রাষ্ট্রপতির ‘অনুরোধ’ এবং প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

শুক্রবার, ১৩ জুলাই ২০১৮


আগামী ১৯ জুলাই চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিনক্ষণ নির্ধারণ হয়েছে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশ। এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের এই সংবাদ-গন্ধ পেয়ে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার সম্ভাব্য তারিখ এবং পরীক্ষা নেয়ার পদ্ধতি নিয়ে পত্রপত্রিকায় প্রাথমিক ধারণা প্রদান শুরু হয়েছে। ০৭.০৭.১৮ তারিখের অনেক পত্রিকার সংবাদেই এসেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় এবার এমসিকিউ থাকছে না, তার বদলে সৃজনশীল পদ্ধতিতে সেখানে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। এর কিছুদিন আগে জানা গিয়েছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অক্টোবরের ৩ তারিখ থেকে ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণ করবে। এটি অবশ্য অসমর্থিত সংবাদ। বর্তমানে দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় চল্লিশ। এ ছাড়া প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় সংখ্যার দিক থেকে সেঞ্চুরি অতিক্রম করে ফেলেছে তাও তো অনেক আগেরই ঘটনা। এতগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় কোনো সমন্বয় নেই বলে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তিরও কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। এই ভোগান্তি নানা প্রকারের। প্রথমত, আর্থিক ভোগান্তির কথাই বলা যাক। একজন পরীক্ষার্থীকে একই বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ফরম কেনা, ফরম পূরণ করে জমাদান এবং লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেয়ার নিমিত্তে বাড়ি থেকে একাধিকবার বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াতের পেছনে যে ব্যয় হয় তা এ দেশের মধ্যবিত্ত ও নি¤œ-মধ্যবিত্ত অনেক পরিবারের জন্যই একটি বাড়তি চাপ বয়ে আনে। সুতরাং এও বলা যায় যে, কোনো শিক্ষার্থীর পক্ষে মোটামুটি ভালোভাবে এইচএসসি পাস করার অর্থই হলো তার মাধ্যমে পরিবারের ওপর একটি অনাকাক্সিক্ষত চাপ তৈরি করা! একেই বলে অদৃষ্ট! আর্থিক এই ভোগান্তির পর যাতায়াতের ভোগান্তিও নির্মমতার দিক থেকে কম নয়! বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা আবার একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে হতে হয় বলে পরীক্ষার শিডিউলেও প্রতিষ্ঠানসমূহ কোনো সমন্বয় রক্ষা করতে পারে না।

বিগত বছরগুলোতে পত্রপত্রিকার মাধ্যমে জানা গেছে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা শেষ না হতেই আরেক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা শুরু হয়েছে। ফলে ধরা যাক যে পরীক্ষার্থী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ শেষ করেছে চট্টগ্রাম বা সিলেট যেতে যেতেই তার সেখানকার কোনো কোনো ইউনিটের পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে (ভৌগোলিক দূরত্ব বুঝাতে উদাহরণরূপে বলা)! অথচ সেই শিক্ষার্থী পর্যাপ্ত অর্থ ব্যয়ে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরম ক্রয় ও জমাদান করেছিলেন। জানা গেছে, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা শেষ করে রাজশাহী যেতে যেতেও একই অবস্থা হয়েছিল অনেক পরীক্ষার্থীর। পরীক্ষার্থীদের সামনে ছিল একদিকে পরীক্ষা শিডিউলের উপর্যুপরিতা অপরদিকে সড়ক বা রেলপথে যাতায়াতের অনিশ্চয়তা। নানা দুর্ভোগে সৃষ্ট নারী পরীক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের মানসিক পীড়নের কথা ভাবতেই গা কেমন শিউরে ওঠে! গত বছর কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা চলাকালে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বৃষ্টির উৎপাতও লক্ষ করা গেছে। সব মিলিয়ে পরীক্ষার্থী এবং তাদের কারো কারো সঙ্গে থাকা অভিভাবকরা অচেনা-অজানা জায়গায় এক ধরনের নাজেহাল ও নাস্তানাবুদ হয়েছে। উন্নত বিশ্বের কোনো রাষ্ট্র হলে এ জন্য জনস্বার্থে ‘মানবাধিকার’ লঙ্ঘন কিংবা ক্ষতিপূরণ মামলা রুজু হতো হয়তো।

ভর্তি পরীক্ষার বিদ্যমান এই পদ্ধতির জন্য, সন্তানের উচ্চশিক্ষার জন্য, সন্তানের জন্য একটি নিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য তথা সন্তানকে কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর জন্য মধ্যবিত্ত বা নি¤œ-মধ্যবিত্ত একটি পরিবারের এই ভোগান্তি কারো কাম্য হতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির এমন অজুহাতে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে আর্থিক, শারীরিক এবং সর্বোপরি চরম মানসিক ভোগান্তির প্রতিযোগিতায় নামানোর এরূপ অধিকার আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের কর্তৃপক্ষকে কে দিয়েছে জানি না। বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের কর্তৃপক্ষ তথা শিক্ষকরা কি কেবল সামান্য কিছু অর্থের জন্য এ দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারকে জিম্মি করবে! প্রশাসনিক ক্রুরতা বা অর্থলাভের এই মানসিকতা থেকে রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের কর্তৃপক্ষ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজের মুক্ত হওয়ার কি কোনো উপায় নেই? দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের এরূপ নাজেহাল হওয়ার বিষয়টি মহামান্য রাষ্ট্রপতিরও দৃষ্টিগোচর হয়েছে বলে আমরা জানি। আমরা মহামান্য রাষ্ট্রপতির উদ্বেগ দেখে অনেকটা আশ্বস্ত হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম জনস্বার্থে মহামান্য রাষ্ট্রপতির এই ‘প্রত্যাশা’কে গুরুত্ব দিয়ে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ ভর্তি পরীক্ষা সংক্রান্ত জটিলতার দ্রুত নিরসন ঘটাবে এবং এ দেশের সাধারণ মানুষের উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠাও শেষ হবে। শেষ হবে প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষার্থীর অমানবিক দুঃখ, কষ্ট, দুর্ভোগ ও দুর্দশা।

গণপ্রজতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মহামান্য রাষ্ট্রপতি এবং এ দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য এডভোকেট আবদুল হামিদ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের সঙ্গে ভর্তি পরীক্ষা বিষয়ক আলোচনায় বসেছিলেন। সেখানে তিনি সাধারণ মানুষের তথা ছাত্রছাত্রীদের নানা রকম ভোগান্তির কথা তুলে ধরে উপাচার্যদের অনুরোধ করেছিলেন সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণের জন্য। যেহেতু রাষ্ট্রপতি প্রজাতন্ত্রের অভিভাবক এবং একইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহেরও অভিভাবক তাই আমাদের মনে হয়েছিল এ দেশের আপামর মানুষের স্বার্থে তথা ‘জনস্বার্থে’ আচার্যের ‘অনুরোধ’টিকে উপাচার্য মহোদয়রা একটি অলিখিত ‘আদেশ’ বা ‘নির্দেশ’ হিসেবে গ্রহণ করেছেন বা করবেন। ন্যায়সঙ্গতভাবে অন্তত তাই হওয়ার কথা। কিন্তু আমরা মহামান্য রাষ্ট্রপতির ও আচার্যের অনুরোধের ‘মর্ম’ ও ‘বার্তা’ বুঝতে ব্যর্থ হলাম এরচেয়ে পরিতাপের বিষয় আর কী হতে পারে জানি না। মহামান্য রাষ্ট্রপতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যের ‘অনুরোধ’কে পাশ কাটিয়ে কার আগে কে ভর্তি পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করবেন এবং কে কী পদ্ধতিতে পরীক্ষা গ্রহণ করবেন তার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। আগামী ১৯ তারিখের মধ্যে (এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের দিন) এই প্রতিযোগিতায় নাম লেখাবেন হয়তো আরো অনেক বিশ্ববিদ্যালয়।

ইতোপূর্বে ইউজিসি বারবার মৃদু অনুরোধ করলেও আইনি কাঠামোর নানা জটিলতায় সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ তাদের স্ব-স্ব অধ্যাদেশ দেখিয়ে বিষয়টি থেকে এড়িয়ে গেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাও ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট সবার দুর্ভোগ নিয়ে একাধিকবার কথা বলেছেন, পরামর্শ দিয়েছেন সমন্বিত পরীক্ষা গ্রহণের। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাশাও কোনো বিশ্ববিদ্যালয় পূরণ করতে পারেনি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের আচার্য যখন প্রত্যাশা করেন তখন তার গভীরতা নিয়ে উপাচার্যদের ভাবনার অবকাশ থাকে। কিন্তু আমরা উপাচার্যদের পরিষদ থেকেও এ নিয়ে তেমন কোনো উদ্যোগ দেখতে পাইনি। অন্তত গণমাধ্যমে সেরকম কোনো সংবাদ আমাদের চোখে পড়েনি। ইউজিসি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং দেশের সর্বোচ্চ অভিভাবক মহামান্য রাষ্ট্রপতির অনুরোধ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ উপেক্ষা করছে! সব প্রকার নির্বাহী প্রতিষ্ঠানকে উপেক্ষা করার এমন শক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কী খুব বেশি গৌরব দান করছে? এর উত্তর কে দেবে?

মহামান্য রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনাকালে মহামান্যের ও অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে উপাচার্য মহোদয়রা নীরব সম্মতিই জানিয়েছিলেন অথবা সম্মতি জানানোর অভিনয় করেছিলেন হয়তোবা। তাই ওই ঘটনার পরপর গণমাধ্যমে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে যেমন সংবাদ প্রচার হয়েছিল তেমনি সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে এ দেশে সোচ্চারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালও একাধিক পত্রিকায় তার প্রতিক্রিয়ামূলক স্তম্ভ রচনা করেছিলেন। এ বিষয়ে দেশের একাধিক জনপ্রিয় দৈনিক এবং অনলাইন পত্রিকায় তার একটি প্রাঞ্জল এবং যৌক্তিক লেখা প্রকাশিত হয়েছে বিগত ৮ জুন তারিখে। সেখানেও সমন্বিত পরীক্ষা গ্রহণসহ রাষ্ট্রপতির ‘অনুরোধ’ প্রসঙ্গটি ব্যাপক স্থান পেয়েছে।

সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণ একটি কঠিন কাজ। জন্য একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনা দরকার। পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য কিছুটা সময়ও প্রয়োজন। সময় ছিল; কিন্তু উদ্যোগ বা উদ্যম দেখা যায়নি কোথাও। কোনো সমস্যা সামনে এলেই কেবল আমাদের সর্বপ্রকার চিন্তাভাবনার উদ্রেক ঘটে। কোনোক্রমে সেই সমস্যার উত্তরণ ঘটলে আমরা আবার সব বেমালুম ভুলে যাই। আসন্ন ভর্তি পরীক্ষা নিয়েও আমাদের ভাবনা চিন্তার কোনো শেষ নেই। এখন সামনের ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে এবং এর সংস্কার সাধন নিয়ে অফুরন্ত কথা বলব, কলাম লিখব, টকশোতে টেলিভিশনকে উত্তপ্ত করে ফেলব কিন্তু কোনোক্রমে নিয়ম-অনিয়মে পরীক্ষা পর্ব শেষ হলে আমরা পুনরায় ভুলে যাব ভর্তি পরীক্ষা বলে কোনো পদার্থ আছে কিংবা ছিল! মহামান্য রাষ্ট্রপতি যখন উপাচার্যদের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিলেন উপাচার্য মহোদয়রা আন্তরিক হলে এতদিনে পরীক্ষা গ্রহণের একটি কর্মপন্থা উদ্ভাবন নিঃসন্দেহে সম্ভব হতো। আমরা দুঃখের সঙ্গে দেখেছি সেরূপ কোনো উদ্যোগ কেউ গ্রহণ করেননি- উপাচার্যরাও না, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সমুদ্রবিজয় সম্ভব হয়েছে, স্থল সীমান্ত বিজয় সম্ভব হয়েছে, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আকাশজয় সম্ভব হয়েছে, পদ্মা সেতু আজ দৃশ্যমান। অথচ সামান্য একটি সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠান করা নিয়ে রাজ্যের যত জল ঘোলা করা! এই পদ্ধতি প্রবর্তনে কার স্বার্থে এবং কোনো গোষ্ঠীর অবহেলা কার্যকর তা এ দেশের সাধারণ মানুষের জানার অধিকার রয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার।

আমাদের জানামতে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের একটি সংস্থা আছে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি তাদের সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণের অনুরোধ জানানোর পরও বিগত প্রায় এক বছরে তারা প্রকৃত পক্ষে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন তা গণমাধ্যম কিংবা আমাদের নজরে আসেনি। যদি আসত, তবে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল বেরুনোর কথা শুনে আমরা পকেট ভারি করার জন্য কার আগে কে পরীক্ষা নেব সে জন্য হামলে পড়তাম না! সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণ এবং এ সংক্রান্ত একটি শৃঙ্খলা প্রবর্তনের দায়-দায়িত্ব বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মহোদয়রা কীভাবে এড়িয়ে যাবেন তা বোধগম্য নয়। ‘জনস্বার্থ সর্বাগ্রে’- এ কথা বিবেচনায় নেয়াও উপাচার্যদের তথা তাদের পরিষদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত।

আহমেদ আমিনুল ইসলাম : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj