রথম রাউন্ডেই বাদ পড়ে গেলো, ভক্তদের মন ভার! লক্ষ সমর্থকের বুক ভেঙে নকআউট পর্বে এসেই বাদ পড়ে গেলো অন্যতম ফেবারিট আর্জেন্টিনা, সহস্র নীল-সাদা পতাকা বিষণœ মুখে নেমে গেলো আকাশ থেকে, আর কিছু রয়ে গেল অযতেœ মুখব্যাদান করে। বিদায় নিয়েছে সুপারস্টার রোনাল্ডোর দল পুর্তুগাল, ¯েপন, আইসল্যান্ড, ম্যাক্সিকো, জাপান, কোস্টারিকা-এর মতো সম্ভাবনাময় দল। সব বাদ গিয়ে শেষ আটে জায়গা নিয়েছিল ফ্রান্স, উরুগুয়ে, ব্রাজিল, বেলজিয়াম, সুইডেন, ইংল্যান্ড, রাশিয়া এবং ক্রোয়েশিয়া। এরপর কোয়ার্টার ফাইনালে আটটি দল খেলে সেমিফাইনালে খেলার জন্য টিকে আছে চারটি দল, বাদ পড়ে গেছে উরুগুয়ে, ব্রাজিল, সুইডেন আর রাশিয়া; যারা টিকে ছিলো ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, বেলজিয়াম এবং ক্রোয়েশিয়া। চার দল থেকে এখন টিকে আছে দুটি দল। ফ্রান্স এবং ক্রোয়েশিয়া ফাইনাল খেলবে, অতঃপর চূড়ান্ত হবে কে হবে এবারের চ্যা¤িপয়ন। আগ্রহী মানুষের মধ্যে নানান জল্পনা-কল্পনা শুনতে পাই; কেউ কেউ প্রত্যাশা করছেন, কেউ আবার সম্ভাবনা বিচার করছেন। চার বছর পর আবার জমবে উত্তেজনা। নতুন নতুন তারকার জন্ম হবে, আবার সময়ের বিবর্তনে সবাই হারিয়েও যাবে। বাংলাদেশ এবং ভারতের জণগনের মধ্য ফুটবল নিয়ে এত উত্তেজনা, এত আগ্রহের পরও বাংলাদেশ তো বটেই বিশাল ভারতও বিশ্বকাপ ফুটবলের জন্য যোগ্য হয়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু এসব উত্তেজনার আড়ালে যতো ধরনের অনৈতিক ঘটনা ঘটে, তার বিষে নীল হচ্ছে; তার খোঁজ আমরা রাখার সুযোগ পাইনি; খেলা নিয়ে কর্পোরেট জগতের বৈষয়িক আকাক্সক্ষা পূর্ণ হবে, আর আমরা বাজি পোড়াবো, ড্রাম-বিউগল বাজাবো, ভেঁপু বাজিয়ে বাতাস মাতাল করে তুলবো। খেলা নিয়ে আমাদের যত উন্মাদনা, যত বেদনার গভীর ক্ষত তার কতটা আমরা সৃষ্টিশীলতার দ্যুতিতে আলোকিত করে তুলতে পেরেছি? তারই সামান্য খোঁজ নিতে চাই!

খেলা নিয়ে যে উন্মাদনা প্রত্যক্ষ করি, ভেবে অবাক হই; আনন্দে এত বিরোধ কেন? প্রশ্ন জাগে, খেলা নিয়ে আজকের যে বিরোধ তা-কি সাম্প্রতিক ঘটনা? না-কি বহু বছরের পুরনো পরম্পরা? আজকের তথ্যপ্রবাহের যুগে মিডিয়াশাসিত সময়ে বিনোদনকে যখন পণ্য করে তুলবার নিত্য প্রয়াশ তখন মানুষের হৃদয়কে আন্দোলিত করে উন্মাদনা সৃষ্টি তো ব্যবসায়িক কৌশলও বটে! কর্পোরেট গোষ্ঠীর বৈষয়িক স্বার্থচিন্তা যে অনেকাংশেই সফল তা বুঝতে পারি, যখন দেখি বাংলাদেশের শহর-বন্দর-গ্রাম-গঞ্জের ঘরে ঘরে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালির জাতীয় পতাকা ওড়ে। যখন দেখতে পাই একদলের সমর্থকের কাছে অন্যদলের সমর্থক বিপন্ন হয়; পছন্দের দল হেরে যাওয়ার বেদনায় যখন আত্মবিসর্জন দেয় সরল ভক্ত; স্বাধীন বাংলাদেশের মাঠে যখন দেখি বাঙালি তরুণী প্ল্যাকার্ড দেখায়, “অভৎরফর, রিষষ ুড়ঁ সধৎৎু সব?” তখন বুঝতে পারি কতটা সফল বিশ্ব নিয়ন্ত্রক কর্পোরেট গোষ্ঠী। বিশ্ব কাপের জরে আক্রান্ত বিশ্ব; আসলেই কি আক্রান্ত? নাকি এ কেবল বাঙালির আবেগ? এখানেও কি সে আবেগ লাগামছাড়া? সারা বছর ক্রিকেট নিয়ে পড়ে থাকা বাঙালির সাময়িক এই ফুটবল প্রেম কি তবে কেবল মিডিয়ার আগ্রাসন? যেখানে ফুটবলের জন্য আমাদের পর্যাপ্ত মাঠ নেই, পর্যাপ্ত সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নেই, প্রণোদনা নেই; সংগঠন-সংগঠক নেই। পড়ার চাপে নতুন প্রজন্মের খেলার মাঠে যাওয়ার ফুরসত নেই, সুস্থ পরিবেশ নেই; সেখানে কীভাবে আমাদের খেলাধুলা বিকশিত হবে সে প্রশ্ন কি থেকে যায় না? কেবল যদি অন্যের উল্লাসের সাথে যুক্ত হতেই আমাদের শ্রম-মেধা-মনন-মনীষা-অর্থ ব্যয় হয়ে যায়, তাকে কি প্রগতি বলবো, না-কি স্রোতের অনুক‚লে গা ভাসিয়ে দেয়া বলবো? এইসব বিভ্রাট কাটিয়ে আমাদের সোনালি অতীত ফিরিয়ে আনতে আমাদের তৎপরতা কোথায়?

আজকের রচনায় আমি খুঁজে দেখতে চাই, খেলা নিয়ে এই যে উন্মাদনা তা আমাদের শিল্প-সাহিত্যে কতটা প্রভাব ফেলতে পেরেছে। ফুটবল বা ক্রিকেট নিয়ে আমাদের সাহিত্যে অথবা শিল্পকলায় সৃষ্টিনৈপুণ্য কতটা বাক্সময় হয়েছে? বাংলাসাহিত্যের প্রথিতযশা লেখকদের মধ্যে খেলা বিষয়ে কতটা আগ্রহ আছে। ১৯১৫ সালে প্রমথ চৌধুরী ‘সাহিত্যে খেলা’ নামে গদ্যে লিখেন, “মানুষের দেহমনের সকল প্রকার ক্রিয়ার মধ্যে ক্রীড়া শ্রেষ্ঠ, কেন না তা উদ্দেশ্যবিহীন।” সাম্প্রতিক সময়ের সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক-এর প্রথমদিককার রচনায় একটি বড় উপন্যাস পাই, যার নাম ‘খেলারাম খেলে যা’। কিন্তু সৈয়দ হক-এর সে উপন্যাসে আমরা পাই অন্য খেলার সন্ধান।

বাঙালির যত লোকখেলা সেদিকে যদি সমান্য দৃষ্টি দিই, দেখবো প্রতিটি খেলার সাথে আছে ছড়া-কবিতা-গান এবং নৃত্যের যোগ। আমাদের কবাডি, গোল্লাছুট, বন্দী-বন্দী, নৌকাবাইচ, থাপ্পি খেলা, ব্যাঙের বিয়ে কোথায় নেই সুর ও গান? সারিগান ছাড়া কি নৌকাবাইচের কথা চিন্তা করা যায়; আমাদের লোকখেলার অসংখ্য ছড়া ও গান থেকে সামান্য দু’চারটির উল্লেখ করছি নিচে-

সারিগান প্রধানত নৌকাবাইচের সাথে সম্পর্কিত। অসংখ্য সারিগানের উদাহরণ দেয়া যায় সংক্ষিপ্ততার স্বার্থে এখানে একটিমাত্র সারিগানের উল্লেখ করছি-

ঝাড়িয়া বান্ধিও মাথার কেশ, রূপের বাহার গো

বাহার গো ঝাড়িয়া বান্ধিও মাথার কেশ \

আউলা চুলের বাউলা খোঁপা বাহার তাতে নাই

বেণীর খোঁপায় ফুল গুঞ্জিলে পাগল হইয়া যাই।

রূপের বাহার গো-

জল ভরিতে না লয় মনে প্রাণ সই গো

কেমনে যাব যমুনারি ঘাটে \

রাধিকা যমুনায় যায় গো হেলিয়া ঢলিয়া।

পাছে পাছে কানু চলে মুরলী বাজাইয়া \ (প্রাণ সই গো)

চলতে গেলে বাজে রাধার চরণে মেথুর

তার মধ্যে কালা মেঘে আসমান করলো ঘোর \

কেমনে ভরে জল রাধা মেঘে হইল আন্ধি

মাডির কলসী ভাইঙ্গা গেল হাতে রইল কান্দি \

থাপ্পি খেলায় ব্যবহৃত অসংখ্য ছড়ার দু’টি-

এলকডি বেলকডি তিনকড়ি দাসী

শ্যামের উক্কা নলের বাঁশি

শ্যাম গেল নদীয়াপুর

তুইল্যা আনলো চাম্পা ফুল

চাম্পা ফুলের গন্ধে

জামাই আয়ে (বর আসে) আনন্দে।

থাপ্পি খেলার অন্য একটি ছড়া-

ফুলে ফুলে ফুলনটি/ একেতে দোলনটি/ একেতে তেলনটি। জামো জামো জামোটি/ বকুল বকুল বকুলটি/

পঞ্চে পাখা তোমার মুখে ঢাকা/ ছয়ে রেখা সাতে শোলক বলা/ আটে পঙ্খি উড়া নয়ে নব্বই জোড়া/

দশে পড়লো জোড়া/ এগারোয় একটি/ বারোয় ঝাপটি/ তেরোয় তেসরি কাটা/ চৌদ্দয় রূপার বাটা/

পনেরোয় পানের খিলি/ ষোলয় ঝাপটি তুলি।

হাডুডু খেলায় ব্যবহৃত অজস্র ছড়া থেকে-

হাডুডু কানাইয়া নৌকা দিলাম বানাইয়া

নৌকা যদি লড়ে

কিল খাইয়া মরে

মরে মরে ……..

মালাই খেলায় ব্যবহৃত ছড়া-

(তর্জনী তুলে) : এইডা কি?

: বলাই।

: এক ডুবে পালাই।

এরপর ডুব দিয়ে পালাবে একজন, অন্যজন তাকে খুঁজে বের করবে। বৃষ্টির জন্য প্রার্থনায় আয়োজিত ব্যাঙবিয়ে খেলাতেও আছে প্রচুর গান; কিন্তু বাঙালির সমস্ত লোকখেলাকে পিছনে ফেলে এগিয়ে এসেছে ফুটবল-ক্রিকেট। বিদেশ থেকে আসা এসব অসুরো খেলায় কোনো সুর নেই- ছড়া বা কবিতা নেই। কেউ কেউ অবশ্য খেলায় ব্রাজিলীয় ছন্দ-আর্জেন্টাইন তাল খুঁজে পান, ব্রাজিলীয় থাম্বানাচে আনন্দ খুঁজে ফেরেন। কিন্তু ফুটবল-ক্রিকেট নিয়ে আমাদের এত যে উন্মাদনা, সে উন্মাদনা কি আমাদের সৃষ্টিশীল জগতকে সেভাবে নাড়া দিতে পেরেছে?

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সাদা-কালোর যুগে খেলা নিয়ে তেমন কোনো ছবি হয়েছি মনে করতে পারছি না। আজিজ আজহার নামে একজন পরিচালক ‘চোখের জলে’ নামে একটি ছবি তৈরি করেন; ১৯৭৪-এর জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ছবিটি মুক্তি পায়। রাজ্জাক-কবরী অভিনীত ছবিটিতে আমরা নায়ক রাজ্জাককে একটা ফুটবল নিয়ে নাড়াচাড়া করতে দেখেছি এবং গোটা তিন দৃশ্যে তাকে খেলোয়াড়ের পোশাকে পর্দায় চলাচল করতে দেখেছি; এর বেশি নয়। স্বাধীনতার অনেক বছর পর ২০১০-এ মুক্তি পায় ‘জাগো’ নামে একটি চলচ্চিত্র; ছবিটির কাহিনী-চিত্রনাট্য ও পরিচালনা করেন খিজির হায়াত খান। ছবিটিতে সামান্য কিছু বিচ্যুতি থাকলেও এ ধরনের ছবির জন্য পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। বাংলাদেশের কবিতায় মনোযোগ দিলে আমরা জসীমউদ্দীন-এর ‘হাসু’ কাব্যগ্রন্থে (১৯৩৮) ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ শিরোনামে একটি কবিতা দেখতে পাই; আর বিশ্বকাপ ফুটবল অথবা ওয়ার্ল্ডকাপ ক্রিকেট চলাকালে নানান পত্রিকায় ছড়া পড়েছি বিভিন্ন জনের, যার অধিকাংশকেই ‘ওয়ানটাইম’ মনে হয়েছে।

বিশ্বকাপে বিশ্ব কাঁপে চায়ের কাপে ঝড়

ঘরে ঘরে বিভক্ত সব স্বজন হলো পর

বাংলারাকাশ রঙিন হলো ভিন-পতাকা ওড়ে

উত্তেজনায় ছুটছে সবাই কার সাথে কে ঘোরে

গোল করে দেয় ঈশ্বরের হাত জিকো অবাক খেলে

মহাকাশের তারকা কে সবার সেরা পেলে।

এ জাতীয় ‘ওয়ানটাইম’ ছড়া বা কবিতা যথেষ্টই লেখা হয়। কিন্তু কালোত্তীর্ণ রচনা কি আমরা পেয়েছি? বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে খেলা নিয়ে আমরা একমাত্র ‘জাগো’ ছাড়া উল্লেখ করার মতো কোনো ছবি না পেলেও ভারতে, বিশেষত মুম্বাইয়ে বেশকিছু চলচ্চিত্র নির্মাণের বার্তা আমরা পাই। আমরা দেখি ১৯৭৭-এ মুনশি প্রেমচান্দ-এর গল্প অবলম্বনে বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় দাবা খেলা নিয়ে নির্মাণ করেন এক অনবদ্য চলচ্চিত্র ‘সৎরঞ্জ কী খিলাড়ি’; ১৯৮৪-তে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রযোজনায় মুক্তি পায় সাঁতার নিয়ে ছবি ‘কোনি’। মতি নন্দীর কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত ‘কোনি’ ছবির চিত্রনাট্য ও পরিচালনা করেন সরোজ দে। ছবিটি ব্যবসাসফল না হলেও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হয়। মতি নন্দীর কাহিনী নিয়ে অমরা নির্মিত হতে দেখি ‘স্টপার’। মতি নন্দীর ‘স্টাইকার‘সহ আরও কিছু রচনায় আমরা খেলাধুলার প্রসঙ্গ উচ্চারিত হতে দেখেছি। মুম্বাইয়ের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে আমরা ১৯৯২-এ মুক্তি পেতে দেখেছি আমির খান অভিনীত ‘জো জিতা ওহি সেকান্দর’ ছবিটি; যে ছবিতে সাইকেলিংকে উপজীব্য করা হয়েছে বিষয় হিসেবে। ছবির পরিচালক ছিলেন মনসুর খান। আমির খান অভিনীত ‘লগন’-এ ক্রিকেট খেলাকে উপজীব্য করা হয়েছে। লগন ছবিটি মুক্তি পায় ২০০১-এ। ২০০৭-এ শাহরুখ খান অভিনীত সিমিত আমিন পরিচালিত ‘চাক দে ইন্ডিয়া’ ছবিটি মুক্তি পায়, যে ছবির বিষয় হিসেবে এসেছে মেয়েদের হকি খেলা। আলী আব্বাস জাফরের পরিচালনায় ২০১৬-তে মুক্তি পায় সালমান খান অভিনীত ‘সুলতান’ ছবিটি; যদিও ‘সুলতান’ ছবিটি অশুদ্ধ বক্সিং খেলা নিয়ে তৈরি হয়েছে; ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে রাজেশ ওমপ্রকাশ মেহেরার পরিচালনায় মুক্তি পায় ‘ভাগ মিলখা ভাগ’, ছবিটির উপজীব্য করা হয় দৌড়কে। ২০১৬-তে দুটি ছবি মুক্তি পায়, যার একটি কুস্তিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে স্বর্ণজয়ের স্বপ্ন পূরণের গল্প নিয়ে নিতেশ তিওয়ারি পরিচালিত আমির খান অভিনীত ছবি ‘দাঙ্গাল’ এবং অন্যটি নিরাজ পাণ্ডে পরিচালিত ভারত ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক এমএস ধনির জীবনভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘এমএস ধনি’। যদিও ভারতের বিশাল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি বিবেচনায় এগুলো সামান্যই।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-এর শ্রীকান্ত উপন্যাসে ‘বাঙালী ও মুসলমান’ ছাত্রদের মধ্যে ফুটবল খেলার বার্তা পড়েছিলাম, “ইস্কুলের মাঠে বাঙ্গালী ও মুসলমান ছাত্রদের ফুটবল ম্যাচ। সন্ধ্যা হয় হয়। মগ্ন হইয়া খেলা দেখিতেছি। আনন্দের সীমা নাই। হঠাৎ ওরে বাবা এ কি রে! চটাপট শব্দ এবং মারো শালাকে, ধরো শালাকে!….. পাঁচ-সাতজন মুসলমান-ছোকরা তখন আমার চারিদিকে ব্যূহ রচনা করিয়াছে পালাইবার এতটুকু পথ নাই।” (শ্রীকান্ত প্রথম পর্ব)। শরৎচন্দ্রের সে ভাষ্যে ‘মুসলমানরা বাঙালি নয়’! ভেবে দুশ্চিন্তায় পড়েছিলাম। হয়তো শরৎবাবু সে সময়ের বাস্তবতাই তুলে ধরেছিলেন তাঁর রচনায়। সে গবেষণায় আমার প্রয়োজন নেই; আমি দেখতে চাই খেলা নিয়ে আমাদের শিল্প-সাহিত্যে আগ্রহের দিকটি এবং উন্মাদনার পরম্পরা। ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় মোহনবাগান ¯েপার্টিং ক্লাব; ১৯১১ সালে ২৯ জুলাই ইংরেজ-বাঙালি খেলায় জয়ী হয়েছিল মোহনবাগান। সেই জয় নিয়ে দেখা গেছে বাঙালির উন্মাদনা। ফুটবলে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা প্রত্যক্ষ করা গিয়েছিল সেদিন। সে খেলায় মোহনবাগান দলের ১১ জনের ১০ জনই ছিলেন পূর্ববঙ্গের খেলোয়াড়। ফুটবল প্রসঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দের বাণী “পদাঘাতের বিপরীতে পদাঘাত কেবলমাত্র ফুটবলেই সম্ভব।” জাতীয়তাবাদী চেতনার কথাই মনে করিয়ে দেয়। ১৩১৮ বঙ্গাব্দে ‘মানসী’ পত্রিকার আশ্বিন সংখ্যায় মুদ্রিত করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়-এর কবিতা পড়েও সেই জয়ে বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনার চিত্র প্রত্যক্ষ করা যায়। কবিতার কিছু অংশ উদ্ধৃত করছি-

জেগেছে আজ দেশের ছেলে পথে লোকের ভীড়,

অন্তঃপুরে ফুটলো হাসি বঙ্গরূপসীর।

গোল দিয়েছে গোরার গোলে বাঙালির আজ জিত,

আকাশ ছেয়ে উঠছে উধাও উন্মাদনার গীত।

আজকের এই বিজয়বাণী ভুলবে নাকো দেশ,

সাবাশ সাবাশ মোহনবাগান খেলেছ ভাই বেশ। করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়-এর কবিতাটি পরবর্তীতে সুর করে গীত হয় এবং যথেষ্ট জনপ্রিয়তাও পায়। ফুটবল নিয়ে উন্মাদনার আরও চিত্র আছে আমাদের কাছে। ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে সেই মোহনবাগান যখন ইংরেজ ফুটবল ক্লাবকে পরাজিত করে, তখনও বাঙালির উন্মাদনা দেখেছে জাতি। স্বয়ং কবি কাজী নজরুল ইসলাম, যিনি ১৯২০-এর দশকে ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছিলেন, ইংরেজ বিরোধিতার জন্য তাঁর বই তখন বাজেয়াপ্ত হচ্ছে, ইংরেজের বিরুদ্ধে কবিতা লেখার দায়ে জেলে গেছেন; নজরুল তখন সওগাত পত্রিকায় কাজ করছেন। ইংরেজ ক্লাবের বিরুদ্ধে বাঙালির বিজয়ের আনন্দে দিশাহারা নজরুল সেদিনই ‘ইংরেজ-বধ’ উদযাপন করতে শিয়ালদা স্টেশান থেকে ট্রেনে চেপে চলে আসেন ঢাকায়। এ প্রসঙ্গে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত তাঁর ‘কলোল যুগ’ গ্রন্থে বলেন, “সুতরাং খেলার মাঠ থেকে সোজা শেয়ালদা এসে ঢাকার ট্রেন ধরল তিনজন। দীনেশরঞ্জন, নজরুল আর নৃপেন।” (পৃষ্ঠা-১২৬) তিনি আরও বলেন, “ঢাকার লোক যখন এমন একটা অসাধ্য সাধন করল তখন মাঠ থেকে সিধে ঢাকায় চলে না যাওয়ার কোনো মানে হয় না। যে দেশে এমন একজন খেলোয়াড় পাওয়া যায় সে দেশটা কেমন দেখে আসা দরকার।” (পৃষ্ঠা-১২৬)। জানা যায় ইংরেজ ক্লাবের বিরুদ্ধে সে খেলায় ঢাকার খেলোয়াড় মনা দত্ত ও রবি ঘোষ বেশ ক’টি গোল করেছিলেন।

বোঝা গেলো, ফুটবল খেলা নিয়ে বাঙালির উন্মাদনা দীর্ঘদিনের। আমরা যদি ১৯৭১-এ মুক্তি পাওয়া কলকাতার ‘ধন্নিমেয়ে’ চলচ্চিত্রের সেই গানের দৃশ্যটির কথা স্মরণ করি, সেখানেও দেখবো ফুটবল খেলা নিয়ে বাঙালির উন্মাদনার চিত্র।

সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল।

কী মধু আছে ঐ তোমার নামে বাবা ফুটবল।

তোমাকে লাথায় কত বুট পরা কত পা

এতো লাথি খাও তবু মুখে কিছু বল না (২)

পুড়ে মরো রোদ্দুরে কাদা মাখো বর্ষায়

তবু ফুলে ফেপে থাকো অবিচল।

জীবনে মরণে পায়ে পায়ে আছো ফুটবল \

আড়াইশ বছরের জমিদারী ঘুচে গিয়ে

দেশ ছেড়ে পালিয়েছে ইংরেজ

নখ-দাঁত ভাঙা সে-যে মৃত সিংহ সে-যে

নেই তার জারিজুরি নেই তেজ।

তবু মানতে তো বাধা নেই (২)

সেই তো শিখালো এই ফুটবল

তারই দৌলতে ভাই অমর হয়েছে নাম

মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল

কী মধু আছে ঐ তোমার নামে বাবা ফুটবল \

পশ্চিমবঙ্গের অসংখ্য ছবিতে আমরা ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান নিয়ে বিবাদ দেখেছি, উন্মাদনাও প্রত্যক্ষ করেছি, কিন্তু বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে তেমন দৃশ্যের অবতারণা হতে দেখিনি; যদিও আবাহনী-মোহামেডান-এর দ্বৈরথ বাংলাদেশ বহুবার প্রত্যক্ষ করেছে মাঠে এবং গ্যালারিতে। খেলার সাথে যখন দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আবেগ জড়িত; খেলা যখন মানুষের সুস্থ বিনোদনের অন্যতম; খেলা যখন আমাদের দেহ-মনকে সতেজ-সজীব রাখে, তখন খেলাধুলার বিকাশের বিষয়টিকে আমাদের সবার বিবেচনায় আনা আবশ্যক নয় কি? আমাদের শিল্প-সাহিত্যাঙ্গনের সৃষ্টিশীল মানুষেরা যদি সাধারণের আবেগকে তাঁদের রচনায়-চিত্রকলায়-সঙ্গীতে-চলচ্চিত্রে বাক্সময় করে তোলেন এবং জীবনের জন্য খেলাধুলার আবশ্যিকতার বিষয়টিকে ফুটিয়ে তোলেন, তাতে হয়তো কর্পোরেট গোষ্ঠী এবং মিডিয়ার অপশাসনের পরও আমাদের জীবনে সামান্য সুবাতাস বয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে সরকার যদি খেলা নিয়ে আমাদের সাধারণ্যে যে উন্মাদনা, তাকে কাজে লাগিয়ে সুস্থ-নিরোগ-বলবান জাতি গড়ার কাজে মনোযোগী হয়, ক্রীড়া-শিল্প-সাহিত্য- সংস্কৃতি বিকাশে প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা দান করে; আশা করা যায় জাতির সামনে আজ জঙ্গিবাদ-ধর্মান্ধতা-ক‚পমণ্ড‚কতা-কুশিক্ষা-ধর্ষণ-সামাজিক অনাচার; ইত্যাদির মতো যেসব অনড় সমস্যা রয়েছে, তা থেকে মুক্তির একটা দিশা খুঁজে পাবে মানুষ। সমাজে ‘টুণ্ডামানসিকতা’র মানুষ দিন দিন যতই বাড়ছে, তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অনাচার-দুর্বৃত্তায়ন। মননের অচলায়তন ভেঙে আমরা যদি সুস্থ সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে নিজেদের পরিশুদ্ধ করে নেবার সুযোগ পাই; নিয়মিত খেলাধুলা চর্চায় যদি আমরা শরীর-মনকে অবসাদমুক্ত করে নিতে পারি; তাহলেই প্রাগ্রসরতার কাছে পরাস্ত হবে বিকলাঙ্গ-অন্ধ জঙ্গিবাদ-ধর্মান্ধতা-ক‚পমণ্ড‚কতা-কুশিক্ষা-ধর্ষণসহ যত সামাজিক অনাচার। বিশ্বকাপ যার ঘরেই যাক, কর্পোরেট গোষ্ঠী আর মিডিয়ার চক্রান্তে আত্মঘাতী হবো না-স্বজনঘাতিও নয়। বিশ্বকাপ যার ঘরেই যাক, তার জন্য আমাদের অভিনন্দন নিশ্চয়ই থাকবে; পাশাপাশি নিজেদের মধ্যে এই প্রতীতিও থাকবে, আমরা যেন ভিনদেশি পতাকা উড়িয়ে-বাজি পুড়িয়েই থেমে না যাই; নিজেদের আগামী দিনের বিশ্বকাপে শামিল করতে সবদিক দিয়ে প্রস্তুত করে তুলি।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj