হৃদরোগীর ঈদের খাবার

শুক্রবার, ১৫ জুন ২০১৮

সে দিন ইফতারের পর চেম্বারে আগত এক ভদ্রলোক বললেন, ‘ডাক্তার সাহেব, হৃদরোগ নিয়ে রোজা রেখে চলেছি। কোনো কষ্ট হচ্ছে না, ঈদ বেশি দূরে নয়। আমি কি ঈদের দিন সব খাবার খেতে পারব?’ উত্তরে আমি বললাম, ‘আমরা ভাগ্য গুণে এই মঙ্গলময় মাস পেয়েছি, রোজা যথাযথভাবে পালনের পর ঈদের খুশির দিন অনেক কিছু খাবেন, তবে পরিমিত। অতিরিক্ত কিছুই খাওয়া যাবে না। মনে রাখতে হবে উরংপরঢ়ষরহব রং ষরভব.’

মুসলমানদের অনেক প্রত্যাশার মাস রমজান। এক মাস রোজা রাখা শুধু খাবার নিয়ন্ত্রণ কিংবা ওজন কমানো নয়, দৈহিক শুদ্ধির পাশাপাশি মানসিক অবস্থার পরিবর্তন হয় সংযম সাধনার মাধ্যমে। এক মাস সিয়াম সাধনার মাধ্যমে খাদ্য-আচরণ নিয়ন্ত্রণ, চরিত্র গঠন এবং অসহায়ের সাহায্য করার পাশাপাশি আত্মবিশ্লেষণের সুযোগ হয়।

এক মাস মোটামুটি হিসাবী খাবারের পর ঈদের খাবার অন্য রকম অনুভূতি সৃষ্টি করে। ভুল করে মনে হতে পারে, “এক মাস সংযমের পর আজ সব খাব, সব করব।”

ঈদের দিন প্রায় প্রতিটি পরিবার বিভিন্ন প্রকার খাবার আইটেম তৈরি করে থাকে। হালকা ও ভারী খাবারের পাশাপাশি প্রাকৃতিক উপাদান-শাক-সবজি, কিশমিশ ও বাদাম ইত্যাদির আয়োজন থাকে।

গরুর মাংস, খাসির মাংস, মুরগির মাংস, ইলিশ মাছ ভাজা কিংবা কলিজা ভাজার মতো ভারী খাবার ঈদের দিন বেশি থাকে। কম থাকে হালকা খাবার যেমন- চপ, কাটলেট, সেমাই, জর্দা বা নুডলুস। সকালে নিজ বাসায় অল্প পরিমাণে হালকা খাবার (সেমাই, জর্দা, চা) খেয়ে ঈদগাহে ঈদের নামাজ পড়ে বন্ধু-আত্মীয়-পড়শীর বাসায় যেতে পারেন। হৃদরোগীকে খাবার গ্রহণের সময় তেল, চর্বি-মিষ্টির আধিক্য কম এমন খাবার খেতে হবে। খাবার হবে পরিমিত। কোনো বাসায়ই দুপুর কিংবা রাতের খাবার খাওয়া ঠিক হবে না। সব সময় অল্প অল্প খেতে হবে। নিজের খাদ্য শক্তির চাহিদার কথা মাথায় রাখতে হবে। সারাদিনে ২৫০০-৩০০০ ক্যালরি গ্রহণ করা যাবে। মনে রাখার সহজ হিসাব ৯-৪-৪ অর্থাৎ চর্বি, শর্করা ও আমিষ জাতীয় খাবারের প্রতি গ্রাম থেকে যথাক্রমে ৯, ৪ ও ৪ ক্যালরি খাদ্যশক্তি আসে। চিনি জাতীয় খাবার বেশি খাওয়া যাবে না। আমাদের একটি সাধারণ ধারণা আছে- চিনি কোনো ক্ষতি করে না। এই ভুল ধারণা থেকে বেশি চিনি বা মিষ্টি জাতীয় খাবার খাওয়া যাবে না। শরীরে প্রবেশের পর চিনি লিভারে গিয়ে চর্বি (৪০%) তে পরিবর্তিত হয়ে শরীরে থেকে যাবে। তাই চিনি কম খেতে হবে আপনার ডায়াবেটিস থাকুক বা না থাকুক।

খাদ্যের পরিমাণ :

ঈদের দিনে এক দিনে হঠাৎ বেশি খাবার খাওয়া যাবে না। হজমে সমস্যা হতে পারে। হৃদরোগীর নিজের চাহিদা ও হজম ক্ষমতা হিসাব করে খেতে হবে। একবারে ভূরিভোজন করা যাবে না।

প্রাকৃতিক খাবার-

অল্প পরিমাণে ভারী/হালকা খাবারের সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা প্রাকৃতিক খাবার খেতে হবে। কম চর্বি শোষণ, ভালো হজম ও শরীর ফিট রাখার জন্য সালাদ, বাদাম, আঙ্গুর ও লেটুস পাতা এসব কিছুটা খেতে হবে। পরিমিত লেবুর রস খাওয়া যাবে।

শেষ কথা-

হৃদরোগীর জীবন হতে হবে নিয়ন্ত্রিত। জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে ওষুধ চালিয়ে যেতে হয়। এক মাস সিয়ামের পর ঈদুল ফিতরের দিন দৈহিক চাহিদানুযায়ী পরিমিত খাদ্য গ্রহণ করতে হবে যা সহজ্য পাচ্য ও কম তেল-চিনিযুক্ত। কাঁচা ভাজা/টালা সব রকম আলগা লবণ ও ধূমপান পরিহার করতে হবে। পরিমিত, সুস্বাদু ও সহজ পাচ্য এই হোক হৃদরোগীর ঈদের খাবারের চরিত্র।

ডা. লিয়াকত হোসেন তপন

হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ

সহকারী অধ্যাপক

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, ঢাকা

পরামর্শ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj