শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় ব্যস্ত রাজধানীবাসী

শুক্রবার, ১৫ জুন ২০১৮

রুমানা জামান : দরোজায় কড়া নাড়ছে খুশির ঈদ। তাই শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় জমজমাট ঈদবাজার। রাজধানীর মার্কেটগুলোর অবস্থা যেন ‘তিল ঠাঁই আর নাহি রে’! অভিজাত শপিংমল থেকে ফুটপাত- সর্বত্রই মানুষের ভিড়। হাতে হাতে শপিং ব্যাগ। পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের চাহিদা মেটাতে পছন্দের পোশাকের খোঁজে মেঘ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে তারা ছুটে বেড়াচ্ছেন এক মার্কেট থেকে আরেক মার্কেটে। রাজধানীসহ পুরো দেশই মেতেছে কেনাকাটার মহাউৎসবে। সকাল থেকে শুরু করে শেষ রাত পর্যন্ত চলছে কেনাবেচা।

বিক্রেতারা বলছেন, অন্য বছরের তুলনায় এবার বেচাকেনা বেশ ভালো। রাজনৈতিক অস্থিরতা নেই। সেইসঙ্গে নগরীজুড়ে রয়েছে কড়া নিরাপত্তা বলয়। চুরি, ডাকাতি আর অজ্ঞান পার্টির দৌরাত্ম্যও নেই বললেই চলে। ফলে ক্রেতারা নিশ্চিন্তে কেনাকাটা করতে পারছেন। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি এসএ কাদের কিরন বলেন, এখন দোকানগুলোয় বেচাকেনা অন্য সব সময়ের চেয়ে ভালো। আশানুরূপ বিক্রি করতে পারছেন ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি স্বস্তি নিয়ে কেনাকাটা করছেন ক্রেতারা।

এ প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ঈদ অর্থনীতির প্রবাহ ছড়িয়ে পড়ছে শহর থেকে গ্রামে। এটা খুবই ইতিবাচক দিক। ঈদ সামনে রেখে ক্রেতাদের খরচ বাড়ছে। আর ক্রেতাদের খরচ বাড়লে তার প্রভাব অর্থনীতির ওপর এসে পড়বে, যা ঈদ মার্কেট ঘিরে হচ্ছে।

সিঁড়ি-গলি-ফুটপাত একাকার গাউছিয়ায় : রাজধানীর গাউছিয়া, নিউ মার্কেট, নীলক্ষেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন মার্কেটে জমে উঠেছে ঈদের কেনাকাটা। মোহনীয় সাজে সেজেছে এখানকার প্রতিটি বিপণিবিতান। বিক্রিও ভালো। রাস্তা, ফুটপাত, মার্কেটের সিঁড়ি, গলি সব জায়গাতেই আছে ক্রেতার আনন্দমুখর পদচারণা। মার্কেটের সিঁড়িতেও চুড়ি, ফিতা নিয়ে বসে গেছেন ভ্রাম্যমাণ দোকানিরা। গাউছিয়ায় শাড়ি কিনতে এসেছেন রামপুরা ওয়াপদা রোডের মিসেস আফরোজা বেগম। তিনি জানান, প্রতিবারই ঈদের শাড়ি কিনতে তিনি গাউছিয়া আসেন। এ ছাড়া গাউছিয়া-চাঁদনী চকে মেয়েদের জন্য যা কিছু দরকার, তার সবই পাওয়া যায়। এ ছাড়া দরদাম করে কেনার সুযোগ আছে। মেয়েদের পোশাক বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ থেকে শুরু করে ৫০ হাজার টাকার মধ্যে। এ ছাড়াও রয়েছে ভারতীয় পোশাকের ছড়াছড়ি। এখানকার দুবাই মার্কেটের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় ছেলেদের জন্য রয়েছে পাইকারি শার্ট ও প্যান্টের সমারোহ।

লোকারণ্য বসুন্ধরা শপিংমল : ভেতরে-বাইরে লোকারণ্য। প্রবেশ পথে ক্রেতাদের দীর্ঘ সারি। কেউ ভিতরে প্রবেশ করছেন, কেউ হাতভর্তি ব্যাগ নিয়ে হাসিমুখে বের হয়ে আসছেন। ছেলে-বুড়ো সবারই সব ধরনের কেনাকাটাই এখানে সম্ভব। পুরো মার্কেটজুড়ে এখন উৎসবের আমেজ। সারাবছর তো আছেই, ঈদ উপলক্ষে যেন আরো জমে ওঠেছে বসুন্ধরা শপিংমল। প্রতিটি লেভেলের দোকানেই কেনাকাটার ব্যস্ততা। এ মার্কেটেও রয়েছে পোশাক-গয়নাগাটি, জুতা, কসমেটিক্স, ক্রোকারিজ, ইলেকট্রনিক্স কিংবা ফুড আইটেমের দেশি-বিদেশি ব্র্যান্ড। জানতে চাইলে বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্স ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি এফএম হান্নান আজাদ জানান, ভালো বেচাকেনা হচ্ছে। সব শ্রেণির ক্রেতারা আসছেন। তিনি জানান, এই মার্কেটের ব্যবসায়ীদের দোকান ভেদে ২০ লাখ টাকা থেকে ৫০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ রয়েছে। দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকায় এবার ভালো ব্যবসা হচ্ছে। তার মতে, আশপাশের এলাকা যানজটমুক্ত হলে চাঁদরাত পর্যন্ত বেচা-বিক্রি আরো বাড়বে।

তিল ধারনের ঠাঁই নেই মৌচাক, বেইলি রোড, কর্ণফুলী সিটিতে : থ্রি-পিস ও শাড়ির জন্য বিখ্যাত রাজধানীর মৌচাক। অসহনীয় যানজটের মধ্যেও মহিলা ও তরুণীরা ভিড় জমাচ্ছেন এখানে। মুগদা থেকে কেনাকাটা করতে আসা আসমা আক্তার জানালেন, সব রকমের জিনিস আছে, দাম করে কেনা যায়, এ জন্য এখানে আসি। নারীদের জন্য এখানে সালোয়ার-কামিজের দোকান যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে শিশুদের পোশাকের দোকান। আছে জুয়েলারি, প্রসাধনী আর ঘরের বিছানা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন ব্যবহারের সব জিনিস। আছে শাড়ি, পাঞ্জাবি, শার্ট ও প্যান্টের দোকান। ঈদ উপলক্ষে এখন সকাল থেকে মধ্য রাত কেনাবেচা চলছে। তবে দোকানিরা জানালেন, এ বছর আগের বছরের চেয়ে কেনাকাটা কিছুটা কম।

অন্যদিকে বেইলি রোডে চলছে দর কষাকষি মুক্ত কেনাকাটা। এই এলাকার পোশাকের দোকানগুলোতে একদামে কেনাবেচা হওয়ায় ক্রেতারাও সাচ্ছন্দ্যে পছন্দের পণ্য কিনতে পারছেন। এ ছাড়া এখানকার ক্রেতাদের বড় অংশ তুলনামূলক ধনী হওয়ায় বেচাকেনাও বেশি হচ্ছে। অন্যদিকে, ক্রেতাদের আনাগোনায় জমজমাট বেচাকেনা চলছে কর্ণফুলী গার্ডেন সিটিতে।

যমুনা ফিউচার পার্কে উচ্চ ও মধ্যবিত্তদের উপচেপড়া ভিড় : রাজধানীর বারিধারায় অবস্থিত বিশ্বের তৃতীয় এবং এশিয়ার সর্ববৃহৎ শপিংমল যমুনা ফিউচার পার্ক এখন ক্রেতাদের পদচারণায় মুখরিত। ক্রেতা আকর্ষণে চোখ ধাঁধানো পণ্য, ব্যাপক আলোকসজ্জা এবং মার্কেটের বাইরে বেলুন ফেস্টুন দিয়ে সাজানো হয়েছে অভিজাত শপিং মলটি। পণ্য কিনলে লটারির মাধ্যমে দেয়া হচ্ছে আকর্ষণীয় পুরস্কার। ফলে বাড়ছে বিক্রি।

জানতে চাইলে ইনটেনসের বিক্রয় কর্মকর্তা বশিররুদ্দিন জানান, এই মার্কেটে কেনাকাটার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট হচ্ছে বিশ্বের নামি-দামি ব্র্যান্ডই সব এক ছাদের নিচে এক সঙ্গে হাতের নাগালে পাওয়া যাচ্ছে। এখানে ক্রেতা আকর্ষণের আরেকটি উৎকৃষ্ট গুণ হচ্ছে সর্বোচ্চ ভালোমানের পণ্যটিও যে কোনো অভিজাত শপিংমলের পণ্যমূল্যের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম। তাই সারা বছর তো বটেই, রমজানের শুরু থেকেই এই মার্কেটে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত কিংবা ফ্যাশন সচেতন সব শ্রেণির ক্রেতার সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ভিড় লেগেই থাকছে।

নি¤œ আয়ের ভরসা ফুটপাত : শুধু সামান্য আয়ের মানুষরাই নন, মধ্য বিত্ত থেকে উচ্চ বিত্তরাও ছুটছেন ফুটপাতে কেনাকাটা করতে। যার কারণে এখন ফুটপাতের দোকানগুলোতেও উপচেপড়া ভিড়। কী নেই এখানে- শাড়ি, জামা, জুতা, শার্ট, প্যান্ট থেকে শুরু করে গৃহস্থালির সব জিনিস পাওয়া যাচ্ছে ক্রয় সীমার মধ্যেই। গুলিস্তানের ফুটপাতের বিক্রেতা জামাত আলী জানান, শূন্য থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের পোশাক আছে তার দোকানে। অন্যবারের চেয়ে এবার আগাম কেনাবেচা শুরু হয়েছে। এই বছর চাঁদাবাজির ঝামেলা নেই বলে খুব শান্তিতে ব্যবসা করা যাচ্ছে। বেচাকেনাও খুব ভালো।

এই জনপদ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj