জনসেবার ঠিকাদার : মুহাম্মদ নিযামুদ্দীন

শুক্রবার, ১৫ জুন ২০১৮

এ কথা বলাটা বোধহয় বেশি বলা হবে না যে, বিশ্বের বাকি বেবাক দেশের চেয়ে বঙ্গদেশে নেতা, উপনেতা ও হাফনেতার সংখ্যা বিস্ময়কর রকম বেশি! এই বেশি হওয়াটা হাসির কারণ, না কাশির কারণ, তা অবশ্য আলাদা কথা। অধিকাংশই কথায় কথায় কাপ্তানি দেখালেও রপ্তানিমূল্য রয়েছে কিনা সন্দেহ। থাকলে রপ্তানি করে রাশি রাশি রুপিয়া কামাই করতে পারতো বঙ্গদেশ। এতে দেশ থেকে দারিদ্র্য যেমন দূর হতো, দশাও দূর হতো। দুর্ভাগ্য দেশের; লক্ষ্য থাকলেও লক্ষণ লাপাত্তা।

জনগণের কাছে এরা জনসেবার ঠিকাদার হিসেবে পরিচিত। কথায় কথায় তারা এমন ভাব দেখান, যেন জনগণের জন্য জান কোরবান; কিন্তু বেশিরভাগেরই বেলায় সেটা ভান। ভোট এলে জনগণ বঞ্চিত, বিজিত হলে বঞ্চিত। বেশিরভাগই বক্তৃতাবাজিতে বেমেসাল। বুঝি বিদ্যাসাগর। হেন কোনো বিষয় নেই, যে বিষয়ে তারা বক্তৃতা-বিবৃতি বর্ষণ করেন না। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, আমেরিকা থেকে ল্যাটিন আমেরিকা, নুন থেকে চুন পর্যন্ত সবই চলে আসে তাদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে। এসব দেখে এও মনে হবে এরাই বুঝি গুরু, গণমানুষ গরু। এরা গায়ে পড়ে গণমানুষকে যেমন শিক্ষাদান করতে ভুল করেন না, তেমনি ভুল করেন না প্রতিপক্ষ দলকে পাঠদান করতে। কিন্তু নিজেরা শিক্ষা নিতে চান না। এই নিতে না চাওয়ার পেছনে নিজেদের নিচে নেমে যাওয়ার ভয় হয়তো কাজ করে।

নেতা হওয়ার ব্যাপারে তিনিই বেশি সৌভাগ্যবান, যিনি জেলে যান। অর্থাৎ কারাগারই কপাল খুলে দেয় কাবিল হওয়ার। জেল থেকে বের হওয়ার সময়ই বড় নেতা বনে যান তিনি। বের হওয়ার সময়ই তাকে বরের মতো বরণ করা হয়, বিপুলভাবে মাল্যভূষিত করা হয়। মালার এহেন বিপুল ব্যবহারের কারণে বাগানে দেখা দেয় ফুলের দুর্ভিক্ষ। ফুলের দুর্ভিক্ষের দরুন দ্রোহ দেখা দেয় মৌমাছিদের মধ্যে। না পেয়ে ফুল, ফোটায় হুল। মধু উৎপাদনেও মন্দা দেখা দেয়। অবশ্য আজকাল কুরবানি বাজারের গরু-ছাগলের গলায়ও ফুলের মালা শোভা পায়। ফুলের মালা কখন যে ফাঁসির দড়ি হয়ে যায় কে জানে!

জেলে গিয়ে যে জননেতা হওয়া যায়, তা জানে না এমনজন জগতে নেই। এক সময় ছিল, জুলুমের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে গিয়ে জননেতারা জেলে যেতো। তখন জেল ছিল সংগ্রামের ব্যাপার, সম্মানের ব্যাপার। বর্তমানে ব্যাপারটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিলকুল বিপরীত। হয়তো দুর্নীতির কারণেই জেলে গিয়েছেন, বেরিয়েছেন নেতা হয়ে। রাজনীতিতে নীতির বুঝি ইতি, ছড়ায় শুধু ভীতি। নীতির অভাবই তো দুর্নীতি। কেউ কি জানতো, জেল থেকে বেরিয়ে ঝড়ের মতন বিজয় কেতন নেড়ে নেতার ভূমিকায় নাজিল হবেন তিনি। তিনি যে কতো বড় নেতা, তা বুঝতে বেগ পেতে হবে না। পোস্টার ও দেয়ালের লেখাগুলোই এর দ্রষ্টব্য দলিল। জনসভার প্রচারেও ঐ জননেতার পরিচয় পাওয়া যায়। যেমন- উক্ত সভায় বক্তৃতা করিবেন সদ্যকারামুক্ত নেতা, অনলবর্ষী বক্তা, মজলুম জনতার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর জনাব…। বিরামহীন বৃষ্টি বর্ষণের মধ্যেও তাদের বক্তৃতা বন্ধ হয় না। বন্ধ হতো, যদি বৃষ্টি তাদের বারোটা বাজাতো। কিন্তু তাদের মাথার ওপর ছাতা ধরার মতো চামচার অভাব হয় না। এভাবে হাটে মাঠে ঘাটে চলতে থাকে তাদের ভাষণ। পল্টন ও লালদীঘির মাঠ হলে তো কথাই নেই। শোনা যায়, তাদের ভাষণ শোনার জন্য গরু-ছাগলেরাও নাকি ঘাস খাওয়া থেকে ঐসময়টুকু বিরত থাকে।

জনসেবার এসব ঠিকাদাররা জনতার সামনে হাজির হন নানান নামে, নানান বেশে। ঠিকাদারি পাওয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে অর্থাৎ নির্বাচন কাছে এলে এরা নেমে পড়েন গ্রামে-গঞ্জে, অলিতে-গলিতে। শঠতাকে ঢাকতে চান শরাফতি লেবাসে অর্থাৎ পাঞ্জাবি পরে। ভাবতে অবাক লাগে, যে পাঞ্জাবি পশুরা একাত্তরে ছিল বাঙালিদের প্রতিপক্ষ, পোশাকের প্রচ্ছায়ায় সেই পাঞ্জাবি নামেরই কিনা প্রত্যাবর্তন! যা বলা হচ্ছিল। ভোট এলে শুরু হয় জোট আর নোটের খেলা। ভোট প্রার্থীরা ভক্ষক থেকে ভিক্ষুকে পরিণত হন কিছু সময়ের জন্য। ভোট ভিক্ষা করতে গিয়ে প্রতিশ্রæতির পর প্রতিশ্রæতি প্রদান করেন; যাতে সৃষ্টি হয় প্রতিশ্রæতির পাহাড়। কখনো কখনো বলেন, গতবার ভোট দিয়ে অমুককে জিতিয়ে ছিলেন আপনারা। কিন্তু তিনি কোনো কাজই করেননি আপনাদের কল্যাণে। আমাকে একবার সুযোগ দিন- সেবা করার জন্য। দেখবেন দৃশ্যপট কীভাবে বদলে দিই। ভোটে জিতলে দৃশ্যপট সত্যিই বদলে যায়। দেখাই যায় না দৃশ্যপট বদলে দেয়ার প্রতিশ্রæতি দানকারীকে। কালেভদ্রে দেখা গেলেও, চেনাই যায় না। আগের মিয়া হালের সাহেব কিনা তাই!

চেয়ার পেয়ে তিনি থোড়াই কেয়ার করেন কাউকে। চেয়ার পেয়ে তার চিন্তা বদলে যায়, চেহারা বদলে যায়। পূর্বের পেঁচার মতো মুখখানা মাশাল্লাহ এখন চালকুমড়ার মতো। পেটও একখানা, বুঝি আজব কারখানা। অর্থাৎ প্রথমে যা খানা, পরে কিনা পায়খানা! পেটেরও তার পরিবর্তন হয়েছে অর্থাৎ প্রসার হয়েছে। খাদ্যের প্রেসার পড়লে প্রসার না হয়ে কি পারে? পেটের পরিবর্তে এটাকে খাদ্যগুদামও বলা চলে। এই পেটের জন্য স্বদেহের নিম্নভাগ তিনি দেখতেই পান না। পেট নিয়ে পেরেশানিও কম নয়- কষ্ট হয় নিতে শ্বাস; এরই মাঝে লুকায়িত অনেক ইতিহাস। এখন তার মুখে নিত্য শোভা পায় ডানহিল, ফাইভ ফাইভ সিগারেট। অথচ এমন একদিনও ছিল, শেয়ার করে বিড়ি টানার জন্য বন্ধুমহলে তিনি বিখ্যাত ছিলেন। যদি বিশ্ব অলিম্পিকে বিড়ি টানা নিয়ে কোনো প্রতিযোগিতা থাকতো, তাহলে তিনিই যে স্বর্ণপদক জিতে দেশের ও দশের গৌরবের বিষয় বলে গণ্য ও ধন্য হতেন, সে সম্পর্কে সামান্যতম সন্দেহ নেই। নেতার সাথে সাথে জনতার চেহারাও বদলে যায়। বিশ্বাস বিদীর্ণ হওয়ায় বিষাদের কালো ছায়া নামে অবয়বে। দেহের দৃশ্যপট হয়ে যায় রবীন্দ্রনাথের কঙ্কাল গল্পের কঙ্কালের মতো। অবশ্য কঙ্কালও কাজে লাগে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ছাত্রদের। সার কারখানায়ও এর যথেষ্ট চাহিদা আছে। এভাবেই চলে বদলের পালা। বদলের সাথে বদলা নেয়াও চলে সমান তালে। গলাগলি পরিণত হয় গোলাগুলিতে।

যে জাতির মধ্যে জনসেবার ঠিকাদার এতো জেয়াদা, সে জাতির জীবনে তো জিল্লতি থাকার কথা নয়, জোয়ার বইয়ে যাওয়ার কথা উন্নতির। সেই কাক্সিক্ষত জোয়ার না হয়ে জোরের জোয়ার কেন হয়েছে, তা ভাবতে গেলে গোলাকার মাথায় যে গোল বেঁধে যাবে এবং শেষে জলপট্টির ব্যবস্থা করতে হবে, তাতে সন্দেহের সুযোগ নেই। প্রতিশ্রæতি প্রতারণায় পরিণত হলে এমন পরিণতি তো হবেই। সেজন্য তো দায়ী পাবলিক নয়, প্রতিশ্রæতি প্রদানকারী; যাদের গালভরা নাম জনগণের সেবক। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে একটি ঘটনার কথা। একবার বাসে করে যাচ্ছিলাম গ্রামের বাড়ি। বাসস্ট্যান্ড থেকে বাস তখনো ছাড়েনি। এরই মধ্যে চিরুনি বিক্রেতা থেকে চকোলেট বিক্রেতা পর্যন্ত বিভিন্ন রকম পণ্য বিক্রেতার ভিড় বাসের মধ্যে। যাত্রী যতো না, তার অধিক তাদের যাতনা। বিক্রির কৌশল হিসেবে বিক্রেতার মুখে বিজ্ঞাপনের যে ভাষা, তাতে সর্বাধিক সম্ভাবনা যে কারো ফাঁসা। অর্থাৎ বোকা হওয়া ও ধোঁকা খাওয়ার সম্ভাবনাই সর্বাধিক।

দেখলাম, দাঁতের মাজন বিক্রির জন্য এক লোক দ্রুতগতিতে বলেছেন, যাত্রী ভাইগণ, চলার পথে বেশি কথা বলে আপনাদের বিরক্ত করবো না। এরকম আরো কিছুক্ষণ মুখস্থ ও মনোযোগ আকর্ষণকারী ভূমিকা ভমি করার পর লোকটি আসল কথায় আসলেন; বললেন, আমার হাতে যা দেখতে পাচ্ছেন, তা দাঁতের মাজন। দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা না বুঝলে দুঃখ দূর হবে না। তাই নিবেদন, সবাই কিনুন দাঁতের মাজন। এতে দাঁত যেমন দ্রুত পরিষ্কার হবে, দুর্গন্ধও দূর হবে। এক প্যাকেট মাজনের মূল্য পাঁচ টাকা। কিন্তু আপনাদের কাছ থেকে পাঁচ টাকা নেবো না। কোম্পানির প্রচারের জন্য দুই টাকা মাইনাস করে মাত্র তিন টাকাই রাখবো। একবার কিনে পরীক্ষা করে দেখুন, কীভাবে এই মাজন ম্যাজিকের মতো কাজ করে। হেলায় সুবর্ণ সুযোগ হারাবেন না। আমার পাশের সিটের যাত্রীটি সেই সুবর্ণ সুযোগ হেলায় নষ্ট হতে দিলেন না। তিনি তিন টাকা দামে এক প্যাকেট দাঁতের মাজন কিনে নিলেন। দুই টাকা বেঁচে যাওয়ার খুশিতে তিনি বাকবাকুম এবং নিজেকে বেশ বুদ্ধিমান ভাবছিলেন। কিন্তু সস্তার যে তিন অবস্থা, তা তিনি টের পেলেন কিছুক্ষণ পরে। কিছুদূর গেলে কৌত‚হলবশত খুলে দেখেন প্যাকেট। প্যাকেটে প্রতারণা প্রত্যক্ষ করলেন। যাতে মাজন থাকার কথা তাতে পেলেন ছাই; যা পাকঘরের চুলায় বিনে পয়সায় পাওয়া যায়। লোকটির লজ্জা লক্ষ করে কে? বিশ্বাসে চোট লাগায় ফুটো বেলুনের মতো চুপসে গেলেন তিনি। তাই দুষ্ট লোকের মিষ্ট কথায় বিশ্বাস করতে নেই, প্রতারকের প্রলোভনে মুগ্ধ হতে নেই।

জনসেবার ঠিকাদাররাও কি জনগণের সাথে সেরকম জুয়া খেলছে? এর জবাব জনগণেরও জানা। কিন্তু জানলেই কি জবান খোলা যাবে? জবানের জন্য কে জীবন জলাঞ্জলি দেবে? তাদের তো একটিই কাজ- ভোট এলে ভালো মানুষের মতো ভোট দেয়া। এবং সেটাই নাকি গণতন্ত্র। কিন্তু এই গণতন্ত্র তো কেবল মাথা গোনে, মেধা গোনে না। পেশি ও পয়সার প্রাধান্য প্রত্যেক ক্ষেত্রে। এখানেই গণতন্ত্রের গলদ। ফলে গণতন্ত্র গভীর সংকটে। তাই বলে ভালো মানুষ যে নেই, তা নয়। তাদের সংখ্যা অল্প কিংবা সেটা গল্প।

আরও সংবাদ...'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj