ঈদের সেকাল একাল

শুক্রবার, ১৫ জুন ২০১৮

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় অনেক কিছুই। ঈদের আনন্দও কী বদলে যায়? ছোটবেলার ঈদের আনন্দ কী বড়বেলায় এসে কিছুটা ছন্দ হারায়? এমন প্রশ্ন ছিল দেশের বরেণ্য কয়েকজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের কাছে? তারা জানিয়েছেন সময়ের সঙ্গে অনেক কিছুই বদলায়, ঈদের আনন্দ, আনন্দ উদযাপনের ধরনে আসে পরিবর্তন। ছোটবেলায় মনের আনন্দে ঈদ উদযাপন করলেও বড়বেলায় এসে ঈদের আনন্দের সঙ্গে যুক্ত হয় দায়িত্বের চাপ। ছোটবেলায় বাবা-মায়ের কাছে নানা রকম বায়না নিয়ে হাজির হওয়া যায়, বড়বেলায় সন্তান, নাতি-নাতনিদের নানারকম আবদার মেটাতে হয়। ঈদ নিয়েই সাজানো হলো এবারের আয়োজন। কথা বলে লিখেছেন শাহনাজ জাহান

মামুনুর রশীদ

আমরা গ্রামেই বড় হয়েছি। সারা বছরে এই ঈদের দিনটিই ছিল আমাদের উৎসবের দিন। চাঁদ রাতে ভালো ঘুম হতো না। শুধু মনে হতো কখন সকাল হবে। তখনকার মানুষদের এখনকার মতো এত বিত্তবান ছিল না। তাই সালামির প্রচলনও তেমন ছিল না। ছোটরা একজোড়া জুতা, একটি জামা পেলেই মহাখুশি হয়ে যেতাম। ঈদের দিন সকালে আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে যেতাম। খালাতো, মামাতো ভাইবোনের সঙ্গে মিলিত হওয়ার আনন্দটা বেশ উপভোগ করতাম। কিন্তু এখনকার ঈদটা পণ্যে পরিণত হয়েছে। এখন সবাই আনন্দের চাইতে কার কত বেশি টাকা আছে, সেটা দেখাতেই ব্যস্ত থাকে। এখন বিনোদনের বহু ক্ষেত্রও তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেই অনাবিল আনন্দটা আর নেই।

লায়লা হাসান

ছোটবেলার ঈদ ভীষণ আনন্দে কাটত। কত হৈচৈ করতাম চাঁদরাতে, মেহেদি পরা নিয়ে। আব্বা, আমাদের শপিংয়ে নিয়ে যেতেন। আব্বা আমাকে খুব আদর করতেন। তিনি আমাকে মা বলে ডাকতেন। এক ঈদে হলো কি, আব্বা আমাকে মার্কেটে নিয়ে গেলেন। একজোড়া নূপূর আমার খুব পছন্দ হলো, তিনি কিনে দিলেন। আমিও মহাখুশি। সারারাত নূপুর পরছি, আবার খুলে রাখছি। কখন সকাল হবে তাই ভেবে। এরকম করতে করতে একটা নূপুরের নব ভেঙে গেল। তারপর আমার সে কি দুঃখ, সঙ্গে ভয়। আব্বা দেখতে পেলে কি বলবেন? ঈদের দিন আমি এক পায়ে নূপুর পরলাম। তা দেখে আব্বা জিজ্ঞেস করলেন এক পায়ে কেন পড়েছো? আমি ছোট মানুষ বুদ্ধি খাটিয়ে বললাম, আব্বা এটা ফ্যাশন। তাই বলে তৎক্ষণাৎ রেহাই পেয়েছিলাম। তারপর সারাদিন, এর বাসা ওর বাসায় ঘুরতাম বন্ধুরা মিলে। যখন বাসায় ফিরতাম তখন পেট ভরপুর। আম্মা খুব রাগ করতেন। বলতেন আমি কষ্ট করে রান্না করি আর তোরা কিনা বাইরে খেয়ে পেট ভরে আসিস? জামা-কাপড় নিয়েও কিন্তু আমরা ছোটবেলায় ভয়ে থাকতাম। কেউ দেখে ফেললেই তো ঈদ শেষ হয়ে যাবে। সেই ভয়ে বালিশের নিচে নিয়ে ঘুমাতাম। বড় হয়ে এখন দায়িত্ব বেড়েছে। সেই ছোটবেলার ঈদের আনন্দ ভীষণ মিস করি। এখন ছোটদের মধ্যে ঈদ নিয়ে উন্মাদনা দেখতে ভালো লাগে।

ফারুক

ছোটবেলা আসলে খুব মজার। আর তার মধ্যে ঈদ তো বিশাল ঘটনা। চাঁদরাতে আমার ভালো ঘুম হতো না। বালিশের নিচে লুকিয়ে রাখা জামাকাপড় দেখতাম একটু পর পর। এগুলো পাহারা দিতে দিতে একসময় ঘুমিয়েও পড়তাম। অনেক সময় অনেক কিছু মনঃপূত হতো না। কিন্তু কিছু করার ছিল না। ওটা নিয়েই আনন্দে থাকতাম। ঈদের দিন আব্বার সঙ্গে ঈদগাহে নামাজ পড়তে যেতাম। দেখতাম কীভাবে ঈদ হয়। একটা বিষয় আমাকে খুব আনন্দ দিত, সেটা হলো আমাদের বাসা থেকে গরিব মানুষ কখনো খালি হাতে যেত না।

আমাদের যে খুব টাকাপয়সা ছিল তা কিন্তু নয়। সেই অল্প থেকেই গরিবদের আমরা সাহায্য করতাম। এটা আমাকে খুব স্বস্তি দিতো। ছোটবেলা আমরা বাবা-মায়ের ওপর ভরসা করে বসে থাকতাম। আর এখন নিজেরাই বাবা হয়েছি, এখন আমার ওপরে আমার পরিবার ভরসা করে। এটা তাদের অধিকার। এই নিয়েই এখনকার ঈদ চলে যায়।

লীনা তাপসী খান

ছোটবেলার ঈদ মানেই আনন্দ। তখন যে যেমনই জামাকাপড় পড়ুক এটা কোনো বিষয় ছিল না। বাবা-মা, যা এনে দিত তাতেই সবাই আত্মহারা হয়ে যেতাম। কখনো আফসোস হতো না জামাকাপড় নিয়ে। সকাল হলেই জামা-জুতো পরে সব বন্ধু মিলে প্রতিটি বাড়িতে যেতাম। তখন পরিচিত, অপরিচিত বিষয়টা ছিল না। একসঙ্গে সবাই মিলে সব বাসাতে যাওয়াটাই ছিল আনন্দের। প্রতিটা বাড়ি যাওয়া এক চামচ করে সেমাই খাওয়া তারপর ঈদের সালামি নিয়ে চলে আসা। ঈদির বিষয়টাতে খুব মজা পেতাম। একবার ঈদে আমাকে একজোড়া টুকটুকে লাল রংয়ের স্যান্ডেল কিনে দেয়া হলো। স্যান্ডেল পরে কিছুদূর যেতেই সেটা ছিঁড়ে গেল। কি যে কষ্ট পেলাম!

এই ঘটনা এখনো আমাকে পীড়া দেয়। ঈদের আগের দিন আমাদের বাড়িতে রান্নাবাড়া, ঘর পরিষ্কার করা, গোছানোর ধুম পড়ে যেত।

আমাদের বাড়িতে চাঁদরাত থেকেই পুরনো দিনের সব গান বাজানো হতো। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ‘পথের ক্লান্তি ভুলে’ আর ‘মা’ গানটা সবচেয়ে বেশি বাজানো হতো। খুব মজা হতো ঈদে। এখনকার ঈদ আসলে ঈদ মনে হয় না। মনে হয় এটা একটা কাজ। যখন ফাঁকা থাকি আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করি, পারিবারিকভাবে প্রশান্তি খুঁজি। এটা গতানুগতিকতায় পরিণত হয়েছে। এখন আনন্দ করি, কিন্তু ছোটবেলার সেই আনন্দটা আর খুঁজে পাই না।

আরও সংবাদ...'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj