প্রিয়জনকে উপহার

শনিবার, ৩০ জুন ২০১৮

** আবুল খায়ের **

কেউ প্রিয়জনকে উপহার প্রদানের মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করার চেষ্টা করেন এবং খুঁজে পান অপরিসীম প্রাণের আবেগ। আবার কেউ উপহার গ্রহণ করার মাঝে খুঁজে পান প্রচণ্ড উচ্ছ¡াস ও নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস। আর প্রাণের আবেগ ও আত্মবিশ্বাসকে মানুষ বহন করে চলেছে বহুকাল থেকে। যা আজো সক্রিয় আছে যুবক-যুবতিদের মাঝে অত্যন্ত সাবলীলভাবে। তবে সেটার প্রকাশভঙ্গি আর আগের মতো বর্তমান নেই।

এক সময় শুভেচ্ছা বিনিময়ের একটি সুন্দর মাধ্যম ছিল ‘পোস্ট কার্ড’। ঈদ আসলেই প্রিয়জনকে উপহার হিসেবে পোস্ট কার্ড পাঠানো একটি প্রচলিত রেওয়াজ ছিল। যেটা অনেক পুরনো পদ্ধতিও বটে।

পোস্ট কার্ড হাতে আসলে কত যে আনন্দের বন্যা ও অনুভূতির ব্যাপার ছিল, তা বলে শেষ করা যাবে না। পোস্ট কার্ডে এক পিঠে প্রাপক ও প্রেরকের নাম-ঠিকানা লেখার সুযোগ ছিল। প্রেরক চাইলে প্রাপককে নিজের মনের কথা/ঈদ শুভেচ্ছা লিখে (খুবই সংক্ষেপে-এক থেকে দুই লাইন-এর মধ্যে) জানাতে পারতেন।

অন্য পিঠে ভালোবাসার আহ্বান-ফুল অথবা ছবি অঙ্কিত কিছু কথা/কবিতার লাইন অথবা ছন্দ ইত্যাদি লেখা থাকত। ঈদের সময় পোস্ট কার্ড কিনতে পাওয়া যেত প্রায় সব শপিংমল। দামও ছিল কম, এক-দুই টাকা। কালে-ভদ্রে বিলীন হতে হতে এখন আর পোস্ট কার্ড দেখা যায় না।

জাদুঘরেও (মিউজিয়ামে) পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ আছে। অনেকে পোস্ট কার্ড সংগ্রহ করা ও তা সংরক্ষণ করার মাঝে খুঁজে পেতেন অনেক গৌরবের ইতিহাস।

পোস্ট কার্ডের যুগ শেষে এল ঈদ কার্ড বিনিময়। নানা রকমের ঈদ কার্ড বাজারে কিনতে পাওয়া যেত। দামও ছিল খুবই কম, তবে বেশ কার্ডও পাওয়া যেত- যেগুলো খুলতেই সুরেলা মিউজিক বা কোনো জনপ্রিয় গান বাজত।

বিচিত্র রকমের ও আকৃতির ঈদ কার্ডে ছন্দ, কবিতার লাইন/ভালোবাসার আকুতি প্রকাশ করা কারুকাজ অথবা লেখা, ছবি, ফুলের কলি অঙ্কিত ছবি/ভাব প্রকাশের সুযোগ থাকত। কেউ নিজের হাতে তৈরি করা ঈদ কার্ড উপহার দিয়ে প্রিয়জনকে সারপ্রাইজ দিতেন।

ঈদ আসলেই ঈদ কার্ডের জন্য আলাদা দোকানের পসরা দিয়ে বসত কিছু কার্ড ব্যবসায়ী। নাম করা কিছু ব্রান্ডও ছিল কার্ডের, যেমন- আজাদ প্রোডাক্টস, আইডিয়েল প্রোডাক্টস, আর্চেস গ্যালারি ইত্যাদি।

কার্ড নির্বাচন করা ছিল একটি কঠিন কাজ। কয়েকদিন বিভিন্ন দোকান ঘুরে ঘুরে তবেই পাওয়া যেত পছন্দের কার্ড। অবশ্য স্টেশনারি/মুদি দোকানেও পাওয়া যেত ঈদ কার্ড।

কিছু মৌসুমি কার্ড বিক্রেতাকে দেখা যেত গলির মাথায়, রাস্তার মোড়ে, পথেঘাটে কার্ডের প্রদর্শনী দিয়ে ক্রেতাদের আকর্ষণ করার প্রাণান্ত চেষ্টা লক্ষ করা যেত। তবে এখন আর সে রকম দেখা মেলে না কার্ড ব্যবসায়ীদের। বর্তমানে ঈদ কার্ড পাওয়া গেলেও তা অতি বিরলও বটে; আগের মতো সহজলভ্য নয় এবং নেই আগের মতো জনপ্রিয়তা, তবে হৃদয়ের আকুতি ও মনের ভাব প্রকাশের চাহিদা একটুও কমেনি।

অতঃপর ‘পোস্ট কার্ড’ ‘ঈদ কার্ডের’ জায়গা দখল করল ক্ষুদে বার্তা (এসএমএস), মধ্যম ক্ষুদে বার্তা (এমএমএস) বা ছবিসহ ক্ষুদে বার্তা। তবে ছবিসহ ক্ষুদে বার্তায় খরচ একটু বেশি ছিল বলে ততটা ব্যাপকতা ছিল না। ঈদের আগের রাত থেকে মোবাইল বা মুঠোফোনে ক্ষুদে বার্তা/মধ্যম ক্ষুদে বার্তা আসতে থাকত, তা ঈদের দিন এমনকি পরের দিনও চালু থাকত।

মোবাইল কোম্পানিগুলো ক্ষুদে বার্তার জন্য নানা রকমের প্যাকেজ সুবিধা দিত। তা এখনো চালু আছে। তবে আগের মতো অতটা আগ্রহ নেই মানুষের; অনেকটা ভাটা পড়েছে চাহিদার কোনো এক অজানা কারণে হয়তোবা সময়ের বিবর্তনে।

বর্তমানে ফেসবুক/টুইটারের যুগে আর টাকা খরচ ও সময় নষ্ট করে ‘ঈদ কার্ড’ পাঠানোর মানসিকতা কয়জনের আছে?

ডিজিটাল কার্ড পাওয়া যাচ্ছে হরেক রকমের এনিমেশেনসহ। দেখতেও খুবই ভালো লাগে। এ ছাড়াও টাইম লাইনে দুই-চারটা কবিতার লাইন অথবা স্বরচিত কিছু লেখা দিয়ে প্রিয়জনকে তাক লাগিয়ে দিতে পারেন অনায়াসে। নিজস্ব স্বকীয়তা ও রুচিবোধের পরিচয় পাওয়া যায় টুইটার/ফেসবুকের টাইম লাইন ভিজিট করলে। তবে মেসেঞ্জারের মাধ্যমেও শুভেচ্ছা বিনিময়সহ যাবতীয় আলাপ করা যাচ্ছে প্রিয়জনদের সঙ্গে হরহামেশায়। স্মরণীয় কোনো মুহ‚র্তের ছবি, ভিডিও বিনিময় করার সুযোগ তো বেশ কাজে লাগাচ্ছেন কিছু রুচিশীল ব্যবহারকারী। প্রিয়জনকে চমকে দেয়ার মাধ্যমে নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করার চেষ্টারত আছেন কিছু নতুন জেনারেশন। ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় ও দাওয়াত প্রদানে আসছে বৈচিত্র্যও। দিন দিন নতুন নতুন ধারণাসহ চলে যাচ্ছে ব্যবহারকারীর ইনবক্সে/টাইম লাইনে। এতে সময়ের অপচয় যেমন কমেছে, তেমনি ব্যবহারও বেড়েছে উল্লেযোগ্যহারে।

পরিশেষে, ‘পোস্ট কার্ড, ঈদ কার্ডের কদর এখনো আছে অমলিন। কথায় বলে- পুরাতনই স্বর্ণ। হৃদয়ের ব্যাকুলতা প্রকাশের ডিজিটাল যত মাধ্যমই আবিষ্কার হোক না কেন, পুরনো মাধ্যম এখনো অটুট তাদের মনের মণিকোঠায় যারা- এর সফল ব্যবহার করেছিলেন অথবা সুবিধা নিয়েছিলেন। স্মৃতিময়-গীতিময় ছিল যাদের যৌবন, তারা কী করে ভুলে থাকবেন প্রিয়সীর সেই হাতের লেখা অথবা কারুকার্য খচিত কার্ড।

অনেকে এখনো জীবনের প্রথম পাওয়া কার্ড খুবই যতœ করে রেখে দিয়েছেন- সুটকেসে বা আলমিরার কোনো এক প্রকোষ্ঠে অথবা ডায়েরির শেষ পাতায়, যুগের পর যুগ ধারণ ও বহন করে চলেছেন সেই প্রিয়জনের উপহার।

মাঝেমধ্যে বের করে স্মৃতির পাতায় ডুবসাঁতার কাটার চেষ্টা করেন। তলিয়ে যাওয়ার পথ থেকে উত্তরণের চেষ্টাও করেন। কেউ ভুলে থাকার ব্যর্থ চেষ্টাও করেন। কিন্তু স্মৃতি কী ভুলে থাকা যায়?

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj