আলোময় : অমিত গোস্বামী

শুক্রবার, ১৫ জুন ২০১৮

তিস্তা নদীর পাশে বাসটা থামতেই লাফ দিয়ে নামল আলোময়। বাস যতক্ষণ কালিম্পং থেকে নামছিল সে বসেছিল জানালার ডানদিকে। সেভাবে তিস্তা নদীকে দেখতে পাচ্ছিল না সে। মাঝে মাঝে ঝলকের মতো ফুটে উঠলেও তিস্তা কিছুটা আড়ালেই ছিল। অথচ তিস্তা নদী দেখার তীব্র ইচ্ছায় বাঁদিকে বারেবারে ঘাড় ঘোরাচ্ছিল। বাস থামতেই প্রায় লাফিয়ে নামল সে। বর্ষায় নেমে আসা তিস্তা এখন সত্যি ভয়ঙ্কর। পাহাড়ের ওপর থেকে তীব্র জলের ধাক্কায় সে নামিয়ে আনে বড় বড় পাথর। এখন সে পূর্ণযৌবনা। কিন্তু গরমের সময় নাকি জলশূন্যতায় তিস্তা শীর্ণ থাকে। তিস্তা তখন শুখা। সামান্যতম জল পাওয়া যায় না এই নদী থেকে। এ নিয়ে তাদের দেশে বিস্তর ক্ষোভ থাকলেও এখনও চুক্তি নিয়ে নাম গন্ধ নেই। ভারতীয় সাংবাদিক ও বন্ধু অর্ক এ নিয়ে গলা ফাটায় কাগজে কাগজে। আলোময়ের দেশকে তিস্তার জল দিতে হবে। না দেওয়া অন্যায় এবং সেই অন্যায় দিনের পর দিন করে চলেছে ভারত। কিন্তু চুক্তি এখনও বিশ বাঁও জলে।

আলোময় বাংলাদেশি। ধর্মে হিন্দু। কিন্তু ভারতের প্রতি সামান্য টান কখনও সে অনুভব করেনি। ছোটবেলায় তাদের শেখানো হতো যে তার দেশকে আশপাশ থেকে ঘিরে পিষে মারছে একটা দানব, তার নাম ইন্ডিয়া। বিদ্বেষ গেঁথে দেওয়া হতো স্কুলের বিভিন্ন পাঠে। ধর্মের সূ² কাঁটা মিশিয়ে দেওয়া হতো বিভিন্ন কার্যক্রমে। তা সত্ত্বেও আলোময়ের কখনও মনে হয়নি বাংলাদেশ তার দেশ নয়। কখনও মনে হয়নি হিন্দু হওয়ার সুবাদে ইন্ডিয়া দেশটা তার হতে পারে। ক্লাসের অনেক হিন্দু ছেলেই ধীরে ধীরে খসে গেছে। সে শুনেছে যে তারা ইন্ডিয়া ভেগেছে। কখনও বাড়িঘর ফেলে, কখনও সব কিছু বেচে দিয়ে। তবু তার পরিবার দেশ ছেড়ে যায়নি।

আলোময় তিস্তা নদীর পাশে রাস্তার ধারে ছোট বাস থেকে নেমে দেখল যে সেখানে বেশ বড় জটলা। অন্যান্য বাস ও গাড়ি থেকে লোক নামছে। এখানে নাকি রিভার র?্যাফটিং হবে। রবারের নৌকোয় বসিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় পাঁচ কিলোমিটার। বাস বা গাড়ি সেখান থেকে পিকআপ করবে। চারদিকে আকাশছোঁয়া পাহাড়। মাঝে এই তীব্র খরস্রোতা নদী।

-হাই ফ্রেন্ড, র?্যাফটিং মে যানা হ্যায়?

-না, না বাবা, এই ভারী পোশাকে পড়ে গেলে সাঁতারও দিতে পারব না।

-সুইম করভি নেহি পাওগে ইতনা কারেন্ট মে! আপ কা তো লাইফ জ্যাকেট রহেগা। গিরোগে নেহি। যো ভি হো বোট সে গিরোগে নেহি। ইধার অ্যাকসিডেন্ট কভি নেহি হোতা।

-তাহলেও। বাপ রে। কী স্রোত।

-আব্বে চলো না, ইতনা ডরপোক কিঁউ? ম্যায় হুঁ না তুমারা সাথ। ম্যায় এক লড়কি হোকে…

ডরপোক! আঁতে লেগে গেল আলোময়ের। সহযাত্রী মেয়েটি তাকে কাপুরুষ বলে দিল! যার ঠাকুরদা ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে নামি কমান্ডার ছিল মুক্তিবাহিনীর। যার পরিবার শুধু ‘স্বাধীনতা’ শব্দটার জন্যে ’৭৫-পরবর্তী সময়ে অশেষ উৎপীড়ন সহ্য করেছে শাসক দলের। যার পরিবার ‘হিন্দু’ হওয়ার জন্যে অনেক ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে, সেই পরিবারের সন্তানকে ‘কাপুরুষ’ বলা! সহ্য হলো না আলোময়ের। সে মেয়েটিকে ডাকল। মেয়েটি দুষ্টুমি হাসি ছড়িয়ে বলল- কেয়া যানা হ্যায় মেরা সাথ?

-ঠিক হ্যায়। চলো।

মেয়েটি সম্ভবত নেপালি বলেই ধারণা আলোময়ের। সে ভাবে আলাপও হয়নি। আসার পথে চা-নাস্তার বিরতি ছিল। দোকানে মেয়েটির সাথে দোকানির বচসা দেখে এগিয়ে গিয়েছিল আলোময়। খুচরো নিয়ে ঝামেলা। মেয়েটির কাছে খুচরো ছিল না। আলোময় খুচরো টাকা দিয়ে মেয়েটিকে বলেছিল- আমাকে শিলিগুড়ি নেমে দিয়ে দেবেন, এমনি এরা এত গরিব, কোথায় পাবে খুচরো? মেয়েটিও কথা বাড়ায়নি। ‘থ্যাংকস’ বলে বাসে উঠে পড়েছিল। আলোময়ও নিজের মতো নিজের মধ্যেই মগ্ন হয়ে গিয়েছিল।

র?্যাফটিংয়ের টিকিটের টাকাটা মেয়েটি দিতেই আলোময় হাঁ হাঁ করে উঠল। চেনা নেই, শোনা নেই, নাম জানা নেই, এতগুলো টাকা কেন মেয়েটি দেবে? বলতেই মেয়েটি বলল- শিলিগুড়ি যাকে দে দেনা, মেরে কো ভি ছুট্টে কা জরুরত হ্যায়। আলোময় বুঝল তার কথাই পুনরাচ্চারিত করল মেয়েটি। তবে তাতে নিছক মজাই আছে, অন্য কিছু নয়। সে হেসে বলল- তাহলে শিলিগুড়িতে গিয়ে কিছু সময় বসতে হবে তো একসাথে। মেয়েটি এবারে উত্তর দিল- বইঠ লেঙ্গে, আপ কফি তো পিলাওগে। আভি চলো। বোটমে যাতে হ্যায়।

বোটে উঠতেই শরীরজুড়ে লাইফ বোট বেঁধে দিল একটি ছেলে। মেয়েটি গলিয়ে নিল নিজের লাইফবোট। তারা চড়ে বসল নৌকোয়। নৌকোটি রাবারের, মাঝে হাওয়া দিয়ে ফুলিয়ে নেওয়া এবং এমনভাবে তৈরি যে উল্টিয়ে না দিলে নিজে থেকে উলটে যাবে না। ভয় কেটে গেল আলোময়ের। একেবারে সামনে মেয়েটি ও সে বসল। ওদের পরে দু’জন করে দুটি সারি। মোট ছ’জন এক একটি বোটে। আলোময় বেশ জুত করে বসে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে হাসল। জিজ্ঞাসা করল- আপনার নামটা জানা হয়নি, কি নাম আপনার? বাসা কোথায়?

-তিস্তা, তিস্তা গুরুং, ঘর দার্জিলিং মে। আপ?

-আলোময়, আলোময় বিশ্বাস। ঢাকায় বাসা। বাংলাদেশ।

-আপ বাংলাদেশি হো? কলকাত্তা কা নেহি?

-না, না, কলকাতার সাথে কোন সম্পর্ক নেই। কলকাতায় যাইই নি কখনও।

-ফির আয়ে ক্যায়সে? কলকাতা বর্ডার সে নেহি?

-না না, বুড়িমারী বর্ডার হয়ে হলদিবাড়ি হয়ে শিলিগুড়ি হয়ে এসেছি। একইভাবে ফিরে যাবো।

-ওহ, ম্যায় তো আপ কো কলকাত্তা কা আদমি সমঝা। আপ স্রেফ ঘুমনে আয়ে?

-ঠিক তা নয়। এসেছি দার্জিলিংয়ে যাবো বলে। একজনের সাথে দেখা করার কথা। কিন্তু জানি না, যাওয়া হবে কিনা, চারদিকে যা টেনশন শুরু হয়েছে। বনধ, আন্দোলন।

তাদের কথা এখানেই থেমে গেল। বোট ছেড়ে দিয়েছে। বোট যাচ্ছে উথাল-পাতাল নৃত্য করতে করতে। মাঝে মাঝেই দুরন্ত ঘূর্ণি। বোট ঘুরে যাচ্ছে একশ আশি ডিগ্রি।

কখনও নেমে যাচ্ছে অতলান্ত জলের খাদে। মুহ‚র্তেই চড়ে বসছে উত্তুঙ্গ ঢেউয়ের মাথায়। নদী যেন যা খুশি করে এগিয়ে নিয়ে চলেছে তাদের বোটটিকে। কখনও গতি বেড়ে যাচ্ছে বিমানের মতো। কখনও উঁচু থেকে নাসিকাঝাঁপ। নামে তিস্তা হলেও তিস্তা নদীর কাছে কাত হয়ে গেছে তিস্তা গুরুং। দুহাতে জড়িয়ে ধরে আছে আলোময়ের ডান বাহু। মুখ চোখ থেকে সকল স্মার্টনেস উধাও। আলোময়ের ভয় তেমন লাগছে না। সত্যি কথা এই যে সাঁতার সে ভালোই জানে। জল যতই উত্তাল হোক, পোশাক যতই ভারী হোক সে কখনও পড়ে গেলেও ডুববে না। তার ওপরে লাইফ জ্যাকেট গায়ে বাঁধা। কিন্তু তিস্তা নামের মেয়েটি ভয়ে সিঁটিয়ে আছে। অবশেষে বোট এসে থামল শেষ পয়েন্টে। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল যেন তিস্তা। মুখে বেঁচে ফেরার এক চিলতে হাসি। আলোময় এ সুযোগ ছাড়ল না।

-এতক্ষণে বোঝা গেল ডরপোক কে? উঃ, আমার ডানহাতটা অবশ হয়ে গেছে।

তিস্তা উত্তর দিল না। মুখে সলজ্জ হাসি নিয়ে বাসের দিকে এগোল। আলোময় আয়েশে একটা সিগারেট ধরালো বাসের কাছাকাছি এসে। বাকি কয়েকজনের অপেক্ষায় বাস দাঁড়িয়ে আছে। ওরা এসে গেলেই বাস যাবে সোজা শিলিগুড়ি।

বাসে উঠে আলোময় দেখল তিস্তা ওর জায়গা দখল করে বসে আছে। পাশের ভদ্রলোককে কি করে যেন ম্যানেজ করে নিজের জায়গায় পাঠিয়ে দিয়েছে। হাতের ইঙ্গিতে তাকে পাশে বসতে বলল তিস্তা। আলোময় বাধ্য ছেলের মতো তিস্তার পাশে গিয়ে বসল। কিন্তু মাথায় যে প্রশ্নটা এতক্ষণ ঘুরপাক খাচ্ছিল সে কথাটা সে জিজ্ঞাসা করল তিস্তাকে।

-আপনি বাংলা সুন্দর বোঝেন। মানে ভাষাটা জানেন। তাহলে হিন্দিতে কথা চালিয়ে যাচ্ছেন কেন?

-আই হেট বাংলা। হামলোগ গোর্খা হ্যায়। হামারা ভাষা গোর্খালি হ্যায়। লেকিন ইয়ে বাঙ্গালি লোগ হাম গোর্খালোগো কো দাবাকে রাখখা হ্যায়। অলগ রাজ্য নেহি দিয়া। অলগ সরকার নেহি দিয়া। অলগ ভাষা নেহি দিয়া। আভি বোলতা হ্যায় সব কো বাংলা শিখনা পড়েগা। হামলোগকা কুছ আইডেনটিটি নেহি হ্যায় কেয়া? স্বাধিকারকে লিয়ে হামলোগো কো অলগ রাজ্য গোর্খাল্যান্ড চাহিয়ে। ইয়ে হামারা মাঙ হ্যায়।

-বুঝলাম জাতিসত্তার প্রশ্ন। একই রকম ভাবে আমরা উর্দু ও হিন্দি বলতে চাই না বা শিখি না। আমরা বাংলাদেশিরা মনে করি যে উর্দু ও হিন্দি পাকিস্তানের ভাষা আর ওদের প্রতি আমাদের অপরিসীম ঘৃণা আছে ’৭১-এর যুদ্ধে তিরিশ লাখ বাঙালিকে হত্যা করেছিল বলে। কিন্তু এবারে এসে বুঝলাম এটা আমাদের ভুল।

-কিঁউ? গলদ কিঁউ?

-দেখুন, পৃথিবীতে বাংলাভাষা হচ্ছে আমাদের বাংলাদেশিদের রাষ্ট্রভাষা। উনিশ কোটি মানুষ এই ভাষায় কথা বলে। যাদের সাথে আপনাদের কোনো লেনাদেনা নেই। অথচ আপনি এই ভাষাকে ঘৃণা করছেন যেহেতু পশ্চিমবঙ্গের আট নয় কোটি লোক বাংলায় কথা বলে। একই ভাবে ভারতে একশ কুড়ি কোটি মানুষের আশি কোটি মানুষ উর্দু বা হিন্দিতে কথা বলছে। অথচ পাকিস্তানের মাত্র আঠের কোটি লোক যেহেতু উর্দু বা হিন্দিতে কথা বলছে তাই আমরা বাংলাদেশিরা উর্দু বা হিন্দি কথা শিখছি না বা বলছি না। এগুলো তো বোকামি।

-ফির ভি হামারা মাঙ যব তক পুরা নেহি হোগা তব তক হামলোগো কো পশ্চিম বাঙ্গাল কা হর চিজ সে দূর রহ না ঠিক রহেগা। নো কম্প্রোমাইজ।

-সে আপনাদের মর্জি। আমি অন্য দেশের। আমার এ ব্যাপারে মতপ্রকাশ ঠিক নয়। আমি জাতিসত্তার প্রশ্নে আপনাদের দাবিকে সম্মান করি। কিন্তু এভাবে জনজীবন স্তব্ধ করে আন্দোলনের নামে কর্মহীন দিন বাড়িয়ে আলাদা রাজ্য পাওয়া যাবে বলে মনে করি না। মাথায় রাখবেন যে ক্ষমতা ধর্ম বোঝে না, অনুভূতি বোঝে না, দাবির যথার্থতা বোঝে না, তারা শুধু ক্ষমতার ব্যাপ্তি বোঝে।

তিস্তা আর কথা বাড়াল না। চুপ করে বাইরের জানালার দিকে তাকিয়ে থাকল। বাস ধীরে ধীরে শিলিগুড়ি ঢুকছে। দুপুরও গড়িয়ে গেছে বিকেলের দিকে। রাস্তায় বৈকালিক ব্যস্ততা। বাস এসে থামল তেনজিং নোরগে বাস টার্মিনাসে।

-আপ কেয়া আজই দার্জিলিং যাওগে? ইয়া শিলিগুড়ি রুকোগে?

-ভাবছি সেটাই। এখন রওনা হলে পৌঁছতে পৌঁছতে রাত। দার্জিলিং তো স্বাভাবিক নয়। এত রাতে থাকব কোথায় সেটাই ভাবছি। যার কাছে যাব তিনি যদি জেগে না থাকেন…। হোটেলও তো খোলা নেই।

-রহনে কি লিয়ে শোচো মৎ। ম্যায় হুঁ না? ও বন্দোবস্ত হো যায়েগা। যানা হ্যায় তো চলো। হাম ভি বোর নেহি হোঙ্গে।

-ঠিক আছে। আপনার মতো সুন্দরী মেয়ের আমন্ত্রণ তার দেশে কেউ প্রত্যাখ্যান করে? আপনার কথাই ঠিক হোক। চলুন দার্জিলিং যাওয়া যাক। তবে একটা শর্ত আছে।

-কেয়া? কৌন সা শরত?

-নো বাস। নো শেয়ার ট্যাক্সি। একটাই গাড়ি নেব। ভাড়া আমি দেব। আরামে যাব। তিস্তা নদীর ঝাঁকানিতে শরীরজুড়ে ব্যথা হচ্ছে। এরপরে অন্য কিছুতে যেতে পারব না।

-ও কে। চলো, যাতে হ্যায়।

একটি চলনসই গোছের গাড়ি ভাড়া করে আলোময় তিস্তাকে নিয়ে রওনা দিল দার্জিলিংয়ের দিকে। খুব বেশি না হলেও কিছু গাড়ি চলছে। ট্যুরিস্টদের নামিয়ে আনা হচ্ছে পাহাড় থেকে। তিস্তা চেষ্টা করল ফোনে কিছু হোটেলে বুকিং নেওয়ার। কিন্তু সব জায়গা থেকে একই উত্তর- প্রশাসনের বারণ আছে। ঘর খালি থাকলেও নতুন বুকিং দেওয়া যাবে না। আলোময় সবই শুনছিল। টেলিফোনের কথোপকথন, তিস্তার কাতর অনুরোধ সবই। কিন্তু সে বেশ নিশ্চিত গলায় তিস্তার সাথে কথা চালিয়ে যাচ্ছিল। তিস্তা স্নাতক শ্রেণির শেষ বছরের ছাত্রী। ইংরেজি অনার্স। কিন্তু গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনে এমনভাবে জড়িয়ে পড়েছে যে পড়াশুনোর গতি বেশ স্তিমিত। আন্দোলনের কাজেই সে গিয়েছিল কালিম্পং।

-তাহলে তিস্তা ম্যাডাম, এত বড় জননেত্রীও আমাকে হোটেল জোগাড় করে দিতে পারল না? আমি কোথায় থাকব এত রাতে?

-আয়্যাম স্যরি ফর দ্য ট্রাবল। কিন্তু তুমি ভাবলে কি করে তোমার থাকার জায়গা ঠিক না করে আমি…

-হা, হা, হা, অবশেষে বাংলা বললে এবং সরাসরি তুমি…

-সেটা আন্ডমাইন্ডফুলি বলে ফেলেছি, নো ইস্যু। তুমি তো বাংলাদেশি। তোমার সাথে কোনো বিবাদ নেই। যাক গে, তুমি আমার বাসায় থাকবে। খুব কমফোরটেবল না হলেও আনকমফোরটেবল হবে না।

-সো কাইন্ড অফ ইউ। নাহ, তিস্তা আমার থাকা নিয়ে বদার করো না। আই শ্যাল ম্যানেজ মাই ওন শেলটার। কিচ্ছু ভেবো না। তোমায় আমি ফোনে জানিয়ে দেব।

-তুমি বিদেশি হয়ে কি করে ম্যানেজ করবে! আমিই পারছি না।

-দাঁড়াও, দুএকটা ফোন করি। তোমার ফোনটা দাও তো। আমারটায় টাওয়ার নেই।

তিস্তার ফোনটা নিয়ে আলোময় একটা নম্বর ট্রাই করল। বাজল, কিন্তু কেউ তুলল না। সে ঘড়ি দেখল। এটা কি সান্ধ্য প্রার্থনার সময়? জানালার বাইরে তাকাল আলোময়। বুঝল কোনো জনবস্তি অতিক্রম করছে গাড়িটি। কার্শিয়ং। বাইরে হোর্ডিংয়ের গায়ে নামটা দেখল সে। পাহাড়ে সন্ধ্যে গাঢ় হয়ে নেমেছে। দলছুট কুয়াশারা পাহাড়ের গায়ে স্থির ভেসে আছে। সুদর্শন উড়ছে সন্ধ্যার বাতাসে। জীবনানন্দ কখনও দার্জিলিং এসেছিলেন? নম্বরটা আবার টিপল আলোময়। কেউ ওঠাল। তিস্তা শুধু শুনল আলোময় কাউকে বলছে- ইয়েস ফাদার, আয়াম কামিং। আলোময় ফোনটা রাখতেই তিস্তা জিজ্ঞাসা করল- কি হলো থাকার ব্যবস্থা? আলোময় সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল- হ্যাঁ, হলো। কিন্তু সে যেন একটু অন্যমনস্ক গম্ভীর হয়ে উঠেছে। তিস্তা কথা বাড়াল না। কিছু পরেই আলোময় জানালার দিকে তাকিয়েই তিস্তার দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিল

-আচ্ছা তিস্তা, তোমাকে তোমার বাবা-মা যদি এখন দার্জিলিংয়ের বাইরে দূরে কোথাও বিয়ে দিয়ে দেন তাহলে তোমার আন্দোলনের কি হবে?

-আমার বাবা নেই। মানে আছেন, কিন্তু আমাদের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। মায়ের ক্ষমতা নেই এখন আমার বিয়ে দেওয়ার। মায়ের টাকা নেই।

-আয়্যাম স্যরি, তোমার পারিবারিক ব্যাপারটা উল্লেখ করার জন্য। আমি যেটা বলতে চেয়েছি তা হলো তোমার যদি বাইরে বিয়ে হয়ে যায় তবে…

-বিয়ে হয়ে যায় কি করে? বিয়ে তো করতে হয়।

-তা হয়। আমি বলতে চাইছি মনে কর আমি তো বাইরের। আমার সাথে তোমার প্রেম হলো। আমি বিয়ে করে তোমায় ঢাকা নিয়ে যেতে চাইলাম। তাহলে তুমি কোনটা বেছে নেবে? আমাকে না আন্দোলনকে?

-কি বলতে চাইছ স্পষ্ট করে বলো তো। তুমি আমাকে প্রপোজ করছ? এই সামান্য আলাপে?

-আরে না রে বাবা, আমি বোঝাতে চাইছি তোমার মতো একজন লড়াকু গোর্খা মেয়ে কোনটাকে প্রায়োরিটি দেবে? উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ও আরামের জীবন নাকি এই অনিশ্চিত আন্দোলনের কষ্ট?

-কে কীভাবে ভাবে আমি জানি না। তবে আমি পাহাড় ছেড়ে যাব না। সেজন্যে আমায় কষ্টে থাকতে হলেও না।

– তোমার সংসার, সন্তান, ঘর…

-তুমি আশ্চর্য মানুষ তো। আগে বললে প্রেম, তারপরে বিয়ে, বিয়ে থেকে চলে গেলে সংসার, সন্তান… একেবারে এক লাফে জলা পাহাড়। কি বলতে চাইছ স্পষ্ট করে বলো।

-নাহ, কিছু না। তুমি বুঝবে না।

গাড়ি দার্জিলিংয়ে ঢুকতেই আলোময় ড্রাইভারকে বলল যে আগে মেমসাহেবকে বাসায় নামিয়ে তারপরে ওকে নামিয়ে দিতে। তিস্তা গাঁইগুঁই করে বলল- আগে তোমায় নামিয়ে দিক। হরতালের শহর। কিন্তু তুমি যাবে কোথায়? আলোময় উত্তর দিল- সেন্ট পলস চার্চ। তুমি বাসায় নেমে যাও। পারলে কাল সকালে এসো। আমায় নিয়ে যেও তোমার বাসায়। তোমার মায়ের হাতের চা খাওয়া যাবে।

দার্জিলিং শুনশান। হরতাল চলছেই। ট্যুরিস্ট কেউ নেই। সব কিছু স্তব্ধ। এর মধ্যে আলোময় সারা দার্জিলিং চষে ফেলছে তিস্তার সাথে। তিস্তা পরের দিন সেন্ট পলস চার্চে এসে আলোময়কে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিল। তিস্তার মা’ও চা করে খাইয়েছিল। সাথে কিছু ঘরোয়া খাবার। আলোময় খাবার বেশ কম খায়। তিস্তা বুঝে ফেলল এই ছেলেটি বেশ স্বাস্থ্য সচেতন। কাজেই খুব একটা জোরাজুরি করে না সে খাওয়ার ব্যাপারে। এখন রেস্তোরাঁগুলোও বন্ধ। সেভাবে আলোময়কে নিয়ে কোথাও খাওয়াতে পারেনি তিস্তা। অবশ্য খুব বড় জায়গায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতাও নেই তার।

-তিস্তা, তুমি একদিন আমায় টাইগার হিল দেখাতে নিয়ে যাবে?

-নিয়ে তো যেতে পারি কিন্তু গাড়ি পাওয়া এখন বেশ মুশকিল।

-গাড়ি নিয়ে ভেব না। ফাদারের গাড়ি পাওয়া যাবে। আর ফাদারের গাড়ি কে আটকাবে?

-তা আটকাবে না। কবে যাবে?

-কালকেই চলো।

হাড়হিম ঠাণ্ডার কাকও না ডাকা ভোরে তিস্তাকে গাড়িতে তুলে নিল আলোময়। বিস্তর পোশাকের নিচে থাকা তিস্তা বলল- একটু কফি খেয়ে যেতে পারতে। সব রেডি ছিল। আলোময় হেসে ফেলল। বলল- জাইমা, টাইগার হিলে পৌঁছে না হয় খাবো। তিস্তাকে মাঝেমধ্যে জাইমা নামে ডাকে আলোময়। আরবিতে এর অর্থ অবিসংবাদী নেত্রী। বাংলাদেশে তাই অনেকেই মেয়ের নাম রাখে জাইমা। তিস্তা বলল- টাইগার হিলে কফি পাবে কি? হরতাল চলছে। আলোময় উত্তর দিল না। অন্ধকার আর কুয়াশা ফুঁড়ে গাড়ি ছুটে চলল টাইগার হিলের পথে।

টাইগার হিলে পৌঁছে ওরা দেখল জনা দশবারো মানুষ এসে পড়েছে সূর্যোদয় দেখতে। সকলেই বাঙালি। কি করে যে এরা এই হরতালের বাজারে এই অগম্য স্থানে পৌঁছোল আলোময় বুঝতেই পারল না। তিস্তাকে জিজ্ঞাসা করল- এরা কি করে…। তিস্তা বলল- এরা লোকাল। মাঝে মাঝেই শখ চাপলে চলে আসে। আর মনে হচ্ছে কফি পাওয়া যাবে। যুৎসই জায়গায় বসে একদৃষ্টে কোনাকুনি আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল আলোময়। কথা বলছিল না। পাশে ঝাঁ চকচকে গোর্খা সুন্দরী। তবুও। আলোময়ের মনে হচ্ছিল যুগ যুগ ধরে আরো কত তাদের মতো তরুণ-তরুণী মুগ্ধ হয়ে এই সূর্য ওঠা দেখেছে! আকাশের এই রঙ পাল্টানো ভোর আলোময়ের কাছে অপার্থিব মনে হচ্ছিল। কুসুম বর্ণ থালা হয়ে সূর্যের আত্মপ্রকাশ, সাথে সাথে কাঞ্চনজঙ্ঘার লাল থেকে সোনালি, তারপরে রুপোর মতো সাদা হওয়া আলোময়কে বিস্ময়ে নির্বাক করে তুলল। এতক্ষণে সে তার অভিব্যক্তি প্রকাশ করল তিস্তার কাছে।

-কি দারুণ, না?

-হ্যাঁ, এমনই তো।

-তোমার দারুণ লাগেনি?

-আমার দারুণ লেগেছে তোমার অভিব্যক্তি। তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে মুখের দিকে তাকিয়ে আমি সূর্যের ওঠা বুঝতে পারছিলাম। আকাশের দিকে আর তাকাইনি।

-সে কী! আমার মুখ দেখছিলে আর এত চমৎকার আকাশের রং বদলানো দেখলে না!

-সে তো আগেও দেখেছি। পরেও দেখব। তোমার মুখের বর্ণবদল তো আর দেখতে পাব না। পুরুষকে তো এত কাছের থেকে আগে কখনও দেখিনি।

গাড়ি সেন্ট পলস চার্চের গেস্ট হাউজের সামনে দাঁড়াতেই আলোময় লক্ষ করল ফাদার ব্যাম্পটন বারান্দায় বসে অপেক্ষা করছেন। গাড়ি থেকে নেমে ওরা দুজনেই উইশ করল ফাদারকে। ফাদার প্রত্যুত্তর দিলেন। পাশের দুটি খালি চেয়ারে ওরা দুজনে বসল। ফাদার আগেই চায়ের ফরমায়েশ করেছিলেন। নিজে হাতে চা করে ওদের হাতে চায়ের পেয়ালা তুলে দিলেন ফাদার। এবার আয়েশ করে নিজের চায়ে চুমুক দিয়ে আলোময়ের দিকে তাকালেন।

-ইয়েস আলোময়। নাও আই গট মাই অ্যাপ্রæভাল। তুমি কি ডিসাইড করলে?

-এখনও ঠিক করিনি ফাদার। আই নিড সাম টাইম। তাড়াহুড়ো কিসের? এখন তো স্কুল কলেজ সব বন্ধ। আমিও তো চলে যাচ্ছি না।

-ওকে। নো ইস্যু। ভাবো। বাট তোমায় পেলে আমার বড় ভালো লাগত।

পুরো ব্যাপারটা তিস্তার কাছে মনে হচ্ছিল হিব্রু ভাষা। বোধের বাইরে। সে আর ধৈর্য রাখতে পারল না।

-ফাদার। আমি কিছুই বুঝলাম না। আমার সামনে কথা হচ্ছে… মে আই বি ইনফর্মড?

-ওহ। তুমি কিছুই জানো না? আলোময় কিছুই বলেনি?

-নাহ। হি ডিডনট সে মে এনিথিং।

-আলোময় ঢাকার একটি মিশনারি কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক জানো তো। বিদেশে পড়াশুনো করে এসেছে। বিদেশে সেটল করেনি বাবার কাছে থাকবে বলে। মাস আটেক আগে বাবাও চলে গেছেন। ওর বাবা আমার ছাত্র ছিল। তাই ওকে আমরা সেন্ট পলস ক্যাথিড্রালের পক্ষ থেকে অনুরোধ করেছি আমাদের এখানে যোগ দিতে। থেকে যেতে বলেছি দার্জিলিংয়ে। যতদিন ইচ্ছে।

-ইটস রিয়েলি আ গ্রেট নিউজ। থেকে যাও আলোময় আমাদের দার্জিলিংয়ে।

-সে কী, তোমরা বাঙালি তাড়াচ্ছো। আর আমাকে বলছ থেকে যেতে?

-তুমি তো বাংলাদেশি। বাঙালি কোথায়?

হাসি আর চাপতে পারল না আলোময়। বেশ জোরেই হেসে ফেলল সে। কিন্তু কিছু বলল না। ফাদার ব্যাম্পটন উঠে পড়লেন। বিদায় সম্ভাষণ জানিয়ে এগোলেন নিজের আবাসের দিকে।

-আলোময়, আমি তোমার বাকি ব্যাপারটা জানি। কিন্তু এই অফারটা তো বলোনি। নিয়ে নাও। দারুণ হবে।

-আসলে আমি সত্যি কিছু ভাবিনি। তাই বলা হয়নি। কিন্তু আমি থাকলে দারুণ আর কি হবে?

-কেন? আমি তোমাকে পছন্দ করি। তুমি আমাকে…। মে বি উই উইল ফল ইন লাভ। তুমি দার্জিলিংয়ে থেকে গেলে আই মে গো অ্যাহেড।

-বাব্বা। তোমার প্রেম তো দেখছি কন্ডিশনাল। বেসড অন প্লেস।

-এখনকার ব্যাপারটাই এরকম। সব দিক ভেবে এগোতে হয়। দিস জেনারেশন ইজ নট ফুলস লাইক প্রিভিয়াস ওয়ান। ওরা প্রেমের জন্যে পুরো দিওয়ানা হয়ে সব ছেড়ে দিতে পারত। আমার মা’কে দেখনি। নাউ শি ইজ সাফারিং।

-আন্দোলন ছাড়তে পারত?

-মানে?

-মানে কিছু নয়। তোমাদের আন্দোলন তো আগের জেনারেশনে শুরু হয়েছিল। তাদের মধ্যে কেউ প্রেমের জন্যে আন্দোলন ছেড়ে দিতে পেরেছিল?

-জানি না। তুমি এই অদ্ভুত প্রশ্নটা বারবার করো কেন বলো তো? একদিকে নিজের জাতিসত্তার কথা বড় মুখ করে বলো। এদিকে আমাদের জাতিসত্তার লড়াইয়ের প্রতি যেন তোমার বিদ্বেষ আছে…।

-না না সেসব কিছুই নেই। অনেক বাঙালির মতো আমি তোমাদের এই বোধকে সম্মান করি।

-তাহলে?

-ও কিছু না। আমার মনে হয় আমরা হয়তো ভালোবাসার জন্যে, ঘর বাঁধার জন্যে আন্দোলনের পথ বা দেশত্যাগ করতাম। কিন্তু তোমরা পাহাড়কে এতটাই ভালোবাসো যে গোর্খাল্যান্ড হলেও কখনও পাহাড় ছাড়তে পারবে না।

-তা জানি না। হয়তো…।

রোজই প্রায় ওদের দেখা হয় কিন্তু মাঝে মাঝেই মিছিল মিটিংয়ের জন্যে সময়টা কমে আসে। তিস্তাকে যেতে হয়। আলোময় হাসিমুখে তখন বিদায় জানায়। তিস্তা প্রায়ই বলে- তুমি কি ঠিক করলে আলোময়? তুমি কি থাকবে দার্জিলিংয়ে? আলোময় রোজই একই উত্তর দেয়- ভাবছি। সে দিন আলোময় বেশ অফমুডে ছিল। তিস্তা একই প্রশ্ন করতেই বেশ গম্ভীর গলায় বলে উঠল- দার্জিলিংয়ে আপাতত থেকে যেতে পারি যদি তুমি তোমাদের আন্দোলন থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ সরিয়ে নিয়ে আসো।

-মানে? এ কি ধরনের শর্ত? আমি না তোমার বউ, না তোমার স্টেডি ফিঁয়াসে। আমার অ্যাকটিভিটির সাথে তোমার থাকা না থাকার কি যায় আসে?

-যায় আসে তিস্তা। কাল চার্চে এসো। তখন বলব কী যায় আসে।

-না না এখন বলো।

-এখন বললে তুমি বুঝবে না।

-তবুও বলো।

-একটাই হিন্টস দিচ্ছি। আমার নাম আলোময় বিশ্বাস। তার মানে এনলাইটেড বিলিফ। তোমার আলোময় বিশ্বাস হচ্ছে তোমাদের আন্দোলন। জাতিসত্তার আন্দোলন। রাজ্য পাওয়ার আন্দোলন। স্বায়ত্তশাসন পাওয়ার আন্দোলন। কিন্তু আমার তা নয়। অন্য কিছু। সংঘাত সেখানেই। আমার বিশ্বাস কি সেটা আন্দাজ করতে পারো? আজ রাতটুকু ভাবো। না পারলে কাল বলে দেব। আজ বললে তুমি বুঝবে না।

সকাল সবে তখন আলো ফুটেছে। চার্চের গেস্ট হাউজের কলিং বেলে হাত রাখল তিস্তা। দরজাটা প্রায় সঙ্গে সঙ্গে খুলে গেল। আলোময় বাইরে যাওয়ার পোশাকে একেবারে রেডি। প্রাথমিক সম্ভাষণ শেষে বাইরে এসে চেয়ারে বসল। তিস্তাকেও বসতে বলল। অল্পবয়েসী একটি ছেলে চা দিয়ে চলে যেতেই আলোময় তাকাল তিস্তার দিকে।

-আমি জানতাম তুমি খুব সকালে হাজির হবে। ঘুমোতে পারোনি ঠিক করে। আমার বিশ্বাসটা আন্দাজ করতে পারলে?

-নাহ। কিছুই মাথায় ঢুকছে না। কিচ্ছু মিলছে না।

-সে তো আমি জানতাম। আর কিছুক্ষণ ধৈর্য রাখো। চা’টা শেষ করে নাও। তোমাকে এক জায়গায় নিয়ে যাব।

-কোথায়?

-চার্চের গ্রেভইয়ার্ডে। গোরস্থানে। গেছো কখনও?

-একবার গেছি। কিন্তু কেন যাব?

-তোমার প্রশ্নটার উত্তর শুনতে।

চা শেষ করে ওরা উঠে পড়ল। আলোময়ের হাতে একগুচ্ছ সাদা টাটকা বাগানের ফুল। আর একটা মোমবাতি। কারোর সমাধিতে জ্বালাবে। কিন্তু সে কে? তিস্তার কৌত‚হল তীব্র হয়ে উঠেছে। সে বেশ দ্রুত হেঁটে চলল গোরস্থানের দিকে।

একটি কবরের সামনে গিয়ে আলোময় মোমবাতিটি জ্বেলে সমাধির ওপরে দাঁড় করিয়ে দিল। এবার অঞ্জলির ভঙ্গিমায় ফুলগুলো ছড়িয়ে দিল পুরো সমাধিজুড়ে। কিছুক্ষণ নীরবে প্রার্থনা করার পরে সে মৌনতা ভাঙল।

-এই সমাধিটি কার জানো?

-না।

-তোমাদের গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের শুরুর সময়ের নেত্রী সুরবানী সুব্বার। নাম শুনেছ?

-অবশ্যই শুনেছি। কিন্তু বিশেষ কিছু জানি না। তবে উনি খ্রিস্টান ছিলেন।

-উনি আমার মা।

-কি?

-ঠিকই শুনছ। উনি আমার মা।

-কি বলছ তুমি? আমার সব কেমন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে।

-হওয়ারই কথা। আমার মা সুরবানী সুব্বা ছিলেন গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের প্রথম সারির নেত্রী। আমার বাবা মনিময় বিশ্বাস বাংলাদেশ থেকে এখানে পড়তে আসেন সেন্ট পলস কলেজে। পড়াশুনো শেষে বাবা ফিরে যাবেন, স্বাভাবিকভাবে এটাই ঘটার ছিল। কিন্তু গোলমাল হলো সুরবানীর সাথে আলাপ হয়ে। বাংলাদেশের জাতিসত্তার আন্দোলনের ফলশ্রæতি বাবা ছোটবেলায় দেখেছেন। বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছে। কাজেই তিনি এই গোর্খা আন্দোলনের প্রতি দুর্বল ছিলেন। সেই সূত্রে আলাপ সুরবানীর সাথে। খ্রিস্টান বউ মেনে নিতে পারেননি আমার পিতামহ। কাজেই বাবা এখানেই বিয়ে করেন এবং স্কুলে শিক্ষকতার কাজ নিয়ে ভালোই ছিলেন। মাও ভালো ছিলেন আন্দোলন নিয়ে।

-তারপর?

-তারপর আমি হলাম। দার্জিলিংয়ের ঠাণ্ডা আমার তখন সহ্য হলো না। আমার জীবন সংশয় হতেই ডাক্তাররা বললেন যে আমাকে বাঁচাতে হলে দার্জিলিং ছাড়তে হবে। এই খবরটা পেলেন আমার পিতামহ। ততদিনে তার রাগ পড়ে গেছে। এদিকে উত্তরপুরুষ জন্মেছে। বাবা খ্রিস্টান বিয়ে করলেও নিজ ধর্ম ত্যাগ করেননি। কাজেই আসরে নামলেন আমার পিতামহ। সসম্মানে বাবা ও মাকে ঢাকায় ফিরতে বললেন। নিজে এলেন দার্জিলিংয়ে। কিন্তু মায়ের জাতিসত্তার আন্দোলন মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়াল। তিনি এখন যাবেন না। এদিকে আমার জীবন সংশয়। আমার পিতামহ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। মায়ের মানসিকতা বুঝতে পারলেন। ফাদার ব্যাম্পটনের হস্তক্ষেপে বাবা ভাঙা মনে মা’কে রেখে আমাকে নিয়ে ঢাকায় ফিরলেন। মা কথা দিয়েছিলেন যে গোর্খাল্যান্ড হলেই মা ঢাকায় আসবেন।

-গিয়েছিলেন তিনি ঢাকায়?

-নাহ। কখনও যাননি। কিছুদিনের মধ্যে তোমাদের নেতা হিল কাউন্সিল মেনে নিলেন। গোর্খাল্যান্ড হলো না। আমার মা নেতার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করতেই তার ওপরে শুরু হলো নীরব অত্যাচার। সব জায়গায় হয়ে উঠলেন ব্রাত্য। তার অনুভূতি তখন পরাজিতের। সব হারিয়ে বসে আছেন। বাবাকেও কিছু জানাননি। কিছুটা আত্মপীড়নের কারণেই দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়লেন। বাবাকে খবর দেওয়া হলো। বাবা এলেন। আমার প্রতি মায়ের ব্যবহার তিনি মেনে নিতে না পারলেও চেয়েছিলেন মাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে। পারেননি। আমি তখন ইংল্যান্ডে একটি স্কুলে পড়ছি আমার পিতামহের ব্যবস্থাপনায়। এ খবর শুনে মা আরো ভেঙে পড়েন। মৃত্যুই তাকে তখন মুক্তি দিয়েছিল।

-ওহ। আমি ভাবতেই পারছি না।

-দেখ তিস্তা। আমার মায়ের কাহিনীর পুনরাবৃত্তি হোক আমি চাইব না। আমার এখানে থেকে যাওয়ার একটাই কারণ হতে পারে সেটা হলো তুমি। ঠিক তুমি নও। তোমার অসমাপ্ত লেখাপড়া। তোমার প্রতি আমার অনুভূতি ক্রমেই ভালোবাসার দিকে এগোচ্ছে। ভালোই যদি বাসতে পারি তাহলে এক দেড় বছর অপেক্ষা করে তোমার গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে তোমায় বিয়ে করে চলে যাব।

-কোথায়?

-ঢাকায় নয়। সেখানে আমার প্রপার্টি ছাড়া কেউ নেই। এখানেও চিরজীবন মায়ের সমাধি আঁকড়ে থাকতে পারব না। অন্য কোথাও অন্য কোনো দেশে। হয়তো ইংল্যান্ডে।

-কিন্তু আমার আন্দোলন? আমার কমিটমেন্ট টুওয়ার্ডস মাই পিপল?

-ড্যাম ইট। আমার মাকে দেখে বুঝতে পারছ না যে আন্দোলন কিসের নামে হয়? কে কি পায়? পুরোটাই ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারা। সে কারণে বলিকাঠে চড়াবো আমার প্রেমকে? স্যরি। কাজেই ডিসাইড করো তোমার আলোময় বিশ্বাস আন্দোলন নাকি রক্ত মাংসের আলোময়। আমাকে যখনই হোক জানিয়ে দিও মোবাইলে মেসেজ করে।

আর দাঁড়াল না আলোময়। হন হন করে হাঁটা দিল চার্চের দিকে। তিস্তাকে পিছনে ফেলে। চার্চের গেটের কাছে আসতেই সে মেসেজ প্রাপ্তির ঘণ্টি শুনল তার মোবাইলে। খুলে দেখল সেখানে তিস্তার মেসেজ- ম তিমিলাই মায়া গরছু। নেপালি বাক্য। মানে বুঝতে পারল না সে। দ্রুত সে গুগল ট্রান্সলেটরে মেসেজটা লিখে দিল। উত্তরটা পেতেই হেসে ফেলল সে। আমি তোমাকে ভালোবাসি।

আরও সংবাদ...'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj