প্রযুক্তির বিশ্বকাপ : তাইসির আদীব নূর

বৃহস্পতিবার, ১৪ জুন ২০১৮

প্রযুক্তি ও নতুনত্বের দিক থেকে এবার রাশিয়া বিশ্বকাপ আগের সব বিশ্বকাপকে ছাড়িয়ে যাবে। অত্যাধুনিক সব প্রযুক্তি ব্যবহৃত যাচ্ছে ২১তম বিশ্বকাপ আসরে। এবারের বিশ্বকাপে রেফারিদের সুবিধার্থে ভিএআর (ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি) পদ্ধতি রেখেছে আয়োজকরা। ভিএআর সিস্টেম রাখার জন্য অনেক আগ থেকেই দাবি উঠছিল। অবশেষে সেই দাবি পূরণ হচ্ছে রাশিয়ায়। প্রযুক্তির এ দুনিয়ার মানুষের হরেক রকম বিশ্বাসের কারণে এবার বিশ্বকাপে অংশ নেয়া দলগুলোর ভাগ্য সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করবে ‘একিলিস’ নামের এক বিড়াল। এর আগের বিশ্বকাপে এই কাজটি করছে ‘পল’ নামক অক্টোপাস। ফুটবলের সোনালি ট্রফি দখলের লড়াইয়ে আজ থেকে মাঠে নামছে অংশগ্রহণকারী ৩২ দেশ। ১৫ জুলাই মস্কোর লুজনিকিতে হবে যার চূড়ান্ত ফয়সালা।

রাশিয়া বিশ্বকাপে অংশ নেয়া ক্ষুদ্র দেশ হচ্ছে আইসল্যান্ড। জনসংখ্যার দিক দিয়ে ক্ষুদ্র দেশটির জনসংখ্যা মাত্র ৩, লাখ ৩৪ হাজার। এবার শিরোপা জিততে কোমর বেঁধে নেমেছে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও স্পেন। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার বিতর্কিত গোলে বিদায়ের ঘণ্টা বেজেছিল ইংল্যান্ডের। রেফারির ভুলে যে পুরো ম্যাচের ফলাফলই পাল্টে যেতে পারে তা দেখেছিল বিশ্ব। তবে এবারের বিশ্বকাপে এমন কোনো ভুল যেন না হয় সেদিকে খেয়াল রেখেই প্রযুক্তির ব্যবহার ঘটানো হচ্ছে। ৮৮ বছরের বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এবার ভিএআর (ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি) সিস্টেম চালু হচ্ছে। অফসাইড, লাল কার্ড, গোল এবং পেনাল্টি এই চারটি বিষয়কে সামনে রেখে রাশিয়া বিশ্বকাপে ভিএআর পরিচালিত হবে। পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে এবার ১৩ জন অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি ম্যাচ পরিচালনার কাজে যুক্ত থাকবেন। ম্যাচে বিতর্কিত কোনো মুহূর্তের সৃষ্টি হলেই রেফারি চাইলে ভিএআরের সহযোগিতা নিতে পারবেন। রেফারির যদি কখনো মনে হয় তার সিদ্ধান্তটি ভুল হলেও হতে পারে তবেই কেবল রেফারি নিজেই অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির শরণাপন্ন হবেন। অনেকটা ক্রিকেটের থার্ড আম্পায়ারের মতো। তবে ক্রিকেটের মতো ফুটবলে কিন্তু খেলোয়াড়রা রিভিউ নেয়ার স্বাধীনতা পাবেন না।

ফুটবলকে আরো নিখুঁত করতেই ফিফার এমন সিদ্ধান্ত। ইউরোপের বেশ কিছু লিগে এর মাঝেই চালু হয়েছে ভিএআর। ফিফা আয়োজিত ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) পদ্ধতির প্রথম প্রয়োগ হয় ২০১৬ সালের ক্লাব বিশ্বকাপে।

পরের বছর অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ ও কনফেডারেশনস কাপেও প্রয়োগ হয়। এবার তা দেখা যাবে রাশিয়া বিশ্বকাপেও। এতে ফুটবলে অনেক স্বচ্ছতা আসবে বলেই আশা করা হচ্ছে। আইএফবিএর পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এখন পর্যন্ত ৮০৪টি ম্যাচে ভিএআর ব্যবহার করা হয়েছে। যার মধ্যে সঠিক সিদ্ধান্ত এসেছে ৯৮.৯ শতাংশ ক্ষেত্রে। প্রত্যেক ম্যাচে গড়ে পাঁচ কিংবা তার কমবার ভিডিও রেফারি ব্যবহৃত হয়েছে এবং ৬৮.৮ শতাংশ ম্যাচে কোনো রিভিউ নেয়া হয়নি। খেলার সময় ইপিটিএস প্রযুক্তিতে খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্য ও গতিবিধির সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করতে পরিধেয় ডিভাইসের আবশ্যকতা ছিল। প্রথমে সমর্থন না করলেও নীতিমালা বদলে এমন ডিভাইসের ব্যবহারের অনুমোদন দেয় ফিফা। তৈরি করা হয় বিশেষ ফিটনেস ট্র্যাকার। ট্র্যাকারগুলো খেলোয়াড়দের বুকে ও পিঠে ব্যবহার করতে হবে। এবারের আসরের প্রযুক্তি ম্যাচগুলোতে ইতোমধ্যেই খেলোয়াড়রা এ ডিভাইসগুলো ব্যবহার করতে শুরু করেছেন। ডিভাইসগুলো রিয়েল টাইম খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্য ও গতিবিধি ধারণ করতে সক্ষম।

এবার নিরাপত্তা ব্যবস্থায় থাকছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। ইউক্রেন এবং সিরিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে যে সব উন্নত প্রযুক্তির পরীক্ষা করা হয়েছে বিশ্বকাপ স্টেডিয়ামগুলোর বাইরে সে সব ড্রোন প্রযুক্তি স্থাপন করবে রাশিয়া। যার সবই সামরিক প্রযুুক্তি। সন্ত্রাসীরা যাতে মাঠে কোনো ধরনের হামলা বা বোমা হামলা চালাতে না পারে সে জন্যই এই প্রযুক্তি ব্যবহার করবে আয়োজক দেশটি।

এ সব ড্রোন সরঞ্জাম বিশেষভাবে ডিজাইন করা, যা রাশিয়ান সেনাবাহিনী ব্যবহার করে। যে সব ড্রোন ব্যবহার হবে তাতে জিএসএম মোবাইল, জিপিএস ডিভাইস এবং স্যাটেলাইট সংযোগের সঙ্গে রেডিও-ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা আছে। পাশাপাশি তথ্য সংগ্রহের জন্য ড্রোনে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবস্থাও। এই ড্রোন বিমান হামলা ঠেকাতেও কাজে দেবে।

রাশিয়া বিশ্বকাপে প্রতিটি ম্যাচে মাঠে প্রত্যেক ফুটবলারের এবং বলের অবস্থান বিশ্লেষণ করা ও সে তথ্য দলগুলোকে দেয়ার প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে রাশিয়া বিশ্বকাপে। বিশ্বকাপে অংশ নেয়া ৩২ দলকেই দুটি করে ট্যাব দেয়া হবে। এর একটি ট্যাব দিয়ে অ্যাপলিকেশনের মাধ্যমে গ্যালারিতে বসা দলের বিশ্লেষকরা তাদের বিশ্লেষণ পাঠাবেন মাঠের ডাগআউটে। সেখানে আরেকটি ট্যাবে তা দেখতে পাবেন দলের সহকারী কোচরা।

দুটি অপটিক্যাল ট্র্যাকিং ক্যামেরা দিয়ে খেলোয়াড় ও বলের অবস্থান সম্পর্কে জানতে পারবেন বিশ্লেষকরা। প্রয়োজনে তিনি স্থিরচিত্র এবং ড্রয়িংও পাঠাতে পারবেন ডাগআউটে। এ ছাড়া সহকারী কোচের সঙ্গে লিখিত বার্তা বা ওয়াকিটকির মাধ্যমে যোগাযোগ করা যাবে।

নতুন এ প্রযুক্তিতে পাওয়া উপাত্ত খেলা চলাকালে, বিরতিতে এবং খেলার পরে মূল্যায়ন করতে পারবেন কোচিং টিমের সদস্যরা। প্রযুক্তির এই ব্যবহারের ফলে প্রতিটি দলই ম্যাচ চলাকালীন নিজেদের টুকটাক ভুল-ত্রুটিগুলো শুধরে নেয়ার সুযোগ পাবে।

আরও সংবাদ...'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj