গগন : মানজুর মুহাম্মদ

বৃহস্পতিবার, ১৪ জুন ২০১৮

এই শালু, আস্তে রাখ। ফেটে যাবে। শালু খিলখিল করে হেসে উঠল।

: ভয় পাইতাছেন?

: যেভাবে ওপর থেকে ঠস ঠস করে আলুগুলো ফেলছিলি, ফেটে যেতে পারে।

: গগন ভাই, আপনি কেমনে গেরিলা পরিচয় দেন বুঝি না। আলু পিন না খুললে কী ফাটে?

শালু আবার খিলখিল করে হাসতে থাকল। শাপলাপুরে বুক চিরে চলে যাওয়া খরস্রোতা নদীটির নাম- কাজলা। নদীটি গভীর। বৈশাখ মাসেও মাঝারি আকৃতির স্টিমার চলে।

শালু শাপলাপুরের চাষি কলিম মিয়ার মেয়ে। তারা এক ভাই, এক বোন। শাপলাপুরের মানুষ খুব দরিদ্র। শাপলা বিলের জন্য এ গ্রামটি আশপাশের দশ গ্রামের মধ্যে বিখ্যাত। এ বিলে প্রচুর লাল শাপলা জন্মায়। লাল শাপলার লতা সবজি হিসেবে অত্যন্ত সুস্বাদু। পুরো বছরজুড়ে এ গ্রামের মানুষ শাপলা বিলের শাপলা লতা খেয়ে বাঁচে। বৈশাখ মাসে এ বিলের পাশের মাঠেই বৈশাখী মেলা বসে। শাপলা বিলের পাশের মাঠে মেলা হয় বলে এ মেলার নাম হয়েছে শাপলা মেলা। যদিও শাপলা মেলায় শাপলা ফুল বিক্রি হয় না। তবে মেলায় আগত দশ গ্রামের হাজার হাজার মানুষ শাপলা বিলের শাপলা ফুল ও লতা খাওয়ার জন্য নিয়ে যায়।

শাপলা মেলার মাটির পুতুল এতদাঞ্চলে যুগে যুগে নাম কুড়িয়েছে। শাপলাপুরের কুমারদের গত চার পুরুষ ধরে বংশপরম্পরায় মাটির পুতুল তৈরিতে বিশেষ দক্ষতা ও নতুনত্ব পুতুলগুলোকে আশপাশের দশ গ্রামের ছেলে-বুড়োর কাছে সমাদৃত করে তুলেছে। এবারের মেলা বৈশাখের শুরুতেই জমে উঠেছে। দুপুর গড়াতেই শালু বড় ভাই শাহেদের সাথে শাপলা মেলায় এসে পৌঁছে। শালুরা যখন মেলায় পৌঁছল তখন মেলায় লোকে লোকারণ্য। নাগরদোলা, মৃত্যুক‚প, রং বেরঙের মাটির পুতুল, ফুলের টব, মোয়া, খই, জিলিপি, বানর নাচ, মোরগ লড়াই, সাপ ও বেজির লড়াই ইত্যাদি শত রকমের মজার মজার জিনিস রয়েছে মেলায়। শালুর মাটির পুতুল খুব পছন্দ। শাহেদ শালুকে বাঘ, জেব্রা, টিয়ে, বন মোরগ ইত্যাদি এক ঝুড়ি মাটির পুতুল কিনে দিল। শালু মনভরে হাওয়ায় মিঠাই ও আইসক্রিম খেল। ছেলে-মেয়েরা আনন্দে চিৎকার চেঁচামেচি করছে। কেউ কেউ হো হো করে হাসছে। শালুর আজ মৃত্যুক‚পের মোটরসাইকেলওয়ালাকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছে। ভাইকে সে সে কথা বলেছেও। শাহেদ তাকে আশ্বস্ত করেছে। শাহেদ নাগরদোলায় চড়ার পরই মৃত্যুক‚পে যাবে বলেছে। শালু ও শাহেদ যখন নাগরদোলায় চড়ছে, ঠিক তখন মেলা কাঁপিয়ে গুলির আওয়াজ শুরু হলো। ঠা ঠা ঠা ঠা গুলির আওয়াজে মেলার ছেলে-বুড়ো দিকবিদিক দৌড়ে পালাতে লাগল। শালুদের নাগরদোলার দোলনা যখন ঠিক উপরে, নাগরদোলাও আর ঘুরছে না। যে ঘুরাচ্ছিল সে পালিয়েছে। শালু ওপর থেকে স্পষ্ট দেখল- পড়িমড়ি করে মানুষের প্রাণভয়ে পালানো। দৌড়াদৌড়ি হুড়োহুড়িতে হরেক রকমের শত-শত মাটির পুতুল ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। মুহ‚র্তে মেলা ফাঁকা হয়ে গেল। শাহেদ নাগরদোলার দোলনার নিচে নামানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হল। নাগরদোলার ওপর দিকে শালুদের সাথে আরো কয়েকজন আটকা পড়ল। এক পাকিস্তানি ফৌজি নাগরদোলা ঘুরিয়ে ওপরের দোলনাগুলো নিচে নামাল। শালুকে রিভলবার হাতে একজন অফিসার ইশারায় ডাকল। শালু ভয় পেল। ভয়ে সে শাহেদের গায়ের সাথে সেঁটে গেল। এবার অফিসার ধমক দিয়ে বলল- ‘এ্যাই লড়কি এধার আও।’ শালু তবুও গেল না। শাহেদকে জড়িয়ে ধরে রাখল। হঠাৎ এক সিপাহি হ্যাঁচকা টান দিয়ে শাহেদ থেকে শালুকে ছিনিয়ে নিল। সিপাহি শালুকে অফিসারের হাতে তুলে দিল। শাহেদ শালুকে ছাড়ানোর জন্য অফিসারের কাছাকাছি গেলে অফিসার বুট দিয়ে তাকে সজোরে হাঁটুর পেছনে আঘাত করল। শাহেদ বুটের লাথি খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে যায়। শাহেদ আবার উঠে দাঁড়াল। সাথে সাথে ঠাস ঠাস দুটি রিভলবারের গুলি শাহেদের বুক এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিল। শাহেদের দেহ যখন মাটিতে ধড়ফড় করছে, তখন শালুকে ছ্যাঁছড়ে নিয়ে পাকিস্তানি হানাদাররা কাজলা নদীর দিকে চলল।

প্রায় এক মাস যাবৎ শালু কাজলা নদীর মাঝ বরাবর ভাসমান পাকিস্তানি ফৌজিদের একটি ছোট স্টিমারে বন্দি আছে। শাপলা মেলা হতে তাকে পাক হানাদারের দল স্টিমারে নিয়ে আসে। স্টিমারটির ওপর দুটি রুম, নিচে চারটি রুম। স্টিমারটি পাক আর্মিদের মোবাইল ক্যাম্প। স্টিমারটি নদীর মাঝে প্রায় সময় স্থির থাকে। গত এক মাসে একবারের জন্যও চলেনি। কেউ ডাঙায় যেতে হলে নৌকো ব্যবহার করতে হয়। অবশ্যই একটি ছোট নৌকা সবসময় স্টিমারের সাথে বাঁধা থাকে। শালুকে যেদিন এখানে নিয়ে আসা হয়, সেদিন শালু খুব কান্নাকাটি করে। স্টিমারে তাকে নিচের একটি রুমে থাকতে দেয়া হয়। সেখানে আরো ছয় জন মহিলা রয়েছে। নিজের চোখের সামনে ভাইকে খুন হতে দেখে দশ বছরের শালুর মানসিক অবস্থা খুব খারাপ হয়ে পড়ে। স্টিমারে আসার পর থেকে ‘হাসি’ নামের সবচেয়ে সুন্দরী মহিলাটি শালুকে বুকে নিয়ে সান্ত¡না দিয়েছে। চোখের জল মুছে দিয়েছে। শালু ‘হাসি’ থেকে জেনেছে ‘হাসি’সহ অন্যান্য মহিলাকেও তার মতো বিভিন্ন জায়গা থেকে পাক হানাদাররা তুলে এনে স্টিমারে বন্দি করে রেখেছে। ‘হাসি’ স্টিমারের সবার জন্য রান্না করে। রান্না হওয়ার পর খাওয়া পরিবেশনও তার দায়িত্ব। তাই সে নিচতলা ও উপরতলা সব জায়গায় বিচরণ করতে পারে। শালুকেও মেজর আসলাম রান্নার কাজে সহযোগিতার নির্দেশ দিয়েছে। তাই শালু আর হাসি দিনের অধিকাংশ সময় একসাথে থাকতে পারে। শালুও স্টিমারের সব জায়গা বিচরণ করতে পারে। হাসিকে শালু প্রথম প্রথম হাসি আপু ডাকতো, পরে আরো সংক্ষেপ করে হাসিপু বলে ডাকতে লাগল।

এই স্টিমারে মোট দশজন পাক ফৌজি রয়েছে। স্টিমারের ডেকের ওপর সার্বক্ষণিক একজন রাইফেল হাতে পাহারায় থাকে। হাসি অত্যন্ত ভীতু। সে মুক্তভাবে স্টিমারে চলাফেরা করলেও একটি বারও পালানোর চিন্তাই করেনি কখনো। শালু সেদিন বলল- হাসিপু, চলো আমরা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে পালিয়ে যাই। হাসি জিভে কামড় দিয়ে বলল- আরে, পালানোর কথা মুখেও আনবি না। সাথে সাথে গুলি করে দিবে। হাসিকে বন্দি করেছে দু-মাস আগে। স্টিমারটি শাপলাপুরে আসার আগে সবুজডাঙ্গা গ্রামের মাথাভাঙ্গা নদীতে ছিল। সেখানে মুক্তিবাহিনীর সাথে দুই দফায় যুদ্ধ হয়। দু-বারই মুক্তিবাহিনীর নৌকোকে গ্রেনেড দিয়ে উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। হাসি দু-বারই মুক্তিবাহিনীর সাথে পাক হানাদারদের যুদ্ধ দেখেছে। গ্রেনেড কীভাবে ছুঁড়তে হয় সেটিও দেখেছে। ওই সব কথা হাসি প্রথম দুয়েক দিনের মধ্যেই শালুকে বলেছে। যুদ্ধের বর্ণনা সহ কীভাবে গ্রেনেড ছুঁড়ে মারা হয়, ছুঁড়ে মারার আগে যে সাবধানে পিনটা খুলে দিতে হয় ইত্যাদি কথা শালুকে খুলে বলেছে।

শাপলাপুরে পাক হানাদার বাহিনীর মোবাইল ক্যাম্প স্টিমারটি আসার পর হতে শাকসবজি, তরি-তরকারি, মাছ, ডিম, মুরগি সবগুলো গগন সাপ্লাই দিয়ে আসছে। গগন শালুর স্কুলের বন্ধু। গগন আর শালু পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। গগন তার ছোট্ট ডিঙি নৌকোটি নিয়ে তরিতরকারি খাঁচায় করে স্টিমারে নিয়ে আসে। একটি বড় ঝুড়িতে তরিতরকারিগুলো মাথায় করে সে নৌকো থেকে স্টিমারের ওপর উঠে আসে। প্রতি সপ্তাহে তিনদিন গগন কাঁচাবাজার স্টিমারে নিয়ে আসে।

মুক্তিবাহিনীর আক্রমণ হতে বাঁচার জন্য পাক হানাদাররা স্টিমারটি নদীর পারের সাথে নোঙর না করে নদীর মাঝখানে নোঙর করে রেখেছে।

গগনকে শালু যেদিন দেখেছিল সেদিন আনন্দে চিৎকার করে উঠেছিল। বলেছিল- গগন, আমাকে তুই এখান থেকে নিয়ে যা। আমি বাড়ি যাব। গগন ঠোঁটে আঙুল লাগিয়ে ইশারায় শালুকে চুপ করতে বলে। শালুর কানে কানে সেদিন গগন বলেছিল, তোরে মুক্ত করব, যদি আমার কথামতো চলিস। যদি আলু দিস তাহলে বাঁচাবো। শালুও কিছু না বুঝে বলেছিল- আচ্ছা, গগন দেব। গগন সেদিনই শালুকে একটু আড়ালে কানে ফিস ফিস করে বলেছিল- সে পিচ্চি গেরিলা। পাকিস্তানিরা তা জানে না। সে সময়মতো এ স্টিমার উড়িয়ে দিবে। তবে তার আগে শালুকেসহ বাঙালি মহিলাদের মুক্ত করবে। সেদিন গগন শালুকে গ্রেনেডের খোঁজ নিতে বলে। গ্রেনেড সম্পর্কে ধারণা দিয়ে বলেছিল- গ্রেনেড দেখতে আলুর মতো। উপরের অংশ লোহার। গগন শালুকে গ্রেনেডকে গ্রেনেড না বলে আলু বলার পরামর্শ দেয়, যাতে পাকবাহিনী শুনলেও বুঝতে না পারে। গগনের সব কথা শুনে শালু সে-কথা হাসিকে খুলে বলে। হাসি সব শুনে আবারো ভয় পেয়ে জিভে কামড় দেয়। কিন্তু শালু হাসিকে জড়িয়ে ধরে বলে- হাসিপু, ভয় পেয়ো না। আমাদের যে করে হোক বাঁচতেই হবে। গগন বলেছে আলুর খোঁজ নিতে। আলু পেলে গগন আমাদের বাঁচাবে। শালুর পীড়াপীড়িতে হাসি আলু অর্থাৎ, গ্রেনেড স্টিমারের কোথায় গ্রেনেড আছে তা খুঁজে দেখতে লাগল।

যে রুমটিতে হাসিরা থাকে সে রুমের পাশের রুমটি সবসময় বন্ধ থাকে। মাঝে মাঝে ফৌজিরা ওই দরজা খুলে আবার বন্ধ করে দেয়। হাসির সন্দেহ হয়, ওই খানেই গোলাবারুদ হয়ত আছে। হাসি বেশ কয়েকদিন রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর ওই দরজা চাপ দিয়েছে, কিন্তু খুলেনি। হাসি জোরে ধাক্কা দেয়ার সাহস করেনি। বন্ধ রুমটির বিষয়ে হাসি শালুকে আজ জানিয়েছে। শালু ঠিক করেছে আজ রাত গভীর হলে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়বে, তখন তারা দুজন জোরে ধাক্কা দিয়ে ওই দরজা খোলার চেষ্টা করবে। শালুর খুব আনন্দ লাগছে। আজ সে কাক্সিক্ষত ‘আলু’ হাতে পাবে। গগনকে সে আলু গোপনে দেবে। গগন তাকে বন্দিদশা থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে। রাত ধীরে ধীরে গভীর হতে লাগল। হাসি ঘুমিয়ে পড়েছে। শালু ধাক্কা দিয়ে হাসির ঘুম ভেঙে দিল। ইশারায় উঠতে বলল। হাসি লাফ দিয়ে উঠে বসল। দুজনই পাশের দরজাটির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দুজনের চারটি হাত একসাথে দরজায় রেখে এক, দুই, তিন বলে জোরে ধাক্কা দিল। ধাক্কা দেয়ার সাথে সাথে দরজা ক্যাঁচ করে খুলে গেল। ভেতরে অন্ধকার, কিছুই দেখা যাচ্ছে না। হাসি রান্নাঘরে গিয়ে কুপিবাতি জ্বালিয়ে আনল। কুপিবাতি নিয়ে দুজনই ভেতরে ঢুকে দেখে- একদিকে কয়েকটি রাইফেল দাঁড় করানো অবস্থায় আছে। অন্য পাশে বেশ কয়েকটি কাঠের কার্টুন রয়েছে। হাসি একটি কাঠের কার্টুনের উপরের কাঠের ঢাকনি ধরে উপর দিকে টান দিতেই খুলে গেল। কাঠের কার্টুনে থরে থরে গ্রেনেড সাজানো। সে আগেও গ্রেনেড দেখেছে, তাই চিনতে পেরেছে। গ্রেনেডগুলো দেখার সাথে সাথে শালুকে বলল- দেখ, দেখ শালু, এগুলোই আলু। তুই ঝটপট রান্নাঘর থেকে তরকারির একটি ঝুড়ি নিয়ে আয়। শালু দৌড়ে গিয়ে রান্নাঘর হতে একটি ঝুড়ি নিয়ে এলো। তারপর টপ টপ ঐ তরকারির ঝুড়িতে গ্রেনেড রাখতে শুরু করল। শালু সাবধানে গ্রেনেডের ঝুড়িটি রান্নাঘরে লুকিয়ে রাখল।

পরদিন গগন তরকারির খাঁচা নিয়ে স্টিমারে উঠলে শালু দূর থেকে চোখ টিপে দেয়। গগন সাবধান হয়ে যায়। গগন স্টিমারের ডেকের উপরে খাঁচা নামিয়ে রাখল। এক ফৌজি এসে তরকারিগুলো উল্টে পাল্টে দেখল। তারপর কচি লাউ, আলু, কাঁকরোল এবং লালশাকের আঁটিগুলোর মধ্যে অর্ধেক রেখে যেতে বলল। ফৌজির এ আদেশে শালু খুশি হয়ে গেল। গগনকে নিয়ে ডেকের ওপর থেকে শালু নিচে রান্নাঘরে গেল। হাসি তাদের পিছু পিছু রান্নাঘরে ঢুকল। শালু ধীরে ধীরে গগনের খাঁচা হতে তরকারি নামিয়ে ফেলল। গগন কিছু একটা বলতে গেলে শালু ঠোঁটে তার ডান হাতের তর্জনি আঙুল রেখে ইশারায় গগনকে কোনো কথা বলতে নিষেধ করল। শালু আর হাসি রান্নাঘরের এ-কোণে লুকিয়ে রাখা গ্রেনেডভর্তি ঝুড়িটি বের করে আনল। টপাটপ গ্রেনেডগুলো গগনের তরকারির খাঁচায় রেখে তার ওপর লালশাকের আঁটি দিয়ে গ্রেনেডগুলো ঢেকে দিল। গ্রেনেড দেখে গগনের চোখ চকচক করে উঠল। হাসি মুখে শাড়ি চেপে থরথর করে কাঁপছে। গগন শালুকে তার ডানহাতের বৃদ্ধাঙ্গুল উঁচিয়ে ইশারায় অভিবাদন জানালো। তারপর সে খাঁচাটি মাথার ওপর নিয়ে স্টিমারের ডেকের ওপর উঠে আসল এবং খুব স্বাভাবিক পায়ে ডেক থেকে নেমে আসল নিজের নৌকায়। গগন বৈঠা হাতে ধীরে ধীরে নৌকা পারের দিকে চালাতে লাগল। স্টিমার হতে নিরাপদ দূরত্বে এসে সে গলা ছেড়ে গান ধরল- (বাংলা বেতারের গান)

নৌকো পারে ভিড়ার পর গগন সরাসরি শাপলা বিলের পাশে লালকাঁটা বনে চলে গেল। লালকাঁটা বন শাপলাপুরের দক্ষিণের বন। এ বনে লালকাঁটাযুক্ত প্রচুর গাছ আছে। কাঁটার জন্য এ বনে সচারচর কেউ যায় না। মুক্তিবাহিনী ওই বনকে বেছে নিয়েছে লুকিয়ে থাকার জন্য। ওই বনে ঢোকার নিরাপদ একটি পথ আছে, যা মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা ছাড়া আর কেউ জানে না। গগন নিয়মিত ওই বনে ওই পথ দিয়ে আসা-যাওয়া করে। গগন লালকাঁটা বনে মুক্তিবাহিনীর দলনেতা শাকিলের সামনে তরকারির ঝুড়িটা নামিয়ে লালশাক সরিয়ে গ্রেনেডগুলো দেখাল। গ্রেনেড দেখে শাকিল গগনকে বুকে জড়িয়ে ধরে এবং ঘোষণা দেয়- আগামী বুধবার স্টিমার আক্রমণ হবে।

আজ বুধবার। গগন দুপুরের কিছু আগে তরকারি নিয়ে স্টিমারে আসল। রান্নাঘরে তরকারি রাখতে গিয়ে শালুর কানে কানে বলল- মুক্তিবাহিনীর লিডার শাকিল ভাই বলেছে, আজ রাতে অপারেশন হবে। স্টিমারের দক্ষিণ দিক হতে আক্রমণ করা হবে। আক্রমণের আগে আমি উত্তর দিকের পাড় হতে নৌকোয় স্টিমারের কাছে আনার সময় বাঁশি বাজাতে থাকব। বাঁশির আওয়াজ শোনার সাথে সাথে তোমরা সবাই তৈরি হয়ে যাবে। দক্ষিণ দিকে গ্রেনেডের প্রথম বিস্ফোরণটা হওয়ার সাথে সাথে সব ফৌজি স্টিমারের দক্ষিণ দিকে মনোনিবেশ করবে। ঠিক তখনি তোমরা দ্রুত উপরে উঠে আসবে। স্টিমারের উত্তর দিকে আমার নৌকা থাকবে। তোমরা দ্রুত আমার নৌকোয় নেমে আসবে।

সূর্য ডুবে গেছে অনেকক্ষণ হলো। গগন শালুর কানে কানে অপারেশনের যে পরিকল্পনার কথা বলেছিল, শালু সে-কথা স্টিমারে বন্দি সব মহিলাদের জানিয়েছে। সবাই গগনের বাঁশির আওয়াজের অপেক্ষা করছে। আকাশে চাঁদ নেই। আকাশভর্তি তারা। আজকের তারাগুলো আগের চেয়ে অনেক উজ্জ্বল মনে হচ্ছে শালুর কাছে। স্টিমারের ডেকের ওপর হতে শালু তারা দেখছিল, আর কান খাড়া করে রেখেছে বাঁশির আওয়াজ শুনতে। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ দূরে বাঁশির আওয়াজ শুনতে পেল। বাঁশির আওয়াজ শুনেই শালু ডেক হতে নিচে নেমে গেল। শালু নিচে গিয়ে সবাইকে ইশারায় বাঁশি শুনতে বলল। সবাই গগনের বাঁশির মনকাড়া মধুর সুর শুনতে লাগল। আর মনে মনে স্টিমার হতে মুক্তি পাওয়ার জন্য মনকে শক্ত করে নিল। গগনের বাঁশির আওয়াজ ক্রমশ বড় হতে লাগল। সবার বুঝতে বাকি রইল না, গগনের নৌকা ক্রমশ স্টিমারের কাছে আসছে। বাঁশির মনভোলানো আওয়াজে সবাই বিমোহিত। হঠাৎ বিকট একটি শব্দে স্টিমার দুলে উঠল। শালুরা বুঝে গেল গগনের কথামতো দক্ষিণ দিক হতে স্টিমারের গায়ে গ্রেনেড ফাটিয়েছে মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা। শালু ও হাসি স্টিমারের দুলুনিতে দাঁড়ানো থেকে পড়ে গেল। শালু তড়াক করে উঠে সবাইকে ইশারায় স্টিমারের উপরে ওঠার ইশারা করে গটগট করে স্টিমারের ডেকের উপরে উঠতে লাগল। স্টিমারের উপরে প্রচণ্ড গোলাগুলির আওয়াজ হচ্ছে। ডেকের উপর উঠেই দেখল- ডেকের উত্তর পাশটায় কোনো ফৌজি নেই। সে নিশ্চিন্ত হল গগনের কথামত ফৌজিরা দক্ষিণ পাশে গ্রেনেড ফাটার সাথে সাথে সেদিকে চলে গেছে। সেদিকেই তারা মুক্তিবাহিনীর মোকাবিলা করছে। শালু পেছন দিকে না তাকিয়েই উত্তর দিকে স্টিমার হতে নামার ছোট্ট সিঁড়ি দিয়ে গগনের নৌকোয় নেমে পড়ল। শালুর পেছন পেছন অন্যরাও গগনের নৌকোয় উঠে পড়ল। গগন দ্রুত নৌকো চালাতে লাগল। প্রাণপণ শক্তি দিয়ে বৈঠা বাইতে লাগল। মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা স্টিমারকে লক্ষ্য করে একের পর এক গ্রেনেড ফাটাতে লাগল। পাক ফৌজিরাও যেদিক থেকে গ্রেনেড আসছে সেদিকে বন্দুকের গুলি চালাতে লাগল।

নৌকা যখন পারে ভিড়ল তখন বিকট আওয়াজে স্টিমারে আগুন ধরে গেল। আগুনের দাউ দাউ লেলিহান শিখা আকাশের দিকে লকলক করে বাড়তে লাগল। আগুনের লাল আলোয় নদীর পারও আলোকিত হলো। সে আলোয় সবাই খেয়াল করল- হাসি নৌকায় নেই। সবাই বুঝতে পারল- হাসি ভয়ে স্টিমার হতে পালায়নি। শালু জলন্ত স্টিমারের দিকে তাকিয়ে হাসিপু হাসিপু করে ডুকরে কেঁদে ওঠল। গগনের চোখ ফেটে কান্না এলো। নীরবে চোখের জল মুছে শক্ত কণ্ঠে বলল- চল, এখান হতে দ্রুত সরে পড়তে হবে। এখানে পাক ফৌজিদের অন্য দল যে কোনো মুহ‚র্তে এসে পড়তে পারে। জ্বলন্ত স্টিমারের আগুনের লাল আলোয় নদীর উত্তর পার লাল হয়ে আছে। গগন দ্রুত পা ফেলে সামনের দিকে হাঁটছে, অন্যরা তার পিছু পিছু হাঁটছে। শালু ডুকরে ডুকরে কাঁদছে। গগনের চোখও বারবার জলে ভরে উঠছে।

আরও সংবাদ...'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj