প্রেম…

শনিবার, ৭ জুলাই ২০১৮

** আল ফাতাহ মামুন **

গল্পটা অন্যভাবেও লেখা যেত। যদি কাওসার ভাই তানিয়াকে বিয়ে করতে রাজি না হতেন। ভালোবাসার যুদ্ধে তাহলে সফলই বলা যায় তানিয়াকে। আহা! কী লড়াইটাই না করেছে মেয়েটি। আমাদের কাওসার ভাইকে পাওয়ার জন্য। জয়তু তানিয়া! জয়তু ভালোবাসা!

তানিয়া তখন নাইনে পড়ে। ওদের গ্রুপে আরো কজন মেয়ে ছিল। খাদিজা, নুসরাত, জান্নাত, ফাহিমা। রূপের প্রতিযোগিতায় তানিয়াই সেরা। মডেল হাই স্কুলের ধর্ম শিক্ষক কাওসার আহমেদ তাই তানিয়াকেই টার্গেট করলেন।

কাওসার ভাই আমার দুবছরের সিনিয়র। তবুও আমি ছিলাম তার পরম বন্ধু। একই মাদ্রাসা থেকে মাওলানা পাশ করেছি দুজনে। তার চাকরি হয়েছে। আমি টো টো কোম্পানির ম্যানেজারই রয়ে গেলাম।

অনেক কষ্টে একটা চাকরি জুটলো। একটি ক্যাডেট মাদ্রাসায় বাংলা সাহিত্য পড়াতে হবে। মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা জাকারিয়া বললেন, ‘রাতুল! তুমি তো ভালো লেখালেখি করো। আমার এখানে বাংলা পড়াও’।

সাড়ে চার হাজার টাকায় গাধার খাটুনি খাটাতেন মাওলানা আমাকে।

কাওসারের ভাইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভেঙে যায় যে কারণে, কাউসার ভাইয়ের পদন্নোতিও ঘটে একই কারণে। আশ্চর্যের ব্যাপার, আমার ছোট্ট চাকরিটিও চলেও যায় ওই অপরাধেই!

মাওলানা জাকারিয়া ও কাউসার ভাই ছিলেন আদর্শ যুব সংঘের সভাপতি ও সেক্রেটারি। দেশব্যাপী তাদের কার্যক্রম। প্রায় বছর খানেক হলো, আমিও তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছি।

যোগ দেয়ার আগে আর যোগ দেয়ার পর আদর্শ যুব সংঘের ‘আদর্শের’ মাঝে আকাশ-পাতাল তফাত পাই। দল ছেড়ে আসার পর সেই তফাত মনে হয়েছে সাত আসমান-সাত জমিনের চেয়েও বেশি।

আদর্শ যুব সংঘের ‘আদর্শ’ সাধারণ কর্মীর জন্য একরকম। নেতা গোছের মানুষের জন্য ভিন্ন রকম। একই অন্যায় কর্মী করলে বহিষ্কার-চাকিরচুত্য। নেতা করলে পদন্নোতি। তাই আমি হারালাম চাকরি। কাউসার ভাই পেলেন সব।

২.

সংঘের অন্যতম শর্ত ছিল, ‘ধর্মে বিবাহবহির্ভূত প্রেম হারাম। তাই কেউ কোনোভাবেই প্রেমঘটিত সম্পর্কে জড়াতে পারবে না। কোনোভাবে যদি প্রমাণ হয়, সংঘের কোনো সদস্য প্রেমে জড়িয়েছে- সঙ্গে সঙ্গে তাকে বহিষ্কার করা হবে। ’

শর্তটি আমাকে দারুণভাবে অভিভূত করে। মাদ্রাসায় পড়ার সময় চাচাত বোন আফরিনের সঙ্গে জটিল প্রেমে মজে যাই। আফরিনের অন্যত্র বিয়ে হওয়ার পর মেয়ে মানুষ আমার চোখের বিষ হয়ে ওঠে। সিদ্ধান্ত নিই, আর কখনো প্রেম করব না। প্রেম করতে কাউকে সাহায্যও করব না।

ক্ষত হৃদয়ে যখন প্রেম বিরোধী সংঘের খোঁজ পাই, তখন প্রাণের ঠিকানা মনে করে নিজেকে সঁপে দিই। যেন যুগ যুগ ধরে এমন কিছুই খুঁজছিলাম মনে মনে।

রাতদিন সংঘের কাজ করি।

কর্মী সংখ্যা বাড়তে থাকে বানের পানির মতো।

পানি জোয়ারে আসে ভাটায় চলে যায়। তেমনি এ সংঘে যারা আসত, আবেগে আসত ঠিকই, তবে প্রেমের জোয়ারে সবাই ভেসে যেত। সিনিয়র অনেককেই দেখতাম গভীর প্রেমে ডুবে থেকেও প্রেমবিরোধী বক্তৃতা প্রসব করতেন অবলীলায়। আমাদের কাউসার ভাই ছিলেন তাদেরই একজন।

কাউসার ভাইয়ের ছাত্রী খাদিজাকে দেখে প্রথম যেদিন প্রেমের পথে পা পিছলে পড়তে গিয়েও পড়িনি, সেদিন কাউসার ভাই-ই মধুর ওয়াজ শুনিয়ে আমাকে পতন থেকে বাঁচিয়েছিলেন।

এরও অনেক পরের কথা।

খাদিজার সঙ্গে আমার প্রেম হয়ে যায়।

সপ্তাহের মাথায় কোর্ট ম্যারেজ করে ফেলি আমরা। যেন সংঘ থেকে বহিষ্কার না হই।

যত সহজে বলে ফেললাম, কাজটা মোটেও তত সহজ ছিল না। খাদিজাকে বোঝাই, প্রেম করা ঠিক না। ধর্ম এলাউ করে না। সব ঠিক হয়ে যাবে। আরো অনেক কথা।

এক সময় খাদিজা রাজি হয়। মানে আমাকে সে বিশ^াস করে। ধর্মকে বিশ^াস করে। ধর্ম এলাউড নয় এমন কোনো কাজ থেকে বেঁচে থাকলে আল্লাহই তাকে বাঁচাবেন। রক্ষা করবেন। তা ছাড়া মুসলিম যুব সংঘের সদস্যরা তো পাশে আছেই। চারদিকেই শুধু সম্ভাবনা আর সম্ভাবনা দেখে নিশ্চিন্তে ‘কবুল’ বলে দেয় খাদিজা।

আল্লাহ তাকে বাঁচিয়েছেন। ভালো রকমই বাঁচিয়েছেন। তবে আমি কেন যেন ফেঁসে গেলাম। বোধহয়! আমার চেয়ে বিশ^াসের জোর খাদিজারই বেশি ছিল। তাই আমাকে ফাঁসিয়ে হলেও তাকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন জগতস্রষ্টা।

অবশ্যই এ নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই আমার। বরং আনন্দের কথা হলো, আমার মতো খাদিজাকে ফাঁসতে হয়নি।

৩.

আদর্শের ‘আদর্শ’ যে সবার জন্য সমান নয়, তখনো আমার জানা ছিল না। জানলাম, মুফতি গিয়াসের ফতোয়া শুনে। আমার মত পাপীকে সংঘে রাখলে সংঘের কলঙ্ক হবে। এই সংঘের সবাই ফেরেশতা। এখানে কেউ প্রেম করে এটা শুনলে দেশে ছি ছি রব উঠবে। সংঘের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে। আর কোর্ট ম্যারেজ করেছে! বিয়ে করেছে!

নির্ঘাত নাজায়েজ কাজ করে ফেলেছে। কোনোভাবে যদি একবার রটে যায়, আদর্শ যুবসংঘের কর্মী রাতুল প্রেম করেছে, কোর্ট ম্যারেজ করেছে- তাহলে তো কথাই নেই…। হেন-তেন বাল-ছাল আরো কতো কী।

ছব্বিশ ঘণ্টার নোটিসে আমি বহিষ্কার হই।

আটচল্লিশ ঘণ্টার মাথায় হই চাকরিচ্যুত।

বিয়ের পরপরই চাকরি হারাই। দারুণ অভাবের মধ্যে পড়ে গেলাম। এতদিন যারা ছিল আমার সংঘের ভাই, এখন তারা বলে, রাতুল কোনোকালেই আমাদের সঙ্গে ছিল না। তাকে আমরা চিনিও না। আমি দীর্ঘশ^াস ফেলি। আর মনে মনে বলি, হায় আদর্শ!

প্রেমের কারিগর প্রেমেশ^রের খেলা বোঝা দায়।

হঠাৎ রব ওঠে তানিয়ার সঙ্গে কাউসার ভাইয়ের সম্পর্ক আছে।

প্রেমের সম্পর্ক।

অবৈধ প্রণয়।

নিষিদ্ধ প্রেম-লোকে যারে কয়।

শোনা যায়- তানিয়া গর্ভবতী।

প্রথমে কেউ বিশ^াস করেনি। আমিও না। কাউসার ভাই প্রেম করতে পারেন- এটা হতেই পারে না।

তবে বিশ^াস আমাকে করতেই হলো। যখন খাদিজা বলল।

খাদিজা ছিল তানিয়ার ঘনিষ্ঠ বন্ধবী। খাদিজা বলল, ‘স্যারের সঙ্গে তানিয়ার সম্পর্ক অনেক দিনের। ’

খাদিজা নিজেও অনেকবার তানিয়াকে নানাভাবে সাহায্য করেছে। প্রেমলীলায় পাহারা দিয়েছে অনেকদিন। স্যার এবং বান্ধবী বলে কথা।

এ সব শুনে আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল কিনা মনে নেই।

তবে কাউসার ভাইয়ের কথা শুনে তানিয়ার ঠিকই মরে যাওয়ার অবস্থা হয়েছে।

মিষ্টি হেসে কাউসার ভাই আত্মরক্ষার সুরে বললেন, ‘তানিয়া হলো আমার ছাত্রী। ছাত্রীর সঙ্গে কীভাবে প্রেম করা যায়- আপনারাই বলুন?’

অস্ত্রটি কাজে লেগেছে। কেউ কিচ্ছু বলেনি আর। শুধু তানিয়ার চোখ দিয়ে অশ্রæ ঝরেছে নদীর মতো। নদী হয়েছে সমুদ্র।

জাকারিয়া কাউসার ভাইয়ের পক্ষ নেবেন এটাই স্বাভাবিক। সান্ত¡নার সুরে তিনি বলেলেন, ‘কাউসার ভাই! সবুর করুন। আপনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। আপনি কিচ্ছু স্বীকার করবেন না। আপনার কোনো ভয় নেই। আমরা পাশে আছি। ’

গিয়াস ভাইও মাওলানার কথায় সায় দিয়ে মাথা নাড়লেন।

কাউসার ভাই মুচকি হাসলেন। যেন তিনি আশ্বস্ত হয়েছেন। বিপদ অনেকটা কেটে গেছে এখন। মনে মনে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ পড়লেন বার কয়েক। উঠে গিয়ে শোকরানা নামাজ পড়লেন দুরাকাত।

সপ্তাহখানেকের মাথায় স্কুল থেকে চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে আসেন কাউসার ভাই।

পনেরো দিন পর জাকারিয়া ভাইয়ের চেষ্টায় আরেকটি স্কুলের প্রিন্সিপাল আমাদের কাউসার ভাই।

এরপর কেটে যায় এক বছর।

খাদিজার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় আমার। আল্লাহ তাকে বাঁচিয়েছেন। ভালো রকমই বাঁচিয়েছেন।

অভাবের জ¦ালা তো সবাই সইতে পারে না। খাদিজাও পারল না। সে চলে গেছে অভাব থেকে মুক্তি পেতে। আমি রয়ে গেছি প্রেমের স্মৃতি বুকে নিয়ে।

আজ যখন শুনলাম, কাউসার ভাই তানিয়াকে বিয়ে করতে যাচ্ছেন, তখন আনন্দে মনটা ভরে উঠল। একই সঙ্গে অজানা এক বিষাদে হৃদয়টা হু হু করে উঠল।

কাউসার ভাই, আপনি আবার প্রমাণ করলেন- জগতে প্রেমই সত্য। আর সব মিথ্যা।

ঠিক এই মুহূর্তে জানতে ইচ্ছে করছে, প্রেম কি শুধু আমার জন্যই অপরাধ? তা না হলে একই কারণে আমি হারালাম পদ-চাকরি আর আমার জীবনের চেয়েও প্রিয় খাদিজাকে। কাউসার ভাই পেলেন সব।

কেন এমন হলো বলতে পারেন?

:: ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj