ঈদের লেনদেনে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে অর্থনীতি

শুক্রবার, ১৫ জুন ২০১৮

মরিয়ম সেঁজুতি : ঈদ বলে কথা। বড় উৎসব, বিরাট আয়োজন। এ উৎসবকে ঘিরে জমজমাট কেনাকাটা ও লেনদেন সারা দেশে। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত চাঙ্গা হয়ে উঠেছে অর্থনীতি। ঈদকেন্দ্রিক পোশাক-আশাক ও বিভিন্ন ধরনের উপহারসামগ্রীর বাজার জমে উঠেছে। প্রতিটি মার্কেট ও ফুটপাতে ক্রেতার ভিড়ই বলে দেয় বিকিকিনি কী পরিমাণ বেড়েছে। জমানো টাকা, উৎসব ভাতা, বেতন ও বোনাস সবই ক্রেতারা খরচ করছেন ঈদ উৎসবকে সামনে রেখে। ফলে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের কারণে অর্থনীতিতে বড় ধরনের গতিশীলতা আসছে। এফবিসিসিআইয়ের হিসাবে এবারের ঈদ অর্থনীতিতে যুক্ত হচ্ছে অন্তত দুই লাখ কোটি টাকা।

ব্যাংকিং খাতে লেনদেন বেড়েছে ব্যাপক হারে। ঈদ উপলক্ষে রেকর্ড গতিতে রেমিট্যান্স আসছে। ঈদের কেনাকাটায় এটিএম বুথে প্রতিদিন ২০ কোটি টাকার বেশি উত্তোলন করছেন গ্রাহকরা। মোবাইলে লেনদেন হচ্ছে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি। এদিকে মানুষের চাহিদা পূরণে বাজারে অতিরিক্ত ৩০ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট ছেড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ঈদ বাজারের অর্থনীতি নিয়ে এ পর্যন্ত সূচারুভাবে কোনো গবেষণা হয়নি, তাই সুস্পষ্ট কোনো রেকর্ডও পাওয়া যায়নি। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, মানুষের আয়ের ৬২ শতাংশ ব্যয় করা হয় ভোগের পেছনে। অর্থনীতিবিদ ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলামের মতে, গ্রামের লিংকেজ বেড়েছে। শহরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গ্রাম চলছে। ফলে ঈদ মার্কেট ঘিরে গ্রামের অর্থনীতিও চাঙ্গা হয়েছে।

অবশ্য ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সমীক্ষায় দেখা যায়, ঈদ অর্থনীতির নিম্নমুখী গতি। সংগঠনটির হিসেব মতে, গত কয়েক বছরে ঈদকে কেন্দ্র করে অর্থনীতি যেভাবে বেড়েছে, এবার সেই বৃদ্ধির হার কমেছে। গত বছরে অর্থনীতিতে যেখানে যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত এক লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। সেখানে এবার সর্বোচ্চ ২ লাখ কোটি টাকা হবে।

ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে, ঈদ বাজার ঘিরে ইতোমধ্যে কয়েক হাজার কোটি টাকা লেনদেন ছাড়িয়ে গেছে। তবে প্রত্যাশা অনুযায়ী কতটুকু ব্যবসা হচ্ছে এ নিয়ে রয়েছে ব্যবসায়ীদের ভিন্ন মত। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি এসএ কাদের কিরণ বলেন, এখন দোকানগুলোয় বেচাকেনা অন্য সব সময়ের চেয়ে ভালো। আশানুরূপ বিক্রি করতে পেরেছেন ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি স্বস্তি নিয়ে কেনাকাটা করেছেন ক্রেতারাও।

ঢাকা মহানগর দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, সার্বিকভাবে ঈদের বাজার ভালো। প্রতি বছরই আমরা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে একটু বেশি লেনদেনের আশা করে থাকি। সাধারণ একটি দোকানে দিনে ১০ হাজার টাকার লেনদেন হলে ঈদ উপলক্ষে লেনদেন হবে ৩০ হাজার টাকা। এবার রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও নির্বাচনকে ঘিরে দেশের অর্থনীতি কিছুটা স্থবির হয়ে আছে। এ ছাড়া ঈদ অর্থনীতির একটা বড় অংশই চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। তাই গত বছরের তুলনায় এবার লেনদেন গতি কিছুটা কম। এ প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ঈদ অর্থনীতির প্রবাহ ছড়িয়ে পড়ছে শহর থেকে গ্রামে। এটা খুবই ইতিবাচক দিক। ঈদ সামনে রেখে ক্রেতাদের খরচ বাড়ছে। আর ক্রেতাদের খরচ বাড়লে তার প্রভাব অর্থনীতির ওপর এসে পড়বে, যা ঈদ মার্কেট ঘিরে হচ্ছে।

ঈদের অর্থনীতি চাঙ্গা করেছে নগদ অর্থের প্রবাহ। এটিএম বুথ, ব্যাংকের শাখার মাধ্যমে প্রচুর নগদ টাকার লেনদেন হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও ঈদকেন্দ্রিক ৩০ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট ছেড়ে টাকার পরিমাণ বাড়িয়েছে। ঈদকেন্দ্রিক কেনাকাটায় এটিএম বুথ থেকে টাকা উত্তোলন দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইস অব বাংলাদেশে (এনপিএসবি) বর্তমানে ৪২টি ব্যাংকের গ্রাহকরা অন্যের বুথ থেকে এটিএম কার্ড দিয়ে টাকা উত্তোলন করতে পারছেন। প্রতিদিন গ্রাহকরা গড়ে ২০ কোটি টাকা বেশি উত্তোলন করছেন, যা গত মে মাসের গড় লেনদেনের তুলনায় দ্বিগুণ। ঈদ উপলক্ষে বেড়েছে মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেন। প্রতিদিন গড়ে লেনদেন হচ্ছে ১ হাজার ৪০ কোটি টাকার বেশি। দেশের আপনজনদের ঈদের আনন্দ বাড়িয়ে দিতে অনেক বেশি রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন প্রবাসীরা।

গত মে মাসে ১৪৮ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। জানা গেছে, সরকারের হিসাবে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন বাবদ প্রতি মাসে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা দেয়া হচ্ছে। ওই হিসাবে এক-তৃতীয়াংশের সামান্য বেশি বোনাস বাবদ প্রায় ৭০০ কোটি টাকা ইতোমধ্যে দেয়া হয়েছে। ৩৫ লাখ গার্মেন্ট শ্রমিকের বেতন হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে কিছু ভালো প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের ঈদ বোনাস দিয়ে দিয়েছে। জানা গেছে, পোশাক শিল্পের শ্রমিকরা বেতন-বোনাস পেয়ে কেনাকাটায় মেতে উঠেছেন। ঈদে কমপক্ষে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বোনাস যাচ্ছে শ্রমিকদের হাতে।

এই জনপদ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj