জীবনের পাতায় পাতায় যা লেখা : বিভুরঞ্জন সরকার

বৃহস্পতিবার, ১৪ জুন ২০১৮

সেই বালকবেলাতেই আমার মাথায় কীভাবে যে রাজনীতির পোকা ঢুকেছিল তা নিয়ে এখন ভাবি, কিন্তু জবাব পাই না। আমার বেশির ভাগ বন্ধু যেখন পড়াশোনা, খেলাধালা, নানা ধরনের দুষ্টুমিতে মেতে থাকতো তখন আমাকে পেয়ে বসেছিল ‘দেশোদ্ধারের’ পাগলামি। আমার পরিবারে কোনো রাজনীতির বালাই ছিল না। বাবা-কাকাদের কোনোদিন রাজনীতি বিষয়ে কথা বলতে শুনিনি। তারা কেউ উচ্চ শিক্ষিত ছিলেন না। তারা ব্যবসা করতেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে মোটামুটি নির্ঝঞ্ঝাট জীবন কাটাতেন। তবে তারা ছিলেন কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন মানুষ। নীতি-নৈতিকতা মেনে চলতেন। ভালো-খারাপের পার্থক্য বুঝতেন। ভালোর পক্ষে থাকতেন। খারাপটা এড়িয়ে চলতেন। কারো ক্ষতির চিন্তা করতেন না। পরনিন্দা, পরচর্চা পরিহার করতেন।

আমি কি কাউকে দেখে বা কারো প্রভাবে রাজনীতিতে জড়িয়েছিলাম? পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খানের সময়কালে আমার বেড়ে ওঠা। তখন রাজনীতি অবাধ ছিল না। চায়ের দোকান বা অন্য কোনো আড্ডায় রাজনীতি নিয়ে তেমন আলোচনা ষাটের দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত শুনেছি বলে মনে পড়ে না। চায়ের দোকানে বরং লেখা দেখেছি : এখানে রাজনৈতিক আলোচনা নিষিদ্ধ।

১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধের পর সম্ভবত পরিস্থিতি কিছুটা বদলাতে শুরু করে। যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা শুনতাম। পাকিস্তানি সৈন্যদের কাছে ভারতীয় সৈন্যরা শক্তি-সাহসে যে পেরে ওঠার মতো নয় এমন কথা কেউ কেউ বলতেন। পাকিস্তানি সৈন্যরা যে কয়েকদিনের মধ্যে দিল্লি দখল করে নেবে, যুদ্ধে যে ভারতের পরাজয় অবধারিত- এমন বিশ্বাস অনেকের মধ্যেই ছিল। প্রতিদিন পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে কত ভারতীয় বিমান ভূপাতিত হচ্ছে, কতটা ট্যাংক বিধ্বস্ত হচ্ছে, কত ভারতীয় সৈন্য নিহত হচ্ছে, আহত হচ্ছে, আটক হচ্ছে তার হিসাবও শোনা যেতো মুখে মুখে। পাকিস্তান যেহেতু আমাদের দেশ তাই পাকিস্তানের সাফল্যে আমার ভালোই লাগতো। তবে ওই যুদ্ধের সময় আমার পরিচিত কয়েকজন হিন্দুকে গ্রেপ্তার করা হয়। বলা হয়, তারা নাকি পাকিস্তানের শত্রু। তারা পাকিস্তানে বসবাস করলেও ভেতরে ভেতরে নাকি ভারতের পক্ষে। তারা জেলের বাইরে থাকলে সেটা নাকি পাকিস্তানের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে। পাকিস্তানকে ‘নিরাপদ’ রাখার জন্য ‘শত্রু’ হিন্দুদের জেলে ঢোকানোর এই বিষয়টি আমার মনে দাগ কেটেছিল।

হিন্দু এবং মুসলমান যে আলাদা দুটি জাতি এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রটি মুসলমানদের জন্য আর হিন্দুদের জন্য ভারত –এই বিষয়টি ওই যুদ্ধের সময়ই আমার কাছে স্পষ্ট হয়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের নাম একটি- পাকিস্তান। অথচ ভারতের নাম ভারত ছাড়াও ইন্ডিয়া, হিন্দুস্থান কেন সে প্রশ্নও তখন তুলতে শুনেছি।

মুসলমানরা ভালো, হিন্দুরা খারাপ। মুসলমানরা বেশি শক্তিমান, কারণ তারা গরু খায়। হিন্দুরা দুর্বল, কারণ তারা বেশি নিরামিষভোজী- এমন আলোচনাও শুনতে হতো। যাহোক, পাকিস্তান ভারত দখল করে নেবে, ভারতও পাকিস্তান হয়ে যাবে- এই স্বপ্নে যখন আমরা বিভোর, তখন হঠাৎ একদিন শুনতে পেলাম সোভিয়েত ইউনিয়নের তাসখন্দ নামক স্থানে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী যুদ্ধ বিরতির জন্য আলোচনায় বসেছেন। নিশ্চিত পরাজয় জেনেই নাকি ভারত এই আলোচনায় বসেছে। মধ্যস্থতার জন্য ভারতই নাকি রাশিয়া বা সোভিয়েত ইউনিয়নকে রাজি করিয়েছে।

যুদ্ধ বন্ধ হলে তো ভারতের লাভ। পাকিস্তান আর দিল্লি দখল করতে পারবে না। আমার মনটা তাই একটু খারাপ হয়ে গিয়েছিল। রাশিয়া কেন পাকিস্তানের এত বড় ক্ষতিটা করলো, সে জন্য রাশিয়ার ওপর আমি মনে মনে রাগই করেছিলাম। যাহোক, তাসখন্দে পাকিস্তান-ভারত শান্তিচুক্তি হলো। যুদ্ধ বন্ধ হলো। কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষর শেষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী দেশে ফেরার আগে তাসখন্দেই মৃত্যুবরণ করেন। তখন কেউ কেউ এমনও বলেছেন, পাকিস্তানের দাপুটে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানকে দেখে ভয়েই নাকি ভারতের ছোটখাটো প্রধানমন্ত্রী শাস্ত্রীর হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল!

দুই.

পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ নয়, তাসখন্দ আমাকে কৌতূহলী করে তুলেছিল। আগ্রহী হয়ে উঠেছিলাম সোভিয়েত ইউনিয়ন বা রাশিয়া সম্পর্কে। ঠিক কার কাছে শুনেছিলাম, আজ আর মনে নেই, তবে সোভিয়েত ইউনিয়ন যে দুনিয়ার প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র, ওই দেশে যে মানুষের ওপর মানুষের শোষণ-বঞ্চনার অবসান ঘটেছে, ওই দেশটি যে যুদ্ধের বিরুদ্ধে, শান্তির পক্ষে, সা¤্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদের আতঙ্ক, কারণ সা¤্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদ হলো যুদ্ধের পক্ষে, দেশে দেশে অশান্তি জিইয়ে রেখে অস্ত্র বিক্রির বাজার তৈরি করে- এই সব জেনে আমি তখনই সোভিয়েত রাষ্ট্র এবং সমাজতন্ত্রের অনুরাগী হয়েছিলাম। কাছাকাছি সময়ে কৃষকদের একটি মিছিলে প্রথম ¯েøাগান শুনেছিলাম : কেউ খাবে তো কেউ খাবে না- তা হবে হবে না।

এই ¯েøাগান আমাকে প্রবলভাবে আলোড়িত করেছিল। তাই তো। এই দেশ, এই পৃথিবী তো সব মানুষের। তাহলে এখানে কেউ খেয়ে এবং কেউ না খেয়ে থাকবে কেন? কারো বাড়িঘর থাকবে, আশ্রয় থাকবে, কারো থাকবে না কেন? এসব জিজ্ঞাসা নিজের মনেই জাগতো। উত্তর খুঁজতে গিয়েই বাজে পড়া অর্থাৎ পাঠ্য বইয়ের বাইরের বই পড়তে আগ্রহী হয়ে উঠি। মানুষের কথা, মানুষের সংগ্রামের কথা, দুনিয়াটাকে বদলালোর কথা নিয়ে লেখা বইপত্র খুঁজতে থাকি। সম্ভবত নানা ধরনের জিজ্ঞাসাই আমাকে রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট করেছিল।

তখন দুজন মানুষের নাম শুনে এবং তাদের সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে আমি উদ্বুদ্ধ হয়েছিলাম। তার একজন গুরুদাস তালুকদার, অন্যজন মোহাম্মাদ ফরহাদ। গুরুদাস তালুকদার ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের নেতা- সংগঠক। জেল-জুলুম সহ্য করেছেন। জমিদারের ছেলে। কলকাতা মেডিকেল কলেজের ছাত্র ছিলেন। কিন্তু এক সময় সব কিছু ছেড়েছুড়ে নেমে পড়েন মানবমুক্তির সংগ্রামে। সমাজতন্ত্র, গরিব মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, সবাই খেতে পারবে, পরতে পারবে, লেখাপড়ার অধিকার পাবে, মাথা গোঁজার ঠাঁই পাবে, রোগে চিকিৎসা পাবে, কাজ পাবে, ন্যায্য মজুরি পাবে- এরকম রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য গুরুদাস তালুকদার ব্রতী ছিলেন। তার পথ অনুসরণের প্রবল আগ্রহ আমার মধ্যে কাজ করতে থাকে।

মোহাম্মদ ফরহাদ, তাকে প্রথম দিকে তার ডাকনাম বাদল হিসেবেই জানতাম। তার বাড়ি আমাদের এলাকায়। কিন্তু তাকে আমরা চোখে দেখিনি। তার সম্পর্কে তার পরিচিত জনদের কাছ থেকে শুনে শুনে তার মতো হওয়ার ইচ্ছা তৈরি হয়। স্কুল শিক্ষক পিতার পুত্র মোহাম্মদ ফরহাদ, আমাদের সে সময়ের বাদল ভাই, স্কুল ছাত্র থাকতেই কীভাবে নিজেকে রাজনীতির মানুষ হিসেবে গড়ে তুলছিলেন, জেল-জুলুমের ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে নিজেকে প্রস্তুত করছিলেন এবং ষাটের দশকের গোড়াতেই পাকিস্তানের সামরিক ডিকটেটর আইয়ুব খানের আতঙ্ক হয়ে উঠেছিলেন- সেসব গল্প শুনে একদিকে যেমন রোমাঞ্চিত হতাম, অন্যদিকে তেমনি নিজেকে তার মতো করার একটা বাসনাও মনের মধ্যে জাগতো। ছোট বেলায় সবারই একজন ‘হিরো’ থাকে, যাকে এখন ‘রোলমডেল’ বলা হয়, তাকে অনুসরণ করে তার মতো হওয়ার ইচ্ছা বা বাসনা অনেকের মধ্যেই থাকে। আমার বালকবেলার দুই হিরো- গুরুদাস তালুকদার এবং মোহাম্মদ ফরহাদ।

গুরুদাস তালুকদার বিয়েশাদি করেননি। প্রচলিত অর্থে যাকে ঘর-সংসার বলে সেটা তার ছিল না। তখন শুনেছিলাম, গুরুদাস তালুকদারের মতো আরো অনেক কমিউনিস্ট বিপ্লবী আছেন যারা সংসারত্যাগী, বিয়ে করেননি। আমিও মনে মনে ঠিক করেছিলাম, যেহেতু আমি তার মতো বিপ্লবী হতে চাই, তাই আমারও বিয়ে করা চলবে না। ক্ষুদ্র সংসারের মায়ায় বাধা না পড়ে সমাজ বিপ্লবের বৃহত্তর সংসারে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। আমি আমার মাকে বলেছিলাম, তোমার ১২ ছেলেমেয়ে। অনেকেরই তো জন্ম দেয়ার সময় অথবা তারপর সন্তানের মৃত্যু হয়। তোমার তা হয়নি। তুমি ভাগ্যবান। তোমার বারো ছেলেমেয়েই বেঁচে আছে। এর মধ্য থেকে একজনকে তুমি দেশের জন্য উৎসর্গ করো।

আমার কথায় মা দুঃখ পেতেন। কোনো মা-ই তার সন্তানকে ‘উৎসর্গ’ করতে চান না। আমার মাও আমাকে উৎসর্গ করতে চাননি। তবে আমি যে ‘রাজনীতি’র পাঁকে জড়িয়ে পড়লাম, তাতে কখনো বাধাও দেননি। আমার বাবাও আমাকে আমার সিদ্ধান্ত বদলাতে চেষ্টা করেননি। শুধু বলতেন, রাজনীতিটা আমাদের মতো সাধারণ নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য নয়। যাদের খাওয়া-পরার সমস্যা নেই তারা করবে রাজনীতি। বাবা আমাকে সরাসরি কিছু না বলে, শুনিয়ে শুনিয়ে কখনো কখনো বলতেন, গরিবের ঘোড়া রোগ থাকতে নেই।

আমি কখনো বাবাকে রাজনীতি বোঝানোর চেষ্টা করিনি। শুধু বলতাম, সব মানুষ একরকম হবে না। আমি স্কুল ছাত্র থাকতেই এটা বুঝেছিলাম যে, আসলে সব মানুষ এক রকম হবে না, হয় না। সবাই ডাক্তার হবে না। সবাই ইঞ্জিনিয়ার হবে না। সবাই শিক্ষক হবে না। সবাই শিল্পী হবে না। কবি হবে না। সবাই চাকরিজীবী হবে না। সবাই রবীন্দ্রনাথ হবে না, নজরুল হবে না। আবার রাজনীতিও সবাই করবে না।

তবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় এটা উপলব্ধি করেছিলাম যে, সবাই রাজনীতি না করলেও রাজনীতির অভিঘাত কিন্তু সবার জীবনকেই প্রভাবিত করে। মুক্তিযুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন, যারা দুঃখ-দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন, উদ্বাস্তু জীবন বেছে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন, তারা কয়জন সরাসরি রাজনৈতিক দলের সদস্য ছিলেন? আমরা অনেকেই নিজেদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে চাই। কিন্তু বিশেষ বিশেষ সময়ে রাজনীতির প্রবাহ আমাদের জীবনকে উলটপালট করে দেয়, তছনছ করে দেয়!

সবার সব ইচ্ছা যেমন পূরণ হবে না, তেমনি কারো কারো ইচ্ছা পূরণের পথে কেউ বাধা হয়েও দাঁড়াতে পারবে না। দাঁড়ালেও সফল হবে না।

তিন.

গুরুদাস তালুকদারের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা ১৯৭০ সালের নির্বাচনের সময়। ঠাকুরগাঁয়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির এক নির্বাচনী জনসভায়। ওই জনসভায় বক্তৃতা করেছিলেন ন্যাপের সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ, অগ্নিকন্যা বলে খ্যাত মতিয়া চৌধুরী এবং গুরুদাস তালুকদার। সে সময় আওয়ামী লীগের নেতারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ক্রমাগত কারা নির্যাতন ভোগের কথা উল্লেখ করে বলতেন, বঙ্গবন্ধুর জীবন থেকে পাকিস্তানিরা ১২টি বসন্ত কেড়ে নিয়েছে অর্থাৎ ১২ বছর কেটেছে তার জেলের ভেতরে। মতিয়া চৌধুরী আওয়ামী লীগের ওই বক্তব্যের জবাবে বলেন, আপনাদের নেতার জীবন থেকে ১২ বসন্ত কেড়ে নেয়া হয়েছে আর আমাদের দলে এমন নেতা আছেন, যাদের জীবনে বসন্তই আসেনি। এই কথা বলে তিনি মঞ্চে উপবিষ্ট গুরুদাস তালুকদারকে দেখিয়ে দিয়েছিলন। সত্যি, গুরুদাস তালুকদারকে জীবনের প্রায় অর্ধেককাল অর্থাৎ ৩৫/৩৬ বছর কাটাতে হয়েছে জেলে। তাছাড়া আত্মগোপনেও থাকতে হয়েছে। শুধু গুরুদাস তালুকদার নয়, বিভিন্ন জেলায় এমন অনেক নাম আছে। গুরুদাস তালুকদার বিয়ে করেননি। চাকরি-বাকরি করেননি। নিজের যে সম্পত্তি ছিল তার খোঁজখবরও রাখেননি। তিনি ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সার্বক্ষণিক কর্মী। পার্টির দেয়া নির্দিষ্ট ভাতায় তাকে চলতে হতো। এমন মানুষ দেশের সর্বত্রই কমবেশি ছিলেন।

বৃহত্তর দিনাজপুর জেলায় যে ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তার সংগঠক ও নেতা হিসেবে প্রায় একসঙ্গে উচ্চারিত নাম হলো গুরুদাস তালুকদার এবং হাজী মোহাম্মদ দানেশ। গুরুদাস তালুকদার সর্বস্ব ত্যাগী ছিলেন। এমনকি কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তারি পড়াও ছেড়ে এসেছিলেন। আর হাজী দানেশ আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করে তারপর কৃষক আন্দোলনে ঝুঁকেছিলেন। তিনি বিয়ে করেছিলেন। স্ত্রী সন্তান নিয়ে তার রাজনীতি করতে কোনো বাধা হলে তিনি শেষ পর্যন্ত রাজনীতিতে সক্রিয় থাকতে পারতেন না।

গুরুদাস তালুকদারের ত্যাগের প্রশংসা আমরা করতাম। তাকে আদর্শ বলে মনে করতাম। তার মতো হওয়ার চেষ্টা করতাম। কিন্তু আজ কি অবস্থা? তার নিজের জেলা দিনাজপুরে কয়জন মানুষ তাকে চেনেন? এমএ পাস একজনকে আমি তার নাম বলেছিলাম। তিনি চিনতে পারলেন না। আমতা আমতা করলেন। আবার দেখুন, হাজী দানেশর নাম কিন্তু অনেকেই জানেন। তার নামে দিনাজপুরে একটি বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে, অন্তত সে কারণেও তার নাম এখনো ব্যাপকভাবে উচ্চারিত হয়।

গুরুদাস তালুকদারের ত্যাগ-তিতীক্ষা-অবদান কি হাজী দানেশের চেয়ে কোনো অংশে কম? তার দেশপ্রেমে কি ঘাটতি ছিল? তিনি যতদিন বেঁচে ছিলেন এক রাজনৈতিক বিশ্বাসে অবিচল ছিলেন। তিনি দল বদল করেননি। আদর্শচ্যুত হননি। হাজী দানেশ কিন্তু দলবদল করেছেন। এদিক-ওদিক করেছেন। গুরুদাস তালুকদার এবং হাজী দানেশের মূল্যায়নে এই যে দুই রকম অবস্থা এর কারণ কি? এ নিয়ে আমাদের কারো মনে কি কখনো কোনো প্রশ্ন দেখা দেয়?

চার.

ত্যাগের বিষয়টি নিশ্চয়ই তুলনীয় নয়। অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের মধ্যে যারা বিয়েশাদি করেছেন এবং যারা করেননি তাদের কারো ত্যাগের পরিমাণ কম নয়। বিয়ে করা না-করার সাথে কম বিপ্লবী বেশি বিপ্লবী হওয়ার তেমন কোনো সম্পর্ক আছে বলে মনে হয় না। ভারতীয় উপমহাদেশে যারা আধ্যাত্ম সাধনায় মনোযোগ দেন, যারা সাধু-সন্ন্যাসী তারা সংসার ত্যাগী হয়ে থাকেন। সংসারের মোহ-মায়াকে নিমগ্নচিত্তে ঈশ্বরকে ডাকার পথে অন্তরায় বলে মনে করা হয়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সূচনালগ্নে যারা সশস্ত্র পন্থা গ্রহণ করেছিলেন, তারা বুঝেছিলেন তারা কি ঝুঁকিপূর্ণ পথে পা দিয়েছেন। জীবন এবং মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করেই তারা দেশমুক্তির কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তারা সংসারী হয়ে বোঝা বাড়াতে যাননি। তাদের অধিকাংশই বিয়ে করেননি। আবার নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর মতো সশস্ত্র যোদ্ধা তো বিয়ে করেছেন। ভারত বর্ষে যারা সশস্ত্র পথে ব্রিটিশ তাড়ানোর জন্য যুগান্তর বা অনুশীলন দলে যোগ দিয়েছিলেন তারাই এক সময় ওই পথকে ভুল মনে করে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে একাত্ম হয়েছেন। ততদিনে তারা বছরের পর জেল খেটেছেন, আন্দামানে নির্বাসন জীবন কাটিয়েছেন। বিয়ে করে সংসারী হওয়ার মতো সময় ও সুযোগ তারা পাননি। কারো বিয়ের বয়স অতিক্রান্ত হয়েছে। কেউ আবার উপযুক্ত পাত্রী খুঁজে পাননি। অভিভাকরাও এ রকম ‘বিপজ্জনক’ পাত্রের কাছে নিজের মেয়ে বা নিকটাত্মীয়কে তুলে দিতে সম্মত হননি। কাজেই আমার ধারণা, অগ্নিযুগের বিপ্লবীরা সিদ্ধান্ত নিয়ে বিয়ে করেননি, ব্যাপারটা সে রকম নয়। পরিবেশ-পরিস্থিতি-সুযোগ কোনোটাই অনুক‚ল ছিল না বলে অনেকে বিয়ে করতে পারেননি। অনেকের ক্ষেত্রে আবার বিয়ে করা সম্ভব হয়েছে। তবে পাকিস্তান আমলে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ থাকায় এবং সরকার কমিউনিস্টদের পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক মনে করায় তাদের হয় টানা কারাগারে থাকতে হয়েছে, নতুবা আত্মগোপনে বা পলাতক জীবন কাটাতে হয়েছে। ওই রকম একটি শ্বাসরুদ্ধ দুঃসহ পরিবেশে বিয়ে করে স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব ছিল না।

যে সব কমিউনিস্ট নেতা বিয়ে করেছিলেন তাদের খুবই কষ্টকর বিচ্ছিন্ন জীবন কাটাতে হয়েছে। আমাদের এই ভূখণ্ডের কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব কমরেড মণি সিংহ। তিনি বিয়ে করেছিলেন। তার স্ত্রী অনিমা সিংহও কমিউনিস্ট ছিলেন। তাছাড়া মণি সিংহের সঙ্গে অনিমা সিংহের ছিল দ্বিতীয় বিয়ে। মণি সিংহ তাকে বিয়ে করতে সম্মত হওয়ায় এবং অনিমা সিংহও সব ঝুঁকিঝামেলার কথা জেনেই বিয়েতে রাজি হয়েছিলেন। তবে ষাটের দশকে পুত্র দিবালোক সিংহ টুটুলকে নিয়ে অনিমা সিংহকে কম হ্যাপা পোহাতে হয়নি। কয়েক বছর ছেলেকে নিয়ে ভারতে গিয়েও থাকতে হয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু জীবিত থাকার সময় পর্যন্ত তারা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পেরেছেন। তারপর আবার শুরু হয়েছিল জেল, আত্মগোপনের রাজনীতি। জিয়ার আমলে কমিউনিস্ট পার্টি খালকাটা সমর্থন করলেও জিয়া কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ করে প্রবীণ নেতা মণি সিংহসহ অনেককে জেলে পুড়েছিলেন। এখনকার কমিউনিস্টরা অবশ্য তা সত্ত্বেও জিয়ার তৈরি বিএনপিকেই দেশের জন্য আওয়ামী লীগের তুলনায় কম ক্ষতিকর মনে করে।

কমিউনিস্ট আন্দোলনের আরেক প্রবাদপুরুষ খোকা রায় বিয়ে করেছিলেন যুঁইফুল রায়কে। যুঁইফুল রায়ও গোপন পার্টির নেতৃস্থানীয় কর্মী ছিলেন। কিন্তু বিয়ে হলেও স্বাভাবিক সংসার জীবন কি তারা পালন করতে পেরেছিলেন? মনে হয় না। পরিস্থিতি এতটাই প্রতিক‚লে ছিল যে এক পর্যায়ে যুঁইফুল রায় কলকাতা চলে যেতে বাধ্য হন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও তিনি আর দেশে ফেরেননি। খোকা রায়ও পঁচাত্তরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কলকাতা চলে যান এবং সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম নেতা বারীন দত্ত, যাকে আব্দুস সালাম নাম নিয়ে চলতে হয়েছিল, তিনি বিয়ে করেছিলেন। তার স্ত্রী শান্তি দত্তও পার্টি করতেন। তাই বিয়েটা সহজ হয়েছিল। এক পুত্র ও এক কন্যাকে নিয়ে শান্তি দত্তের সংসার কতোটা সুখের ছিল তা অনুমান করে নিতে কষ্ট হয় না। সে যুগের কমিউনিস্টদের মধ্যে আরো বিয়ে করেছিলেন টাঙ্গাইলের হাতেম আলী খান, পাবনার অমূল্য লাহিড়ী, জসিমউদ্দিন মণ্ডল, কুষ্টিয়ার শেখ রওশন আলী, শেরপুরের রবি নিয়োগী, ময়মনসিংহের জ্যোতিষ বোস, অজয় রায়, রংপুরের ছয়েরউদ্দিন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে কারাগারে চরম বর্বরতার শিকার নারী নেত্রী ইলা মিত্র বিয়ে করেছিলেন আরেক মহাপ্রাণ মানুষ রমেন মিত্রকে। তবে তারা এ দেশে থাকতে পারেননি। তারা কলকাতায় যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পরিবেশ অনুকূল মনে করে কিছুটা বেশি বয়সেও সংসার পেতেছিলেন সুনামগঞ্জের বরুণ রায়, নেত্রকোনার সুকুমার ভাওয়াল। আর অপেক্ষাকৃত কম বয়সী কমিউনিস্টরা সবাই বিয়ের কন্যা পেয়েছেন। তবে এক্ষেত্রে স্ত্রীকে অবশ্যই উপার্জনক্ষম হতে হতো। স্ত্রী আয়-রোজগার করবেন, স্বামী বিপ্লবের কাজে সময় দিবেন- ব্যবস্থাটা অনেকটা সে রকমই ছিল।

পাঁচ.

প্রবীণ বিপ্লবীদের মধ্যে যারা বিয়ে করেননি তাদের তালিকাটাও একেবারে ছোট নয়। কয়েকজনের নাম উল্লেখ করছি। সত্যেন সেন, জিতেন ঘোষ, অনিল মুখার্জি, রণেশ দাশগুপ্ত, জ্ঞান চক্রবর্তী, নলিনী দাস, মুকুল সেন, অমল সেন, মণিকৃষ্ণ সেন, আশু ভরদ্বাজ, সন্তোষ ব্যানার্জি, ডা. আব্দুল কাদের চৌধুরী, আজিজুল ইসলাম খান, মোখলেসুর রহমানসহ আরো নাম যোগ করা যাবে।

কারো কারো মধ্যে এমন একটা ধারণা চালু ছিল বা এখনও আছে যে, যারা বিয়ে করেননি, সংসারের মায়ায় জড়াননি তারাই বুঝি প্রকৃত বিপ্লবী এবং দেশপ্রেমিক। আগেই বলেছি, এমন ধারণা ভ্রান্ত। বিয়ে করা এবং না করা যাদের নাম উল্লেখ করলাম, তাদের কাউকে কারো চেয়ে কম আত্মত্যাগী বলা যাবে না। তাছাড়া এ ভাবে তুলনামূলক আলোচনা করাও যথার্থ নয়।

এটা স্বীকার করতেই হবে যে যারা সংসার বা পরিবার করেননি তারা আসলে নিজের পরিবারের বাইরে একটি আলাদা পরিবার পেয়েছিলেন, সেটা ছিল বৃহত্তর কমিউনিস্ট পরিবার। অবিবাহিত কমরেডরা যেসব কমিউনিস্ট অথবা কমিউনিস্ট-দরদি পরিবারে আশ্রয় পেতেন সেখানে তারা অনেকটা নিজের পরিবারের মতোই থাকতেন। তবে অবশ্যই ‘অনেকটা’, পুরোটা নয়। আশ্রয় গ্রহণটা যখন দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে তখন যে কিছুটা বিরক্তির বা অমনোযোগের তৈরি হয়নি, তা জোর দিয়ে বলা যাবে না। আমি নিজেও এমন কিছু ঘটনা জানি যা বললে কেউ হয়তো আহত বোধ করবেন। তবে এটাকে আমি আবার খুব বড় করে দেখতে চাই না। এটা আমার কাছে মানবিক ত্রুটি বলেই মনে হয়। বাবা-মাকেই যখন অবহেলা করতে দ্বিধা করা হয় না, সেখানে রক্তের সম্পর্কহীন একজন মানুষকে নিজের ঘর শেয়ার করে হৃষ্টচিত্তে থাকা খুব সহজ ব্যাপার নয়।

আবার এই মানুষগুলো সবাই ঋষিতুল্য ছিলেন, তাদের মধ্যে কখনো মানবিক দুর্বলতা তৈরি হয়নি এমন দাবি যারা করেন তাদের সঙ্গেও আমি সবিনয়ে দ্বিমত পোষণ করি। মুণিঋষিদের স্খলনপতন নিয়েই যখন গল্প তৈরি হয়, তখন কমিউনিস্টদের সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখার কোনো যুক্তি থাকতে পারে বলে আমি মনে করি না। গুরুদাস তালুকদারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, দাদা, বিয়ে না করে জীবনটা পার করে দিলেন কীভাবে? কখনও বিয়ে করার ইচ্ছা হয়নি?

সোজাসাপটা উত্তর দিয়েছিলেন তিনি। বলেছিলেন, বিয়ে করার ইচ্ছা তো হতোই। কিন্তু সময় আর সুযোগ পেলাম কই। বিয়ের যখন বয়স তখন তো জেলে অথবা আত্মগোপনে। তাই আর বিয়ে করা হয়ে উঠলো না।

একই প্রশ্ন করেছিলাম কৃষক নেতা ফজলুল হক খোন্দকারকে। তিনি খুব রসিক মানুষ ছিলেন। প্রথম দিকে বলতেন, পাত্রী তো এখনো খুঁজছি। যারে পছন্দ করি সে আমাকে পছন্দ করে না। বিয়ে না করার কোনো ইচ্ছা নেই। শেষ দিকে বলতেন, বিপ্লবটা যেমন হতে হতে হচ্ছে না, তেমনি আমার বিয়েটাও হতে হতে হলো না। বিপ্লব করতে পারলাম না বলে যেমন দুঃখ নেই, তেমনি বিয়ের জন্যও কোনো খেদ নেই!

কারো মনের প্রকৃত গোপন কথা জানার উপায় নেই। আমরা বিপ্লবীদের সম্পর্কে এমন একটি ধারণা তৈরি করেছিলাম যে তাদের বুঝি ব্যক্তিগত কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। তাদের কাছে থেকেও আমরা তাদের দূরের মানুষ বানিয়েছিলাম। আজ সেজন্যই আমরা তাদের অনেকের কথাই ভুলে যাচ্ছি, ভুলে গেছি। অথচ তারা যেভাবে আলো জ্বেলে আঁধার দূর করার সাধনা করেছেন, একটি অসা¤প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে নিজেদের সুখ ও চাওয়া-পাওয়া বিসর্জন দিয়েছেন, তা আজ আর কারো কাছে আলোচনার বিষয়ও নয়। রাজনীতিতে নীতিহীনতা, আদর্শহীনতার নিন্দা-সমালোচনা আমরা করি, কিন্তু বাস্তবে যারা আদর্শবান ছিলেন, নিঃশেষে যারা নিজেদের উজাড় করে দিয়েছেন তাদের আমরা মনে রাখি না। আমরা নিজেরা যেমন কেউ আদর্শবান, নীতিবান, চরিত্রবান হয়ে ওঠার চেষ্টা করি না, তেমনি অন্যের চরিত্র হননেও আমাদের উৎসাহের কোনো ঘাটতি নেই।

রাজনীতির জন্য নিজেকে অযোগ্য বিবেচনা করে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে এসেছি প্রায় তিন দশক হতে চললো। এখন রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করি। আশা-নিরাশার দোলাচলে দুলছি। কখনো মনে হয়, জীবনের পাতায় পাতায় যা লেখা তার সবই ভুল। আবার পরক্ষণেই মনে হয় : মেঘ দেখে তুই করিস নে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে।

আরও সংবাদ...'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj