বিশ্বকাপ উন্মাদনা : শামসুজ্জামান শামস

শুক্রবার, ১৫ জুন ২০১৮

বিশ্বকাপ, দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থের পর্দা ওঠার বাকি আর মাত্র কয়েক দিন। দুরু দুরু বুকে ফুটবলপ্রেমীরা ক্ষণ গণনা শুরু করে দিয়েছেন নিশ্চয়ই। কারণ প্রতি চার বছর পরই আসে বিশ্বকাপ ফুটবল। বিশ্বকাপ মানে নানামুখী সমীকরণ। একজনের সঙ্গে আরেকজনকে জড়িয়ে মুখোমুখি লড়াইয়ের ছক কষা। বিশ্বকাপ মানে ময়দানের লড়াইকে বাইরেও টেনে নিয়ে যাওয়া। বিশ্বকাপ মানে শুধু যেন এক প্রতিযোগিতা নয়, প্রথম হয়ে বিশ্বের নজরে পড়ার সবচেয়ে উপযোগী মঞ্চ। তাই বিশ্বকাপ এলেই লড়াইয়ের মঞ্চে কোন দল, কোন খেলোয়াড় বাজিমাত করবে, তা নিয়ে যেমন জল্পনা-কল্পনা থাকে, তেমনি দল ও খেলোয়াড়দের সাজিয়ে-গুছিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে কোন পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান এগিয়ে থাকল, সেটার দিকেও বিপুল আগ্রহ থাকে সবার। ১৪ জুন রাতে সৌদি আরবের বিপক্ষে স্বাগতিক রাশিয়ার ম্যাচ দিয়ে যাত্রা শুরু হবে ফুটবল মহাযজ্ঞের। বিশ্বকাপের মূল খেলা শুরুর আগেই অবশ্য এক দফা কাঁপুনি শুরু হয়ে গেছে, যাতে শামিল হয়েছে ক্রিকেটের দেশ বাংলাদেশও। ক্রিকেটের মতো ফুটবলও যে এ দেশের মানুষের উন্মাদনার আরেক নাম তা নতুন করে প্রমাণ করার কোনো অবকাশ নেই। এ দেশের মানুষের কাছে বিশ্বকাপ মানে হয়তো আর্জেন্টিনা নয়তো ব্রাজিল। এই দুদেশের পতাকা উড়িয়ে ইতোমধ্যে তা প্রমাণও হয়েছে। শুধু এবার নয়, বিশ্বকাপের প্রতি আসরেই বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের সমর্থকরা প্রিয় দলের পতাকা ওড়ানোর প্রতিযোগিতায় নামেন। ইদানীং জার্মানি, স্পেনসহ অন্যান্য দেশের কিছু পতাকাও উড়তে দেখা যায়।

যোজন যোজন দূরে রাশিয়ায় শুরু হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপ ফুটবল। আর এত দূরের বাংলাদেশে বসেই চলছে বিশ্বকাপ উদযাপনের জোর প্রস্তুতি। সহসাই সর্বত্র টাঙানো শুরু হবে প্রিয় দলের পতাকা। জার্সি কেনার ধুম চলবে। তরুণ-তরুণী তো বটেই শিশু কিংবা মধ্যবয়সীরাও বাদ থাকতে নারাজ বিশ্বকাপ উন্মাদনার এই রঙিন ছোঁয়া থেকে। ঘরে-বাইরে চলবে কোন দল সেরা এই নিয়ে তর্কযুদ্ধ। কি ক্যাম্পাস, বন্ধুদের আড্ডা বা চায়ের দোকান সবখানেই চলবে বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে চর্চা। আর ফেবারিট দলগুলোর জার্সি, টি-শার্ট, গেঞ্জিতে ফুটপাত থেকে শুরু করে নামিদামি ফ্যাশন আউটলেটগুলো ছেয়ে যাবে। বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রাম, শহর ও নগরে যুবক-যুবতীদের গায়ে উঠবে হলুদ, লাল আর আকাশি রংয়ের জার্সি। বাংলাদেশ বিশ্বকাপে না খেললেও এখানকার মানুষের মধ্যে ফুটবল নিয়ে আগ্রহের কমতি নেই। আর একে কেন্দ্র করে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বিশ্বকাপকে সামনে রেখে কর্মব্যস্ততা বেড়ে যায় ছোট ছোট অনেক প্রতিষ্ঠানের। দেশব্যাপী চাহিদা মেটাতে ছোট ছোট গার্মেন্টসগুলোতে বিভিন্ন দেশের জার্সি ও পতাকা বানানোর ধুম পড়ে যায়। কোটি কোটি টাকার ব্যবসা চলে জার্সি ও পতাকা তৈরিকে কেন্দ্র করে।

এ গ্রহে স্বাধীন দেশের সংখ্যা ২০৬টি। জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত দেশের সংখ্যা ১৯৩টি। অথচ ফিফার আওতায় রয়েছে ২১১টি দেশ! সামান্য ২২ সেন্টিমিটার ব্যাসার্ধের বলটির সৌরভ তাহলে বহু আগে থেকেই ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীব্যাপী? বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ টেলিভিশনের পর্দায় সরাসরি উপভোগ করবেন ফুটবল বিশ্বকাপ। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এদিকে খেলা দেখার জন্য বাংলাদেশের ফুটবল পাগল মানুষের মধ্যে টেলিভিশন কেনার আগ্রহ বেড়ে যায়। যাদের বাসায় টিভি নেই কিংবা টিভি পুরনো হয়ে গেছে- তারাও ছুটবে টেলিভিশনের দোকানে। ফুটবল উৎসবে টেলিভিশনের বাড়তি চাহিদা সামলাতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিতে হয় টিভি উৎপাদনকারী ও বিক্রেতাদের। উৎপাদন বাড়ানো হয় কয়েক গুণ। স্বাভাবিকের চেয়ে ব্যাপক মজুদ বাড়ানো হয়। সেই সঙ্গে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে দাম কমানোসহ নানা অফারও দেয়া হয়।

দুনিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় এই ক্রীড়া আসর প্রথমবারের মতো রাশিয়ার মাটিতে শুরু হবে ১৪ জুন, ফাইনাল ১৫ জুলাই। উদ্বোধনী এবং ফাইনাল ম্যাচের ভেন্যু মস্কোর লুজনিয়াকি স্টেডিয়াম। ১৯৩০ সালে শুরু হওয়া বিশ্বকাপ ফুটবলের এটি হবে ২১তম আসর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে দুটি বিশ্বকাপ (১৯৪২ ও ১৯৪৬) অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। রাশিয়া বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে ক্ষুদ্র দেশ আইসল্যান্ড ও পানামার। ফুটবল মহাযজ্ঞে এবারই প্রথম খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে দল দুটো। অবিশ্বাস্য শোনালেও সত্যি যে, ইউরোপের দেশ আইসল্যান্ডের জনসংখ্যা মাত্র ৩ লাখ ৩৫ হাজার! জনসংখ্যার হিসাবে বিশ্বকাপের সবচেয়ে ছোট দল আইসল্যান্ড। এর আগে এই রেকর্ড ছিল ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগোর। ২০০৬ বিশ্বকাপে খেলার সময় দেশটির লোকসংখ্যা ছিল প্রায় ১৩ লাখ। ওদিকে কনকাকাফ অঞ্চল থেকে উঠে আসা মধ্য আমেরিকার দেশ পানামার আয়তন প্রায় ৭৫ হাজার বর্গ কিলোমিটার এবং জনসংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ।

বাংলাদেশের অনেক মানুষ অপেক্ষায় থাকে বিশ্বকাপের জন্য। শুধু খেলা দেখা নয়, নিজেদের রুটি-রুজির জন্য, এই যে বিশ্বকাপ উপলক্ষে দেশময় হাজার হাজার পতাকা বাসা-বাড়ির ছাদে উড়ছে, এ পতাকাগুলোর কারিগরেরাও তো বিশ্বকাপ-যজ্ঞের অংশ। তারাও তো বিশ্বকাপ উন্মাদনার একটা অংশ বিলিয়ে দিচ্ছে ফুটবলের মূলধারা থেকে বহু ক্রোশ দূরে থাকা একটি দেশের মানুষের মধ্যে। ফুটবলের তীর্থভূমি লাতিন আমেরিকা ও ইউরোপ গত ২০ আসরের বিশ্বকাপ শিরোপা নিজেরা ভাগ করে নিয়েছে। ইউরোপ এগিয়ে তারা জিতেছে ১১টি বিশ্বকাপ। এর মধ্যে জার্মানি এবং এবার বিশ্বকাপের টিকেট না পাওয়া ইতালি চার বার করে বিশ্বকাপ জিতেছে।

ইংল্যান্ড, ফ্রান্স এবং স্পেন জিতেছে একবার করে। লাতিন আমেরিকার ব্রাজিল সর্বাধিক পাঁচবার, উরুগুয়ে এবং আর্জেন্টিনা দুইবার করে বিশ্বকাপ জিতেছে। এবার রাশিয়ার ১২টি স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের যে ম্যাচগুলো হবে তা খেলা হবে টেলস্টার-১৮ নামক বল দিয়ে। রাশিয়া বিশ^কাপের বল তৈরি করেছে অ্যাডিডাস। ১৯৭০ সাল থেকে বিশ^কাপ ফুটবলের জন্য বল তৈরি করছে প্রতিষ্ঠানটি। ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ^কাপে ব্যবহার করা বলটি দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে এবারের বিশ^কাপের জন্য টেলস্টার-১৮ নামক বলটি তৈরি করেছে অ্যাডিডাস।

লড়াইটা মাঠের ২২ জনের। তবে মাঠের বাইরে বিশ্বকাপ দখলের এই মহারণের প্রস্তুতি থেকে শুরু করে পরিকল্পনা সবই করেন দলের প্রশিক্ষকরা। এমনকি মাঠের নব্বই মিনিটের লড়াইয়েও থাকে তাদের মস্তিষ্ক উৎসরিত নানা পরিকল্পনা ও দ্রুত কৌশল পাল্টানোর খেলা। জার্মানির জোয়াকিম লো, ব্রাজিলের তিতে, পর্তুগালের ফার্নান্দো সান্তোস, আর্জেন্টিনার জর্জ সাম্পাওলি, বেলজিয়ামের রবার্তো মার্টিনেজ, ফ্রান্সের দিদিয়ের দেশ্যামরা এবারো মাঠের বাইরে থেকে কলকাঠি নাড়বেন।

ব্রাজিলের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নযাত্রায় মূল ভূমিকাটা পালন করতে হবে নেইমারকে। নিজেকে কিংবদন্তিদের কাতারে নিয়ে যেতে আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপ জিততে হবে মেসিকে। রাশিয়া বিশ্বকাপে স্পেন, জার্মানি এবং ফ্রান্সকে ফেবারিটের তালিকা থেকে বাদ দেয়ার অবকাশ নেই।

এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত সব বিশ্বকাপের ফাইনালে কেবল ইউরোপীয় এবং দক্ষিণ আমেরিকান দলগুলো অংশ নিয়েছে। দুটি মহাদেশই বিশটি শিরোপা জেতেছে। এই দুই মহাদেশের বাইরে কেবল দুটি দলই সেমিফাইনালে উঠতে পেরেছে, যুক্তরাষ্ট্র (১৯৩০ সালে) এবং দক্ষিণ কোরিয়া (২০০২ সালে)। সাম্প্রতিককালে আফ্রিকার দলগুলো সফলতা পেলেও তারা কখনো সেমিফাইনালে পৌঁছতে পারেনি। ওশেনিয়া অঞ্চলের দলগুলো কেবল তিনটি বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে এবং মাত্র একটিতে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠেছে।

ইউরোপীয় দলগুলো তাদের জেতা ১১টি শিরোপার ১০টি ইউরোপে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে জিতেছে। গতবার ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে শিরোপা জেতে জার্মানি। অন্যদিকে ইউরোপীয় দেশগুলোর বাইরে ইউরোপে শিরোপা জিতেছে এমন একমাত্র দেশ হচ্ছে ব্রাজিল, যারা ১৯৫৮ সালে ইউরোপে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে শিরোপা জিতেছে। কেবল দুটি দল পরপর দুবার শিরোপা জিতেছে- ব্রাজিল ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে এবং ইতালি ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে।

বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতি চার বছর পরপর হওয়া একটি মহাযজ্ঞ। এটি কেবল একটি সাধারণ ক্রীড়া আসরই নয়, এর সঙ্গে জড়িত হয়ে আছে অনেক কিছু। ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান। বিশ্বের ২১১টি দেশের ৭০০ কোটি মানুষ প্রাণভরে উপভোগ করবে বিশ্বকাপের খেলা। বিশ্বকাপের সময় সারা বিশ্বের প্রায় ২০০ কোটি মানুষ এর সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িত থাকে। অর্থাৎ বিশ্বের চার শতাংশ মানুষ বিশ্বকাপের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। জড়িত তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রম, জীবন ও জীবিকা।

বিশ্বকাপ ফুটবল সন্দেহাতীতভাবেই বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী প্রতিযোগিতা। কেবল বাণিজ্যিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দিক দিয়ে নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক দিকে দিয়েও এ বিশ্বকাপের রয়েছে অন্য রকম মাহাত্ম্য। রাজনীতিবিদরা যা করতে পারেন না, বিশ্বকাপ তাই করে দেখায়। বাংলাদেশ এবার রাশিয়া বিশ্বকাপ বলয় থেকে অনেক দূরের একটি দেশ। আমরা বিশ্বকাপে খেলছি না। ভবিষ্যতে কোনোদিন খেলব। সেই দিন হয়তো বেশিদূরে নয়।

আরও সংবাদ...'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj