সেলিনা হোসেন

শুক্রবার, ১৫ জুন ২০১৮

আমাদের শ্রেষ্ঠ কথাকার : মুহম্মদ নূরুল হুদা

ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৭৩ সাল থেকে। সেই সময় থেকেই আমরা দুজন বাংলা একাডেমিতে কর্মরত। লেখক হিসেবে তাঁর বেড়ে ওঠাটা খুব নিকট থেকে দেখেছি। অবাক হয়েছি এই শ্যামল রং বাঙালি রমণীর সৃষ্টিশীল বিবর্তন ও সাফল্যের উচ্চতা দেখে। সেই উচ্চতা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। তিনি ক্রমে ক্রমে আমাদের সাহিত্য ও ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাকার হয়ে উঠছেন।

১৪ জুন সেলিনা হোসেন একাত্তর পেরিয়ে বাহাত্তরে পা রাখলেন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি ও সৃষ্টিকলা সমগ্রে এটি এক স্মরণীয় সময়ফলক। ২০ শতকের ষাটের দশক থেকে সেই যে তাঁর কথন-বয়ানের শুরু, গত ছয় দশকাধিক কাল ধরে তা বাঁকের পর বাঁক পেরিয়ে স্বতশ্চল উচ্ছলতায় কেবলই সমুদ্রাভিসারী হয়ে চলেছে। উৎস থেকে যাত্রা তার নিরন্তর। না, তাঁর কোনো থামা নেই, উলম্ফন নেই, আছে শুধু সচেতন অভীষ্ট-বদল। তাঁর অনিষ্টও একটাই : নিজের জন্য আর অন্য সবার জন্য এক অভিন্ন নান্দনিক নিদান, যা মানুষকে সর্বাংশে মানুষ করে তোলে। এই ছয়-দশকের সার্বক্ষণিক লেখকপনা তাঁকে করে তুলেছে আমাদের কালের এক তুলনারহিত সৃষ্টিসাধক, যাঁর কলম থেকে জন্ম নিয়েছে গুচ্ছ গুচ্ছ মনজয়ী, জনজয়ী ও কালজয়ী সৃষ্টিসম্ভার, যার দৃশ্যমান আঙ্গিক গদ্যভঙ্গি, আর যার অন্তর্জালে পরিব্যাপ্ত কবিতার তৃপ্তি ও অতৃপ্তি। গদ্যে-পদ্যে ভেদরেখা তুলে দিয়ে যাঁরা এক অদ্বৈতবাদী সাহিত্যচর্চায় নিবেদিত, সেলিনাকে তাঁদেরই একজন বলে মনে করি।

সন্দেহ নেই, তাঁর মূল পরিচয় ঔপন্যাসিক। তাঁর নানা মাত্রিক গল্প-উপন্যাসে উৎকীর্ণ হয়েছে সমকাল ও স্বসমাজের চলমান ইতিহাস, তার সামাজিক-রাজনৈতিক দ্ব›দ্ব-সংকটের বহুমাত্রিকতা। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস, বিশেষত ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, নারী আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণবিস্ফোরণ, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে অদ্যাবধি সংঘটিত সামাজিক-রাজনৈতিক তাবৎ ঘটনাপুঞ্জ তাঁর রচনায় একটি সচেতন নতুন মাত্রায় অভিষিক্ত।

প্রবন্ধে-নিবন্ধে ও বাগ্মিতায় তিনি সমকালের এক বিবেকী কণ্ঠস্বর। তাঁর রচনা আদৃত হয়েছে দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও। অনূদিত হয়েছে ইংরেজি, ফরাসি, জাপানি, কোরিয়ান, ফিনিস, আরবি, মালয়ালাম, স্প্যানিশ, রুশ, মালে, কানাড়িসহ বিভিন্ন ভাষায়। অদম্য সচল সেলিনা হোসেন লেখক হিসেবে যেমন সযতœ পরিচর্যাপ্রবণ, তেমনি অতিপ্রজও বটে। এই দুই বৈপরীত্য সাধারণত এক স্রষ্টায় দুর্লঙ্ঘ্য। সেলিনা দৃশ্যমান তাঁর ব্যতিক্রম।

তাঁর রচনার একটি অসম্পূর্ণ তালিকা এই বক্তব্যের পক্ষে উদ্ধৃত করছি। তাঁর গল্পগ্রন্থ : উৎস থেকে নিরন্তর (প্রথম গ্রন্থ), জলবতী মেঘের বাতাস, খোল করতাল, পরজন্ম, মানুষটি, মতিজানের মেয়েরা, অনূঢ়া পূর্ণিমা, সখিনার চন্দ্রকলা, এ কালের পান্তাবুড়ি, অবেলার দিনক্ষণ, নারীর রূপকথা, নুনপান্তার গড়াগড়ি, মৃত্যুর নীলপদ্ম ইত্যাদি। উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলো : জলোচ্ছ¡াস (প্রথম উপন্যাস), জ্যোৎস্নায় সূর্যজ্বালা, হাঙর নদী গ্রেনেড, মগ্ন চৈতন্যে শিস, যাপিত জীবন, নীল ময়ূরের যৌবন, পদশব্দ, চাঁদবেনে, পোকামাকড়ের ঘরবসতি, নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি, রণ, কাঁটাতারে প্রজাপতি, খুন ও ভালোবাসা, কালকেতু ও ফুলরা, ভালোবাসা প্রীতিলতা, টানাপোড়েন, গায়ত্রী সন্ধ্যা, দীপান্বিতা, যুদ্ধ, লারা, কাঠ কয়লার ছবি, মোহিনীর বিয়ে, আণবিক আঁধার, ঘুমকাতুরে ঈশ্বর, মর্গের নীল পাখি, অপেক্ষা, দিনের রশিতে গিটঠু, মাটি ও শস্যের বুনন, পূর্ণছবির মগ্নতা, ভূমি ও কুসুম, উত্তর সারথি, যমুনা নদীর মুশায়রা, আগস্টের একরাত, গেরিলা ও বীরাঙ্গনা, দিনকালের কাঠখড়, স্বপ্নের বাজপাখি, নিঃসঙ্গতার মুখর সময়, হেঁটে যাই জনমভর ইত্যাদি। তাঁর শিশু-কিশোর গ্রন্থসমূহ : সাগর, বাংলা একাডেমি গল্পে বর্ণমালা, কাকতাড়–য়া, বর্ণমালার গল্প, আকাশ পরী, অন্যরকম যাওয়া, যখন বৃষ্টি নামে, জ্যোৎস্নার রঙে আঁকা ছবি, মেয়রের গাড়ি, মিহিরুনের বন্ধুরা, রংধনু (সম্পাদনা), এক রুপোলি নদী, গল্পটা শেষ হয় না, বায়ান্নো থেকে একাত্তর, চাঁদের বুড়ির পান্তা ইলিশ, মুক্তিযোদ্ধারা, সোনারতরীর ছোটমণিরা, পুটুসপুটুসের জন্মদিন, নীলটুনির বন্ধু, কুড়কুড়ির মুক্তিযুদ্ধ, ফুলকলি প্রধানমন্ত্রী হবে, হরতালের ভূতবাবা, রাসেলের জন্য অপো, হোজ্জার পুতুল, নদীর ধারের মেয়েটি। তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ : স্বদেশে পরবাসী, ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলন, একাত্তরের ঢাকা, নির্ভয় করো হে, মুক্ত করো ভয়, ঘরগেরস্থির রাজনীতি, নিজেরে করো জয়, প্রিয় মুখের রেখা, শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ, পথ চলাতেই আনন্দ, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ ইত্যাদি। এ ছাড়া রয়েছে তাঁর প্রায় বেশ কিছু সম্পাদিত গ্রন্থ। ইচ্ছে করেই সেলিনা হোসেন রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলির রেখাচিত্রটি দেওয়া হলো। তাঁর গুণগ্রাহী পাঠক-পাঠিকা অসংখ্য। এই তালিকাটি তাঁদের খানিকটা হলেও সাহায্য করবে। ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৭৩ সাল থেকে। সেই সময় থেকেই আমরা দুজন বাংলা একাডেমিতে কর্মরত। লেখক হিসেবে তাঁর বেড়ে ওঠাটা খুব নিকট থেকে দেখেছি। অবাক হয়েছি এই শ্যামল রং বাঙালি রমণীর সৃষ্টিশীল বিবর্তন ও সাফল্যের উচ্চতা দেখে। সেই উচ্চতা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। তিনি ক্রমে ক্রমে আমাদের সাহিত্য ও ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাকার হয়ে উঠছেন। তাঁর উদ্দেশে নিবেদন করি ভক্তের প্রণতি : সেলিনা হোসেন, আপনি জন্মসূত্রে বিশ্ববাঙালি, কর্মসূত্রে এক প্রমুক্ত মানব। আপনার মগ্নচৈতন্যের শিসে সমীকৃত বাঙালির জাতিসত্তা, ঐতিহ্যলগ্নতা, প্রগতিপ্রসারতা, বৈশ্বিকতা, নান্দনিকতা। সর্বোপরি আপনার বোধে জায়মান দেশোত্তর ও কালোত্তর মানবিক অভিন্নতা। ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ তথা তাবৎ ভেদবুদ্ধির ঊর্ধ্বে আপনি ক্রমেই হয়ে উঠছেন এক ভারসাম্যময় মানবসত্তা। আপনার সৃষ্টি ও কর্ম চিরায়ু হোক।

আরও সংবাদ...'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj