নিজের রাষ্ট্র, নিজের ভাষা : অনুপম সেন

বৃহস্পতিবার, ১৪ জুন ২০১৮

প্রতিটি জাতির জীবনে কয়েকটি দিন অসাধারণ উজ্জ্বলতায় ভাস্বর। কারণ, এই দিনগুলো জাতির জীবনের আদর্শকে ধরে রেখে প্রেরণা হিসেবে কাজ করে; যেমন, ১৪ জুলাই ফরাসি জাতির জীবনে। দু’দশক আগে সারা বিশ্বজুড়ে ফরাসীরা ১৪ জুলাই, বাস্তিল দিবসের, দুশ বছর পালন করেছিল। ফরাসিরা মনে করে, এইদিন তারা তাদের হাজার বছরের পরাধীনতার বন্ধন ছিন্ন করে নিজেদের জীবনে, প্রত্যেক নাগরিকের জীবনে রাজনৈতিক স্বাধীনতার উন্মেষ ঘটিয়েছিল। তাই এই দিনটি তাদের জীবনের, ইতিহাস-ঐতিহ্যের অবিনাশী মহিমায় ভাস্বর। বাঙালি জাতির জীবনেও ১৬ ডিসেম্বর তা-ই; অমর দিন।

বাঙালি ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বরের আগে কখনো প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতা পায়নি, স্বাধীন ছিল না। বাঙালির যে জাতীয়তাবোধ, তা-ও পরিপূর্ণতা পেয়েছে ১৯৭১-এ। পাল, সেন ও সুলতানী আমলে স্বাধীন রাজা ও স্বাধীন সুলতানরা ছিলেন, কিন্তু বাঙালি স্বাধীন ছিল, এ কথা বলা যাবে না। ব্যক্তির সব মৌলিক অধিকারের কখনো স্বীকৃতি ছিল না এসব রাষ্ট্রে বা রাজ্যে। পাল, সেন এবং সুলতানী আমলে, এমনকি নবাবী আমলেও বাংলার সীমারেখা কখনো বাংলাকে অতিক্রম করে গেছে, কখনো ক্ষুদ্র পরিসরে সীমাবদ্ধ থেকেছে। এসব অঞ্চলের রাজা-বাদশাহরা যথাযথভাবে বাংলার চর্চাও করতেন না। তাদের রাজ দরবারের ভাষা বাংলা ছিল না; ছিল সংস্কৃত, পালি, ফারসি ইত্যাদি। ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বরের আগে বাঙালির জন্য বাংলা কখনো একক রাষ্ট্রভাষা ছিল না। ১৯৫২’র একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষার জন্য বাঙালি প্রাণ দিয়েছিল। তার ফলে পরবর্তীকালে বাংলা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হয়, একক রাষ্ট্রভাষা হয়নি। রাষ্ট্রের সব মানুষের মননের একমাত্র বাহন হয়নি।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাঙালি জাতি তার জাতিসত্তাকে পরম গৌরব দান করে যে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করল, তা এই জাতির হাজার বছরের ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক প্রাপ্তি। কিন্তু এই অর্জনের পেছনে রয়েছে ত্রিশ লাখ লোকের প্রাণদান ও ততোধিক লোকের অশ্রæ। তাই এই দিন যে তাৎপর্যে মণ্ডিত তা যুগ যুগ ধরে বাঙালিকে ভাবাবে, কাঁদাবে, উদ্দীপ্ত করবে। এই দিন বাঙালিকে, প্রতি প্রজন্মের বাঙালিকে মনে করিয়ে দেবে তার স্বাধীনতা যুদ্ধের অঙ্গীকার ছিল একটি শোষণমুক্ত অসা¤প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। কিন্তু বাঙালির এই রাজনৈতিক চৈতন্যের উন্মেষ এবং তা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে স্বাধীনতা অর্জন কোনো আকস্মিক ঘটনা বা স্বয়ম্ভূ ব্যাপার নয়, এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস।

১৭৫৭ সালের ২৩ জুলাই পলাশীর যুদ্ধে সিরাজদ্দৌলা হেরে গেলে বাংলাদেশ ব্রিটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পদানত হয়। এই দিনটিকে পরবর্তীকালে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময়, বাঙালির স্বাধীনতা হারানোর দিন হিসেবেই গণ্য করা হয়। এটা অনস্বীকার্য, পলাশীর যুদ্ধে সিরাজদ্দৌলা হেরে যাবার ফলে বাঙালির জীবনে, তথা ভারতীয়দের জীবনে যে দীর্ঘ দু’শ বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, যে অমানিশা নেমে এসেছিল, তার ফলে ঋদ্ধ বাঙালি দরিদ্র বাঙালিতে পরিণত হয়। শাহাজাহানের রাজত্বের শেষভাগে ফরাসি পর্যটক বার্নিয়ার দুবার বাংলা ভ্রমণ করে মুগ্ধ হয়েছিলেন বাঙালির ঐশ্বর্যে। তিনি তৎকালীন ফরাসি প্রধানমন্ত্রী কোলবার্টকে লিখেছিলেন, বাংলাই পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশ।

কিন্তু এই দেশটি এবং তার অধিবাসী-বাঙালি দীর্ঘ দু’শ তের বছরের পরাধীনতার ফলে (ব্রিটিশ শাসনের ১৯০ বছর ও ২৩ বছরের পাকিস্তানি শাসনে) আজ পৃথিবীর অতি দরিদ্র দেশগুলোর অন্যতম। কিন্তু একদিন তা ছিল না। এই উপমহাদেশের কিংবদন্তিতুল্য ঐশ্বর্যই তৎকালীন ইউরোপের বহু ঐশ্বর্যলিপ্সু বণিক স¤প্রদায়কে ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ সমুদ্রের বুকে কাঠের জাহাজ ভাসিয়ে ভারতে আসতে প্রলুব্ধ করেছিল। ব্রিটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ফরাসি ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ডাচ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ইত্যাদি ‘ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’গুলো এখানে এসেছিল এখানকার শিল্প-সম্পদে লুব্ধ হয়ে, বিশেষত বস্ত্র শিল্পের আকর্ষণে; কারণ, বাংলার মসলিনের খ্যাতি তখন বিশ্বজুড়ে। একটি ইউরোপীয় বণিক কোম্পানি হঠাৎ করেই ভাগ্যের আনুকূল্যে বাংলার কর্তৃত্ব, শাসনভার পেয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ এই ঘটনাকে উল্লেখ করেই লিখেছেন, ‘বণিকের মানদণ্ড পোহালে শর্বরী/দেখা দিল রাজদণ্ডরূপে’।

কিন্তু এই যে বণিকের মানদণ্ড বা দাঁড়িপাল্লা রাজদণ্ড হলো, এর পেছনে কি কোনো কারণ ছিল না? রবার্ট ক্লাইভ নিজেই উল্লেখ করেছেন, তিনি যখন তাঁর সামান্য কিছু সৈন্য নিয়ে মুর্শিদাবাদে ঢুকছিলেন, জনগণের মধ্যে তখন কোনো বিরোধিতা দেখেননি। বস্তুত এ সময় আশপাশের গ্রামের লোকজন নিশ্চিন্তে চাষাবাদ করে যাচ্ছিল। জনগণের কাছে এ ঘটনা কোনো বিরাট বিপর্যয়রূপে দেখা দেয়নি। তারা ভেবেছে, এক শাসক গেছে অন্য শাসক আসবে, তাতে তাদের কি? যেহেতু তখনো এ দেশে জাতীয়তাবাদের উন্মেষ হয়নি, তা-ই তারা রাষ্ট্রের উত্থান-পতনের সঙ্গে নিজের ভাগ্যের উত্থান-পতনকে এক করে দেখতে পারেনি। জাতীয়তাবোধ হলো তা-ই যখন প্রতিটি ব্যক্তি জাতি বা রাষ্ট্রের সঙ্গে নিজেকে অবিনা (ওহংবঢ়ধৎধনষব) ভাবে, অবিচ্ছেদ্যভাবে; রাষ্ট্রের জয়-পরাজয়, সুখ-দুঃখের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করে ফেলে। সিরাজদ্দৌলা বা তাঁর মাতামহ আলিবর্দির সময় বাঙালির এই জাতীয়তাবোধের বিকাশ ঘটেনি, ঘটার কথাও নয়, কারণ আলিবর্দি বা সিরাজদ্দৌলা কেউই বাঙালি ছিলেন না। তাঁদের রাষ্ট্র পরিচালনার ভাষাও বাঙলা ছিল না; তাঁদের অনেকের মুখের ভাষা ছিল তুর্কি, সরকার পরিচালনার ভাষা ছিল ফারসি। পূর্ববর্তী পাল বা সেন রাজাদের সময় রাষ্ট্র পরিচালনার ভাষা ছিল, আগেই উল্লেখ করেছি, সংস্কৃত বা পালি, সাধারণের বুলি বা প্রাকৃতজনের ভাষা প্রাকৃত-বাংলা রাজভাষা ছিল না, রাষ্ট্র পরিচালনার বা সরকার পরিচালনার ভাষায় কখনো তা রূপান্তরিত হয়নি।

দুই.

নিজের ভাষা নিয়ে অবশ্য বাঙালির গর্ব আজন্মকালের। নবম দশম শতকের চর্যাপদের কবি ভূষক লিখেছেন; বাঙালি ভৈলি। স›দ্বীপের সপ্তদশ শতকের কবি আব্দুল হাকিম, যারা এ দেশে জন্মেও এ দেশের ভাষার চর্চা করে না তাদের ভর্ৎসনা করে লিখেছেন; ‘যেজন বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী সেজন কাহার জন্ম নির্ণয় ন’জানি’। কবিরা যতই বলুন না কেন, ভাষার প্রতি বাঙালির এই গভীর মমত্ববোধ বাঙালি জাতীয়তাবোধে পরিণত হয়নি। জাতীয়তাবাদ বিকাশের অন্যতম বাহন, অর্থাৎ বাংলা গদ্যের তখনো যথার্থ বিকাশই ঘটেনি। বাঙালি তখনো নিজেকে যথার্থ-অর্থে তার পরিবারের গণ্ডি, গোত্রের গণ্ডি, গোষ্ঠীর গণ্ডি বা গ্রামের গণ্ডির বাইরে স¤প্রসারিত করতে পারেনি। কারণ তখনও অধিকাংশ বাঙালির অর্থনৈতিক জীবন প্রায়-স্বয়ংসম্পূর্ণ পল্লী বা গ্রামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সে তখনো কেবলমাত্র অতি আবশ্যকীয় কয়েকটি পদার্থ যেমন লোহা, লবণ ইত্যাদির জন্য গ্রামাতীত জগতের ওপর নির্ভর করত।

ইউরোপেও জাতীয়তাবোধের বিকাশ দ্বাদশ-ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতকের আগে ঘটেনি। পুঁজিবাদের বিকাশের ফলেই ইউরোপে জাতীয়তাবাদের বিকাশ হয়। নর্মান বিজয়ের ফলে (ফ্রান্সের নর্মান্ডি থেকে এসে উইলিয়াম ১০৬৬ সালে ইংল্যান্ড জয় করেছিলেন) ১০৬৬ থেকে ১৩৬২ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ডের রাজভাষা ছিল ফরাসি। ১৩৬২ সালে ইংরেজি ইংল্যান্ডের সরকারি ভাষার মর্যাদা পায়। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে যে রকম প্রায় দীর্ঘকাল প্রথমে সংস্কৃত ও পরে ফারসি বিদ্বজ্জনের ভাষা ছিল, তেমনি ইউরোপের প্রায় সর্বত্রই বিদ্বজ্জনের ভাষা ছিল লাতিন। ইংল্যান্ডের একজন পণ্ডিত অনায়াসে স্পেনের এক বিদ্বজ্জনের সঙ্গে লাতিন ভাষায় ভাবের আদান-প্রদান করতে পারতেন; যেমন, এই উপমহাদেশে এক সময় এমন আদান-প্রদান সম্ভব ছিল প্রথমে সংস্কৃত ও পরে ফারসির মাধ্যমে।

চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপের অধিকাংশ রাষ্ট্রই ছিল সামন্ততাত্রিক রাষ্ট্র যেখানে ব্যক্তির, সামন্তের ও ছোট ছোট রাজন্যের আনুগত্য ছিল তাঁদের উচ্চতর ধাপের সামন্ত-ভূস্বামী ও রাজন্যবর্গের প্রতি। এ কারণেই আমরা দেখি, ইংল্যান্ডের রাজা ফ্রান্সের নর্মান্ডি থেকে আসায় এবং নর্মান্ডিতে তাঁর জমিদারি থাকায় তিনি ফ্রান্সের রাজাকে তাঁর সামন্ত-আনুগত্য প্রদান করছেন, অর্থাৎ ফ্রান্সের রাজা সামন্ততান্ত্রিক প্রথা অনুযায়ী তাঁর সামন্ত প্রভু। অষ্টাদশ শতকেও সামন্ততান্ত্রিক সম্পর্কের কারণে ইংল্যান্ডের রাজা হচ্ছেন এমন এক জার্মান যুবরাজ যিনি ইংরেজি জানতেনই না।

প্রাক পুঁজিবাদী ইয়োরোপে, তৎকালীন ভারতবর্ষের মতোই ব্যক্তিস্বার্থ ও জাতীয়স্বার্থ অভিন্ন ছিল না। তখনো তা ভারতবর্ষের মতো লৌকিক স্বার্থের গণ্ডিকে অতিক্রম করতে পারেনি। ইউরোপে পুুঁজিবাদ বিকাশে শহরগুলোর বণিক শ্রেণির স্বায়ত্তশাসন অর্জন অর্থাৎ ঈরঃু বা ঞড়হি করপোরেশনের স্বশাসন অর্জন সামন্ত-ব্যবস্থার অবসান ঘটানোয় যে ভূমিকা রেখেছিল, উপমহাদেশে তা কখনো হয়নি। এখানে শহরগুলো ছিল, এক অর্থে, গ্রামেরই স¤প্রসারণ; এগুলো ছিল মুখ্যত তীর্থস্থান অথবা প্রশাসনিক কেন্দ্র, গ্রামের বাইরে যে রাষ্ট্রশক্তি ছিল তার সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্ক ছিল সুদূরবর্তী, ক্ষীণ। রাজস্ব ও অন্যান্য কর প্রদানেই তা সীমাবদ্ধ ছিল। গ্রামীণ জীবন আবর্তিত হতো পরিবার বা পঞ্চায়েতকে ঘিরে। রাষ্ট্র নিয়ে গ্রামীণ, নাগরিক বা ব্যক্তি কদাচ মাথা ঘামাতো।

ত্রয়োদশ, চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতকে ইউরোপে ঠবৎহধপঁষধৎ বা লৌকিক ভাষাসমূহ ধীরে ধীরে জনগণের ভাষা থেকে রাষ্ট্রভাষায় রূপ নিতে শুরু করে, পুঁজিবাদের বিকাশের ফলে। উপমহাদেশেও এই সময়েই বিভিন্ন লৌকিক ভাষার, যেমন বাংলা, উড়িয়া, অহমিয়া, গুজরাটি, হিন্দি প্রভৃতির বিকাশ সম্ভব হয়েছিল বিভিন্ন প্রাকৃতের যেমন মাগধী-প্রাকৃত, সৌরশেনী-প্রাকৃত ইত্যাদির বিবর্তনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু এখানে প্রাক্-পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা বিদ্যমান থাকায় গণতন্ত্র যেমন বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়নি বা তার প্রয়োজনও অনুভূত হয়নি, তেমনি লৌকিক ভাষাও রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পায়নি।

তিন.

এই উপমহাদেশে জাতীয়তাবাদের বিকাশ এবং তার যে মাধ্যম, সেই সমৃদ্ধ লৌকিক গদ্যের বিকাশের জন্য ইংরেজি ঔপনিবেশিক শাসনের অভিঘাতের প্রয়োজন হয়েছিল। ইংরেজি ভাষার সংস্পর্শে এসেই উপমহাদেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠী উপলব্ধি করেছিলেন, কীভাবে এই দেশের সম্পদ ঔপনিবেশিক শক্তির কেন্দ্রে স্থানান্তরিত হচ্ছে, কীভাবে দেশের জনগণ ধীরে ধীরে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে; বাংলা, গুজরাট, মহারাষ্ট্র ইত্যাদি অঞ্চলের সমৃদ্ধ বস্ত্রশিল্প কিভাবে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত অসম বাণিজ্যের মাধ্যমে। ম্যানচেস্টার ও ল্যান্কাসায়ারের যন্ত্রচালিত শিল্প-কারখানাগুলো বাংলার মসলিনের সঙ্গে পেরে না ওঠায় ব্রিটিশ পার্লামেন্টে শিল্প-বুর্জোয়ার প্রতিনিধিরা মসলিনের উপর তিনশ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল যখন এডাম স্মিথ, রিকার্ডো প্রমুখ অর্থনীতিবিদরা মুক্ত বাণিজ্যের গুণকীর্তনে ইউরোপের বিদ্বৎমণ্ডলীকে উচ্চকিত করে রেখেছিলেন। সমসাময়িক জার্মান অর্থনীতিবিদ ফ্রেডরিক লিস্ট একে ‘চরম শঠতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। এই উপমহাদেশের, ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক শোষণের স্বরূপ প্রথমবারের মতো উদঘাটন করেছিলেন দাদাভাই নওরোজী তাঁর ‘পভার্টি এন্ড আনব্রিটিশ রুল ইন ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে। রমেশ চন্দ্র দত্তের ‘দি ইকোনমিক হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া’ গ্রন্থকেই যথার্থ অর্থে ‘অর্থনৈতিক শোষণ ও নির্ভরশীলতা চক্র’ তত্ত্বের আদিগ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। ব্রিটিশ শাসন কেবলমাত্র এই উপমহাদেশের জনগোষ্ঠীকে যে ‘ক্রমবিকাশমান চরম দারিদ্র্য চক্রে’ নিক্ষেপ করেছিল, তা-ই নয়, শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিকাশমান জাতীয়তাবোধকেও নানা দোলাচলে নিক্ষেপ করেছিল। ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের বিকাশকে বিপথে চালিত করেছিল সম্প্রদায় ভিত্তিক বিভেদ চেতনাকে আশ্রয় করে, কাজে লাগিয়ে।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে এই সা¤প্রদায়িক চেতনাকে ভিত্তি করেই পাকিস্তানের শাসকচক্র যখন নিজেদের পশ্চিম পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসকচক্রে রূপান্তরিত করল, তখন তারা বাংলারই মতো ইন্দো-ইউরোপীয় আর্য ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত উর্দুকে মুসলিম ধর্মের ভাষা হিসেবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করে বাঙালির ভাষার অধিকারকে কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করল। এই চেষ্টা যে কেবলমাত্র সাংস্কৃতিক শোষণই ছিল না, এর মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক শোষণের বীজও যে উপ্ত ছিল, এটা বুঝতে বিদগ্ধ, বিশেষত বিকাশমান মুসলিম মধ্যবিত্ত বাঙালির দেরি হয়নি।

ভাষার অধিকার যে মানুষের মুখ্যতম মৌলিক অধিকারগুলোর অন্যতম, বাঙালি রক্ত দিয়ে বিশ্বে তা প্রথম প্রতিষ্ঠা করে। ভাষা আন্দোলনে যে বিষয়টি মূর্ত হয়েছিল, তা হলো পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাভাষী জনগণের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের স্বরূপ। এই শোষণের অর্থনৈতিক স্বরূপটি ক্রমশই বাঙালির কাছে পরিস্ফুট হতে থাকে, বিশেষত নব-উন্মেষিত, শিক্ষিত বাঙালির কাছে। বাঙালি তাই মুক্তির আকাক্সক্ষায় অধীর হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে যে ৬ দফা দাবিনামা ঘোষণা করেছিলেন, তা ছিল বাংলা ভাষাভাষী বাঙালির অর্থনৈতিক মুক্তির দলিল। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকচক্র বাঙালির এই মুক্তির সনদ মানতে পারেনি, কারণ এর মধ্যে দুটি অঞ্চলের বা দেশের স্বাধীন রাজনৈতিক সত্তার অবয়ব পরিস্ফুট হয়েছিল।

চার.

ষোলই ডিসেম্বর অগণিত প্রাণ ও অসংখ্য মা-বোনের সম্ভ্রম ও অশ্রæর বিনিময়ে যে বাংলাদেশের জন্ম হলো তাই বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর হাজার বছরের ইতিহাসের প্রথম রাষ্ট্র, যেখানে তার ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবোধ পূর্ণতা পেল। ১৯৭২-এর সংবিধান গ্রহণ করার প্রাক্কালে তাই গণপরিষদে বঙ্গবন্ধু জাতীয়তাবাদকে এভাবে ব্যাখা করে বলেছিলেন ‘অনেক দেশ আছে একই ভাষা, একই ধর্ম, একই সবকিছু, কিন্তু সেখানে বিভিন্ন জাতি গড়ে উঠেছে, তারা একটি জাতিতে পরিণত হতে পারেনি। জাতীয়তাবাদ নির্ভর করে অনুভূতির ওপর। আজ বাঙালি জাতি রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছে; এই সংগ্রাম পরিচালিত হয়েছিল যার ওপর ভিত্তি করে, এই স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে যার ওপর ভিত্তি করে সেই অনুভূতি আছে বলেই আজকে আমি বাঙালি, আমার বাঙালি জাতীয়তাবাদ’।

যেহেতু ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে মরণপণ সংগ্রাম করেই এই রাষ্ট্র অর্জিত হয়েছে, তাই ’৭২-এর সংবিধানে পরিষ্কার ভাষায় এই রাষ্ট্রের অন্যতম আদর্শ বা করণীয় হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘শোষণমুক্ত সমাজ’ প্রতিষ্ঠা ও ‘মানবসত্তার মর্যাদা’ নিশ্চিত করা।

আরও সংবাদ...'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj