কর্মজীবী মায়েদের প্রতি সহানুভূতি

সোমবার, ৯ জুলাই ২০১৮

** অরুণ কুমার বিশ^াস **

কর্মজীবী মা শব্দটি শুনলেই মনের ক্যানভাসে ভেসে ওঠে একজন ব্যস্ত ও দায়িত্বশীল নারীর চেহারা। বর্তমানে দেশের মোট কর্মজীবী মানুষের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ নারী। এই নারী জনগোষ্ঠীর আবার একাংশ শুধু বাইরে নয়, ঘরেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে থাকেন। কারণ তারা একাধারে মা, আবার কারো স্ত্রী, বোন কিংবা মেয়ে। দশভুজার মতো এ সব নারী ঘরে ও বাইরে দুই জায়গাতেই নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করে থাকেন। একটু গভীরভাবে ভাবলে বোঝা যায়, পরিবার ও দেশের সার্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে কর্মজীবী মায়েদের ভূমিকা কতটা তাৎপর্যপূর্ণ।

মায়ের কথা উঠলেই সন্তানের সুষ্ঠু লালন-পালনের কথা এসে যায় অনেকটা অবধারিতভাবে। মা যেমন সন্তান জন্ম দেন, তেমনি একজন কর্মজীবী মা তার স্বামীর পাশাপাশি নিজেও পরিবারের ভরণ-পোষণের জন্য কাজ করে থাকেন। একই সঙ্গে তাকে পরিবারের অন্য সদস্যের দেখভালও করতে হয়। বর্তমান সমাজব্যবস্থায় একজন নারী কেবল ঘরের কোনে মুখ গুঁজে পড়ে থাকবেন, এ আশা করা সমীচীন নয়। কারণ রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে একার আয়ে এখন পারিবারিক ব্যয়নির্বাহ করা সবসময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই পারিবারিক সচ্ছলতা ও দেশের উন্নয়নে কর্মজীবী নারীর ভূমিকা ক্রমশ অনস্বীকার্য হয়ে উঠেছে। বেশিরভাগ সময় আমাদের দেশে চলমান পিতৃতান্ত্রিক পরিবার ব্যবস্থায় মায়েদের ভূমিকা রীতিমতো উপেক্ষিত হয়ে এসেছে। একজন মা কিংবা পরিবার প্রধানের স্ত্রী হিসেবে নারী শুধু কাজেকর্মে ব্যস্ত থাকবেন, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তার কোনো বক্তব্য থাকবে না- এমনটাই আশা করা হয়। কেউ যদি এর অন্যথা কিছু করতে যান, তখনই বাধে বিপত্তি।

এ ধরনের আচরণ ভয়ানক অন্যায়। দৈনন্দিন কাজের ক্ষেত্রে নারীর স্বকীয়তা থাকা বাঞ্ছনীয়। তাদের মতামত ও সিদ্ধান্তের প্রতি সঠিক সম্মানও দেখাতে হবে। বলাবাহুল্য, পরিস্থিতি ক্রমশ বদলাচ্ছে। এর প্রধান কারণ দেশের সার্বিক উন্নয়নে নারীর ভূমিকা বাড়ছে। অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে বসিয়ে রেখে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই পুরুষের পাশাপাশি নারীরা ঘর সামলে বাইরে গিয়ে অফিস-আদালত করছেন। যিনি স্বামী তিনি পরিবারের হাল ধরেন এতে কোনো সন্দেহ নেই। পরিবারে বাবা-মা কিংবা স্বামী-স্ত্রীর কাজের গড়পড়তা হিসেব করলে দেখা যাবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পুরুষরা কেবল অফিস করেন। টুকটাক বাজার-সদাই করেন, আবার কখনো বা অপেক্ষাকৃত কঠিন কাজের দায়িত্ব নিয়ে থাকেন। মোটকথা পরিবারের কর্তা মূলত একমুখী কাজ করেন। ঘরের কাজে তাকে খুব একটা হাত লাগাতে হয় না। ঘরোয়া কাজ মানেই স্ত্রী বা সন্তানের মা করবেন এমনটাই ধরে নেয়া হয়।

অপরদিকে একজন কর্মজীবী মা সন্তানের দেখভাল শুধু নয়, তাদের সঠিক লেখাপড়ার দিকে নজর দেয়া, ঘরের কাজ ছাড়াও স্বামীর মতোই বাইরের কাজ করেন। সস্প্রতি একটি জরিপে দেখা যায়, মেয়েরা কর্মক্ষেত্রে অনেক বেশি দায়িত্বশীল ও স্বাচ্ছন্দ্য। অডিট কিংবা জটিল হিসাব-নিকাশের ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় নারীদের ওপর কর্তৃপক্ষ বরং বেশি ভরসা করে থাকেন। কর্মক্ষেত্রেও নারীদের অনেক বেশি দায়িত্বভার নিতে হয়। দায়িত্ব পালনে নারীরা পুরুষের তুলনায় কোনো অংশে কম পারদর্শী বা পারঙ্গম নন।

সাতসকালে পরিবারের সবার জন্য নাশতা বানানো এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা, সন্তানদের স্কুলের জন্য তৈরি করে দিয়ে তারপর তাকে অফিসে ছুটতে হয়। বেশির ভাগ দিন হয়তো তাকে না খেয়েই বেরিয়ে যেতে হয়। অফিসে গিয়েও তাকে সন্তানদের কথা ভাবতে হয়। তারা ঠিকঠাক স্কুল থেকে ফিরল কিনা, বা ফিরে কিছু খেতে পেল কিনা তা নিয়েও তাকে ভাবতে হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিবারের পুরুষ সদস্যের এসব বিষয়ে বেশি মাথা ঘামান না। ধরেই নেয়া হয় ঘরোয়া ব্যাপার স্ত্রীই সব সামলাবেন।

অফিস থেকে ফিরেই একটু ফ্রেশ হয়ে কর্মজীবী মাকে তৃতীয় দফা কাজে নামতে হয়। যেন কোনো বিরতি নেই। অনেকটা যুদ্ধ ক্ষেত্রের মতো। যুদ্ধক্ষেত্রে বিরতি থাকলেও এই সংসার সামলানোর যুদ্ধে বিরতি বলে কিছু নেই। প্রতিনিয়ত তাকে লড়ে যেতে হয়। ঘর-অফিস, আবার ঘর। কর্মজীবী মা বিনা বাক্যব্যয়ে তার সন্তান ও পরিবারের মুখ চেয়ে সেই ভর বহন করে যান।

এই বিরতিহীন কর্মযজ্ঞের মূল্যায়ন কে করছে! আদৌ কেউ করছে কি! একটু পান থেকে চুন খসলেই অফিস কিংবা ঘরে তাকে শুনতে হয় অদক্ষতা ও অলসতার অপবাদ। এত দায়িত্ব পালনের পরও তাকে কি দুটো প্রশংসাসূচক বাক্য শোনানো হয়।

এ সব কর্মজীবী নারীর কাজের সঠিক মূল্যায়ন করা উচিত। কারণ তারা অফিস এবং পরিবার- এই দুটো প্রতিষ্ঠান বস্তুত বাঁচিয়ে রাখেন। একটি দিনের জন্য যদি একজন কর্মজীবী নারী ঘরের কাজে ইস্তফা দেন, তাহলে দেখা যাবে পরিবারের অন্যান্য সদস্যের খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে সারা দিনের চলমানতা স্থবির হয়ে পড়বে।

কর্মজীবী নারী বিশেষত কর্মজীবী মাকে তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দিতে হবে। শুধু পরিবারে তার ভূমিকার কথা স্বীকার করলেই হবে না, তার যা প্রাপ্য তাকে তা দিতে হবে। মনে রাখতে হবে পরিবারে তার ভূমিকা যেমন অনন্য, তেমনি পুরুষের পাশাপাশি কর্মজীবী মা পরিবারের উন্নয়নের চাকা সচল রাখার ক্ষেত্রেও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যেহেতু ঘরে ও বাইরে দুজায়গাতেই দায়িত্ব পালন করছেন, আয়-উপার্জন করছেন, তাই পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও তার মতামতকে অগ্রাহ্য করা চলবে না। যৌক্তিক বিবেচনায় যতখানি গ্রহণযোগ্য, ঠিক ততটাই নারীর মতামতকে আমলে নিতে হবে। নইলে শুধু পিতৃতান্ত্রিকতার ধুয়ো তুলে কর্মজীবী নারীর ভূমিকা খর্ব করলে তা হবে আত্মঘাতী, অবিবেচনাপ্রসূত ও অমানবিক। আমাদের ঘরে ও বাইরে- সবখানে সব কর্মজীবী মায়ের কাজের সঠিক মূল্যায়ন এবং উৎসাহ দেয়া উচিত। (পিআইডি)

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj