ভিটামিনের প্রয়োজনীয়তা বনাম অপব্যবহার

শুক্রবার, ১৫ জুন ২০১৮

ভিটামিন এক ধরনের জৈব পদার্থ যা খুব অল্প পরিমাণে হলেও আমাদের শরীরের বৃদ্ধি এবং পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য একান্ত প্রয়োজন। এগুলো আমাদের শরীরের অভ্যন্তরে তৈরি হয় না বলে দৈনন্দিন খাবারের সাথে বাইরে থেকে গ্রহণ করার প্রয়োজন পরে। বিশ্বের উন্নত এবং উন্নয়নশীল উভয় দেশেই ভিটামিনের অভাবজনিত সমস্যা পরিলক্ষিত হয়। সাধারণত খাদ্যে ভিটামিনের ঘাটতির ফলে ভিটামিনের অভাবজনিত সমস্যা দেখা দেয়। আবার কোনো কোনো রোগব্যাধি বা ওষুধও ভিটামিনের অভাবজনিত সমস্যা সৃষ্টি করে। আজকাল রোগীদের মধ্যে (কখনো বা সুস্থ ব্যক্তির মধ্যেও) অকারণে ভিটামিন ট্যাবলেট গ্রহণ করার প্রবণতা দেখা যায়। কিছু কিছু চিকিৎসকও রোগীদের ভিটামিন থেরাপি দিতে পছন্দ করেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন ভিটামিনের উপকারিতা যেমন রয়েছে, ওভারডোজ বা পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ার মারাত্মক ক্ষতিকর দিকও রয়েছে। ভিটামিন ‘এ’, ভিটামিন ‘বি-৬’ এবং ভিটামিন ‘ডি’ অধিক মাত্রায় গ্রহণ করলে মারাত্মক পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া হতে পারে। আমাদের দেশে প্রচুর পরিমাণে ফলমূল, শাক-সবজি, লতাপাতা, চাল, ডাল ইত্যাদি উৎপন্ন হয়। ট্যাবলেটের পরিবর্তে এসব থেকে অতি সহজেই আমরা প্রয়োজনীয় ভিটামিনগুলো পেতে পারি।

ভিটামিন ‘এ’ (রেটিনল) : আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে ভিটামিন ‘এ’-এর বিপুল ভাণ্ডার রয়েছে। ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ দেশীয় খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে কলিজা, দুধ, ডিম, কালো কচু শাক, সবুজ কচু শাক, মুলা শাক, ডাঁটা শাক, কাঁচামরিচ, মিষ্টিকুমড়া, কাঁঠাল, আনারস, ধনেপাতা, পালং শাক, পাট শাক, লাল শাক, কলমি শাক, শিম, গাঁজর, পেয়ারা, আমড়া, পাকা পেঁপে প্রভৃতি বেশ সহজলভ্য। ভিটামিন ‘এ’ আমাদের শরীরের আবরণী কলাকে সুস্থ রাখে এবং জীবাণু সংক্রমণ প্রতিরোধ করে। শিশুর দৃষ্টিশক্তি বিকাশে ভিটামিন ‘এ’-এর ভূমিকা অপরিহার্য। এর অভাবে শিশুদের রাতকানা রোগ হয়। অন্ধত্বের একটি বড় কারণ হচ্ছে ভিটামিন ‘এ’ এর অভাব। ক্যান্সারের ওপর বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা গেছে , খাদ্যে ভিটামিন ‘এ’ এবং ‘সি’-এর অভাব থাকলে মুখ গহŸর, গলবীল এবং শ্বাসনালীর ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে বেড়ে যায়। অধিক মাত্রায় ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল গ্রহণ করলে মাথা ব্যথা, বমি বমি ভাব, ত্বকের খসখসে ভাব এমনকি ত্বকের উপরিভাগ খসে পরা, যকৃতের ক্ষতি, গর্ভস্থ শিশুর বিকলাঙ্গতার মতো মারাত্মক সমস্যা হতে পারে।

ভিটামিন ‘বি-৬’ (পাইরিডক্সিন) : আমাদের দেশের প্রচলিত অধিকাংশ খাদ্যদ্রব্যে ভিটামিন ‘বি-৬’ পাওয়া যায় বলে এর অভাবজনিত সমস্যা খুব একটা দেখা যায় না। তবে কিছু ওষুধ (আইসোনিয়াজাইড, পেনিসিলামাইন, জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ি) দীর্ঘদিন খেলে এর অভাবজনিত সমস্যা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রার্ড চিৎিসকের পরামর্শমত পাইরিডক্সিন ট্যাবলেট সঠিক মাত্রায় সেবন করা যেতে পারে। অধিক মাত্রায় ভিটামিন ‘বি-৬’ ট্যাবলেট কয়েক মাস ধরে গ্রহণ করলে “সেন্সরি পলিনিউরোপ্যাথি” নামক এক ধরনের স্নায়ুরোগ দেখা দেয়।

ভিটামিন ‘সি’ (এস্করবিক এসিড) : যকৃত, আলু, টমেটো, পেয়ারা, কমলা, আমলকী, বড়ই, লেবু, বাঁধাকপি, মুলাশাক, পালং শাক, ধনেপাতা, করলা, কাঁচামরিচ, সাজনা, ফুলকপি প্রভৃতি খাবারে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘সি’ পাওয়া যায়। তবে অত্যধিক তাপে এ ভিটামিনটি নষ্ট হয়ে যায় বলে কম তাপে রান্না করতে হবে অথবা কাঁচা খেতে হবে। গৃহীত খাদ্যে তাজা শাক-সবজি এবং ফলমূলের ঘাটতি থাকলে পাকস্থলীর ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। যদিও আজ পর্যন্ত কোনো গবেষণায় এটি নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি। তবে জীবজন্তুর ওপর গবেষণা করে জানা গেছে ‘নাইট্রেট্স’ আহার করলে শরীরে “এন নাইট্রোসো কম্পাউন্ড্স” নামক ক্যান্সার উৎপাদক পদার্থ তৈরি হয়। ভিটামিন ‘সি’ বা “এসকরবিক এসিড” এই ক্যান্সার উৎপাদক পদার্থ তৈরিতে বাধা প্রদান করে। এ থেকে ধারণা করা হচ্ছে ভিটামিন ‘সি’ ক্যান্সার প্রতিরোধে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। ভিটামিন ‘সি’ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় (বিশেষ করে সর্দি প্রতিরোধক) এবং রক্তের কোলেস্টেরল কমায় বলেও ধারণা করা হয়। অধিক মাত্রায় ভিটামিন ‘সি’ ট্যাবলেট গ্রহণ করলে পাতলা পায়খানা এবং কিডনিতে ‘অক্সালেট’ পাথর হতে পারে।

ভিটামিন ‘ডি’ (কলিক্যালসিফ্যারল) : মাছ, কড লিভার অয়েল, দুধ, ডিম, যকৃত প্রভৃতি খাবারে ভিটামিন ‘ডি’ পাওয়া যায়। মানবদেহের ত্বক, যকৃত এবং কিডনিতে এই ভিটামিনটি তৈরি হয়। সূর্যের আলো বাচ্চাদের ত্বকে ভিটামিন ‘ডি’ তৈরিতে সহায়তা করে। এর অভাবে বাচ্চাদের ‘রিকেট্স’ এবং বড়দের ‘অস্টিওমেলাসিয়া’ ও ‘মায়োপ্যাথি’ রোগ হয়। মাত্রাতিরিক্ত ভিটামিন ‘ডি’ এবং (অথবা) ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট গ্রহণ করলে ‘হাইপারক্যালসেমিয়া’ (বমির ভাব, বমি, কোষ্ঠকাঠিন্য, ঘুম ঘুম ভাব এমনকি কিডনিতে পাথর) হতে পারে।

ভিটামিন ‘ই’ (টোকোফেরল) : ডিমের কুসুম, ভেজিটেবল অয়েল, বাদাম প্রভৃতি খাবারে ভিটামিন ‘ই’ থাকে। এটি এক ধরনের ‘এন্টিঅক্সিডেন্ট’ যা জীব কোষের অভ্যন্তরে অবস্থিত ডিএনএ -কে ক্যান্সারের মারাত্মক ক্ষতি থেকে রক্ষা করে। এ ছাড়া রক্তনালী স্বাভাবিক (এথেরোজেনেসিস কমায়) রাখতেও এর ভূমিকা রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

আমাদের শরীরের জন্য বিভিন্ন ভিটামিনের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কিন্তু প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভিটামিন ক্ষতির কারণ হতে পারে। আজকাল অনেকের মাঝেই রেজিস্ট্রার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতিরেকে যখন-তখন, প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে ভিটামিন ট্যাবলেট গ্রহণ করার প্রবণতা দেখা যায়। এর ফলে শরীরে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। তাই আমাদের সবার উচিত হবে ভিটামিন ট্যাবলেটের পরিবর্তে তাজা অথবা সঠিক উপায়ে রান্না করা ভিটামিনসমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণ করার অভ্যাস গড়ে তোলা।

ডা. মুহাম্মদ কামরুজ্জামান খান

জনস্বাস্থ্য ও প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ

সহকারী রেজিস্ট্রার, হৃদরোগ বিভাগ

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

পরামর্শ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj