উৎসবের আরেক নাম বিশ্বকাপ : শামসুজ্জামান শামস

শুক্রবার, ১৫ জুন ২০১৮

বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতি চার বছর পরপর হওয়া একটি মহাযজ্ঞই। এটি কেবল একটি সাধারণ ক্রীড়া আসরই নয়, এর সঙ্গে জড়িত হয়ে আছে অনেক কিছুই। ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান। বিশ্বের ২১১টি দেশের ৭০০ কোটি মানুষ প্রাণ ভরে উপভোগ করবে বিশ্বকাপের খেলা। বিশ্বকাপের সময় সারা বিশ্বের প্রায় ২০০ কোটি মানুষ এর সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িত থাকে। অর্থাৎ বিশ্বের চার শতাংশ মানুষ বিশ্বকাপের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। জড়িত তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রম, জীবন ও জীবিকা। রাশিয়া-সৌদি আরব ম্যাচ দিয়ে ২১তম বিশ্বকাপের পর্দা উঠবে। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় সমগ্র পৃথিবী ক্রীড়াবিশ্বের অন্যতম বড় এ উৎসবটি বরণ করে নেয়ার প্রহর গুনছে। আমাদের দেশে বেশ কয়েক বছর ধরে বিশ্বকাপ ফুটবল উৎসবে পরিণত হয়েছে। লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা বিশ্বকাপে না থাকলেও এ দেশের হাটে, মাঠে, ঘাটে, বাড়ির ছাদে ওঠানে পত পত করে উড়ছে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, স্পেন, জার্মানি, ইংল্যান্ড, ফ্রান্সসহ অনেক দেশের পতাকা। তরুণ-তরুণী তো বটেই শিশু কিংবা মধ্যবয়সীরাও বাদ থাকতে নারাজ বিশ্বকাপ উন্মাদনার এই রঙিন ছোঁয়া থেকে। ঘরে-বাইরে চলছে কোন দল সেরা এই নিয়ে তর্কযুদ্ধ। কি ক্যাম্পাস, বন্ধুদের আড্ডা বা চায়ের দোকান সবখানেই চলবে বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে আলোচনা।

কার হাতে উঠবে ২১তম বিশ্বকাপ ট্রফি। নতুন বিশ্বসেরা কারা? জ্বলে উঠবেন কোনো তারকা। চলছে এমন অনেক হিসাব-নিকাশ ১৮৭২ সালে স্কটল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের খেলার মধ্য দিয়ে বিশ্বে প্রথম আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলার প্রচলন ঘটে। ১৯০৪ সালে ফিফা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ১৯০৬ সালে ফিফা সুইজারল্যান্ডে অলিম্পিকের আদল থেকে ভিন্ন একটি আন্তর্জাতিক ফুটবল প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। আন্তর্জাতিক ফুটবলের বয়স তখনো অনেক কম হওয়ায় তা সফলতার সঙ্গে সমাপ্তি ঘটেনি। উরুগুয়ে ১৯২৪ ও ১৯২৮ সালের অলিম্পিক ফুটবল প্রতিযোগিতায় স্বর্ণপদক লাভ করে। ১৯২৮ সালে ফিফা অলিম্পিকের বাইরে আলাদাভাবে নিজস্ব আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৩০ সালে স্বাধীনতার শতবর্ষ পা দেয়া দুবারের অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়েকে (১৯২৪ সাল থেকে ফিফার পেশাদার যুগ শুরু করে) ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপের স্বাগতিক দেশ হিসেবে নির্বাচন করে ফিফা। আর সেই থেকে বিশ্বকাপ ফুটবলের জয়যাত্রা শুরু হয়। ১৯৩০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত বিশ্বকাপ জয়ী দলকে জুলে রিমে ট্রফি প্রদান করা হতো। ফিফা প্রেসিডেন্ট জুলে রিমের নামে এটির নামকরণ করা হয়। ১৯৭০ সালে ব্রাজিল তৃতীয় বারের মতো বিশ্বকাপ জিতলে তাদের স্থায়ীভাবে ট্রফিটি দেয়া হয়।

১৯৭০ সালের পর আরেকটি নতুন ট্রফির যা ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি নামে পরিচিত এ নতুন ট্রফিটির উচ্চতা ৩৬ সেন্টিমিটার, ১৮ ক্যারট সোনা দিয়ে তৈরি ও ওজন ৬১৭৫ গ্রাম। ১৯৮২ বিশ্বকাপে দলের সংখ্যা বৃদ্ধি করে ২৪ করা হয়। এরপর ১৯৯৮ সাল থেকে ৩২টি দেশ বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পাচ্ছে। ১৯৩০ সাল থেকে সদ্য শুরু হওয়া বিশ্বকাপ ফুটবল লড়াইয়ে নায়ক থেকে খলনায়ক কিংবা এর বিপরীতটা ঘটে যাবার নজির আছে অনেক, একই সঙ্গে রয়েছে অনেক তারকার উত্থান ও বিজয়গাথা। দলীয় পারফরম্যান্সের সঙ্গে সঙ্গে এখানে অনেক খেলোয়াড় থাকেন দর্শকদের নেক নজরে। অতিমানবীয় ফুটবল নৈপুণ্য দেখিয়ে সর্বোচ্চ গোল করে এখানে খেলোয়াড়রা পান গোল্ডেন বুট, ২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপে কে হবেন সর্বোচ্চ গোলদাতা? সে তালিকায় রয়েছেন মেসি, নেইমার, রোনালদো, টমাস মুলার, গ্রিজম্যান, হ্যারি কেন। এবার রাশিয়ার ১২টি স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের যে ম্যাচগুলো হবে তা খেলা হবে টেলস্টার-১৮ নামক বল দিয়ে। রাশিয়া বিশ^কাপের বল তৈরি করেছে অ্যাডিডাস। ১৯৭০ সাল থেকে বিশ^কাপ ফুটবলের জন্য বল তৈরি করছে প্রতিষ্ঠানটি। ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ^কাপে ব্যবহার করা বলটি দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে এবারের বিশ^কাপের জন্য টেলস্টার-১৮ নামক বলটি তৈরি করেছে অ্যাডিডাস।

এবারের ফুটবল বিশ্বকাপ যেন আগাগোড়া প্রযুক্তিতে মোড়া। খেলোয়াড়দের শরীরেও যুক্ত থাকবে বিশেষ সেন্সর, যা তাদের শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করবে। ১৯৮৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ বলেই ‘ঈশ্বরের হাত’ দিয়ে গোল করতে পেরেছিলেন দিয়েগো ম্যারাডোনা। বর্তমানে হলে তা কি আর সম্ভব হতো? তাই বলা চলে, প্রযুক্তি শুধু বিশ্বকাপ দেখার অভিজ্ঞতাই বদলে দেয়নি, কখনো কখনো বদলে দিচ্ছে ম্যাচের ফলও। আর বিশ্বকাপে প্রযুক্তির ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে। প্রায় দুই বছর ধরে কয়েকশ ম্যাচে পরীক্ষা চালানোর পর এ বছরের মার্চে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) নামের প্রযুক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। রাশিয়াতেই প্রথমবারের মতো রেফারিকে সাহায্য করবে ভিএআর। প্রযুক্তিটি অনেকটা ক্রিকেটের থার্ড আম্পায়ারের মতো।

পর্দার সামনে একদল রেফারি বসে থাকেন। তারা ভিডিও ফুটেজ দেখে পরীক্ষা করে মাঠের রেফারিকে তথ্য জানান। মূল রেফারি তাদের কথার ওপর নির্ভর করতে পারেন, চাইলে নিজেও ভিডিও ফুটেজ পরখ করে দেখতে পারেন। ফুটেজ দেখে মূল রেফারির যে সিদ্ধান্ত দেবেন, তাই চূড়ান্ত।

আরও সংবাদ...'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj