বাঙালির ঈদ উৎসব : শামসুজ্জামান খান

শুক্রবার, ১৫ জুন ২০১৮

বাংলাদেশে উৎসব নতুন ধরন ও নবতাৎপর্য লাভ করেছে। ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আধুনিক জীবনবোধ ও জীবনজিজ্ঞাসার নানা প্রতীকী অর্থ ও উদ্ভাবনাময় ব্যঞ্জনা। বাংলাদেশকে বলা হয় ‘বারো মাসে তেরো পার্বণ’-এর দেশ। এ থেকে এই কথা বোঝায় না যে, বাংলাদেশে উৎসব-অনুষ্ঠান লেগেই আছে। তা নয় মোটেই। কারণ উৎসব আর পার্বণের মধ্যে মূলগত পার্থক্য আছে। ‘উৎসব’ মূলত সার্বজনীন অর্থাৎ সবাই মিলে উদযাপন করার একটি বিষয়। এদিক থেকে দেখলে উৎসব চরিত্রগতভাবে সেক্যুলার। উৎসবে ধর্ম সম্পৃক্ততা নেই এমন নয়। তবে এর দুই ধরনের বৈশিষ্ট্য। এক. ধর্মীয় উৎসব হলে এতে ধর্মীয় আচার ও রীতিনীতি বা করণ-ক্রিয়া থাকতেই পারে। যেমন- মুসলিম বাঙালির ঈদ উৎসব আবার সার্বজনীন। এতে ধর্মীয় করণ-ক্রিয়াটুকু কেন্দ্রীয় বিষয়। কিন্তু এর আনুষঙ্গিকতাও আছে। মজার ব্যাপার হলো, বৃহৎ উৎসবে সামাজিক এবং আন্তঃধর্ম সম্প্রদায়গত ও অংশগ্রহণগত চাপও এতটা বৃদ্ধি পায় যে, উৎসবে কেন্দ্রীয় বিষয় আর মুখ্য এবং আধিপত্যবাদী অবস্থানে থাকে না। ঢাকার বাঙালি মুসলমানের ঈদ উৎসব এবং কলকাতার বাঙালি হিন্দুর সার্বজনীন দুর্গাপূজায় এমনটি যে ঘটে গেছে, সাম্প্রতিককালের ইতিহাস এর সাক্ষী। এ জন্য পার্বণ মূলতই ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা করণ-ক্রিয়ার জন্য নির্দিষ্ট ছিল। এর মধ্যে সাধারণ সামাজিক বা আন্তঃসম্প্রদায়গত কোনো সম্পৃক্তির চাপ থাকে না। পার্বণ ছোট, সীমাবদ্ধ ধর্মীয় গণ্ডিতে আবদ্ধ এবং রূপান্তর বা সামাজিক সম্প্রসারণ নেই। কারণ পার্বণ সার্বজনীন নয়, বহুলাংশে ধর্ম সম্প্রদায়ের পারিবারিক অনুষ্ঠান। পারিবারিক এই পার্বণ আবার পরিবারের সবাই সর্বক্ষেত্রে মিলিতভাবে করে এমনও নয়। পরিবারের নিষ্ঠাবান বয়স্ক ধার্মিকরাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ পার্বণ উদযাপন করে থাকেন। তাই গোটা পরিবারের, বিশেষ করে তরুণদের অংশগ্রহণ না থাকায় বহু পার্বণের বিলুপ্তি ঘটেছে। কোনো কোনো উৎসবের ভেতরগত অন্তঃসারের মধ্যে সামাজিক সংহতি বা আন্তঃধর্মীয় সম্প্রদায়ের সমবেতভাবে উদযাপনের উপাদান থাকায় এর বিপুল বিস্তার ও গুণমানগত উন্নয়ন ঘটেছে। এর নানা চমৎকারিত্ব, শক্তিমত্তা ও সামাজিক সংহতির উদাহরণ পেশ করা যায়।

অন্যদিকে আমাদের কিছু প্রাচীন পার্বণ ও উৎসবও যে বিশালভাবে রূপান্তরিত হয়ে জাতীয় এবং ধর্মনিরপেক্ষ বা সেক্যুলার রূপ পরিগ্রহ করেছে, তা তো আমরা চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি। একটু ইতিহাস অনুরাগী বা অনুসন্ধানপ্রবণ মনের অধিকারী হলে তো কথাই নেই। ইতিহাস বিশ্লেষণ করেই নানা উৎসবের লক্ষণ, উদ্দেশ্য, রূপান্তর প্রক্রিয়া ও ধর্মীয় উপাদানের প্রতি নিষ্পৃহতা এবং সমাজ সংহতি ও মানবিক মিথষ্ক্রিয়ার প্রতি গুরুত্ব আরোপের প্রয়াস দেখি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধর্মীয় উপাদান ছেঁটে ফেলে তাকে পরিশীলিত ও সংস্কৃতির ঐতিহাসিক ধারার মধ্যে নবরূপে বিন্যস্ত করার প্রয়াস দেখি।

বাংলাদেশে ঈদ উৎসবের সাম্প্রতিক বিপুল বিস্তার ও গভীরতা আমাদের আর্থ-সামাজিক রূপান্তরের একটি নতুন চিত্র সামনে এনেছে। মূল্যবোধের অবক্ষয়, অশান্তি ও আবিলতার যে সৃষ্টি করেছে- এর ভেতর দিয়েও সমাজ এগোচ্ছে, পরিবর্তিত হচ্ছে নিরন্তর এবং এই পরিবর্তনের একটা ধারাবাহিকতাও আছে। ঈদ উৎসবের ওই ধারাবাহিক পরিবর্তনের ধারার উৎস খুঁজতে হলে আমাদের ষোড়শ-সপ্তদশ শতকের বাংলার সামাজিক ইতিহাসের গ্রামীণ এবং সদ্য গড়ে ওঠা খুবই সীমিত আকারের নগর জীবন অবলোকন করতে হবে। এতে হয়তো একটা সমন্বিত লোকজীবন খুঁজে পাওয়া যাবে কিছু বিরোধাত্মক উপাদান সত্ত্বেও। মৈমনসিংহ গীতিকা বিষয়ে অথরিটি চেক পণ্ডিত দুশান জবাভিতেলের বক্তব্য উদ্ধৃত করে মার্কিন ইতিহাসবিদ রিচার্ড ইটন যে মন্তব্য করেছেন, এর সারবত্তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। মৈমনসিংহ গীতিকার গবেষক দুশান (তার বিখ্যাত গ্রন্থ ঋড়ষশ ইধষষধফং ভৎড়সগু সবহংরহম ধহফ ঃযব ঢ়ৎড়নষবসং ড়ভ ঃযবরৎ অঁঃযবহঃরপরঃু ১৯৬৩) মৈমনসিংহ গীতিকা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, আধুনিক-পূর্বকালের মৈমনসিংহের গীতিকাগুলো : ঘবরঃযবৎ ঃযব চৎড়ফঁপঃং ড়ভ ঐরহফঁ ড়ৎ গঁংষরস পঁষঃঁৎব নঁঃ ড়ভ ধ ংরহমষব ইবহমধষর ঋড়ষশ পঁষঃঁৎব- এই সূত্র ধরে ঐতিহাসিক ইটন সাহেব আধুনিক-পূর্ব বাংলাদেশের লোকধর্মকেও শাস্ত্রীয় ধর্মের তুল্যমূল্য বিবেচনা করেছেন। সেভাবে দেখলে পূর্ববাংলার গ্রামাঞ্চলের প্রচলিত ইসলামও ছিল লৌকিক ইসলাম- যাতে স্থানীয় আচার-সংস্কার বিশ্বাসের ছোপ লেগেছিল বেশ ভালোভাবেই। এই সমন্বয়ধর্মিতার নানা উপাদান বাংলার ইসলামকে বিশিষ্ট করেছিল।

ঈদ উৎসব শাস্ত্রীয় ইসলামের এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। তবে দ্বাদশ শতকের বাংলায় ইসলাম এলেও ৪০০-৫০০ বছর ধরে শাস্ত্রীয় ইসলামের অনুপুঙ্খ অনুসরণ যে হয়েছিল, তেমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। সেকালের বাংলায় ঈদ উৎসবেও তেমন কোনো ঘটা দেখা যায় না। এর কারণ হয়তো দুটি- এক. গ্রামবাংলার মুসলমানরা ছিল দরিদ্র এবং দুই. মুসলমানের মধ্যে স্বতন্ত্র কমিউনিটির বোধ তখনো তেমন প্রবল হয়নি। ফলে ধর্মীয় উৎসবকে একটা সামাজিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর অবস্থাও তখনো সৃষ্টি হয়নি। আর এটা তো জানা কথাই যে, সংহত সামাজিক ভিত্তি ছাড়া কোনো উৎসবই প্রতিষ্ঠা লাভ করে না। তাই বৃহৎ বাংলায় ঈদ উৎসব সপ্তদশ, অষ্টাদশ, এমনকি ঊনবিংশ শতকেও তেমন দৃষ্টিগ্রাহ্য নয়। নবাব-বাদশাহরা ঈদ উৎসব করতেন। তবে তা সীমিত ছিল অভিজাত ও উচ্চবিত্তের মধ্যে। সাধারণ মানুষের কাছে সামাজিক উৎসব হিসেবে ঈদের তেমন কোনো তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা ছিল না। গোটা উনিশ শতক ধরে বাংলাদেশে যে ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন চলে, এর প্রভাব বেশ ভালোভাবেই পড়েছে নগরজীবন ও গ্রামীণ অর্থবিত্তশালী বা শিক্ষিত সমাজের ওপর। মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাও এই চেতনাকে শক্তিশালী করেছে। ফলে ওই অনুক‚ল পরিবেশেই ইসলামিকরণ প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে এক শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলনের রূপ নিয়েছে। এমনকি ধর্মনিরপেক্ষতা কেন্দ্রে রেখে পরিচালিত বাংলাদেশ আন্দোলন এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ইসলামিকরণ প্রক্রিয়ার যে নবরূপায়ণ ঘটেছে, এতে ঈদ উৎসব রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে নতুন গুরুত্ব পেয়েছে।

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর যে বিপুল মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে উঠেছে- তা বিদ্যা, বিত্ত, রুচি ও সংস্কৃতিতে তেমন পাকা না হয়ে উঠলেও তারা সামাজিক শ্রেণি হিসেবে নতুন গুরুত্ব ও তাৎপর্য লাভ করায় তাদের প্রধান উৎসব হিসেবে ঈদ জাতীয় মর্যাদা লাভ করে। এ ভূখণ্ডে ঈদের এ নতুন মর্যাদা এই প্রথম। এ জন্য বাংলাদেশে ঈদ এখন যতটা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও রীতি-কেতার অংশ, এর চেয়ে বেশি জাতিগত সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নির্মাণের নবপ্রকাশ। বাংলাদেশের আধুনিক বাঙালি মুসলমানদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রা সমন্বিত করার এক নতুন প্রকাশও আমরা দেখি ঈদ উৎসবের নববিন্যাসের মধ্যে। বাঙালি মুসলমান এভাবেই তাদের জীবনের একটা কন্ট্রাডিকশন বা দ্ব›েদ্বর সমাধান প্রত্যাশা করেছিলেন। কারণ তাদের ধর্মগ্রন্থের ভাষা আর জাতিগত সাংস্কৃতিক আত্মপ্রকাশের ভাষা ভিন্ন। পাকিস্তানের রাষ্ট্র শাসকরা ওই দুই ধারা এক করে দিতে চেয়েছিল। পূর্ববাংলার বাঙালি মুসলমান তা হতে দেননি। তারা দুই ধারাই রক্ষা করে এর মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়াস পেয়েছেন। ফলে ঈদ বা বাংলা নববর্ষ কিংবা একুশে ফেব্রুয়ারির কোনো উৎসবই তাদের কাছে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বাংলাদেশের বাঙালির আশা-আকাক্সক্ষা, উদ্বেগ-আত্তি সবকিছুই এর সঙ্গে মিশে আছে। এটা এই বাংলার বাঙালির এক স্বকীয় বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অর্জন। আসলে বাংলাদেশের বাঙালি তার আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বিন্যস্ত করছে এক নতুন ও বড় আয়োজনের মধ্য দিয়ে। এটা করতে গিয়ে জটিল ও কষ্টকর এক প্রক্রিয়াকে তারা অতিক্রম করছে কখনো সময়ের সাহসী সন্তান হিসেবে, কখনো কিছু দ্বিধা ও সংকটে, কিছুটা বিভ্রান্তিতে থমকে দাঁড়িয়ে, কখনো অস্পষ্টতায় পথ হাতড়ে। তবে লক্ষ্যটা বোধহয় ঠিকই আছে।

বাঙালি মুসলমানের কোনো জাতীয় উৎসবই ছিল না। পশ্চিমবাংলার বাঙালি মুসলমান তাদের জন্য কোনো জাতীয় উৎসব নির্মাণ করে নিতে পেরেছে কিনা, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কিন্তু বাংলাদেশের বাঙালি বিগত শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বিশাল ও কষ্টকর কর্মযজ্ঞের মধ্য দিয়ে গেছে। বাঙালি হিন্দুর শারদীয় দুর্গা উৎসবের মতো ঈদ উৎসবকে বিশাল জাতীয় উৎসবে পরিণত করেছেন। এর মধ্যে এনেছেন সাংস্কৃতিক মাত্রিকতা এবং যোগ করেছেন নতুন নতুন ইহজাগতিক উপাদান। তাই ঈদ উৎসব যতটা ধর্মীয়, এর চেয়ে বোধহয় বেশি পরিমাণে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক জীবনধারা এবং সাংস্কৃতিক উপাদানে পূর্ণ। ঈদ ফ্যাশন ও ডিজাইন শো, পত্রপত্রিকার ঈদ সংখ্যা, নাটক ও বিচিত্রানুষ্ঠানের মঞ্চায়ন, টেলিভিশনে সপ্তাহব্যাপী ঈদের বিচিত্র সব অনুষ্ঠান ঈদ অনুষ্ঠান অন্য ধর্মের মানুষের কাছেও গ্রহণযোগ্য করে সার্বজনীন ও লোকপ্রিয় করে তুলেছে। নিছকই ধর্মীয় এক উৎসব একই সঙ্গে জাতীয় সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত করা হয়েছে। বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনার প্রাগ্রসর কারণেই হিন্দু বাঙালির দুর্গা উৎসব এবং মুসলমান বাঙালির ঈদ উৎসব একই সঙ্গে তাদের সাংস্কৃতিক উৎসবও বটে।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj