দুই দিনের দুনিয়া

শনিবার, ৭ জুলাই ২০১৮

** এস আর শানু খান **

স্বামীর স্মৃতি বলতে একটি ঘর ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। কাঁসার বদনা যেটাতে পানি রেখে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আগে ওজু করতেন। নদীর ঘাটে গোসল করতে যেতেন। মাজা পানিতে নেমে সেই বদনা বুড়িয়ে বুড়িয়ে গোসল করতেন। গোসল সেরে বাড়ি ফিরবার সময় বদনায় করে পানি নিয়ে ফিরতেন। সোনার মতো চকচক করত সব সময়। তাকালে চোখে ধান্দা লেগে যেত। সুন্দর একটি লাঠি। চোখ জুড়ানো নকশা করা। পিতলের আবরণে বেড়ি পরানো। যেটি দিয়ে লাঠি খেলতেন স্বামী গনি সরদার।

তখনকার সময়ে লাঠি খেলার সেরকম কদর ছিল। কোথাও লাঠি খেলা হলে দশ বারো গ্রাম পর্যন্ত সাড়া পড়ে যেত। সেই আমলে লাঠি খেলে গনি সরদারকে কেউই হারাতে পারত না বিধায় নামের পরে সর্দার জুড়িয়ে দিয়েছিলেন লোকেরা। স্বামীর শত শত স্মৃতিবিজড়িত সেই কাঁসার বদনা আর পিতলের লাঠি বিক্রি করে খেয়েছেন। ভালো মন্দ খাদ্য খাবার আর পোশাক আশাকের বিলাসিতায় একটু ঘাটতি হলেই জ্ঞান হারিয়ে পেলতেন রিনা বড়–য়া। তখনকার সময়ে পুরুষদের মতিগতি খুব ভাবায়।

গনি সরদারের বড় ভাই সামাদ শেখ। ছেলের সংখ্যা চার মেয়ের সংখ্যা তিন। তখন শভা প্রথম স্ত্রী মারা যান। ব্যাস আবার বিয়ে করলেন। সেই স্ত্রীর পেটে আবার জন্ম হলো তিন ছেলে চার মেয়ের। তাহলে ছেলেমেয়ের সংখ্যা দাঁড়ালো চোদ্দ। উল্লেখ্য, আরো চার পাঁচটা সন্তান মারা যায় রোগে ভুগে ছোটবেলাতেই। সামাদ শেখ যখন দ্বিতীয় বিয়ে করেন তখন তার স্ত্রীর বয়স ছিল মাত্র ২৪ আর সামাদ সরদার তখন ৫৫-৫৬ এর গণ্ডিতে।

গনি সরদারের প্রথম স্ত্রী তিনটা ছেলেমেয়ে হওয়ার পর শারীরিকভাবে একটু অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার কয়েকদিনের মাথায় ঘটক দিয়ে যাচাই-বাছাই করে বিয়ে করেন রিনাকে। বিয়ের সময় রিনার বয়স মাত্র ১৯ বছর আর স্বামী গনি সরদার তখন ষাটের ঊর্ধ্বে।

রিনা ছিলেন অপরূপ সুন্দরী। আর গনি সরদারের ছিল অঢেল জমিজমা। ইয়া বড় ভিটার ওপর বাড়ি। বিরাট বড় ফলের বাগিচা। এই কথা চিন্তা করেই হয়তো রিনার বাবা-মা বিয়ে দিয়েছিলেন বুড়ো গনি সরদারের সঙ্গে।

অসুস্থ থেকেই এক সময় মারা গেলেন প্রথম স্ত্রী। রিনার একটি মাত্র ছেলে জন্ম নেয়ার পরই গনি সরদার এ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। তখন আগের পক্ষের তিন ছেলেরা বিয়েশাদি করে যার যার মতো।

রিনা আর তার ছেলে নিয়ে গনি সরদারের সেই ঘরে থাকেন। তিল তিল করে বড় করে তুললেন ছেলেকে।

বুড়ো বয়সে সুন্দরী ও কম বয়সী বউ বিয়ে করে অন্য পুরুষের মতোই শেষ বয়সে মাথাটা বিক্রি করে গিয়েছিলেন গনি সরদার। যে গনি সরদার নদীর ঘাটে গোসল করতে গেলেই ঘাট থেকে সব হন্নে হয়ে পালাতো পানি থেকে। ছেলেমেয়ে মহিলা বলে কোনো কথা নেই। গ্রামের কোনো নারীর মাথায় কাপড় না থাকলে অকথ্য ভাষায় ধমকাতেন।

গনি সরদার মানেই গ্রামের সব লোকের কাছে এক ত্রাস। শেষ বয়সে বিয়ে করে সেই সম্মানটুকু কবরে নিয়ে যেতে পারেননি গনি সরদার। বউয়ের কথায় উঠবস করতে হয়েছিল। বউকে কিছু বললেই রিনা ভয় দেখাতেন বাপের বাড়ি চলে যাবার।

গায়ের চামড়া একটু ফর্সা আর বয়স একটু কম ছিল বলে রিনার দেমাগও ছিলও একটু বেশি। বুড়ো বয়সে বউ ছাড়া থাকতে চাননি বলেই বউয়ের সকল বায়না পূরণ করেই চলতেন গনি সরদার। যখন যেটা বলতেন মুখের কথা মুখেই থাকতেই সেটা এনে দিতেন গনি সরদার।

গনি সরদারের মৃত্যুর পরে স্ত্রী রিনা বড়–য়ার বিলাসিতা বেড়ে যায় আরো অনেক। বাড়িতে ফেরি করা শাড়ি-কাপড় আসলেই এক সঙ্গে চার পাঁচটা কিনে রাখতেন। বাজারে গিয়ে শাড়ি কিনে আনতেন এক সঙ্গে অনেকগুলো। মাছ ছাড়া ভাত মুখে উঠতো না। আর সপ্তাহের মধ্যে এক দুবার গোশত তো আছেই। মন চাইলেই এ পিঠা সেটা তো থাকলই। বাস্তবে বৈধব্যের কোন ছাপ ছিলো না তার মধ্যে। সব সময় রং চং ওয়ালা শাড়ি পরে বেড়াতেন।

রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে জোয়ান বুড়ো কেউই না তাকিয়ে পারতেন না। সপ্তাহ না ঘুরতেই একবার হাঁড়ি ভর্তি করে পিঠা বানিয়ে রওনা হতেন ভাই বাড়ির দিকে।

রিনা বড়–য়ার একটি গুণ ছিল সব সময় ভালোমন্দ খেতেন। সৎ ছেলেমেয়েদেরও খুব ভালোবাসতেন। বুঝতেই দিতেন না সৎ ছেলে।

দারুণ ভোগ বিলাসিতার মধ্য দিয়েই পার হচ্ছিল দিনকাল।

ছেলে বড় হলো। ছেলেকে বিয়ে করালেন। ছেলের বিয়ের অল্প কয়েকদিনের মাথাতেই ছেলে অনেক পাল্টে গেল। বউমার ফুঁস মন্ত্রে বশ হয়ে মাকে আলাদা করে দিলো। ছেলের দুই ছেলে হলো। হঠাৎ মাথায় বিদেশ যাওয়ার ভূত চেপে বসল। বিদেশ যেতে হলে টাকার দরকার।

জমিজমা বেচা ছাড়া আর কোনো লাইন নেই। মায়ের সঙ্গে একটু মিল মহব্বত দিয়ে মাকে পটিয়ে মায়ের জমি বিক্রি করে বিদেশ গেলেন। বিদেশ যাওয়ার আগে নিজের বউ আর মাকে আবার এক করে এক সঙ্গে রান্নাবান্না করে খেতে বলে গেলেন। কিন্তু ছেলে বিদেশ গিয়ে বাড়িতে টাকা পাঠানো আরম্ভ করলেন। আর এই টাকা হাতে পেয়ে বউয়ের পাখা গজালো।

ছেলের কাছে ফোনে এটা ওটা বলে মাকে আবার আলাদা করে দিলেন। মা এটা ওটা গাছ গাছালি বিক্রি করে চলছিলেন। মাঝে মাঝে পরের বাড়িতে মাটি কাটতেন, কারো বা লেপ শিলাই করে দিতেন, মুড়ি ভেজে দিতেন, আবার কখনো বা কারো ব্যাড়া বুনে দিয়ে যা কিছু পেতেন তাই দিয়েই জীবন চালাতে লাগলেন। গ্রামের মেম্বরকে ধরে বয়স্ক ভাতার একটি কার্ড করে নিলেন। কয়েক মাস যেতেই কিছু টাকা পেতেন টাকা পেয়েই নাতি পুতাদের জন্য জামা, গেঞ্জি কিনে আনতেন। মুরগি কিনে এনে ছেলের ছেলেদের নিয়ে খেতেন।

দুই বছর পর বিদেশি ছেলে বাড়ি এলেন ছুটিতে। বিদেশ থেকে বউয়ের জন্য নিয়ে এলেন দামি দামি গহনা, এটা ওটা। কিন্তু মায়ের জন্য নিয়ে এলেন একটি মাত্র বিছানার চাদর আর একটি জায়নামাজ। মায়ের খুব শখ হলো চেইনটা। ছেলে প্রথমে মাকে দিতে রাজি হলেও বউয়ের কথায় এক দম চেপে গেলন।

মাঝে একটু আধটু করে জ্বর জ্বর বোধ হয় রিনা বড়–য়ার। কিন্তু কাজ করা মানুষ তো তেমন বোধ করতেন না। টাকাপয়সার টানাপোড়েনের জন্যই জ্বর একসময় মারাত্মক আকার ধারণ করল। দারুণ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। হাত পা ফুলে গেল। বিছানায় পড়লেন। বউমা তো তেলে বেগুনে জ্বলতে থাকলেন। গ্রামের অন্য মহিলারা দেখতে যায় আর এটা ওটা বলে শুনে বউমার খুব রাগ হয়। সবাই চলে আসলে বউমা গদগদ করে বলতে থাকেন, পাড়ার দরদিরা তো এসে বলেই খালাস আর যত জ্বালা হয়েছে আমার। আর দাঁত শিটকিয়ে বলতেন এখন শুয়ে কেন। যাদের বেড়া বুনে দিতেন আর মাটি কেটে দিতেন তারা এখন কই। হাঁটাচলা করতে অক্ষম হয়ে পড়ায় গোসল করিয়ে দিতে হতো রিনাকে।

বউমা গোসল করাতে গিয়ে বলতেন, এখন গোসল করিয়ে দিতে হচ্ছে কেন? যাও গিয়ে নদী থেকে গোসল করে আসো। মন থেকে নয় গ্রামের সবার কথায় অতিষ্ঠ হয়েই একটু দেখানোর জন্য ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন। কিন্তু ডাক্তার জানালেন বড় দেরি হয়ে গেছে। ব্লুাড ক্যান্সার হয়েছে।

বাড়ি নিয়ে গিয়ে ভালো মন্দ খাওয়ান। আর বেশিদিন টিকবে না। বাড়ি ফিরিয়ে আনলেন। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও বউ একটু ভালো আচরণ করলেন না। লোকজন না থাকলেই নানান কঠিন কথা বলতেন। এভাবে মাত্র মাস খানেকের মতো সময় অতিবাহিত হওয়ার পর একদিন হঠাৎ থেমে গেল রিনা বড়–য়ার নিঃশ্বাস। নিস্তব্ধ হয়ে গেল হৃৎপিণ্ডটা।

বিছানায় পড়বার পরে রিনা বড়–য়া বলেছিলেন যে মরার পর উনার কবরটা যেন বাড়ির কাছাকাছি দেয়।

কবর খুঁড়তে হবে। কোদাল নিয়ে বের হলো কয়েকজন। কোথায় খুঁড়তে হবে এমন প্রশ্ন সবার মুখে। মহিলাদের মধ্য থেকে কোনো একজন বলে উঠিল রিনার বলা কথা। সবাই কবর খুঁড়তে শুরু করল বাড়ি থেকে সামান্য দূরে। বারান্দা থেকেই দেখা যায় কবর।

কিন্তু ছেলের বউ গিয়ে কবর খুঁড়তে নিষেধ করে বসল। সবাই জানতে চাইল সমস্যা কি? বউমা জানিয়ে দিলেন স্বামী বাড়ি থাকে না। এই বাড়িতে ছেলেপেলে নিয়ে আমার একা থাকতে হবে। ভয় করবে না। দিনের ভিতর হাজারবার কবর দেখতে হবে। ওর থেকে এক কাজ করেন আমার শ্বশুর মরবার আগে নাকি বলে গিয়েছিলেন যে আমার শাশুড়ি মরলে উনার কবরের পাশে কবর দেয়ার কথা। তো ওখানেই কবর খোঁড়েন।

কবর খোঁড়া হলো স্বামীর কবরের ঠিক পশ্চিম পাশে। এবার চালির বাঁশ কাটতে হবে। পারিবারিক গোরস্থান। ওখানেই কয়েকটা বাঁশের ঝাড় রয়েছে। কেউ একজন দুই তিনটা বাঁশ কেটে চালির বাঁশ বানাতে লাগলেন। কার বাঁশ কেউ জানে না। তবে এইটুকু বলতে পারে যে উনার কোনো ছেলেরই হবে। হঠাৎ আগের পক্ষের এক ছেলে এসে মুখ মুড়িয়ে বলতে লাগলেন সব বাঁশই কি এক ঝাড়ের থেকে কেটেছ। ওটা নাকি উনার ঝাড়। ঝাড়ে বাঁশে বাঁশে এঁটে রয়েছে।

অথচ তিনটা বাঁশের জন্য তার এত দরদ।

তার এমন কথা শুনে একজন তার নিজের ঝাড়ের বাঁশ এনে দিলেন কবর ঘিরে দেয়ার জন্য বেড়া তৈরি করতে। তৈরি হলো বেড়া। সব কাজই করছে পাড়ার ছেলেরা। আর গনি সরদারের প্রথম স্ত্রীর দুই ছেলের ছেলেরা ঢাকার গার্মেন্টসে চাকরি করে। বাড়ি এসেছে দাদিকে দেখতে কিন্তু দাদির লাশের ধারের কাছেও ঘেঁষছে না। নবাবের মতো এদিক ওদিক ঘুরছে।

মনে হচ্ছিল বাড়িতে এত মানুষ দেখে কি করে নিজের ভাবভঙ্গি দেখাবে সেটাই বুঝে উঠতেছিলেন না। কবরের বেড়াটাকে বাঁধার জন্য দরকার তখন চারটে খুঁটির। সবাই বলল বাঁশ কিংবা অন্য কিছু দিয়ে খুঁটি দিলে ওগুলোতো পঁচে যাবে। ওর থেকে কচা গাছ দিয়ে খুঁটি দিলে কচা বেঁচে যাবে এবং কবরের নিশানাটা বছরের পর বছর বোঝার একটা চিহ্ন থাকবে।

দা নিয়ে বের হলো কচা আছে কোথায়। আগের পক্ষের এক ছেলের বাড়ির উঠানে একটি বড় কচা গাছ। তার উপরে ডালপালায় ভরা। একজন উঠে গেল গাছে। ছেলের বউ দাপাতে দাপাতে বের হয়ে আসলেন রান্নাঘর থেকে। বলতে লাগলেন কচা দিয়ে কি হবে।

একজন বলেই ফেললেন যে কচা আমরা বাড়ি নিয়ে যাব। একটা দুইটা কাটার পর বারবার বলতে লাগলেন যে বেশি ডাল কাটলে নাকি কচা গাছ মরে যেতে পারে। গাছে ডালপালা প্রায় শ’খানেক হবে আর কবরে লাগবে মাত্র চারটে। অথচ কত কথা। অথচ কত সুন্দর সুন্দর কথা বলেন মুখে বলার সময়। কিন্তু স্বার্থের বেলায় একবারে ষোলআনা। অবশেষে জানাজা পড়ে শেষ হলো দাফনের কাজ। দুদিনের দুনিয়ায় কত রং বাহানা। কত ছলচাতুরি আর কত স্বার্থের টানাপড়েন। আর কতই না নিচু মানসিকতা।

:: মাগুরা

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj