রাক্ষসদের রান্নাঘরে : হালিমা খাতুন

শুক্রবার, ১৫ জুন ২০১৮

ওদের রান্না ঘরটা স্টেডিয়ামের চেয়েও বড়। না, তারচেয়েও। মনে হয় গোটা দুই এয়ারপোর্ট জোড়া দিয়ে ঘরটা তৈরি। বিম্বিশা ইপ্সিকে বলেছিল যে রান্না ঘরে একটু কাজ দেখিয়ে দিয়ে, আর টুকিটাকি কিছু কাজ সেরে, কিছু টিফিন সঙ্গে নিয়ে সে ইপ্সির সঙ্গে নৌকা চড়তে যাবে ভোমরা লেকে। ভোমরা লেকের মস্তবড় একটা পোস্টার রান্নাঘরের একদিকের দেয়ালজুড়ে আঁকা ছিল। বিম্বিশা ইপ্সিকে বললো- ইপ্সি ওই দ্যাখ, ভোমরা লেকের ছবি। ওখানেই আমরা যাবো।

রান্না ঘরে ঢুকে তো ইপ্সির চোখ ছানাবড়া। ভোমরা লেকের দিকে তাকাবে কি! তার সামনের বিশাল বিশাল আগ্নেয়গিরির দিকেই তার চোখ আটকে গেলো। এগুলো কি? চুলো? কি বিশাল বিশাল চুলো? আর সেগুলো থেকে ইটের ভাটার মতো বা আগ্নেয়গিরির মতো উঁচু হয়ে আগুন আর ধোঁয়া বের হচ্ছে।

সে তাকিয়ে আরো দেখে বড় বড় আস্ত গাছ। আমেরিকার সেই রেড উডট্রির মতো চুলোর মধ্যে ঢোকানো। তা থেকেই আগুন বের হচ্ছে। কতোগুলো চুলো জ্বলছে সে দিকে খেয়াল না করে ইপ্সি দেখল বিশাল বিশাল জাহাজের মতো কড়াইতে করে কি সব রান্না হচ্ছে। সে সব চুলোয় রান্না থেকে দম আটকানো ভয়ানক একটা উৎকট গন্ধ বের হচ্ছে। চুলো থেকে একটু দূরে বিশাল বিশাল কলমি শাকের পাহাড়। আরো অনেক রকম শাক-সবজির উঁচু স্ত‚প। সব তার চেনা নয়। খাদ্য কি অখাদ্য তাই বা কে জানে।

সে দেখলো ঘরের বাইরে কয়েকশ ট্রাক। বোধ হয় ঐ সব ট্রাকে করে শাক-সবজি আনা হয়েছে। জানালার ও পাশে কয়েকশ গরু, তারও পাশে একটু দূরে এক পাল হরিণ, ঘোড়া, হাতি, চিতাবাঘ, শেয়াল ও কুকুর। আরো একটু দূরে কতো বড় বড় খাঁচার মধ্যে বিড়াল, বানর ও ভালুক জাতীয় অনেক প্রাণী। ইপ্সি বুঝতে পারলো না ওই বিচিত্র ধরনের চিড়িয়াখানার রহস্য। এ ছাড়া এই ঘরটিকে বিম্বিশা রান্নাঘর বললো। তা অবশ্য ঠিক। চুলোয় রান্না হচ্ছে। আগুন জ্বলছে, ধোঁয়া উঠছে। কিন্তু অত শাক দিয়ে কি হতে পারে? হয়তো বিদেশে চালান দেবে বা অন্য কিছু। কৌত‚হল মেটাবার জন্য ইপ্সি বিম্বিশাকে প্রশ্ন করলো- অত শাক দিয়ে কি হবে?

-অত আর কই? আমরাতো শাক খাই না। মা, বাবা আর দাদী শুধু খায়। ওতে ওদের এক বেলার ব্যবস্থাই হবে না, আমরা একশ ভাইবোন মাংস ছাড়া আর কিছুই খাই না।

ও আর কটা শাক, বন্যা হয়ে এ বছর শাক পাওয়া যাচ্ছে না ওগুলো আফ্রিকা থেকে আনা হয়েছে। না হলে দেখতিস কতো শাক। ভালো করে দেখতে হলে হেলিকপ্টারে করে উপর থেকে দেখতে হতো। আচ্ছা ভাই, তুই একটু দাঁড়া। আমি মাকে একটুখানি ফোন করে জিজ্ঞাসা করি এ শাক কি দিয়ে রান্না হবে। আর দুপুরে আমাদের সবার জন্য কি কি ব্যবস্থা হবে।

-তা তোর করতে হবে?

-না, না। আমাদের খণ্টামুখী বুয়া- মানে শ্রীমতি পাচিকা কানে একদম শোনে না। ড্রাগন চাচা ও তার দশ ছেলে ছুটিতে। হিড়িম্বার হাত পুড়ে গেছে। সে বাঁধতে পারে না।

-তা হলে?

-খণ্টামুখী কানে শোনে না বলে তাকে ছবি এঁকে বোঝাতে হবে। আমার মা আবার ছবি আঁকতে পারে না। তাই আমাকে রান্নাঘরে আসতে হলো। তুই একটু বস ভাই। না হয় ভোমরা লেকের ছবিটা অবর্ভা করো। ওখানেই তো যাবো আমরা।

বিম্বিশা মাকে ফোন করতে লাগলো। ইপ্সি তাদের কথাবার্তা কিছুটা শুনতে পেলো। কলমি শাক কি দিয়ে রান্না হবে জিজ্ঞাসা করলে ওর মা কি যেন বললো। বিম্বিশা রিপিট করলো। মানুষ দিয়ে রান্না করতে হবে? ঠিক আছে মা। আমি এঁকে দিচ্ছি। আর শোন, কটা মানুষ দিতে হবে? বিশটা? হ্যাঁ, বিশটা। বিশটা এঁকে দাও।

-কোন মশলা দিতে হবে?

-না। মানুষরা তো প্রচুর মশলা খায়। তাদের গা থেকেই তো পেঁয়াজ-রসুনের গন্ধ বের হয়। কথা বললে ধনে আদা যেন বের হয়ে আসে। তাই কোনো মশলা দিতে হবে না। ওগুলোকে কেটে ভালো করে গরম পানি আর সাবান দিয়ে ধুয়ে নিতে বলিস। বন মানুষ হলে দেওয়া লাগতো।

-ফাইন। আমি ঘণ্টামুখীকে এঁকে মেনুটা দেখিয়ে দিচ্ছি। তুমি কি বলছো? না, ভাববার কিছু নেই। আমি সব ঠিকঠাক বুঝিয়ে দেবো। তুমি একটু আস্তে বলো। তোমরা কখন খাবে?

-পারলে এখনই। এমন খিদে পেয়েছে যে তোকেই খেয়ে ফেলতে পারি।

-জোক করো না মা। শোন আমার বন্ধু ইপ্সি এসেছে। ওকে আমাদের অ্যালবামগুলো দেখাবো। তারপর ওর সঙ্গে ভোমরা লেকে নৌকা বাইতে যাবো। রান্না হলে তোমরা খেয়ে নিও। আমার জন্য চিন্তা করো না। আমি খাবার সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি। আর কি বলছো? আমার চুলের উকুনের কথা? এখন অত জোরে বলো না। ও শুনতে পাবে। খুব লজ্জার কথা।

-বিম্বিশার মা ওদিক দিয়ে ধমকে দিয়ে বললো আবার কি? কচ্ছপের মতো বড় বড় উকুনতো আমার মাথায় চাষ করি। ওগুলো শুকিয়ে চানাচুরের মতো খাওয়া যায়। অসুখ-টসুক হলে যখন খাবার রুচি থাকে না তখনো এগুলো জ্যান্তই সুপের মধ্যে দেয়া হয়।

তবে সব সময় ওগুলো ধরা যায় না। চুলের মধ্যে ওগুলো লুকিয়ে থাকে। এতে আবার লজ্জা কি? লেখাপড়া শিখে কেবল লজ্জা লজ্জা শিখেছো। তোমার মাথার উকুন বাছতে হবে না। ওগুলো ওখানেই বড় হবে।

-মা, একটু চুপ করো। ও মানুষ। শুনলে ও আর আমার সঙ্গে মিশবে না।

-কি বললি? কি বললি? মানুষ? আমি এক্ষুনি আসছি।

-না মা না, দোহাই তোমার। আমি ওকে বাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি।

-কোথায়? আমি সেখানেই যাবো। তোর বলা লাগবে না। আমি আসছি। বাজার আর জঙ্গল থেকে বুড়ো বুড়ো মানুষ ধরে আনে ওগুলো খেয়ে একটুও তৃপ্তি পাওয়া যায় না। তোর বন্ধু। তাহলে তো তোর মতোই কচি হবে। খুব ভালো হবে কচমচিয়ে চিবিয়ে খাবো। আমার মেয়ে বিম্বিশা, তুই কতো ভালো। রোজ যদি তোর মতো কচি কচি মানুষ ধরে নিয়ে আসিস তাহলে খুব মজা হয়। কচি মানুষ খেতে আমার কি যে মজা লাগে।

-দোহাই তোমার মা! এসো না, এসো না, আমি এক্ষুনি চলে যাচ্ছি ওকে নিয়ে।

-বলেই বিম্বিশা ইপ্সিকে টানতে টানতে নিয়ে একটা সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো। তারপর সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগলো। শেষের দিকের কথাবার্তা ইপ্সি ঠিকমতো বুঝতে পারেনি। আগের কথাও রান্নার সামগ্রী দেখেই তার বুকের মধ্যে কাঁপুনি শুরু হয়ে গিয়েছিল। তার বান্ধবী বিম্বিশা যে রাক্ষস কন্যা তা সে কোনোকালে বুঝেনি। বিম্বিশা অনেক দিন ধরে ওকে বাড়িতে নিয়ে আসার কথা বলছিল। হোস্টেলে থেকে থেকে তার ভালো লাগছিল না। মা-বাবা আমেরিকায়। সেখান থেকে তারা স্পেসে যাবার চেষ্টা করছে। তাই নিয়ে তারা সারাক্ষণ সারা বছর ব্যস্ত। মোটা মাপের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী তারা নাসাতে আছে দীর্ঘদিন ধরে। এগারই সেপ্টেম্বরের পরে তাদের কাজের চাপ বেড়ে গেছে। তবে স্পেস ক্রাস্টের কাজের চেয়ে ডগউ (ডবধঢ়ড়হ ড়ভ গধংং ফবংঃৎঁপঃরড়হ)ই বেশি। যত কম খরচে ডগউ তৈরি করা যায় তার জন্য বুশ প্রশাসন উঠেপড়ে লেগেছে। এতদিন তো তারা সন্ত্রাসী তৈরি করার কাজে ব্যস্ত ছিল।

সন্ত্রাসী প্রজেক্ট সাক্সেসফুল হওয়ার পর সব দেশে তাদের ঠিকমতো অপারেশনে পাঠানো হয়েছে। এখন সন্ত্রাসী ধ্বংসের নামে ব্লুাকলিস্টের দেশগুলোকে খতম করতে হবে। বছরের পর বছর ধরে ওসব দেশে যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ লেগে থাকবে। তখন এদের কারখানাগুলো ডবল, ত্রিপল শিফটে কাজ করবে। অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে রেসের ঘোড়ার মতো ছুটতে থাকবে। সারা পৃথিবী সেই ঘোড়ার বশ্যতা স্বীকার করবে। নাইলে সেকালে ভারতের রাজারা যেমন অশ্বমেধযজ্ঞ করতো, এরা এখানে নরমেধ যজ্ঞ করবে। তাই নাসার বিজ্ঞানীরা তৎপর। অবসর নেই তাদের এতটুকুও। ইপ্সি অনেক দিন ধরে বিম্বিশাকে বলছিল তাদের বাড়ি দেখতে যাবে। বিম্বিশা কিন্তু এড়িয়ে গেছে। কারণ সে জানে তার মা কি চিজ।

ইপ্সিকে সে এক সেকেন্ডের মধ্যে খেয়ে ফেলবে। তখন তার খিদে বেড়ে যাবে, পারলে ওর মা বিম্বিশাকেও খেয়ে ফেলতে পারে। সে জন্যই সে ফাঁক গুনছিল কখন মা বাড়ি থাকবে না, খামার বাড়িতে ব্যস্ত থাকবে। সেই ফাঁকে সে ইপ্সিকে তাদের বাড়ি দেখিয়ে আবার ইপ্সিকে চট করে ট্রেনে তুলে দেবে। কিন্তু তার মা সর্বনাশী জানতে পেরেছে আর ছুটে আসছে তার বান্ধবীকে খাবার জন্য। তাই সে ইপ্সির হাত ধরে একটা হ্যাচকা টান দিয়ে বললো- ইপ্সি, ইপ্সি সর্বনাশ হয়ে গেছে। মা তোর খবর জেনে গেছে। তাড়াতাড়ি আয়। আয় এই টানেলের মধ্যে ঢুকি।

-কিন্তু আমার ব্যাগ আর চুলের ক্লিপ।

: রাখ তোর ব্যাগ আর চুলের ক্লিপ। আমার মা ছুটে আসছে।

: তাতে কি হয়েছে?

: হয় নাই, হবে। তোকে ব্যাগ খাতাপত্র সমেত গিলে খাবে। পানিও লাগবে না তার সাথে।

: তার মানে?

: মানেটানে কিছু নেই। আমার মা একটা রাক্ষসী।

: দূর বাজে কথা।

: বাজে কথা হলে তুই থাক।

: না, না, না! চল।

ওরা দুজনে টানেলের মধ্যে ঢুকল। বিম্বিশা একটা সুইচ টিপে দিল। পাথরের মতো একটা দরজা ঝপাং করে বন্ধ হয়ে গেলো। পেছনের

বাড়ির বা কিছুর সঙ্গেই যোগাযোগ রইলো না। বিম্বিশা ইপ্সিকে বললো-

-এখন তোর আর কোনো বিপদ হবে না। আমরা শাঁ করে একদম এ রাজ্যের বাইরে চলে যাবো। তবে একটু জোরে দৌড়াতে হবে।

-কিন্তু?

-কিন্তু, কিন্তু না।

-বলছিলাম কি, তোর মা কি এই টানেলের কথা জানে না?

খুব জানে। কিন্তু এটা হ্যান্ডেল করতে পারে না। এ সুইচের অন-অফ উল্টো করে রাখা হয়। তার মানুষ খাওয়া মগজে সেটা একেবারেই ঢোকে না।

-বুদ্ধিটাতো বেশ ভালো। এর বৈজ্ঞানিক কে?

-আমার নানী।

-সে মানুষ খেতো না?

-না। অন্য জীবজন্তু সবই সে অনায়াসে খেয়ে ফেলতো। কিন্তু কেন জানি মানুষ খেতো না।

-সে জন্যই বোধ হয় তার বুদ্ধিটা টনটনে ছিল।

-এ ছাড়াও তার মেয়েটা যে বেয়াড়া ছিল তা সে ভালো করে জানতো।

-আর লোভী নাম্বার ওয়ান। সেই জন্য বিকট রাক্ষস নন্দিনী হয়েও সে মানুষের জন্য এই চিন্তাটা করে আমাকে এটা শিখিয়ে দিয়ে গেছে।

-কোথায় গছে?

-মরে গেছে? তার বয়স কতো হয়েছিল?

-তিনশো।

-তিনশো বলিস কি!

-না, বলবার কিছু না। এ কথা তো সবার জানা। আমাদের মনে রাক্ষসদের বয়স তিনচার কেন পাঁচ ছয় হাজার বছরও হয়। কিন্তু আমার নানী বেচারা দাঁতের কষ্টে মারা গেলো।

-তা কেমন করে হলো?

-আরে সে এক লজ্জার ঘটনা। নানী একটা গরিলা ধরতে গিয়েছিল। গরিলা তার মুখে এমন থাপ্পড় দিয়েছিল যে তার সবকটা দাঁত একেবারে ঝর ঝর করে ঝরে পড়েছিল। গরিলা ধরাতো দূরের কথা তখন তার কি যে কষ্ট। কতো ডেন্টিস্ট এলো আর গেলো। তাদের চেম্বার এনে বাড়িতে বসানো হলো। কিন্তু নানীর দাঁত লাগান গেলো না। কিছু খেতে পারে না। শুধু পচা মাংসের সুপ, তাজা রক্ত আর…

-আর থাক। আর শুনতে চাই না। আমার গা ঘিন ঘিন করছে। বমি আসছে।

-তোরা মানুষরা অমনি। এতে বমি আসে ওতে পায়খানা আসে। যাকগে ওসব কথা। আমি আর রক্ত-টক্তর কথা বলছি না শেষে কি হলো তাই শোন।

-বল।

-নানীর যখন সেই শোচনীয় অবস্থা তখন এক বুড়ো ডেন্টিস্ট বললো, কি যদি ম্যামথের দাঁত এনে লাগিয়ে দেয়া যায় তাহলে হয়তো হতে পারে। কিন্তু ম্যামথ মানে তো সেই বিরাট আকারের হাতি। তারা তো সেই আদিকালে পৃথিবীতে বাস করতো। এখন কোথায় তাদের পাওয়া যাবে? মুরগি বা হাঁস, জিরাফ, বাঘ, ভালুক মানে একালের কিছু হলে তো কথা ছিল না। হয় কোনো মিউজিয়াম অথবা কোনো পাহাড় বা গেøসিয়ারের মধ্যে জমে থাকা, আটকে পড়া ম্যামথ বা তার দাঁত যদি পাওয়া যায় তার চেষ্টা করা হলো। চিঠি লিখে সব দেশের রাক্ষসদের জানানো হলো।

শেষকালে প্রায় দুবছর পরে আরিজোনা, কাঙ্গো বা ব্রিটিশ, কলাম্বিয়া অথবা সাইবেরিয়ার এক রাক্ষস এক সেট ম্যামথের দাঁত পাঠালো। কিন্তু মুণ্ডুসমেত। সে এক যন্ত্রণা। বড় বড় মিস্ত্রি এলো বড় বড় করাত ও কুড়োল নিয়ে। তারা এসে বহু চেষ্টা করলো। কিন্তু মুণ্ডু থেকে দাঁত আলাদা করতে পারলো না। আরো এক বছর কেটে গেলো। মিস্ত্রিরা সব ফেল। তারপর ইঞ্জিনিয়ার এলো একদল। রাশিয়া, জাপান, আমেরিকা, চীন কোনো দেশ বাদ গেলো না। শেষে আমাদের দেশের জিঞ্জিরা থেকে এক পুচকে ইঞ্জিনিয়ার একটা ইলেকট্রনিক করাত দিয়ে ম্যামথের মাথা থেকে দাঁত আলাদা করে দিল। সে বেশি টাকাও নিলো না। মাত্র দুহাজার টাকা।

তারপর সমস্যা হলো ডেন্টিস্ট নিয়ে। যে বুড়ো ডেন্টিস্ট বলেছিল ম্যামথের দাঁত লাগালে চলবে, সে ডেন্টিস্ট হঠাৎ ভলকানোর মধ্যে পড়ে মরে গিয়েছিল। আর সে পড়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই সেই ভলকানো মানে আগ্নেয়গিরির মধ্যে দিয়ে অগ্ন্যুৎপাত শুরু হয়ে গিয়েছিল। প্রায় এক মাস ধরে সেই পাহাড়ের মাথা দিয়ে গনগনে আগুন, ধোঁয়া গলানো লোহা, তামা, সীসা ও আরো কতো ধাতু, গরম কাদা পানি মাটি পাথর ছিটকে ছিটকে বের হতে থাকে, তাতে আশপাশের হাজার হাজার গ্রাম একেবারে সেই আগুনের স্রোতে পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। সেইসব গ্রাম, বাড়িঘর মাঠ বাগান, ফসল ক্ষেত কিছুরই কোনো চিহ্ন থাকে না। সেসব জায়গা দেখলে মনে হবে না যে সেখানে কোনো বসতি ছিল এককালে, একেবারে যেন পাথরগুলো লেপে দিয়েছে।

-তারপর কি হলো, তাই বলো, ভলকানো-মলকানোর গল্প শুনতে আর ভালো লাগছে না। এই টানেলের মধ্যে থেকে বের হতে পারবো কিনা তার ঠিক নেই।

-আচ্ছা শোন। এই টানেল আর একটু পরে শেষ হয়ে যাবে। এপথ দিয়ে হেঁটে আমরা অনেকবার অনেক বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়েছি। তোর ভয় নেই।

-তোদের ভয় আর আমাদের ভয় আলাদা। সে যাই হোক, বল। হ্যাঁ, তার পরে আবার সেই জিঞ্জিরার ডেন্টিস্ট।

-তুই কি বলতে চাস জিঞ্জিরায় ডেন্টিস্টও পাওয়া যায়। আর তাদের দিয়ে সাংঘাতিক সাংঘাতিক কাজ হয়।

-হয়, হয়, তুই হয়তো জানিস না। যা হোক এবারও এক ষোলো বছরের ডেন্টিস্ট এসে নানীর মুখে ম্যামথের দাঁত সেট করে দিয়ে গেলো। এক বছরের গ্যারান্টিও দিয়ে গেলো। নানীতো একদম ভালো হয়ে গেলো, আর প্রাণভরে জীবজন্তু খেতে লাগলো। খেতে খেতে এ অঞ্চলের জীবজন্তু সব শেষ হয়ে গেলো। তখন সে আফ্রিকায় যাবে বলে ঠিক করলেন। এর মধ্যে এক বছর হয়েও গেলো। নানী খুশিতে ডগমগ।

পথে খাবার জন্য সে এক ডজন কুমির শুকিয়ে রেখেছিল। একদিন মাঝরাতে ঘুম ভেঙে নানীর মনে হলো কুমিরগুলো ঠিকমতো শুকিয়েছে কিনা একটু দেখা দরকার। তাই ভেবে সে একটা শুকনো কুমির চিবোতে শুরু করলো। একটা খাওয়া হয়ে গেলো। নানীর বেশ ভালো লাগলো কুমিরটা খেয়ে। সে আর একটা খাবে বলে প্রায় আধখানা শুকনো কুমিরের মাথার দিকটা মুখে পুরে দিয়ে চিবোতে লাগলো। হঠাৎ লাগানো ম্যামথের দাঁত খুলে তার গলার মধ্যে ঢুকে গেলো। অনেক চেষ্টা করলো। সেই বিশাল দাঁত গলার ভেতর থেকে বের করতে পারলো না। এমনকি কুমিরের মাথাও মুখের ভেতর থেকে বের করতে পারলো না। দম আটকে গিয়ে সে ভয়ানক যন্ত্রণায় দাপাদাপি, এপাশ-ওপাশ করতে লাগলো। অতবড় ভারী শরীরটার সেই দাপাদাপির ভার তার ঘর সইতে পারলো না।

মড়মড় করে তার ঘর তার গায়ের ওপর পড়লো। ম্যামথের দাঁতের চাপে তার শ্বাসনালী ঠিক সেই সময় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলো। সে মারা গেলো। এই যে আমরা টানেলের বাইরে এসে গেছি। তুই সামনে তাকিয়ে দেখ একটা বাস আসে কিনা। আমি সুইচটা বন্ধ করে দিই।

বিম্বিশা টানেলের সুইচটা অফ করে দিলো। কোনো শব্দ না করেই একটা পাথরের দরজা এসে বন্ধ হয়ে গেলো। ইপ্সি বললো- ওই যে একটা বাস। বিম্বিশা বললো- উঠে পড়। উঠে পড়। কিছু মনে করিস না। আবার দেখা হবে। ইপ্সি বললো- মনে হয় না।

আরও সংবাদ...'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj