কে জিতবে বিশ্বকাপ শিরোপা : শামসুজ্জামান শামস

মঙ্গলবার, ১২ জুন ২০১৮

বিশ্বকাপ, দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থের পর্দা ওঠার বাকি আর মাত্র ২ দিন। রাশিয়া বিশ্বকাপের উদ্দেশে মেসিদের দেশ ছাড়ার আগে দেশটির প্রেসিডেন্ট মরিসিয়ো মাকরি তার মেয়ে আন্তোনিয়া নিয়ে আর্জেন্টিনার ফুটবল সংস্থার দফতরে উপস্থিত হয়ে মেসিকে বলেছেন, জেনে রেখো, তোমরা বিশ্বকাপে যা-ই করবে, তাতেই আর্জেন্টিনার জনগণ খুশি হবে। এটা ভেবো না, বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হতে না পারলে তা তোমার ফুটবল ক্যারিয়ারে কালো দাগ পড়বে। এ রকম উন্মাদের মতো ভাবনা এ দেশের কারো মাথাতেই নেই। আসন্ন বিশ^কাপে ১৭ জুন সৌদি আরবের মুখোমুখি হয়ে জার্মানদের শিরোপা ধরে রাখার মিশন শুরু হবে। তার আগে প্রস্তুতি ম্যাচে অঘটনের স্বীকার হয়েছে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ২-১ গোলে হেরেছে জার্মানি। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জার্মানির অপ্রত্যাশিত এই পরাজয়ে ক্ষেপেছেন কোচ জোয়াকিম লো। ম্যাচ শেষে লো বলেছেন, এই পরাজয়টা আমাকে বিরক্ত করেছে। আমরা যা পরিকল্পনা করে রেখেছিলাম মাঠে তার অনেক কিছুই বাস্তবায়ন করতে পারিনি। আমরা প্রচুর বল হারিয়েছি যেখানে আমরা গোলের সুযোগ তৈরি করতে পারতাম। শিরোপা অক্ষুণœ রাখতে হলে আমাদের সামনের দুই সপ্তাহে প্রচুর কাজ করতে হবে। পাঁচবারের বিশ^ চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল প্রীতি ম্যাচে ক্রোয়েশিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়েছে। এ ম্যাচের মধ্য দিয়েই দীর্ঘদিন পর ফুটবলে ফিরেছেন ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টার নেইমার। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে পিএসজির হয়ে অলিম্পিয়াক মার্সেইয়ের বিপক্ষে লিগ ওয়ানের ম্যাচে খেলার সময় চোট পেয়েছিলেন নেইমার। বিশ্বকাপের আগে মাঠে ফিরেই ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের ৬৯তম মিনিটে বাঁ দিক থেকে ফিলিপে কুতিনহোর দেয়া পাস থেকে গোল করে ব্রাজিলকে এগিয়ে নেন নেইমার। এটি ব্রাজিলের জার্সিতে নেইমারের ৫৪তম গোল। এরপর ম্যাচের একেবারে অন্তিম মুহূর্তে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন রবার্টো ফিরমিনো। ইংল্যান্ড, ফ্রান্সও প্রীতি ম্যাচে জিতে বিশ্বকাপে ভালো ফলাফলের পূর্বাভাস দিচ্ছে।

১৪ জুন রাতে সৌদি আরবের বিপক্ষে স্বাগতিক রাশিয়ার ম্যাচ দিয়ে যাত্রা শুরু হবে ফুটবল মহাযজ্ঞের। পর্দা নামবে ১৫ জুলাইয়ের ফাইনালের মধ্য দিয়ে। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, স্পেন, ফ্রান্স নাকি অন্য কেউ জিতবে শিরোপা। এ নিয়ে দেশে দেশে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। রাশিয়া বিশ্বকাপই মেসির শেষ বিশ্বকাপ। আর্জেন্টাইন সুপারস্টার কি পারবে তার দেশকে তৃতীয় শিরোপা এনে দিতে? নাকি নেইমা ব্রাজিলকে ষষ্ঠ শিরোাপা এনে দিবে। এমন সব জটিল প্রশ্নের উত্তর মিলাতে হলে উপভোগ করতে হবে বিশ্বকাপের দুর্দান্ত সব ম্যাচগুলো। এ গ্রহে স্বাধীন দেশের সংখ্যা ২০৬টি। জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত দেশের সংখ্যা ১৯৩টি। অথচ ফিফার আওতায় রয়েছে ২১১টি দেশ! দুরু দুরু বুকে ফুটবলপ্রেমীরা রাশিয়া বিশ্বকাপের ক্ষণ গণনা শুরু করে দিয়েছেন নিশ্চয়ই। কারণ প্রতি চার বছর পরই আসে বিশ্বকাপ ফুটবল। বিশ্বকাপ মানে নানামুখী সমীকরণ। একজনের সঙ্গে আরেকজনকে জড়িয়ে মুখোমুখি লড়াইয়ের ছক কষা। বিশ্বকাপ মানে ময়দানের লড়াইকে বাইরেও টেনে নিয়ে যাওয়া। বিশ্বকাপ মানে শুধু যেন এক প্রতিযোগিতা নয়, প্রথম হয়ে বিশ্বের নজরে পড়ার সবচেয়ে উপযোগী মঞ্চ। তাই বিশ্বকাপ এলেই লড়াইয়ের মঞ্চে কোনো দল, কোনো খেলোয়াড় বাজিমাত করবে, তা নিয়ে যেমন জল্পনা-কল্পনা থাকে, তেমনি দল ও খেলোয়াড়দের সাজিয়ে-গুছিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে কোনো পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান এগিয়ে থাকল, সেটার দিকেও বিপুল আগ্রহ থাকে সবার। লড়াইটা মাঠের ২২ জনের। তবে মাঠের বাইরে বিশ্বকাপ দখলের এই মহারণের প্রস্তুতি থেকে শুরু করে পরিকল্পনা সবই করেন দলের প্রশিক্ষকরা। এমনকি মাঠের নব্বই মিনিটের লড়াইয়েও থাকে তাদের মস্তিষ্ক উৎসরিত নানা পরিকল্পনা ও দ্রুত কৌশল পাল্টানোর খেলা। জার্মানির কোচ জোয়াকিম লো, ব্রাজিলের তিতে, পর্তুগালের ফার্নান্দো সান্তোস, আর্জেন্টিনার জর্জ সাম্পাওলি, বেলজিয়ামের রবার্তো মার্টিনেজ, ফ্রান্সের দিদিয়ের দেশ্যামরা এবারো মাঠের বাইরে থেকে কলকাঠি নাড়বেন। ব্রাজিলের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নযাত্রায় মূল ভূমিকাটা পালন করতে হবে নেইমারকে। নিজেকে কিংবদন্তিদের কাতারে নিয়ে যেতে আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপ জিততে হবে মেসিকে। রাশিয়া বিশ্বকাপে স্পেন, জার্মানি এবং ফ্রান্সকে ফেবারিটের তালিকা থেকে বাদ দেয়ার অবকাশ নেই। তারুণ্যনির্ভর ইংল্যান্ড কি ১৯৬৬ সালের পনুরাবৃত্তি ঘটাতে পারবে? তাই দেখার বিষয়। এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত সব বিশ্বকাপের ফাইনালে কেবল ইউরোপীয় এবং দক্ষিণ আমেরিকান দলগুলো অংশ নিয়েছে। দুটি মহাদেশই বিশটি শিরোপা জেতেছে। এই দুই মহাদেশের বাইরে কেবল দুটি দলই সেমিফাইনালে উঠতে পেরেছে, যুক্তরাষ্ট্র (১৯৩০ সালে) এবং দক্ষিণ কোরিয়া (২০০২ সালে)। সাম্প্রতিককালে আফ্রিকার দলগুলো সফলতা পেলেও তারা কখনো সেমিফাইনালে পৌঁছতে পারেনি। ওশেনিয়া অঞ্চলের দলগুলো কেবল তিনটি বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে এবং মাত্র একটিতে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠেছে।

ইউরোপীয় দলগুলো তাদের জেতা ১১টি শিরোপার ১০টি ইউরোপে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে জিতেছে। গতবার ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে শিরোপা জেতে জার্মানি। অন্যদিকে ইউরোপীয় দেশগুলোর বাইরে ইউরোপে শিরোপা জিতেছে এমন একমাত্র দেশ হচ্ছে ব্রাজিল, যারা ১৯৫৮ সালে ইউরোপে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে শিরোপা জিতেছে। কেবল দুটি দল পরপর দুবার শিরোপা জিতেছে- ব্রাজিল ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে এবং ইতালি ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে।

বিশ্বকাপের মূল খেলা শুরুর আগেই অবশ্য এক দফা কাঁপুনি শুরু হয়ে গেছে, যাতে শামিল হয়েছে ক্রিকেটের দেশ বাংলাদেশও। ক্রিকেটের মতো ফুটবলও যে এ দেশের মানুষের উন্মাদনার আরেক নাম তা নতুন করে প্রমাণ করার কোনো অবকাশ নেই। এ দেশের মানুষের কাছে বিশ্বকাপ মানে হয়তো আর্জেন্টিনা নয়তো ব্রাজিল। এই দুদেশের পতাকা উড়িয়ে ইতোমধ্যে তা প্রমাণও হয়েছে। শুধু এবার নয়, বিশ্বকাপের প্রতি আসরেই বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের সমর্থকরা প্রিয় দলের পতাকা ওড়ানোর প্রতিযোগিতায় নামেন। ইদানীং জার্মানি, স্পেনসহ অন্যান্য দেশের কিছু পতাকাও উড়তে দেখা যায়।

যোজন যোজন দূরে রাশিয়ায় শুরু হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপ ফুটবল। আর এত দূরের বাংলাদেশে বসেই চলছে বিশ্বকাপ উদযাপনের জোর প্রস্তুতি। সহসাই সর্বত্র টাঙানো শুরু হবে প্রিয় দলের পতাকা। জার্সি কেনার ধুম চলবে। তরুণ-তরুণী তো বটেই শিশু কিংবা মধ্যবয়সীরাও বাদ থাকতে নারাজ বিশ্বকাপ উন্মাদনার এই রঙিন ছোঁয়া থেকে। ঘরে-বাইরে চলবে কোন দল সেরা এই নিয়ে তর্কযুদ্ধ। কি ক্যাম্পাস, বন্ধুদের আড্ডা বা চায়ের দোকান সবখানেই চলবে বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে চর্চা। আর ফেবারিট দলগুলোর জার্সি, টি-শার্ট, গেঞ্জিতে ফুটপাত থেকে শুরু করে নামিদামি ফ্যাশন আউটলেটগুলো ছেয়ে গেছে। বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রাম, শহর ও নগরে যুবক-যুবতীদের গায়ে উঠেছে হলুদ, লাল আর আকাশি রংয়ের জার্সি। বাংলাদেশ বিশ্বকাপে না খেললেও এখানকার মানুষের মধ্যে ফুটবল নিয়ে আগ্রহের কমতি নেই। আর একে কেন্দ্র করে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বিশ্বকাপকে সামনে রেখে কর্মব্যস্ততা বেড়ে যায় ছোট ছোট অনেক প্রতিষ্ঠানের। দেশব্যাপী চাহিদা মেটাতে ছোট ছোট গার্মেন্টসগুলোতে বিভিন্ন দেশের জার্সি ও পতাকা বানানোর ধুম পড়ে যায়। কোটি কোটি টাকার ব্যবসা চলে জার্সি ও পতাকা তৈরিকে কেন্দ্র করে।

বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ টেলিভিশনের পর্দায় সরাসরি উপভোগ করবেন ফুটবল বিশ্বকাপ। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এদিকে খেলা দেখার জন্য বাংলাদেশের ফুটবল পাগল মানুষের মধ্যে টেলিভিশন কেনার আগ্রহ বেড়ে যায়। যাদের বাসায় টিভি নেই কিংবা টিভি পুরনো হয়ে গেছে- তারা ছুটছেন টেলিভিশনের দোকানে। ফুটবল উৎসবে টেলিভিশনের বাড়তি চাহিদা সামলাতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিতে হয় টিভি উৎপাদনকরী ও বিক্রেতাদের। উৎপাদন বাড়ানো হয় কয়েক গুণ। স্বাভাবিকের চেয়ে ব্যাপক মজুদ বাড়ানো হয়। সেইসঙ্গে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে দাম কমানোসহ নানা অফারও দেয়া হয়।

বাংলাদেশের অনেক মানুষ অপেক্ষায় থাকে বিশ্বকাপের জন্য। খেলা দেখা নয়, নিজেদের রুটি-রুজির জন্য। এই যে বিশ্বকাপ উপলক্ষে দেশময় হাজার হাজার পতাকা বাসা-বাড়ির ছাদে উড়ছে, এ পতাকাগুলোর কারিগরেরাও তো বিশ্বকাপ-যজ্ঞের অংশ। তারাও তো বিশ্বকাপ উন্মাদনার একটা অংশ বিলিয়ে দিচ্ছে ফুটবলের মূলধারা থেকে বহু ক্রোশ দূরে থাকা একটি দেশের মানুষের মধ্যে। ফুটবলের তীর্থভূমি লাতিন আমেরিকা ও ইউরোপ গত ২০ আসরের বিশ্বকাপ নিজেরা ভাগ করে নিয়েছে। ইউরোপ এগিয়ে তারা জিতেছে ১১টি বিশ্বকাপ। এই মধ্যে জার্মানি এবং এবার বিশ্বকাপের টিকেট না পাওয়া ইতালি চার বার করে বিশ্বকাপ জিতেছে। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স এবং স্পেন। লাতিন আমেরিকার ব্রাজিল সর্বাধিক পাঁচবার, উরুগুয়ে এবং আর্জেন্টিনা দুইবার করে বিশ্বকাপ জিতেছে। এবার রাশিয়ার ১২টি স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের যে ম্যাচগুলো হবে তা খেলা হবে টেলস্টার-১৮ নামক বল দিয়ে। রাশিয়া বিশ^কাপের বল তৈরি করেছে অ্যাডিডাস। ১৯৭০ সাল থেকে বিশ^কাপ ফুটবলের জন্য বল তৈরি করছে প্রতিষ্ঠানটি। ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ^কাপে ব্যবহার করা বলটি দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে এবারের বিশ^কাপের জন্য টেলস্টার-১৮ নামক বলটি তৈরি করেছে অ্যাডিডাস।

গ্যালারি'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj