বিশ^কাপে ৩ গোল মেশিন : আ ত ম মাসুদুল বারী

বৃহস্পতিবার, ১৪ জুন ২০১৮

সব আগ্রহ, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে পর্দা উঠছে বিশ^কাপের ২১তম আসরের। বিশ^ ফুটবলের সবচেয়ে বড় এই মহাযজ্ঞ শুরু হচ্ছে আজ। বিশ^ ফুটবলপ্রেমীরা পুরো একটি মাস বুদ হয়ে থাকবে রাশিয়া বিশ^কাপ নিয়ে। এ আসরে কোন দল চ্যাম্পিয়ন হবে, কোন কোন তারকা বিশেষ আলো ছড়াবেন, তা নিয়েও ফুটবলপ্রেমীদের কৌত‚হলের শেষ নেই।

নেইমার জুনিয়র : নেইমার দা সিলভা স্যান্তোস জুনিয়র একজন ব্রাজিলীয় পেশাদার ফুটবলার, যিনি ফরাসি ক্লাব প্যারিস সেইন্ট জার্মেইন (পিএসজি) এবং ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে ফরোয়ার্ড বা উইঙ্গার হিসেবে খেলেন। ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ সালে মগিদাস ক্রুজেস, ব্রাজিলে জন্ম নেয়া নেইমার জুনিয়র নামেই বিশ^ব্যাপী পরিচিত। যাকে আধুনিক বিশে^র উদীয়মান ফুটবলারদের মধ্যে অন্যতম মনে করা হয়। নেইমারের সর্বাধিক পরিচিত তার গতি, বল কাটানো, সম্পূর্ণতা এবং উভয় পায়ের ক্ষমতার জন্য। তার খেলার ধরন তাকে এনে দিয়েছে সমালোচকদের প্রশংসা, সঙ্গে প্রচুর ভক্ত, মিডিয়া এবং সাবেক ব্রাজিলীয় ফুটবলার পেলের সঙ্গে তুলনা। ২০০৯ সাল থেকেই ব্রাজিলের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করা নেইমার ২০০৯ সালে অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ^কাপ ফুটবলে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই জাপানের বিপক্ষে গোল করেন নেইমার। তার খেলা দেখে পেলে-রোমারিওর মতো কিংবদন্তি ব্রাজিলিয়ান ফুটবলাররা দাবি তোলেন তাকে ২০১০ বিশ^কাপ স্কোয়াডে নেয়ার জন্য। চারদিকে তুমুল চাপ সত্ত্বেও তখনকার কোচ দুঙ্গা নেইমারকে নেননি। দুঙ্গার যুক্তি ছিল, নেইমার দারুণ প্রতিভাবান কিন্তু বিশ^কাপে ব্রাজিল দলে জায়গা পাওয়ার মতো এখনো এতটা পরীক্ষিত হয়ে ওঠেনি। সেই বিশ^কাপে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই বিদায় নেয় ব্রাজিল এবং বিদায় ঘটে কোচ দুঙ্গারও। নতুন কোচ হয়ে আসা মানো মেনেজস বিশ^কাপের পরপরই নেইমারকে ব্রাজিল স্কোয়াডে যুক্ত করে নেন। ১১ নম্বর জার্সি পরে ব্রাজিলের হয়ে ১০ আগস্ট, ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে মাত্র ১৮ বছর বয়সে অভিষেকেই গোল করেন নেইমার। ম্যাচের ২৮ মিনিটে এই গোল দিয়েই নেইমার পুরো ফুটবল বিশ^কে জানিয়ে দেন তার আগমনী বার্তা। ২০১২ অলিম্পিকে চীনের বিপক্ষে ৮-০ গোলে জয়ের ম্যাচে ব্রাজিলের হয়ে প্রথম হ্যাটট্রিক করার গৌরব দেখান নেইমার।

লুই ফেলিপে স্কলারির অধীনে ২০১৪ সালে বিশ^কাপ যাত্রা শুরু করেন ১.৭৪ মিটার (৫ ফুট সাড়ে ৮ ইঞ্চি) উচ্চতার নেইমার। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়ান ডিফেন্ডার হুয়ান ক্যামিলো জুনিগার আচমকা এক ট্যাকলের কারণে পাঁজরের হাড় ভেঙে চলে যেতে হয় সোজা হাসপাতালে। যে কারণে সেমিফাইনালে নেইমারবিহীন ব্রাজিল ৭-১ গোলে জার্মানির কাছে পরাজয়বরণ করে। ২০১৪ সালের দুঃসহ স্মৃতি মুছে কোচ তিতের অধীনে দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, এখন অপেক্ষা রাশিয়া থেকে বিশ^কাপ জয়ের। ২০১৮ বিশ^কাপে নেইমাররা নিজের দেশকে সবার আগেই বিশ^কাপে তুলে এনেছেন। এ পর্যন্ত ব্রাজিলের হয়ে ৮৫ ম্যাচ খেলে ৫৫ গোল করেছেন নেইমার।

লিওনেল মেসি : ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি (১.৭০ মিটার) উচ্চতার ছোটখাটো গড়নের কিন্তু দুর্দান্ত গতি, যার পায়ের কারুকাজ আর বলের অসাধারণ নিয়ন্ত্রণের কারণে বিশ^ ফুটবলের জাদুকর নামে পরিচিত আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল মেসি। আর্জেন্টিনার রোজারিও, সান্তা ফে তে জন্ম নেয়া মেসির পুরো নাম লিওনেল আন্দ্রেস মেসি কুচ্চিত্তিনি। মাঠের আক্রমণভাগের খেলোয়াড় মেসি

২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ^কাপ হয়তো তার বিশ^কাপের মুকুট পড়ার শেষ সুযোগ। বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি আর্জেন্টিনার রোজারিওতে স্টিল কারখানায় কর্মরত বাবা হোর্হে হোরাসিও মেসি এবং পার্টটাইম ক্লিনার মা সেলিয়া মারিয়া কুচ্চিত্তিনি-এর ঘরে ১৯৮৭ সালের ২৪ জুন জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক পরিবারের আদি বাসস্থান ছিল ইতালির আকোনা শহরে। তার পূর্বপুরুষদের একজন অ্যাঞ্জেলো মেসি ১৮৮৩ সালে সেখান থেকে আর্জেন্টিনায় চলে আসেন। মেসির বড় দুই ভাই এবং এক ছোট বোন রয়েছে। বড় দুই ভাইয়ের নাম রদ্রিগো ও মাতিয়াস এবং ছোট বোনের নাম মারিয়া সল। পাঁচ বছর বয়সে মেসি স্থানীয় ক্লাব গ্রান্দোলির হয়ে ফুটবল খেলা শুরু করেন যার কোচ ছিলেন তার বাবা হোর্হে।

২০০৬, ২০১০ এবং ২০১৪ সালের ৩টি বিশ^কাপে অংশগ্রহণ নিয়ে ১৫ ম্যাচে মেসির গোল সংখ্যা ৫টি আর বিশ^কাপে গোল করতে সহায়তা করেছেন ৫টিতে। ৫বার ব্যালন ডি’অর বিজয়ী মেসি হাঙ্গেরির বিপক্ষে জাতীয় দলে অভিষেক হয় ১৭ আগস্ট, ২০০৫ সালে। জাতীয় দলের হয়ে প্রথম গোল: ১ মার্চ, ২০০৬, প্রতিপক্ষ-ক্রোয়েশিয়া, অপরদিকে জাতীয় দলের হয়ে প্রথম অধিনায়কত্ব: ২২ জুন, ২০১০, প্রতিপক্ষ-গ্রিস এবং জাতীয় দলে তার অধিনায়কত্বে মোট ৪৮ ম্যাচে জয় পেয়েছেন ৩৪টিতে, পরাজয় ৭টি এবং ড্র ৭টিতে।

ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো : পর্তুগিজ অধিনায়ক ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর মনোযোগ এখন রাশিয়া বিশ^কাপে। আগামী শুক্রবার স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে পর্তুগালের বিশ^কাপ অভিযান। ‘বি’ গ্রুপে তাদের অপর দুই প্রতিপক্ষ মরক্কো ও ইরান। শুরুতেই কঠিন প্রতিপক্ষ, সাবেক বিশ^ চ্যাম্পিয়ন ও এবারের আসরের অন্যতম ফেভারিট স্পেন। তবে আত্মবিশ্বাসের কমতি নেই রোনালদোর, রাশিয়া বিশ^কাপে তৃতীয়বারের মতো দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

নেইমারের সঙ্গে একই দিনে জন্ম হলেও ফুটবলীয় অর্জনে তার একমাত্র প্রতিদ্ব›দ্বী লিওনেল মেসি। ১৯৮৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পর্তুগালের মাদেইরা দ্বীপপুঞ্জের রাজধানী ফানচালে জন্মগ্রহণ করেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ডস সান্তোস অ্যাভেইরো। মালি বাবা ও রাঁধুনী মায়ের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান রোনালদো। যিনি পৃথিবীর আলো দেখার আগে তিনি শিকার হতে যাচ্ছিলেন এক নির্মম বাস্তবতার। গর্ভে থাকাকালেই রোনালদোর মা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন গর্ভপাত করাবেন। কিন্তু ততদিনে অনেক সময় পার হয়ে যাওয়াতে ডাক্তার পরামর্শ দিয়েছিলেন গর্ভপাত না করানোর। রোনালদোর মাও পরবর্তী সময় তার সিদ্ধান্ত বদল করেন। শেষ পর্যন্ত সান্তোস অ্যাভেইরো পৃথিবীর আলো দেখালেন পরিবারের চতুর্থ সন্তানকে। কনিষ্ঠ সন্তানের নাম রাখলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের নামে। আভেইরো এবং মারিয়া ডলারস ছোট ছেলের ডাক নাম রাখলেন তারা রোনালদো। শৈশবটা অভাব অনটনে স্থানাভাবে অ্যাভেইরো পরিবারের চার সন্তান একই রুমে বেড়ে ওঠে। পরবর্তী সময় তাদেরই একজন ২০১৬ ও ২০১৭ সালে ফোবর্স সাময়িকীর সর্বোচ্চ আয় করা অ্যাথলেটদের তালিকার শীর্ষে স্থান দখল করেন।

রোনালদোর ফুটবলার হবার পেছনে তার বাবা-মার অবদান সবচেয়ে বেশি। পরিবারের খরচ মেটাতে পৌরসভার মালির চাকরির বাইরে স্থানীয় ক্লাব অন্দোরিনহার কিট ম্যানও ছিলেন রোনালদোর বাবা জোসে। সে সুবাদেই মাত্র ৭ বছর বয়সে আন্দোরিনহায় যোগদানের সুযোগ ঘটে রোনালদো। ১২ বছর বয়সে স্পোর্টিং সিপির তিন দিনের এক ট্রায়ালে যাওয়াটাই রোনালদোর জীবনের গল্পটা পালটে দেয়। মেদেইরা ছেড়ে লিসবনে স্পোর্টিংয়ের ইয়ুথ একাডেমিতে যোগ দেন ক্রিস্টিয়ানো। ১৪ বছর বয়সেই ফুটবল ক্যারিয়ার নিয়ে নিঃসন্দেহ হয়ে যাওয়ায় মায়ের সঙ্গে কথা বলে লেখাপড়ায় ইস্তফা দেন। পরের বছরই শারীরিক সমস্যায় ফুটবল থেকে বিদায় নেয়ার উপক্রম হয়েছিল তার। হৃদস্পন্দনের সমস্যায় ফুটবল ক্যারিয়ার নিয়ে শঙ্কায় পড়েছিলেন রোনালদো। অস্ত্রোপচার করে সে শঙ্কা কাটিয়ে আর কখনো পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি রোনালদোকে। ব্যক্তিগত জীবনে চার সন্তানের জনক রোনালদো। স্ত্রী জর্জিনা রদ্রিগেজ।

আরও সংবাদ...'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj