গোল! ঘটনা কিন্তু লম্বা…

শুক্রবার, ১৩ জুলাই ২০১৮

** ইলিয়াস বাবর **

বাঙালির সরলতা সর্বজনীন- গপ্প-মজলিস-যাপনে তা বেরিয়ে আসে; কখনোসখনো সামগ্রিক জাতিসত্তার সিম্বল হিসেবেও তা চিহ্নিত হয়ে যায় পরম্পরায়। বলা দরকার, এ সরলতার আবহের মধ্য দিয়ে বাঙালি নির্মাণ করে কাঠিন্য- ক্রমশ তাও মিশে যায় দৈনন্দিনতায়। অনিশেষ গপ্পপ্রীতিতে বাঙালির আরেক আসক্তির নাম বিশ্বকাপ! বিশ্বকাপ মানে ফুটবলের সর্বোচ্চ ক্রীড়াযজ্ঞ। পৃথিবীর তাবৎ বুঝদার-বেবুঝ লোক সরাসরি কিংবা টিভি পর্দায় কিংবা লোকমুখে উপভোগ করে ফুটবলের সৌন্দর্য। বাঙালি টিভির পর্দায় দেখে, পত্রিকার বাহারি আয়োজন থেকে ধার নিয়ে জব্বর চাপাবাজি চালিয়ে যায় অফিসে, বাড়িতে এবং বৈঠকে। খেলা শেষ হয়েছে রাত ২টায় কিন্তু আড্ডা শেষ হতে হতে সূর্যমামা উদয় হবার দশা! কোথাকার কোন দেশ, তাও মহাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে অথচ আগন্তুকের মনে হতে পারে- বাঙালি জীর্ণ-কুটির কি প্রসাদেই হয়ে গেল ম্যাচটি। বাস্তবতা এমন, আমাদের দাদা কি দাদার বাপের নাম মনে না থাকলেও মনে আছে ম্যারাডোনা কখন হাতে গোল দিয়েছিল, কখন কোমর দোলায় মুগ্ধ করেছিল রজার মিলা! বাদ যায় না আমাদের সাহিত্য। সাহিত্য যেহেতু সামগ্রিক জীবনের নির্যাস- বাদ যায় না খড়কুঁড়োও। তা অমন উন্মাদনাজোগানো ফুটবল কেন বাদ যাবে আমাদের সাহিত্য থেকে, সাহিত্য-আয়োজন থেকে, প্রিন্ট কি অনলাইন বিশেষ সংখ্যা থেকে? চার বছর পরপর পাওয়া পৃথিবীর অন্যতম আকর্ষণীয় এ আয়োজনের সাথে ডলারের বিশেষ সম্পর্ক আছে, আয়-রোজগারের ধান্ধা আছে, কেনা-বেচার ব্যাপার আছে, সম্প্রচার-স্বত্বের বিষয় আছে তা থাকবেও। কিন্তু বাঙালির ফুটবলপ্রীতিতে আছে কেবলই ভালোবাসা- ভালোবাসার সাথে যা কিছু তিক্ততা তাও!

প্রিয় পাঠক, আপনারা নিশ্চয়ই ইমদাদকে ভুলেননি! তা ভুলি কেমন করে! কবি জসীমউদ্দীন এর সেই নায়ক ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ ইমদাদকে আমরা পলে পলে স্মরণ করি মাঠে-ঘাটে, আমাদের রাঙা কি বিবর্ণ শৈশবে। প্রায় একই রকম, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যতিক্রমহীন শৈশব আমাদের- ফলে, দেখা হয়ে যায় ইমদাদেও, কখনোবা নিজেই হয়ে যাই ইমদাদ! ইমদাদ কেমন ছিলেন? এ প্রশ্ন অনেকের সাথে আমাদেরও কিন্তু কবি জসীমউদ্দীন সে সুযোগ না দিয়ে সুদারুণ কাব্যিকতায় তুলে আনেন আমাদের ইমদাদকে, আমাদের শৈশবের যত দুষ্টামি আর দস্যুপনাকে। কবিতার বয়ানে দেখা যাক তবে- ‘আমদের মেসে ইমদাদ হক ফুটবল খেলোয়াড়,/ হাতে পায়ে মুখে শত আঘাতের ক্ষতে খ্যাতি লেখা তার।/ সন্ধ্যাবেলায় দেখিবে তাহারে পটি বাঁধি পায়ে হাতে,/ মালিশ মাখিছে প্রতি গিঁটে গিঁটে কাত হয়ে বিছানাতে।/ মেসের চাকর হয় লবেজান সেঁক দিতে ভাঙ্গা হাড়ে;/ সারা রাত শুধু ছটফট করে কেঁদে কেঁদে ডাক ছাড়ে।’ ফুটবলের সাথে আঘাতপ্রাপ্তির দারুণ সখ্য, যাকে হালআমলে ইনজুরি বলে দিব্যি চালিয়ে দেই আমরা। ইমদাদের জন্য হয়তো কারো দুঃখ লাগে না কিন্তু ইনজুরিগ্রস্ত রোনালদো কিংবা নেইমারের ভারাক্রান্ত মুখের সাথে মিলে যায় আমাদের কপালের চিন্তারেখা। হয়তো সাপোর্ট করা দেশের জাতীয় ফুটবল দলের কোচেরও অমন টেনশন নেই যতটা বাঙালির। আসলে বাঙালির ভালোবাসাটা নিখাদ বলে, এখানে বাড়াবাড়ি একটু বেশিই, গালাগাল করার পরক্ষণেই গলাগলি করার নজির তো বাঙালিরা করে! আহা, ম্যারাডোনা ডোপটেস্টে পজেটিভ হয়ে নিষিদ্ধ হলেন ফুটবল থেকে অথচ আর্জেন্টাইনদের সমান দুঃখী হয়ে কাঁদছে ব-দ্বীপের ফুটবলপ্রেমীরা। লোকমুখে শোনা যায়, এই ম্যারাডোনা নাকি আমাদের দেশের নামই জানেন না! এই হলো গিয়ে বাঙালির প্রেম, কিছুদিন আগে তিন ব্রাজিলিয়ান সাংবাদিক তা উপলব্ধি করে গেছেন, হয়তো অদূর ভবিষ্যতে উপলব্ধি করবেন আরো অনেকেই।

কবি জসীমউদ্দীন বুকের কাছেই থাক, আরেকটু ঘুরে আসা যাক, অন্যদৃষ্টি থেকে। ‘সবুজ পত্র’র প্রমথ চৌধুরী কিন্তু বেশ জোর দিয়েই বলেছিলেন ক্রীড়ার কথা- ‘মানুষের দেহমনের সকল প্রকার ক্রিয়ার মধ্যে ক্রীড়া শ্রেষ্ঠ, কেননা তা উদ্দেশ্যবিহীন।’ এই ‘উদ্দেশ্যবিহীন’ ক্রিয়ার জন্য আজকের দিনের হাহাকার-রোদন, রীতিমতো তুমুল প্রতিযোগিতার কথা কি চলতিভাষা চালু করা ঝানুলোকটির মানসপটে আসেনি? তিনি কি সমুখের দিকে তাকিয়ে দেখতে পাননি ফুটবল খেলোয়াড়দের রীতিমতো স্বর্ণখণ্ডের দামে বিভিন্ন ক্লাবে চুক্তির কথা? আহা, এই ফুটবল নিয়ে নানা মিথ চালিত আছে, নানা গল্প প্রতিনিয়ত ঢালপালা মেলে এবং অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের উৎপত্তি হয়েছে ফুটবলে বিনিয়োগ ও সম্প্রচারণে। এটা তো সত্য বিশ্বসংঘের চেয়েও বেশি ফিফার সদস্য সংখ্যা! মানুষের পাশে দাঁড়ানো, মানবিক হওয়ার ক্রিয়ায় ফুটবল ও ফুটবলারদের সংযুক্তি আমাদের বেশ আশান্বিত করে। বিভিন্ন সময়ের ফুটবললিজেন্ডের ফুটবল খেলিয়ে প্রাপ্ত অর্থে সহায়তা করা হয় অসহায়দের, নাখাভুখাদের। এমনতর চমৎকার ইচ্ছের সাথে আমাদের চোখ একটু দূরে গিয়ে হয়তো আশির দশকই হতে পারে- দেখে ওঠে এ দেশের আবহানী-মহামেডানের ফুটবলযুদ্ধের চিত্র। উপচেপড়া দর্শক, পাগলপ্রায় চিৎকার ও দুইভাগে ভাগ হয়ে যাওয়া শুধু ফুটবলকে কেন্দ্র করে- এরকম বিরল অথচ প্রায় দৃশ্যমান চেহারা আমরা ফুটবলের বদৌলতে দেখতে পাই অহরহ। এই ধরুন, এই বিশ্বকাপ শুরুর প্রক্কালে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও দুটি ধারা ক্রমশ বহমান দেখতে পেয়েছি, তা একই পরিবারে ভেতরেও! ল্যাটিন দুটি দেশ প্রতিবেশী হয়ে হয়তো শান্তি-সুখে নিজের নিয়ে মগ্ন আছে, নিজেদের খেলায় ধ্যান রাখছে কিন্তু বাংলাদেশে প্রতিবেশীর শ্রদ্ধা দূরে থাক, ভাই-ভাই পরস্পরে মুখোমুখি পতাকা টাঙানো নিয়ে, খেলার আগাম ফলাফল নিয়ে, দোকানে-বাড়িতে কিংবা পাড়ার মোড়ে টাঙানো বড় পর্দায় দেখা খেলার নানাবিধ বিষয়াশয় নিয়ে। কোন দলের কোন তারকার খেলোয়াড়টি গোল দিতে পারেনি, কে বড়বেশি অভিনয় করেছে, কাদের ফুটবল ইতিহাস কতবেশি সমৃদ্ধ তা নিয়ে যত মাথাব্যথা। এই মাথাব্যথা কখনোসখনো মাথা-ফাটানোর মতো জটিলতায় চলে যায়, দুই সমর্থকের তর্ক হয়ে যায় দুই এলাকার প্রেস্ট্রিজ। কোন দলের পতাকা কত বড় হলো, কাদেরটা বেশি দেখা যায়- সেইসাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোন দলের খবরাখবর বেশি, কোন ক্লাবে প্রিয়দলের কোন তারকা খেলে এসব নিয়ে বাঙালির বিশ্বকাপ মৌসুম যারপরনাই দারুণ কাটে। এই তর্কের অবসান হয় যখন, দুটো দল- কেউ আগে, কেউ পরে বিদায় নেয় বিশ্বকাপমঞ্চ থেকে। আহা, দল হারার শোকে কেউবা উন্মাদ- কেউ নাওয়াখাওয়া ভুলে গিয়ে, ফেসবুকের মাতামাতি ডিএ্যাকটিভ করে একেবারে সাধু হয়ে যায়। এ ছাড়া আসলে আর কোনো উপায়ই থাকে না তুমুল সমর্থকদের- তারা বড় বেশি আক্রান্ত ফুটবল দ্বারা, নিজের সমর্থন করা প্রিয় দল দ্বারা। কাগজে তো একবার শিরোনামই হলো, জমি বিক্রি করে প্রিয় ফুটবল দলের বিরাটাকার এক পতাকা বানালো এক পাগল সমর্থক! হাতাহাতি, কথাবিনিময়, তর্ক এসব সৌন্দর্য নিয়েই বাঙালির বিশ্বকাপ দর্শন এক আশ্চর্য দর্শনই। তবুও বাঙালি লেখক ভোলেন না তার পরিচয়। আত্মপরিচয়ের কুলীনতায় বাইরের সব সৌন্দর্যই ¤øান লাল-সবুজের কাছে। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা- সমর্থকদের অসাধারণ উন্মাদনার ভেতরেও কবি আল জাবিরী বলে ওঠেন এই কথা- ‘আমার গায়ে হলুদ দেখে/ তোমার ওঠে জ্বর/ নীল-সাদা ওই মুক্ত আকাশ/ ভাবছি না তো পর।/ পর ভাবি না ঘরকে আমি/ আপন করে রাখি/ নীল সাদা আর হলুদ মিলে/ আলোর মাখামাখি।/ তোমার আমার এক ঠিকানা/ লাল সবুজের মাটি/ এই মাটিকে ভালোবেসে/ সবাই হবো খাঁটি।’ খাঁটি হবার শিক্ষা আমাদের নিতেই হয়। বিশ্বকাপে বিশ্ব-কাঁপার চিত্র আমরা মুকুল শাহরিয়ার-এর ‘বিশ্বকাপ জ্বর’ ছড়ায় দেখতে পাই এমনভাবে- ‘পুরোটা দেশ কাঁপছে এখন/ বিশ্বকাপের জ্বরে/ এ জ্বর মাপার থার্মোমিটার/ নেই তো কারও ঘরে।/ জ্বর কমানোর জন্য তো নেই/ সিরাপ এবং বড়ি/ আজব এ জ্বর বাড়ে-কমে/ মিলিয়ে হাতঘড়ি।/ জ্বরের আবার প্রকার আছে/ সবুজ-সাদা-লাল/ হলুদ এবং আকাশিতেই/ দেশটা বেসামাল।’ এই বেসামাল পরিস্থিতির ৪ শিকার ফুটবলপাগল সব বয়েসি মানুষই। রাত জেগে খেলা দেখা, খেলাশেষে প্রিয় দলের বিজয়ে মিছিল করা, আতশবাজি ফাটানো ইত্যাদিতে ক্লান্তি নেই কারো। প্রিয়দলের বিজয়ে যেনবা বিয়েবাড়ির আনন্দ। প্রিয়দলের পরাজয়ে একেবারে কবরের নিস্তব্ধতা। বিপরীত উদযাপন নির্ধারণের মুখ্য নির্ণায়ক খেলার ফলাফল। এই ফল নিয়ে টিপ্পনি চলে, কথা কাটাকাটি চলে, হাসাহাসি আর গালাগালি চলে। কখনো আহত কিংবা নিহত হয় বেচারা টেলিভিশটাই! তবুও সে চুপ থাকে; ওদিকে বিপরীত দল করা সমর্থকদের তখন আনন্দ রাখার জায়গাই নেই এই বদ্বীপে। আসলে উপলক্ষপ্রিয় বাঙালিরা দূর-নিকট হিসাব করে না, লাভ-ক্ষতির তো প্রশ্নেই আসে না, আপন করে নেয় বিনাশর্তেই। ফুটবলকে মন দেয়ার এই ইতিহাসে প্রতিনিয়ত যোগ হতে থাকে পাগলামি, তাতে হাওয়া দেয় ফেসবুকসহ যাবতীয় যোগাযোগ মাধ্যম।

ইংরেজেরাও চেয়েছিল বাঙালির ফুটবলপ্রেম দিয়ে ভুলিয়ে দেয়া যাবে জাতীয়তাবাদ। বাঙালি হাসতে জানে, কাঁদতে জানে, গল্পবাজ হলেও অধিকারের প্রশ্নে আপসহীন এটা ভুলে যাওয়া চলবে না কোনোভাবেই। নগেন্দ্র প্রসাদের হাত ধরে ঔপনিবেশ বাঙালি ঢুকে যায় ফুটবলে। তখনো অবশ্য ফুটবলকে মেনে নেয়ার মতো ভাবনার অবসর আমাদের হয়ে ওঠেনি। তার নানাবিধ কারণও তৎসময়ের সমাজবাস্তবতায় বজায় ছিল। সত্যেন্দ্রকুমার বসু যেমনটি লেখেন ১৩৩৫সনে- ‘ইহা (ফুটবল) বিজাতীয় বিদেশীয় খেলা, পরন্তু ইহা বহুব্যয়সাধ্য খেলা। এই হেতু ইহা আমাদের ধাতুসহ নহে। আমাদের জাতীয় খেলা হাডুডুডু (চুচু অথবা সেল কপাটি) অথচা গুলীডাণ্ডা আমাদের ধাতুসহ। এই দরিদ্র দেশে যে খেলায় গাঁটের কড়ি ব্যয় নাই, সেই খেলাই আমাদের মতো দরিদ্র জাতির ধাতুসহ।’ এটা ইংরেজশাসিত আমলের চিত্র হলোও বর্তমানেও যেকোনো বিষয়ের সাথে ধর্মের মেলবন্ধন সম্ভবত বাঙালির সবচেয়ে বড় অভ্যেস। না হয় শরৎচন্দ্রের মতো বাঙালির নাড়িনক্ষত্র জানা সাহিত্যিক কী করে বলেন- ‘ইস্কুলের মাঠে বাঙ্গালী ও মুসলমান ছাত্রদের ফুটবল ম্যাচ।’ অবাক হলেও আমাদের মানসভিত্তিকে আমরা কোনোভাবেই ভুলতে পারি না, এজন্য দায়ী বাস্তবতা, একচোখা চরম ছোটলোকি। বিশ্বব্যাপী এগিয়ে যাবার মাহেন্দ্রসময়েও কেন রজারমিলাকে বলতে হয়, আমি আফ্রিকান বলে, আমি কালো বলে আমাকে মূল্যায়ন করা হয়নি। এমনি এমনি তো কথা আসে না, দুঃখীভাব আসে না, বর্ণবাদী আচরণ এখনো আছে ফুটবল মাঠে, আমাদের পরিপার্শ্বে। যাহোক, সতীশচন্দ্র ঘটক ‘খেলা’ শিরোনামের লেখায় ১৩২৪ সনে প্রকাশ করেন এমন ‘অনেকে খেলা বললে বোঝেন বাজে কাজ- অর্থাৎ যার কোনো মূল্য নেই, প্রয়োজনীয়তা নেই- যা কেবল কোনোরকমে সময় অতিবাহিত করবার উপায়। … খেলাতে সমাজের কি উপকার হয়, দশের কি উপকার হয়?’ যেকোনো নতুন কিছুরই উপকার দ্রুত আসে না, হৃদয়ঙ্গম করার ব্যাপার তো সব সময় থাকে! ১৯১১ সালে এই উপমহাদেশে ইংরেজ দলকে পরাজিত করে মোহনবাগান স্পোর্টস ক্লাব। সেই ম্যাচ দেখতে বাঙালির বিশেষ আগ্রহ কিংবদন্তিতুল্য। তা শুধু এগারোজনের দলে দশজন পূর্ববঙ্গের বলে নয় বরং নতুনকে স্বাগত জানানোর পথে এগিয়ে যাওয়া। তখন থেকেই ফুটবল বাঙালির জাতিয়তাবাদী আবেগের অন্যতম হাতিয়ার, যা কি না সবিস্তারে দেখতে পাই পার্থ চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘ব্লুাক হোল অব এম্পেয়ার’ বইতে। আরো মজার বিষয় যুক্ত হতে থাকে মোহনবাগের ইংরেজবধের সাথে সাথে। ‘মানসী’ পত্রিকায় করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায় লেখেন এমন কবিতা- ‘জেগেছে আজ দেশের ছেলে পথে লোকের ভিড়/ অন্তঃপুরে ফুটল হাসি বঙ্গরূপসীর/ গোল দিয়েছে গোরার গোলে বাঙালি আজ জিত/ আকাশ ছেয়ে উঠছে উধাও উন্মাদনার গীত।/ আজকের এই বিজয়বাণী ভুলবে নাকো দেশ,/ সাবাশ সাবাশ মোহনবাগান খেলেছ ভাই বেশ।’ তারও পর ১৯২৮ সালে মোহনবাগানের আরো বড় অর্জনে কাজী নজরুল ইসলাম লেখেন- ‘যে চরণ দিয়ে ফুটবল নিয়ে জাগাইলে বিস্ময়,/ সেই চরণের শক্তি জাগুক আঁধার ভারতময়।/ এমনি চরণ-আঘাতে মোদের বন্ধন ভয়-ডর/ লাথি মেরে মোরা দূর করি যেন, ‘আল্লাহু আকবর’।’ বলা যায়, ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রথম সংগ্রাম ফুটবলের মতো এ দেশের মানুষ ব্রিটিশদের তাড়াতে সক্ষম হয়। সেই থেকে ফুটবল আর শুধু আনন্দ দেয়া ক্রীড়া নয়, যুগে যুগে তার সাথে যোগ হয়েছে অর্থবিত্তের হিসাব, জাতিয়তবাদী চিন্তার সংশ্লেষ, স্বাধীনতার উন্মাদনা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রাপ্তিতে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের কথা কি আমরা ভুলে যেতে পারি? শব্দসৈনিক-রণাঙ্গনের সৈনিক ও অন্যান্য সেক্টরের সৈনিকদের মতো বিশ্বব্যাপী জনমত গঠনে জাকারিয়া পিন্টুর নেতৃত্বে মাঠে স্বাধীন দেশের পতাকা উড়ানো ছিল সত্যিকার অর্থেই অনন্যসাধারণ এক ব্যাপার। আহা, ফুটবল ম্যাচ শুরু করার আগে মাঠে খেলোয়াড়দের বুকে হাত দিয়ে জাতীয় সঙ্গীতে গলা মেলানোর দৃশ্য কাকে না আবেগতাড়িত করে! খেলার সাথে এভাবে যোগ হয়ে যায় আবেগ, ভালোবাসা আর দেশাত্মবোধ।

ফুটবল নিয়ে তর্ক করার মতো উপাদান অজ¯্র। তর্কের চেয়ে বরং মাঠের শিল্পীদের নিয়ে কথা হোক। বেলোসের ‘দ্য ব্যাজিলিয়ান ওয়ে অফ লাইফ’-এ আমরা দেখতে পাবো ব্রাজিলিয়ানদের ফুটবলপ্রেমের বিচিত্র তথ্য। ডেভিড উইনার তার ‘ব্রিলিয়ান্ট অরেঞ্জ : দ্য নিউরোটিক ব্রিলিয়ান্স অফ ডাচ ফুটবল’ গ্রন্থে দেখান টোটাল ফুটবলের দেশের ফুটবল নিয়ে অসাধারণ সব পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা। কুপারের ‘ফুটবল অ্যাগেইনস্ট দ্য এনিমি’ কিতাবেও ফুটবল নিয়ে সারগর্ভ কথাবার্তার দেখা পাওয়া যায়। আসলে ফুটবল এমনই এক সম্মোহন যাতে বাঙালি তো পড়েই, পড়েছে তাবৎ বিশ্বের বুঝদার সব মানুষই। আচ্ছা, একজন প্লেমেকার যখন তার জালচেরা শটটি দিয়ে পরাস্থ করে গোলকিপারকে, তখন গোলকিপার নিজেকে কি ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ভাবেন? তারও কি তখন নীরবে রক্তক্ষরণ হতে থাকে? আধুনিক ফুটবলে তার কাজও তো সবচেয়ে বেশি মাঠে- পুরো মাঠটা একদম দেখতে পায় বলে হয়তো বিশ্বকাপের প্রায় অর্ধেক দলেরই অধিনায়কের বাহুবন্ধবী থাকে গোলকিপারের বাহুতে। ‘এদুয়ার গ্যালিয়ানো’ ও বিখ্যাত ফুটবল বিষয়ক বই ‘সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো’ বইতে গোলকিপার নিয়ে দারুণ একটি কথা আছে। আফসানা বেগমের অনুবাদে যেমনটি- ‘অনেকে তাকে বলে ডোরম্যান, কিপার, বাউন্সার বা নেট-মাইন্ডার। কিন্তু তাকে আসলে বলা যেতে পারে শহীদ, অনুতাপের আধার কিংবা ঘুষির উপযুক্ত এক ব্যাগ। সে একাকী দূরে দাঁড়িয়ে খেলা দেখার বাধ্য দর্শক। গোলপোস্ট ছেড়ে সে নড়তে পারে না। দুটো পোস্ট আর ক্রসবার তার বরাবরের সঙ্গী। সে যেন ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড়িয়ে প্রতি মুহূর্তে একটা গুলির অপেক্ষা করে।’ গোল হজম করলে গোলকিপার খলনায়ক আর দারুণ কিছু সেভ তাকে দেড় ঘণ্টার মধ্যেই বানিয়ে দেয় অসাধারণ নায়ক। বর্তমানে ফুটবল এমনই গতি আর ট্যাকটিসের মিলন যেখানে ভুল করা যায় না, শক্তির সাথে মাথা দিয়েও যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হয় মাঠের যোদ্ধাদের। কোন দল কেমন খেললো তারচেয়ে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায় খেলার ফলাফল। গোলের সংখ্যা নয় বরং পয়েন্টই শেষ গন্তব্য। এসব নিয়ে বাঙালির বিস্তর আগ্রহ, ফুটবল বিশ্বকাপ আসলে যে কেউ হয়ে যায় ফুটবল বিশেষজ্ঞ। তা ছাড়া আমাদের পত্রিকাকেন্দ্রিক যে জমাট আয়োজন দিনদিন আমরা লক্ষ্য করি, নন্দিত জাতীয়-আন্তর্জাতিক ফুটবল প্লেয়ার দিয়ে দৈনিকে কলাম লেখা চলে সমানতালে। কবি-সাহিত্যিকরা এই অবসরে ফেদে পেলে দারুণ সব কবিতা-গল্প-ছড়া। চোখে কিংবা কলমের ডগায় লেগে থাকে জাতশিল্পীর একেকটি গোলের পরশ। দিনশেষে, এগারোজনের খেলায় নায়ক হয়ে উঠেন একজন গোলদাতাই, একজন সফল স্ট্রাইকারই। এখানেই মূলত ফুটবলের যত রহস্য। বাকি দশজনের কাজই যেন ওই একজনকে হেল্প করা, তার কাছে ডিফেন্সচেরা পাস দেয়া। যত কাণ্ডই হোক ফুটবল নিয়ে, জসীমউদ্দীনের ইমদাদ হাজারবার ফিরে আসুক আমাদের মাঝে, রেফারিকে গালি দেয়া হোক, প্রিয় জার্সি রাগে-ক্ষোভে পোড়ানো হোক- তবুও জেগে থাকে গোল। ফুটবল শেষতক মিলনের খেলা, গোলের খেলা তা অস্বীকার করবে কোন অর্বাচীন!

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj