এবার স্বস্তির ঈদযাত্রা সড়কে আশঙ্কা থাকলেও যানজট নেই

শুক্রবার, ১৫ জুন ২০১৮

কাগজ প্রতিবেদক : ঈদযাত্রার সব শঙ্কা দূর করে স্বস্তিতে ঘরে ফিরছে মানুষ। কয়েকদিন আগেও যেখানে সব সড়কেই তীব্র যানজট, ট্রেনের সিডিউল বিপর্যয়ে শঙ্কায় অস্থির ছিল, সেখানে যাত্রীবাহী বাস ও ট্রেনগুলো দুরন্ত গতিতে নিজ নিজ গন্তব্যে ছুটে যাচ্ছে। কোথাও যানজট বা অন্য কোনো ঝক্কি-ঝামেলা নেই। যানবাহনেরও কোনো সংকট দেখা যায়নি। গত দুদিনে দেশের সব সড়ক ও মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বাড়লেও যাত্রীদের ভোগান্তি ও দুদর্শার কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

তবে শেষ কর্মদিবসে গতকাল বৃহস্পতিবার সব জায়গাতেই ঘরমুখো মানুষের উপচে পড়া ভিড় ছিল। কমলাপুর রেলস্টেশনে ছিল হাজার হাজার যাত্রীর ভিড়। স্টেশন চত্বর ও প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনে তিল ধরনের ঠাঁই ছিল না। রাজধানীর গাবতলী ও মহাখালী বাস টার্মিনালে যাত্রীদের ভিড় দেখা গেছে। তবে দুপুর পর্যন্ত ফাঁকা ছিল সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল। তবে বিকালের দিকে সেখানেও যাত্রীদের ঢল নামে। সদরঘাটে দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় ছিল। ঈদের ছুটির প্রাক্কালে গতকাল ছিল শেষ কর্মদিবস। সকালে সবাই অফিসে গেলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি অফিসেই উপস্থিতির হার কমতে থাকে। সচিবালয়সহ প্রায় সব সরকারি ও বেসরকারি দপ্তরগুলো দুপুরের দিকেই ফাঁকা হয়ে যায়। এরপরই রাজধানীর বাস-লঞ্চ টার্মিনাল ও রেলস্টেশনে ঘরমুখো মানুষের ভিড় শুরু হয়। বিকালের দিকে সব জায়গাতেই নারী- পুরুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। গাবতলী ও মহাখালী বাস টার্মিনালে যাত্রীরা আসার পরপরই বিভিন্ন রুটের বাস নিজ নিজ গন্তব্যে রওয়ানা হয়। মহাখালীতে

যাত্রীরা এসেই বাসের টিকেট সংগহ করেন এবং বাসের সিট পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গন্তব্যের উদ্দেশে রওয়ানা হয়। সেখানে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা যায়নি। যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের পরিস্থিতি দেখতে মহাখালী বাস টার্মিনালে আসেন। এ সময় তিনি বলেন, এবার মানুষ স্বস্তি নিয়ে বাড়ি যাবে। সড়ক ও মহাসড়কের কোথাও কোনো ধরনের যানজট হয়নি।

এখন যেমন স্বস্তি নিয়ে বাড়ি যাচ্ছে তেমনি আবার ছুটির পর স্বস্তি নিয়েই ঢাকায় ফিরে আসবে।

সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে টিকেট বা যানবাহনের কোনো সংকট ছিল না। সকালের দিকে টার্মিনাল ছিল একেবারেই ফাঁকা। অসংখ্য বাস যাত্রীর অপেক্ষায় ছিল। সায়দাবাদ জনপদ মোড়ের শ্যামলী, ইকোনো, হানিফসহ বিভিন্ন বাস কাউন্টারগুলোতে যাত্রীর ভিড় দেখা যায়নি। সবগুলো কাউন্টারেই একই দৃশ্য দেখা গেছে। তবে সকাল ১১টার দিকে যাত্রীদের কাউন্টার থেকে টিকেট সংগ্রহ করতে দেখে গেছে। দুপুরের দিকে এখানেও যাত্রীদের ভিড় বাড়তে থাকে। পরিবহন কর্মীরা জানান, রাস্তায় যানজটের ভয়ে মানুষ বিকল্প উপায়ে ঘরে ফিরছে। এ কারণে যাত্রীর চাপ নেই। আবার রাস্তায় যানজটও নেই।

জানা গেছে, গতকালও দেশের কোনো সড়ক ও মহাসড়কে কোনো যানজট হয়নি। সব রুটের যানবাহন দ্রুত গতিতে গন্তব্যে ছুটে গেছে। উল্টরাঞ্চলের প্রবেশ পথ বঙ্গবন্ধু সেতুর দুইপাশই ফাঁকা ছিল। এই পথের যানবাহনের প্রবল চাপের কারণে বিগত সময়ে মির্জাপুর ও গাজীপুর চৌরাস্তা থেকেই দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হতো। কিন্তু গতকাল এই গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ফাঁকা ছিল। এ ছাড়া ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কেও নির্বিঘ্নে যানবাহন চলাচল করেছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোনো অংশেই কোনো ধরনের যানজট ছিল না।

দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার প্রধান প্রবেশদ্বার শিমুলিয়া কাঁঠালবাড়ী ফেরিঘাটে বাসের জন্য ফেরিগুলো অপেক্ষায় ছিল। বাস ও লঞ্চ টার্মিনালে মানুষের উপচে পড়া ভিড় থাকলেও এই ফেরিঘাটে এর কোনো প্রভাব পড়েনি।

রেলে তিল ধারণের ঠাঁই নেই : কমলাপুর রেলস্টেশনে গতকাল মানুষের উপচে পড়া ভিড় ছিল। স্টেশন চত্বর ও ট্রেনে ছিল না তিল ধারণের ঠাঁই। ছাদেও শত শত মানুষ জীবনবাজি রেখে কোনো রকমে ব্যাগ-পোটলা নিয়ে ঈদ যাত্রায় বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন। প্রতিটি ট্রেন স্টেশনে ভিড়ছে তো হাজারো যাত্রী হুমড়ি খেয়ে পড়ছে কে কার আগে ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। গেটে অসম্ভব ভিড়, সে কারণে অনেককে বাচ্চা-কাচ্চাদের জানালা দিয়ে ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করানোর দৃশ্যও চোখে পড়েছে। যাত্রীর চাপ থাকায় এবং কিছু ট্রেন দেরিতে স্টেশনে ঢোকায় কয়েকটি ট্রেনের সিডিউল বিপর্যয় ঘটেছে বলে স্টেশন সূত্রে জানা গেছে। গতকাল সকাল থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে যাওয়া প্রতিটি ট্রেনেই ছিল প্রচণ্ড ভিড়। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন রুটের ট্রেনে আসন ছাড়াও ভেতরে দাঁড়িয়ে, পাদানিতে ঝুলে, ইঞ্জিনের সামনে পেছনে আর ছাদে চড়ে বাড়ির পথ ধরেছেন ঘরমুখো মানুষ।

রেল সূত্রে জানা গেছে, ঈদের দুদিন আগে গতকাল বৃহস্পতিবার পাঁচটি বিশেষ ট্রেনসহ মোট ৬৯টি ট্রেন ঢাকা ছেড়ে যায়। যার মধ্যে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ৪২টি ট্রেন ছেড়ে যায়। এগুলোর মধ্যে ৮-১০টি ট্রেন ১ থেকে ৩ ঘণ্টা দেরিতে স্টেশন ছেড়ে যায়। বিশেষ করে পশ্চিম- উত্তরাঞ্চলগামী কয়েকটি ট্রেনের যাত্রায় বিলম্ব হওয়ায় বিষাদ ছড়িয়েছে যাত্রীদের মধ্যে। গরমের মধ্যে শিশুদের ভোগান্তি ছিল বেশি। অনেকে অসুস্থ বোধ করেছেন। দুপুরের দিকে বিমানবন্দর রেলস্টেশনে ট্রেনের ছাদে ওঠার সময় এক যাত্রী ওপর থেকে পড়ে গেলে ট্রেনে কাটা পড়ে তার পা বিচ্ছিন্ন হয় বলে জানা গেছে।

গতকাল চিলাহাটির নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি কমলাপুর ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল সকাল ৮টায়। ট্রেনটি ২ ঘণ্টা দেরিতে ছেড়ে যায়। লালমনিরহাট ঈদ স্পেশাল ট্রেনের ছেড়ে যাওয়ার সময় বেলা সোয়া ৯টায়। কিন্তু বেলা সাড়ে ১২টায় ট্রেনটি প্ল্যাটফর্ম থেকে ছেড়ে যায়।

যাত্রীদের চাপ বেশি থাকায় ট্রেন দেরি করছে বলে জানান কমলাপুর স্টেশনের ব্যবস্থাপক সিতাংশু চক্রবর্ত্তী। তিনি বলেন, ৬৯টির মধ্যে ৮-১০টা ট্রেন ছাড়া বাকিগুলো সময়মতো ছেড়ে গেছে। ধূমকেতু, সুন্দরবন এক্সপ্রেস দুটি দেরি করে স্টেশনে এসেছে। এ জন্য এগুলো ছাড়তেও দেরি হয়েছে। যাত্রীদের চাপে একটি কোচে সমস্যা দিয়েছে, ফলে এটি পরিবর্তন করতে হয়েছে, এ কারণে রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেন দেরি করেছে। তা ছাড়া যাত্রীদের ওঠা-নামায় সময় বেশি লাগায় তার প্রভাবেও ট্রেনের দেরি হচ্ছে বলে জানান তিনি।

সদরঘাটে ঘরমুখো মানুষের ঢল : গতকাল বৃহস্পতিবার দক্ষিণাঞ্চলের ঘরমুখো মানুষের ব্যাপক ঢল নামে দেশের প্রধান নদীবন্দর সদরঘাটে। সন্ধ্যার পর এ ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হয় সংশ্লিষ্টদের। কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই গতকাল অনেক লঞ্চকে ঝুঁকিপূর্ণভাবে ছাদে ও ডেকে যাত্রী বোঝাই করে ঘাট ছাড়তে দেখা গেছে।

সকাল থেকে রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে যাত্রীরা সদরঘাটে আসতে থাকেন। দুপুর নাগাদ অর্ধশতাধিক লঞ্চ ভোলা, বরিশাল, বরগুনা, চাঁদপুর, টরকীসহ দক্ষিণাঞ্চলের ৪২ রুটে যাত্রা করে। যাত্রীতে পরিপূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিআইডব্লিউটিএ, পুলিশ ও আনসার সদস্যরা লঞ্চগুলোকে ঘাট ছাড়তে বাধ্য করে। দুপুরের পর যাত্রীর চাপ ব্যাপকভাবে বাড়তে থাকে। বিশেষ করে পোশাক শ্রমিকদের ভিড়ে সন্ধ্যার দিকে পরিস্থিতি সামলাতে হিমশিম খেতে হয় সবাইকে। এ সময় দফায় দফায় পল্টুনের সঙ্গে টার্মিনাল ভবনের গেট বন্ধ করে ভিড় নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়। তবে এ সুযোগে অনেক লঞ্চকে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করে ঘাট ছাড়তে দেখা যায়।

বিআইডব্লিউটিএর পরিদর্শক (টিআই) মাহফুজ আলম জানান, এখন ঈদে আর আগের মতো ভিড় হয় না। তবে বৃহস্পতিবার শেষ কর্মদিবস থাকায় যাত্রীদের চাপ বেশি। ছুটির পর সবাই গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা করছেন। আগের দিন বুধবার সদরঘাট থেকে ছেড়ে গিয়েছিল ১২২টি লঞ্চ।

ভিড় এড়াতে এবারো বিভিন্ন গন্তব্যের যাত্রীদের জন্য ঘাট ভাগ করে দেয়া হয়েছে। চাঁদপুরের লঞ্চগুলোর জন্য লালকুঠি ঘাট, বরিশাল, ভোলা, বরগুনা ও পিরোজপুরের লঞ্চের জন্য প্রধান টার্মিনাল এবং পটুয়াখালীর লঞ্চগুলোর ওয়াইজঘাট টার্মিনালে পল্টুন নির্ধারণ করা হয়। এ ছাড়া ঈদ উপলক্ষে বিআইডব্লিউটির নিয়মিত ও বিশেষ সার্ভিস চলেছে ওয়াইজঘাট ও মূল টার্মিনাল থেকে।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj