আম্বিয়া খাতুনের বিদ্রোহ : দীপিকা ঘোষ

শুক্রবার, ১৫ জুন ২০১৮

গাঁয়ের উঠতি ধনী মাতব্বর আসরদ্দি সর্দারের কথামতো গফুর শেখ তিনদিন আগে মসজিদের ইমাম, মজিদ আলির কাছে শপথ করেছিল তার প্রথম সন্তান আম্বিয়া খাতুনের নিকাহ্ ঠিক না করে অন্য কাজে সে হাত দেবে না। উত্তরে বৃদ্ধ ইমামসাব খুশি হয়ে তার পিঠ চাপড়ে বলেছিল- দেইখো শ্যাখের পো, তুমার জবাবের য্যান নড়চড় না হয়। হইলে সারা গেরামে কিন্তুক আল্লাহ্পাকের গজব নামবো! অত বড় মইষের নাগাল জুয়ান ম্যায়া, সে সবখানে মদ্দ পুলা হইয়া চইরা বেড়ায়, এই রকম পাপ আর কতকাল চোখে দেখন যায়? তুমার তারে এইভাবে ছাইড়া রাখা উচিত হয় নাই গফুর শ্যাখ! ম্যায়ার কামাই যতি খাবা তাইলে তিনখান মদ্দ পুলার জম্ম দেছো ক্যান? ম্যায়াছেলের থান হইলো ঘরের ভিতার, বায়রা তার এত কী? তুমার ম্যায়া তো আর বেইশ্যা না গফুর শ্যাখ! মাতব্বর আসরদ্দি সদ্দার খুব ভালো কথাই কইছে তুমারে! যাও, এবার তারে ঘরে বান্ধনের কাম করো!

হঠাৎই অলৌকিকভাবে কয়েক বছর ধরে আসরদ্দি সর্দারের অর্থনৈতিক অবস্থা বদলাতে শুরু করেছে দ্রুত। বছর দুয়েক আগে গ্রামের মধ্যে সে মসজিদ- মাদ্রাসা বানিয়েছে নিজ গ্যাঁটের পয়সা খরচা করে। মসজিদের মজিদ আলি তারই নিযুক্ত ইমাম সাহেব এবং গ্রামের মধ্যে আসরদ্দি সর্দারের গোপন ফতোয়ার জোর ইমাম মজিদ আলির প্রকাশ্য ফতোয়ার চেয়ে ঢের বেশি শক্তিশালী। একে ডিঙিয়ে যাবার শক্তি ও সাহস অসচ্ছল গফুর শেখের নেই। মজিদ আলির সঙ্গে কথা শেষ করে গফুর শেখ যখন বাড়ি ফেরার রাস্তা ধরলো তখন শেষ কার্তিকের সূর্যের আলো প্রায় মরে যেতে বসেছে। মসজিদের পেছনে সবুজ গাছের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে পড়েছে তার রক্তাক্ত ¤øান পরশ। তার অনেকখানি রক্তিম আভার জ্বলুনি বুকে পুরে অন্য মনে পথ চলছিল গফুর শেখ। কেননা ইমাম সাহেবের কথাগুলো যে আসলে আসরদ্দি সর্দারেরই নির্দেশ, এই সত্য বোঝার মতো স্পষ্ট উপলব্ধি খানিক আগেই তার হয়েছিল। একটু আগে হাট ফিরতি পথের মধ্যে ভিন গাঁয়ের কিছু ইয়ারদোস্তদের সামনেই গফুর শেখকে হঠাৎ পথ আটকে আসরদ্দি সর্দার জিজ্ঞেস করেছিল- গফুর মিয়া, তুমার ম্যায়ার নিকাহ্র কাম কিছু আগাইল? হঠাৎ আসরদ্দির এরকম প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিল না গফুর শেখ। বিশেষ করে গত দু’তিন বছর ধরে আম্বিয়া খাতুনের নতুন করে নিকাহ্ দেবার কথা তার মনেও হয়নি। তাই বোঝার অক্ষমতায় জবাব দেবার বদলে অবাক হয়ে সে প্রশ্ন করেছিল- হঠাৎ এই কথা জিগাও ক্যান মাতবরসাব?

আসরদ্দির মুখের প্রত্যেক রেখায় গাম্ভীর্যের ছোঁয়া লেগেছিল এরপরে। সমাজে তার অবস্থান এখন পাল্টে যাচ্ছে দ্রুত। তার ব্যক্তিত্ববোধের প্রখরতাও তাই বেড়ে গেছে অনেকটা। গাঁয়ের ধনী ব্যক্তি এবং মাতব্বর হিসেবে গফুর শেখেরই তার প্রশ্নের জবাব দেবার কথা। প্রশ্ন করবার ধৃষ্টতা নয়। দরিদ্র গফুর শেখের এই আচরণকে তাই ঔদ্ধত্যের প্রকাশ বলে মনে হয়েছিল তার কাছে। আসরদ্দি প্রশ্নের জবাব না দিয়ে গম্ভীর গলায় একরাশ বিরক্তি ঢেলে বলেছিল- আইজ বাড়ি যাবার পথে মসজিদে গিয়া ইমামসাবের সাথে অবশ্য দেখা কইরা যাবা! সব কথা তার কাছ থিকা তুমার জানা দরকার! এই প্রসঙ্গেরও মর্মোদ্ধার করতে না পেরে গফুর শেখ আসরদ্দি সর্দারের মুখে ফের সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকাতেই হঠাৎ অকারণে নিজের ঘন কাঁচাপাকা দাড়ির মধ্যে খানিকটা আঙুল চালিয়ে মহাবিরক্তিভরে সে বলে উঠেছিল- অমন গবেট চোখে চাইয়া আছো ক্যান? আমার কথার অর্থ বুজো নাই? এর জন্যিই নিজির ম্যায়াটারে অমন ধম্মের ষাঁড় বানাইয়া ছাইড়া দেছো মিয়া! অন্য গেরামের মাইনষের কাছে আমার তো এতে মান-ইজ্জত যায়! তুমার গাধামি আমার অসহ্য লাগে গফুর শ্যাখ! এখুন যাও! আমার অন্য কাম আছে! মসজিদে যাও, ইমামসাব তুমারে সব ভালোমতোন বুজাইয়া দেবে! খাড়াইয়া রইলা ক্যান? যাও!

জলিরপারের গফুর শেখ এখন চার সন্তানের জনক হলেও সুদীর্ঘ চোদ্দ বছর ধরে তাদের প্রথম ও একমাত্র কন্যা, আম্বিয়াই ছিল একমাত্র সন্তান। আর্থিক অবস্থা সচ্ছল না থাকায় তখন মেয়ে হয়েও আম্বিয়াকে অর্থ উপার্জনে পিতার সঙ্গে পুত্রের ভূমিকা পালন করতে হতো। আম্বিয়ার সেই পুরনো অভ্যাস তিন পুত্রের জন্মের পরেও এখনো অনেকখানিই বজায় আছে। ভাইয়েরা তার চেয়ে অনেক ছোট হওয়ায় এখনো সেই-ই বেশিরভাগ সময় মাঠে গরু দুটোকে চরায়। মাথায় করে বোঝা টেনে আনে। সামান্য জমির ফসলটুকু মাড়াইয়ের কাজ করে। এমনকি তাদের মাটির ঘর জীর্ণ হয়ে গেলে বাবাকে সে ঘর সারাইয়ের কাজেও সাহায্য করে। আম্বিয়ার এই কাজের মধ্যে যে কিছুমাত্র অপরাধ আছে, এমন কথা এক হাট ভিন গাঁয়ের লোকের মধ্যে আসরদ্দি সর্দার অমন অপমান করে না বোঝালে গফুর শেখের মনে হয়তো কখনো উদয়ই হতো না। এছাড়া ছেলেবেলা থেকেই আম্বিয়ার জীবনধারাটাই এমন যে, গাঁয়ের কারুর মনে কখনো কোনো সংশয়ও জাগেনি এসব নিয়ে। তবুও সংশয় যখন একবার ইমামের ফতোয়া জারির ভেতর দিয়ে শুরু হয়ে গেল তখন তা যে প্রবলরূপে গ্রামের বহু মনেই এখন তোলপাড় জাগাবে, এই ইঙ্গিত মজিদ আলি যেমন গফুর শেখকে দিয়েছিল তেমনি গফুর শেখও জেনেছিল, এই নিয়ে তার বিরুদ্ধে অনেককাল ধরেই একটি বিদ্রোহের চারা রোপিত হয়ে আছে।

দু’দিন আগে মেয়ের পাত্র ঠিক করতে যাওয়ার পূর্বে স্ত্রী নসিরনবিবিকে সে তাই ব্যাকুলভাবে বলেছিল- যে কইরাই হোক আমার জবান রাখা চাই আম্বিয়ার মা! ইমামসাবরে আমি কথা দেছি! কিন্তুক আসলে তো জানি, এর পাছে আসল কলকাঠি নাড়ার মালিক ওই আসরদ্দি সদ্দার! ও জল্লাদটা পারে না এমুন কাম তামাম দইনায় নাই! সেই জন্যেই তো ডর আমার বেশি! নসিরন এমনিতে বেশ বোকাসোকা হলেও সেই মুহূর্তে স্বামীর কাছে কথা বলেছিল খুব গুছিয়ে। বলেছিল- ম্যায়ার জামাই খুঁইজ্যা আনা তো আর বশ্শি দিয়া মাছ ধরার ব্যাপার না আম্বিয়ার বাপ, যে টোপ দিলাম আর মুখ ফাঁক কইরা গিললো? যারা তুমারে এইসব কথা কয়, তুমি না পারলে তারই খুঁইজা দিক না! আমরা তো আর ম্যায়ার নিকাহ্ দিব না বইলা গোঁ ধইরা বসি নাই! অত ডর কিসের তুমার? ডর পাই ওই চশোমখোর আসরদ্দি আর তার সব নেকড়ে সাকরেদগুলানরে! হঠাৎ আম্বিয়ার নিকাহ্ নিয়া অগো অতো মাথা ব্যথা হইলো ক্যান কও তো আম্বিয়ার মা? এতকাল তো হয় নাই! তাই ভাবি, অগো আসলে মতলবখান কী? ইমামসাবের কথাবাত্তাও য্যান এখুন কেমুন কেমুন…. বলতে বলতেই মিইয়ে গিয়েছিল গফুর শেখ।

চব্বিশ পেরিয়ে এখন প্রায় পঁচিশ ছুঁইছুঁই করছে আম্বিয়া খাতুন। গাঁয়ের সব খেটে খাওয়া মেয়েদেরও এই বয়সে যে দৈহিক সৌন্দর্যটুকু থাকা উচিত আম্বিয়ার তা নেই। সেই কৈশোর থেকে আজ অবধি পথে-ঘাটে আসতে যেতে কোনো ভিন পুরুষই তার দিকে এমন দৃষ্টিপাতে কখনো তাকায়নি, যাতে ভালোলাগার একটি নিটোল মুগ্ধতা সে চোখে ফুটে ওঠে। আম্বিয়া তাই বোধের জাগরণ থেকেই জানে, দেখতে সে সুন্দরী নয় এবং এজন্য একটি কুণ্ঠিত লজ্জাবোধও মাঝেমধ্যে অঙ্কুশের ঘায়ে বেদনা দেয় তাকে।

আম্বিয়ার গড়ন খানিক পরিমাণে পুরুষালি। বাঙালি মেয়ের তুলনায় ঢ্যাঙা। মেদহীন শরীর। চলাফেরাতেও মেয়েলি নরম ছাদের বদলে একটু বেশি দৃঢ়তা। যেন সারাক্ষণই একটি ললিত ছন্দের বাইরে পা রাখতে ব্যস্ত তার শরীর। তবুও তার বিয়ে হয়েছিল। একবার নয়। তিনবার। কৈশোর যৌবনের সন্ধিলগ্ন থেকে একেবারে পরিপূর্ণ শ্রাবণের বিকশিত কদম ফুলের মতো মুখরিত যৌবনে। কোনো বিয়েই টেকেনি। দু’বছর পেরুতেও মা হতে পারেনি বলে। তার রূপহীনতার অভিশাপের ওপর এই অক্ষমতা প্রতিবারই বয়ে এনেছিল কঠোরতর প্রতিবাদের আক্রোশ! আম্বিয়ার তালাক হয়েছিল তিনবার। কারণ কুরূপা আম্বিয়াকে যারা বিয়ে করেছিল তারা কেউই তাকে সন্তান তৈরির বিশেষ যন্ত্র ছাড়া আর কিছু ভাবেনি।

আশ্চর্যভাবে তিনদিনের মধ্যেই চতুর্থবারের মতো আম্বিয়ার বিয়ে ঠিক করে ঘরে ফিরে এলো গফুর শেখ। বিজয়লাভের গৌরব তখন তার বুকের মধ্যে দামামা বাজাচ্ছিল খুব জোরেসোরে। স্বয়ং মসজিদের ইমাম মজিদ আলিসহ আসিরদ্দি সর্দার তাকে যে অপমান করেছে এবার তার জবাব দেবার পালা। কাল সকাল না হতেই ইমামকে সে জানিয়ে দেবে কাউকে জবান দিলে গফুর শেখ তা রাখতেও পারে। নিজের কৃতিত্বে উৎফুল্ল গফুর শেখ তাই উঠোনে পা দিয়েই স্ত্রীর উদ্দেশে গলা চড়িয়ে কথা বললো- আম্বিয়ার মা গেলা কই? বহুৎ খুশ খবর আছে শুইনা যাও! বলতে বলতে অজ¯্র তালি লাগানো ছাতাটিকে বারান্দার বাঁশের আড়ার সঙ্গে ঝুলিয়ে রেখে মৌজ করে পা গুটিয়ে বসলো গফুর শেখ। তারপর হাতের নাগালে ঝুলে থাকা একটি পুরনো তেলচিটে গামছায় মুখ মুছে ঘরের দরজায় তার অপেক্ষমাণ দৃষ্টি প্রসারিত করলো।

একটু পরেই চল্লিশ পেরিয়ে যাওয়া নসিরন মাথায় ঘোমটার দৈর্ঘ্য বাড়াতে বাড়াতে মিটিমিটি হাসিমুখে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলো বাইরে। নসিরনের চেহারায় দৈর্ঘ্যরে চেয়ে প্রস্থের পরিমাণটাই বেশি। এত বেশি বয়সেও তার আপাদমস্তকে তাই বেশ একটি ঢলঢলভাব আছে। স্বামীর সামনে একটি উঁচু পিঁড়িতে বসে পড়তে পড়তে কোমরের খুঁট থেকে ছোট্ট একটি পুরনো কৌটো টেনে বার করলো সে। তারপর খানিকটা তামাক গুঁড়ো আঙুলে তুলে পানের রসে কষে যাওয়া দাঁতে ঘঁষে দিতে দিতে হেসে জিজ্ঞেস করলো- আম্বিয়ার কাম ঠিক হয়া গেছে নাকি আম্বিয়ার বাপ? কুনখানে করলা? বউয়ের হাতে হাতপাখার বাতাস খেতে খেতে প্রফুল্ল মুখে আম্বিয়ার বাপ জবাব দিল- আনামপুর। নসিরুল্লাহ ঘরামির সাথে। বয়স বেশি হইলে কী হয়, দ্যাখতে শুনতে এখনো সে জুয়ান! গায়ে গতরে জোর আছে! জমিজিরেতও কম নাই! আম্বিয়া সেখানে সুখেই থাকবো! আনন্দে সফলতায় গফুর শেখ তার দুই চোখ বারকয়েক নাচালো। নসিরনের মুখে জ্বলতে থাকা প্রত্যাশার প্রদীপ হতাশার হাওয়ায় নিভে গেল এক ঝটকায়। গলার স্বরের উত্তেজনাতেও ভাটি পড়লো তার- এর আগেও তো নসিরুল্লাহ্র সাথে কাম হইছিল আম্বিয়ার বাপ! দুই বচ্ছরের বেশি তো টিকতি পারলো না! সফলতার ছন্দপতনে রুষ্ট হলো গফুর শেখ- তাতে অসুবিদা কী হইলো? সে কাম তো হইছিল আরো বারো বচ্ছর আগে! তারপর আরো দুইবার বিয়া করছে নসিরুল্লাহ। তাগো ঘরে তিন পুলা দুই ম্যায়া জম্মাইছে! বউ দুইটা অবশ্যি পরপর ব্যাদি হইয়া মরছে। কিন্তুক পুলাপানের আর সখ নাই তার! এইসব গ্যাদা গ্যাদা পুলাম্যায়া আর ভরন্ত সুম্সারটারে ঠিক রাখতেই আম্বিয়ারে সে ঘরে নিতে চায়! কিন্তু গফুর শেখ এতখানি আশাবাদ ব্যক্ত করার পরেও মুখের ভাব বদলালো না নসিরনের। সে অন্যমনে গম্ভীরভাবে গভীর গলায় বললো- আম্বিয়ার সাথে শাদির আগেও তার আরও দুইটা বউ তেরো চৈদ্দ বচ্ছর ঘর করার পরে মরছে! সেই সাথে পুলাগুলানও! এরপর আরও দুইটা বউ গেল! আমাগো আম্বিয়ার যতি কিছু হয়া যায়! সাফল্যের উত্তেজনা বারবার বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এবার জোরে জোরে খেঁকিয়ে উঠলো গফুর শেখ। তিক্ত গলায় বললো- যত কুচিন্তা খালি তুমার মনে আম্বিয়ার মা! হায়াত-মউত সবই আল্লার হাতে! কিন্তুক এর ভালো দিকও আছে! মনে করো, আমাগো আম্বিয়ার বরাত খুলবো দেইখাই এইসব ঘটনাগুলান ঘটছে! নসিরুল্লাহর এখুন কত জমিজিরেত ভাবো! তার উপুর আম্বিয়ার তো পুলাম্যায়াও হইবো না কুনোদিন! ওই জাগা সে তাও পাইবো! বলতে বলতে অস্থিরভাবে উঠে গিয়ে গফুর শেখ হুঁকো সাজাতে বসলো।

আশাবাদের কথা শুনতে শুনতে অল্পবুদ্ধির নসিরনের মুখের ওপর হারানো প্রফুল্লতা ফিরে আসতে না আসতেই মিলিয়ে গেল দ্রুত। পুরনো দিনের বহু যন্ত্রণাকাতর দিন জীর্ণ পাতার মতো ঝরে পড়লো তার দীর্ঘশ্বাসে ভরা স্মৃতির দুয়ার জুড়ে। মেয়ের জন্মের সুদীর্ঘ সাত বছর পরেও নসিরনের যখন কোনো পুত্রসন্তান জন্মালো না, তখন গফুর শেখ আরেক নারীকে ঘরে এনেছিল পুত্রলাভের প্রত্যাশায়। তার এই দাবিকে সেদিন ধর্ম আর সমাজ নসিরনের হৃদয়বেদনা থেকেও অনেক বেশি মূল্য দিয়েছিল। আম্বিয়ার মায়ের যন্ত্রণা সেদিন তাই সোচ্চার হতে পারেনি। অবশ্য তিন বছরেও পূর্ণ হতে পারেনি গফুর শেখের প্রত্যাশা। পরে এক গভীর রাতে পূর্ব প্রেমিকের হাত ধরে পালিয়েছিল সেই নারী। আম্বিয়ার বাপ এরপরে তার স্বপ্ন পূরণে অসচ্ছলতার কারণেই তৃতীয় নারী ঘরে আনেনি। কিন্তু ওই তিনটি বছরই, তরুণী নসিরনের যৌবনবতী প্রহরগুলোকে দীর্ঘ লক্ষ বছরের অপমান আর যন্ত্রণায় পুড়িয়ে খাঁক করে দিয়েছিল। আম্বিয়ার ব্যথা তাই মা হয়ে নয়, সে নারী হয়েই বুঝলো বেশি।

স্বামীর মুখের ওপর তীব্র চোখে তাকিয়ে সে জিজ্ঞেস করলো- নসিরুল্লাহর পুলাম্যায়া আছে তো তাতে আম্বিয়ার কী? তুমি পারলে অন্যখানে কাম ঠিক করো। ওই মানুষটারে আমার এট্টুও পছুন্দ হয় নাই! গফুর শেখের মোলায়েম দৃষ্টি হঠাৎই কঠোর হয়ে গেল। ভেতরের প্রচণ্ড আলোড়নে তার কণ্ঠস্বরও বদলে গেল মাধুর্যহীনভাবে। ক্ষিপ্ত হয়ে সে জিজ্ঞেস করলো- তুমার পছুন্দ হয় নাই মানে? মসজিদের ইমামসাবরে আমি তিনদিন আগে কথা দেছি না? কথা রাখতে না পারলে সারা গেরামে আল্লাহ্পাকের গজব নামবো! তার উপুর এর পাছে আছে আসরদ্দি সদ্দার! এই কাম না হইলে আমাগো সবসুদ্ধ্যা গেরামছাড়া কইরা ছাড়ব! তুমার কি মাথা খারাপ হইছে আম্বিয়ার মা? ছাড়ে ছাড়–ক! তাতে কি? বলেই নীরব হয়ে গেল নসিরন।

হঠাৎ তার চোখে পড়েছিল আম্বিয়া তাদের পেছনে কয়েক হাত দূরেই নিঃশব্দে এসে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার মুখের ওপর দীর্ঘ বাদলঝরা আষাঢ়ের প্রগাঢ় ছায়া। চোখের দৃষ্টিতে প্রতিবাদের সংক্ষুব্ধ মুখরতা। মেয়ের এমন চেহারা এর আগে কখনো চোখে পড়েনি তার। বউয়ের দৃষ্টি অনুসরণ করে পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টিপাতে মেয়ের মুখে তাকালো গফুর শেখ। আম্বিয়াও তাকালো পিতার চোখে। বজ্রদীপ্ত মেঘের মধ্যে হঠাৎ ঘর্ষণে যেমন প্রচণ্ড বিদ্যুৎ জ্বলে ওঠে, সেইভাবে। পিতা দেখলো এই আম্বিয়া তাদের প্রাত্যহিক জীবনের পরিচিত আম্বিয়া খাতুন নয়। এক আলুলায়িত আগুনের উদ্বেলিত হল্কা।

সদ্য বিয়ন্ত গাভীটাকে ঘাস খাইয়ে একটু আগেই সে ফিরে আসছিল মাঠ থেকে। পথিমধ্যে মজিদ আলির সঙ্গে দেখা হতে আজ তার সর্বাঙ্গ জুড়ে সে ফতোয়ার পতাকা উড়িয়ে দিয়েছে খুব জোরেশোরে। মজিদ আলির মুখে আম্বিয়া সবই শুনেছিল। কেবল নসিরুল্লা ঘরামির সঙ্গে নিকাহ ঠিক হয়েছে, এই খবরটি নতুন ছিল তার কাছে। গফুর শেখ মেয়ের মুখ থেকে চোখ সরিয়ে নিতেই আম্বিয়া মুখের ঘাম মুছে সুদৃঢ় স্বরে বললো- এই কামে আমার মত নাই বাজান! এ কাম তুমি ভাইঙ্গা দেও! বাজান উত্তপ্ত হয়েই ছিল। মেয়ের উক্তির পরে ফুটন্ত খইয়ের মতো তড়িৎবেগে লাফিয়ে উঠে বললো- তর মত নাই মানে? এর চ্যায়া ভালো তুই আশা করিস ক্যামনে? তর আছে কী? আমার কিচ্ছু নাই! তাই কিছু আশাও করি না বাজান! কিন্তুক এট্টা বদ মাইনষের সুমসার আমি করতে পারবো না, এই আমার শ্যাষ কথা!

আম্বিয়ার দুঃসাহসে গফুর শেখ সবখানি ধৈর্য হারালো এবার। দ্বিগুণ চেঁচিয়ে উঠে বললো- আমারে তুই জবান ফিরাইতে কস হারামজাদি? সবাইরে আমি কথা দেছি না? ইমামসাব তর নামে কী কইছে জানস? জবান না রাখতে পারলে যে মহাসব্বনাশ হয়া যাবে! আমারে তুই দোজখে পাঠাইতে চাস? অফুরন্ত উত্তেজনায় বক্তব্য শেষ করেই মুঠোয় ধরে রাখা হুঁকোর আগুনে অস্থিরভাবে কয়েকবার ফুঁ দিল সে। প্রবল বাতাসে ছোট ছোট দু’চারটি আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে পড়লো তাতে। স্বামীর অসংযত বিহŸলতায় নসিরন দ্রুত তার হাত ধরে বসিয়ে দিতে দিতে মিনতিভরে বললো- অত মাথা গরম কইরো না! থির হয়া বসো তো! আমাগো সব্বনাশ হয় এমুন কাম কি আর আম্বিয়া করবো কুনোদিন? তুমার কথা মতোনই কাম হইবো!

কচুরিপানা বোঝাই এঁদো পুকুরে নাইতে নেমে বহুদিন আম্বিয়ার মনে হয়েছে সমাজ সংসারের সবখানে তার জীবনটাও এমনিভাবে ভাসমান। কোথাও দাবি প্রতিষ্ঠার অধিকার নেই। তার সম্পূর্ণতা কেবল তার নিজেরই মধ্যে। তাই একদিন যে ভয় নসিরনের মনে বাসা বেঁধে গাঁয়ের মোড়লদের বিরুদ্ধে তাকে গর্জে উঠতে দেয়নি, সে ভয় আম্বিয়ার ছিল না। বহুকালের সঞ্চিত অভিযোগের ঝাঁপি খুলে সে অনায়াসেই বললো- এই কথা তো আমিও তুমারে জিগাইতে পারি বাজান! ইমামসাবের কথা শুইনা, গেরামের সব বদমাইশ মাতব্বরগো কথা মতোন তুমিই বা আমারে দোজখে পাঠাইতে চাও ক্যান? যে দোজখে তুমি নিজে যাইতে ভয় পাও, সেইখানে আমারে তুমি কোন পরানে পাঠাইতে চাও?

ফতোয়ার বিরুদ্ধে আম্বিয়ার এই ভাষা তার প্রচলিত সমাজে এমনই অভিনব যে গফুর শেখ মর্মোদ্ধার করতে না পেরে নীরব হয়ে রইলো এরপরে। এমনকি যে নসিরন একদিন তার সাজানো সংসারে অন্য নারীর পদচারণায় গভীরভাবে আহত হয়েছিল তার কাছেও এই প্রতিবাদের ভাষা পরিচিত নয়। সে বিস্ময়ে মেয়ের মুখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো- বাজানের উপুর গোস্বা করস ক্যান আম্বিয়া? তোর ভালোর জন্যিই তো সে তোরে নিকা দিতি চায়? এট্টা সুমসার হইলে তো তোরই ভালো! অমুন সুমসার আমার চাই না মা! নসিরুল্লাহ তার সুমসার দেখার জন্যি একজন বান্দি রাখলেই পারে! আমি তো তুমাগো কাছে সুমসার কুনোদিনও চাই নাই মা! তাইলে ক্যান তুমরা সবাই আমারে …বলতে বলতে আম্বিয়া হঠাৎই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো আকুলভাবে। নসিরন ঘরের বারান্দা ছেড়ে নিচে নেমে মেয়ের কাছে এসে দাঁড়ালো। মাথায় আলতো করে হাত রেখে একরাশ সহানুভূতি ছড়িয়ে নরম গলায় বললো- সবই তোর নসিব রে মা! কিন্তুক তোরে ঘরে নিবার গরজ এবার নসিরুল্লাহরই বেশি! তোর বাপ যে সবাইরেই জবান দেছে আম্বিয়া! কুরান হাতে নিয়া কথা দেছে ইমামসাবরে!

মায়ের কথায় চোখের আঁচল সরিয়ে স্পষ্ট চোখে তাকালো মেয়ে। তাকিয়েই বড় একা হয়ে গেল সে। নসিরন এখন তিন পুত্রের জননী। তার সুখস্বপ্ন এখন সীমাহীন। পুরনো জীবনের অপমান, যন্ত্রণা, অবহেলার কোনো ছায়া আজ ছড়িয়ে নেই তার জীবনে। এমন সুখপূর্ণ সংসারের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আম্বিয়ার জন্য নসিরন কি আর পারে আপন স্বার্থ বলি দিতে? মায়ের কথায় সুতীব্র রোষ আর ধিক্কারের চাপে ফেটে চৌচির হয়ে গেল তার বুক। সেই যন্ত্রণার তীব্রতা গলায় ধরে রেখেই সে বললো- বাজান কথা দেছে বইলাই আমি বারবার তুমাগো কুরমানির গরু হইতে পারবো না মা! আমার জেবনে কিচ্ছু নাই জানি, তবুও আমার জেবনটা আমারই! খালিই আমার! সেইখানে বাজানের জবান, ইমামের ফতোয়া, আসরদ্দি সদ্দারের কুনো বদমাইশি আমি মানবো না! খবদ্দার আম্বিয়া বেশি বাড়াবাড়ি করিস না কইলাম! গজব নামবো আমাগো উপুর! বলতে বলতে অস্থিরভাবে হুঁকোটি নামিয়ে রাখলো গফুর শেখ। তাগো তুমি অত ডরাও ক্যান বাজান? তুই ডরাইস না? না! কিন্তুক দোজখরে আমি খুব ডরাই বাজান! ছোটকাল থিকা তার আগুনে জ্বলতে জ্বলতে মনে বড় যাতনা হয়া গেছে তাই তারে ডরাই! কিন্তুক আমি আর জ্বলতে চাই না! তুমার কথার বরখেলাপ হইয়া তুমি দোজখে গেলেও আর জ্বলতে চাই না বাজান!

তোর জন্যি আমারে কি গেরাম ছাড়া লাগবে হারামজাদি? আমার এই সুনার সুমসারটারে তুই কি ছারখার কইরা দিতে চাস? দশজনের সামনে কুরান হাতে নিয়া যে জবান আমি দেছি, তারে তুই ফিরাইতে কস? সে জবান তো তুমি দেছো, আমি দেই নাই! আমার জেবনটারে বাজি রাইখা বারবার তুমি দশজনরে জবান দেছো বাজান! কিন্তুক আইজ আমি সব্বাইরে বুঝাইয়া ছাড়বো, আমার জেবনটা আমার কাছে ইমামসাবের ফতোয়ার থিকা অনেক বড়! তুমি ঘরে যাও! ভয় নাই তুমার! এর বিহিত যা করা লাগে আমিই করবো বাজান! বলেই সে সামনে থেকে চলে যাবার জন্য পা বাড়ালো।

নিজের একান্ত নিঃস্ব নিঃশব্দ মেয়ের এতখানি প্রখর তেজের সামনে গফুর শেখ যেন অজান্তেই ঝলসে গিয়েছিল আচমকা। এবার আম্বিয়া বাড়ি ছেড়ে চলে যাবার জন্য পা বাড়াতেই সে বারান্দা থেকে প্রায় লাফিয়ে নেমে ছুটে এসে পেছন থেকে মেয়ের চুলের মুঠি টেনে ধরলো। সব দেখে চেঁচিয়ে উঠলো নসিরন -তুই কি পাগল হইছিস আম্বিয়া? গোখকু সাপের ন্যাজে তুই পাও দিবার চাইস! আমার আরো তিনটা পুলা আছে না? তাগো কী হইবো? তর বাজানের কী হইবো?

আম্বিয়ার সারা অঙ্গজুড়ে একটি অলৌকিক আগুন জ্বলছিল তখন। সেই আগুনের তোড়ে জীবনজোড়া এতকালের সবখানি অন্ধকার সরে যাচ্ছিল দ্রুত। সেখানে দৃষ্টি ছুঁয়ে মায়ের আকুতিতে সাড়া দিল আম্বিয়া- ভয় নাই মা! তুমাগো কুনো সব্বনাশ আমি করবো না! আমি খালি তামাম দোজখের সব আগুন ফতোয়াবাজগো গায়ে লাগাইয়া পুড়াইয়া মারবো! আম্বিয়ারা আর যাতে কুনোদিনও সেই আগুনে পুইড়া না মরে, সেই বেবস্থা করতে দেও মা! গফুর শেখ মেয়ের চুলোর মুঠোয় হ্যাঁচকা টান মেরে কর্কশ তীক্ষèতায় হিসহিস করে উঠলো- তর সব শয়তানি আইজ আমি শ্যাষ করবো হারামজাদি! ধম্মের ষাঁড় হইয়া তামাম দইনা তুই ঘুইরা বেড়াইতে চাস? সারা গেরামে তুই গজব নামাবি বেইশ্যা হয়া, তাই ভাবছস? তরে কুনোদিনও আমি তা করতে দিব না আম্বিয়া!

কিন্তু আম্বিয়ার মধ্যে দীর্ঘকালের প্রস্তুতি শেষে যে আত্মজাগরণ ঘটেছে আজ, তার প্রবল স্রোত তখনও তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। তার উত্তপ্ত উদগীরণ আগ্নেয়গিরির মতোই চারপাশের সমাজ সংসারের সীমান্ত ছাড়িয়ে ঊর্ধ্বগামী করে দিচ্ছিল নিস্তরঙ্গ আম্বিয়াকে। তার বিচ্ছুরণের তেজে এক ঝটকায় গফুর শেখের হাত থেকে সে ছাড়িয়ে নিল নিজেকে এবং তারপরেই প্রখর দীপ্তিতে প্রবল হয়ে বললো- আসরদ্দি মাতব্বর আর ইমামসাবরে তুমি এত ডরাও ক্যান বাজান? তুমি আর তারা কি আলাদা? তার মানে? তার মানে, তুমি যা কইলা ঠিক এই কথাই আমি পথে ঘাটে আসতে যাইতে অনেকবার শুনি সদ্দার আর তার বুইড়া ভাইঙ্গর মজিদ আলির মুখে! তাই তুমারেই আমি জিগাই বাজান- আমি যতি স্বাধীনভাবে চইলাফিরা বেড়াই বইলা তুমাগো বিচারে বেইশ্যা হই, তাইলে যে আম্বিয়াগো তুমরা বারবার জেবন ভইরা নানা মাইনষের সাথে নিকাহ দেও, সেইসব আম্বিয়ারা তুমাগো ফতোয়ার বিচারে কী হয় বাজান? বলেই জবাবের জন্য প্রতীক্ষায় না করে বাড়ির পেছনে কলাবাগানের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল গফুর শেখের কন্যা আম্বিয়া খাতুন। গফুর শেখ ছুটতে গিয়েই হোঁচট খেলো পায়ে। সবকিছু বড় এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে তার। নসিরন ঘরের পৈঠা বেয়ে বারন্দায় উঠতে গিয়েও দ্রুত নিচে নেমে এলো- কী হইলো আম্বিয়ার বাপ? তুমার পায়ে লাগলো নাকি? বইসা পড়লা ক্যান? বলতে বলতেই অন্তরের সবটুকু ব্যাকুলতা ঢেলে ফ্যাকাশে মুখে বিহŸল স্বামীর দিকে একবার সে তাকালো। তারপর দ্রুত ছুটে এসে অন্যমনে গফুর শেখের গায়ে হাত রেখে অস্ফুটে কয়েকটি শব্দ উচ্চারণ করলো সে।

স্ত্রীর কথার একটি শব্দও কানে শুনতে পেল না গফুর শেখ। তার দৃষ্টি তখন বাগানের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া আম্বিয়া খাতুনের পেছনে অসহ্যভাবে প্রসারিত ছিল। যেখানে অমাবস্যার অন্ধকারে তার ভবিষ্যৎ সংসার, রক্তাক্ত জীবনের ছবি হয়ে ভেসে যাচ্ছিল একের পরে এক। যেখানে কেবলই মজিদ আলির বর্ণিত ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ গজবের ভয়াবহ দৃশ্যাবলী। আসরদ্দি সর্দারের হিংস্র নখরের রক্তাক্ত প্রতিহিংসা। আবাল্য সংস্কারের স্তর পেরিয়ে মজিদ আলিদের এমন গজবকে প্রতিরোধ করার জ্ঞান এবং শক্তি গফুর শেখদের নেই। নেই আসরদ্দি সর্দারদের প্রতিহিংসাকে প্রতিহত করার প্রবলতা!

আরও সংবাদ...'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj