ঈদ ও বিশ^কাপ : মোহীত উল আলম

শুক্রবার, ১৫ জুন ২০১৮

আমার মনে পড়ে না আর কখনো ঈদ ও ফুটবল বিশ^কাপ একত্রে পড়েছে কিনা। পড়লেও টিভি সম্প্রচারের যুগে পড়েছে কিনা। এবারে ২১তম বিশ^কাপ শুরু হতে যাচ্ছে রাশিয়ায় ১৪ জুন। আর ঈদ পড়তে যাচ্ছে ১৬ কিংবা ১৭ জুন। রোজার এক মাসের পর বিশ^কাপের এক মাস। রোজার কৃচ্ছ্রসাধনের পর ঈদের আনন্দের সঙ্গে মিশে গেল বাঙালির প্রিয় খেলা ফুটবলের আনন্দ। আবার উদ্বোধনী খেলাটা পড়েছে স্বাগতিক দেশ রাশিয়ার সঙ্গে সৌদি আরবের। সেদিন থাকবে বাংলাদেশের হিসাবে রোজা নম্বর ২৮। মুসলিম জাহানের তর্কাধীন বিবেচনায় নেতৃত্বদানকারী দেশ সৌদি আরবের খেলোয়াড়রা যদি রোজা রাখেন তাহলে খেলায় শারীরিক সক্ষমতা কতটুকু বজায় রাখতে পারবেন জানি না। ফুটবল ক্রিকেটের মতো সুবেশী নরম-সরম খেলা নয়। পেশি আর ঘাম, ঘাম আর পেশি হচ্ছে এ খেলার নিয়ন্তা। আমার কেন যেন সন্দেহ হয় মিসরের যুবরাজ-খেলোয়াড় মোহাম্মদ সালাহ, মো. সালাহ নামে যিনি অধিক পরিচিত, চ্যাম্পিয়নস কাপের ফাইনালের দিন রোজা করছিলেন। ইউক্রেইনের রাজধানী কিয়েভে অনুষ্ঠিত ঐ খেলাটি হয়েছিল ২৭ মে, যেদিন ছিল রোজা নম্বর ১০। তিনি রোজা রেখেছিলেন মনে হলো, কারণ রিয়্যাল মাদ্রিদের স্প্যানিশ খেলোয়াড় সার্জিও র‌্যামোসের একটা মধ্যম গোছের টানে তিনি হালকা পালকের মতো মাটিতে বেমক্কা পড়ে কাঁধের জোড়টা খসিয়ে খেলার বাইরে চলে যান। সে ম্যাচে তার দল লিভারপুল ৩-১ গোলে হেরে বিদায় নেয়- এবং সাথে সাথে মাটি হয় তাদের ১৩ বছর পর চ্যাম্পিয়নস লিগ কাপ লাভ করার স্বপ্ন। সালাহর দেশ মিসর এবারের বিশ^কাপে খেলছে। পত্রিকায় দেখলাম, তাঁর কাঁধের জোড় দ্রুত জোড়া লেগেছে এবং মিসরের প্রেসিডেন্ট আব্দেল ফাত্তাহ এল সিসি তাদের ফুটবল দলকে রাশিয়ার পথে বিদায় জানানোর বেলায় সালাহর সঙ্গে করমর্দনের সময় আশা প্রকাশ করেছেন যে তিনি মিসরের প্রথম ম্যাচ উরুগুয়ের বিপক্ষে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। এ খেলাটা হবে তারপরের দিন, অর্থাৎ ১৫ জুন, ইয়াকাতেরিনবার্গ শহরে। সৌদি আরব এবং মিসর এ দুই ইসলামিক দেশই ‘এ’ গ্রুপে পড়েছে এবং স্বাগতিক রাশিয়া ও দুইবারের বিশ^ চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়েও একই দলে পড়েছে। অর্থাৎ, সেদিনও রোজা চলবে। তাহলে সৌদি আরব আর মিসরের খেলোয়াড়রা কি এ সময়ে রোজা রাখবেন? গুরুতর প্রশ্ন। কারণ আগেই বলেছি ফুটবল গুরুতর শারীরিক খেলা। মিসরের একজন সাংবাদিক, নিভার্ট ওয়ালিদ একটা ওয়েবসাইটে এ বার্তা পাঠিয়েছেন যে মিসরের ফতোয়া কমিটির প্রধান জানিয়েছেন যে বিশ^কাপ খেলার সময় মিসরের খেলোয়াড়দের রোজা না রাখলেও চলবে। শুধু মূল খেলার সময় না, প্রস্তুতি ম্যাচের সময়ও। তবে এ ফতোয়াটা মুসলিম উম্মার কাছে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়েছে কি না তা তিনি জানেন না। সাকিবরা এবার আফগানদের কাছে একটানা মাইর খাবার সময় প্রতিযোগিতার মধ্যে রোজা রাখা-না-রাখা নিয়ে একটা প্রশ্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছিল, কিন্তু সেটা বেশিদূর এগোতে পারেনি কারণ বিপক্ষ দল আফগানিস্তান কাগজে কলমে আরও জোরদার মুসলমান দেশ।

যা হোক, ‘এ’ গ্রুপ থেকে দুটো দল কোয়ালিফাই করে দ্বিতীয় রাউন্ডে বা নক-আউট রাউন্ডে উঠবে আর দুটো দল দেশে ফিরে যাবে- যদি না তাদের একটা রাশিয়া হয়। রাশিয়া আউট হয়ে গেলে রাশিয়ায় থেকে যাবে। সৌদি আরব আর মিসর যদি বাংলাদেশের ঈদ উন্মাদনার কিছুটা পায় এবং সে সঙ্গে বাংলাদেশের ফুটবল উন্মাদনার আরো কিছুটা পায় তাহলে তারা নিশ্চিন্তে রাশিয়া আর উরুগুয়েকে টা টা জানিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে উত্তীর্ণ হতে পারে। আর যদি বাংলাদেশের তৈরি মেইড-ইন-বাংলাদেশ জার্সি তাদের গায়ে চাপে তাহলে এ তিনটি কারণেই- বাংলাদেশের ঈদ উন্মাদনা, বাংলাদেশের ফুটবল উন্মাদনা আর বাংলাদেশের তৈরি জার্সি পরার কারণে- এই দুই মুসলিম দেশের দ্বিতীয় পর্বে ওঠা কেউ আটকাতে পারবে না। আরো একটা কারণে এবারের বিশ^কাপ বাংলাদেশের জন্য ঈদের আনন্দের সমতুল্য হবে। সেটা হলো, প্রায় সবগুলো খেলাই বাংলাদেশের সময় অনুযায়ী বিকেল আর সন্ধ্যা মিলে ৪টা, ৫টা, ৬টা, ৯টা এরকম সময়ে পড়েছে। কী নিদারুণ সুখ : অফিস শেষ করে এসে, ব্যবসার হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে, ঘরে বসে বা ক্লাবে বসে নিশ্চিন্ত মনে বৈকালিক চা খাওয়া আর খেলা দেখা।

ঈদ সম্পর্কে বলতে গেলে শুধু সৌদি আরব আর মিসরের কথা বললে তো চলবে না। আরো পাঁচটি দেশ খেলছে যাদের মুসলিম দেশ বলা হয়। সেগুলো হলো ইরান, মরোক্কো, সেনেগাল, তিউনিশিয়া ও নাইজেরিয়া। তবে আফ্রিকার সবচেয়ে জনবহুল দেশ নাইজেরিয়াকে এ কাতারে ফেলা ঠিক হবে কি না জানি না। প্রায় উনিশ কোটি লোকের এ দেশটিতে মুসলমানের সংখ্যা খ্রিস্টানদের চেয়ে ১০% বেশি, যথাক্রমে ৫০% ভাগ এবং ৪০% ভাগ, কিন্তু ওদের তেইশ জনের ঘোষিত দলে খেলোয়াড়দের নাম পড়ে যা বুঝলাম, বেশিরভাগই খিস্টান ধর্মের অনুসারি। মুসলিম দেশের বাইরে মুসলমান খেলোয়াড় আছেন চারজন, যাঁদের তিনজন সুপারস্টার। তাঁরা হলেন যথাক্রমে মেসুৎ ওজিল (জার্মানি), মারুয়ানে ফেলানি (বেলজিয়াম), আর পল পগবা, যাঁর দিকে ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশম বড় বড় চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছেন যে এঁর বরাতে হয়তো ফ্রান্স দ্বিতীয়বারের জন্য বিশ^কাপ নিয়ে আসবে। আর চতুর্থজনও ফ্রান্সের, তেমন নাম শুনিনি আগে- এ্যান গোলো কান্তি।

দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর রেওয়াজ আছে সমাজে। বাংলাদেশ তো বিশ্বকাপে খেলছে না, কিন্তু বাংলাদেশের তৈরিকৃত জার্সি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী অনেক দলের গায়ে উঠবে। সেভাবে আমরা একটা তৃপ্তি পাচ্ছি। বাংলাদেশে মুসলমান জনগোষ্ঠী বেশি, তাই মুসলামান দেশ যেগুলো খেলছে তাদের সঙ্গে সহমর্মিতা বোধ করা জায়েজ হবে। এভাবেও হয়তো আমরা এক ধরনের তৃপ্তি পেতে পারি। যতই ফিফার গগণবিদারী চিৎকার থাকুক না কেন যে বিশ্বমানবতার সংহতির জাতিসংঘ বস্তুত নিউ ইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘের প্রধান দপ্তর নয়, বরঞ্চ বিশ^কাপের মঞ্চ যেখানে হয় সেটাই, কিন্তু কাপড় নিংড়ে পানি ঝরালে দিন শেষে যেটা বের হয় সেটা হলো বিশ^কাপ ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের না হলেও, মূলত রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদ প্রকাশের একটা এ্যাটম বোমা।

এদিক থেকে আমার আজকের লেখার শিরোনামটাও খানিকটা খাপছাড়া গোছের। কারণ আমি ঈদ আর বিশ^কাপকে যৌগক্রিয়া হিসেবে দেখিয়েছি আনন্দের দিক থেকে, কিন্তু আসলে বেশ খানিকটা তফাৎ আছে এ আনন্দ প্রক্রিয়া বিতরণকৃত হবার বেলায়। ঈদের আনন্দ শুধু মুসলমানরা উদযাপন করে না। অমুসলমানরাও করে। কিন্তু বিশ^কাপের আনন্দ প্রতিযোগিতা যত এগুতে থাকে, সেটা বাড়ার চেয়ে ক্রমশ কমতে থাকে। কারণ যে দেশগুলো পর্যায়ক্রমে খসতে থাকে, সে দেশগুলোতে যেন কেয়ামত জারি হয়েছে এরকম অবস্থা হয়। ১৯৯৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ^কাপে কলম্বিয়া যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হেরে যায় এ্যান্ড্রেস এসকোবার নামক এক রক্ষণভাগের খেলোয়াড়ের আত্মঘাতী গোলের কারণে। সে বেচারা দেশে ফিরে গিয়ে নিজের শহর মেডেলিনে প্রাণটা খোয়ায় উগ্র-দেশপ্রেমিক সমর্থকদের কাছে। এবারের চ্যাম্পিয়নস কাপের ফাইনালের কথাটাও আবার আনি। চোট পেয়ে সালাহর বেরিয়ে যাওয়ার কারণে নয়, বরঞ্চ গোলরক্ষক লোরিস ক্যারিয়াসের আশ্চর্যজনক দুটো মোটা ভুলের কারণে লিভারপুল ৩-১ গোলে রিয়্যাল মাদ্রিদের কাছে হেরে যায়। এ ভুলটা যদি ক্যারিয়াস নিজের দেশ জার্মানির পক্ষে করতেন, তাহলে কি হতো জানি না, কিন্তু তিনি যদি জার্মানির না হয়ে কলম্বিয়া বা এ জাতীয় নি¤œ সংস্কৃতির দেশের নাগরিক হতেন, তাহলে নিশ্চিত তাঁর খবর ছিল। আর্জেন্টিনার খেলা যেদিন পড়ে, সেদিন শুধু যে বুয়েনস এয়ার্সের রাস্তাঘাট খালি হয়ে যায় তা নয়, ঢাকা চট্টগ্রামের রাস্তাঘাটও খালি হয়ে যায়। এটার কি ব্যাখ্যা?

ঐ যে ম্যারাডোনা! ফিফার যেটা লক্ষ্য : ফুটবলকে ধর্ম-জাতি-রাষ্ট্র ইত্যাদি বিভাজনের ঊর্ধ্বে রেখে বিশ্বমানবতার প্রতীক হিসেবে দাঁড় করানো, সেটার সবচেয়ে বড় প্রতীক ম্যারাডোনা।

এ কথাটা বলেই একটা অনাবশ্যক বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছি আমি জানি। কেননা, এই চট্টগ্রামের রাস্তায় হালকা নীল-সাদা স্ট্রাইপের টি-শার্ট পরে যেমন আর্জেন্টিনার ভক্তদের রাস্তায় হাঁটতে দেখি, তেমনি দেখি হলুদ টি-শার্ট পরা ব্র্রাজিলের সমর্থকদের। ফেসবুকে দেখি দুদলের সমর্থকদের মধ্যে স্ট্যাটাস-যুদ্ধ।

ম্যারাডোনার ১৯৮৬-র অতুলনীয় খেলা বা ১৯৯০-এর যুদ্ধরত সৈনিকের মতো খেলার কথা বলছি না- এগুলোর কথা সবাই জানে- বলছি তাঁর ইতালির সিরি আ লিগের খেলাগুলোর কথা, যখন মাত্র দ্বিতীয় বিভাগ থেকে উঠে আসা একটা দলকে তিনি শুধু পরপর তিন বছর (১৯৮৬/৮৭, ১৯৮৭/৮৮, ১৯৮৮/৮৯) ইতালীয় লিগের চ্যাম্পিয়ন করলেন না, এনে দিয়েছিলেন ১৯৮৯ সালে চ্যাম্পিয়নস কাপ ট্রফিও, যখন এটার নাম ছিল ইউএফএ কাপ। এরপর তাঁর নেতৃত্বে নাপোলি ১৯৯০ সালে ইতালির সুপার কাপ জেতে।

সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা জানাই।

আরও সংবাদ...'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj