দেশপ্রেম কি তবে নিহত হয়েছে : সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

না, দেশপ্রেম নিহত হয়নি; তবে বেশ আহত হয়েছে যে সেটা ঠিক। যে জন্য কাতর অবস্থায় পড়ে আছে। কাতরাবে যে এমন জোরও পাচ্ছে না, নিজের মধ্যে। সেবাশুশ্রƒষার লোক নেই। তা কার হাতে আহত হলো আমাদের ওই অতি জীবন্ত দেশপ্রেম? অতিজীবন্তই তো ছিল সে এতদিন, বিশেষ করে একাত্তরে। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আমরা বারবার বিদ্রোহ করেছি, ব্রিটিশ আমলে যেমন পাকিস্তান আমলেও তেমনি। বিদ্রোহ যে করেছি সেটা ওই দেশপ্রেমের কারণেই। অনেককাল ধরেই সমষ্টিগতভাবে বাঙালি রাষ্ট্রদ্রোহী, কিন্তু কখনোই দেশদ্রোহী ছিল না।

দেশ বলতে কেবল ভূমি বোঝায় না; ভূমি তো বোঝাবেই, কিন্তু দেশ ভূমির চেয়েও বড়, অনেক অনেক বড়, কেননা দেশে মানুষ আছে, মানুষ থাকে এবং সে জন্যই দেশ অমন তাৎপর্যপূর্ণ। দেশপ্রেম বলতে আসলে দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসাই বোঝায়।

আমাদের এই দেশপ্রেম বারবার পরীক্ষা ও নির্যাতনের মুখে পড়েছে। একাত্তরের কথা আমরা ঘুরে ঘুরে বলি, কেননা চরম একটা পরীক্ষা তখনই হয়েছে। তার আগেও হয়েছে, পরেও হয়েছে, কিন্তু একাত্তরে যেমনটা হয়েছে বাঙালির জন্য দেশপ্রেমের পরীক্ষা তেমনটি আর কখনো হয়নি। হানাদারেরা সব দেশপ্রেমিক মানুষকেই সেদিন প্রাণদণ্ডাদেশ দিয়েছিল, অপেক্ষাটা ছিল আদেশ কার্যকর করার মাত্র। স্বাধীনতার পরে দক্ষিণপন্থি একটি বাংলা দৈনিক লিখেছিল- কমিউনিস্টদের আন্ডাবাচ্চা সমেত খুঁজে বের করতে হবে; একাত্তর সালে চরম দক্ষিণপন্থি পাকিস্তানি সেনাবাহিনী প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য শিশু-বৃদ্ধ সব দেশপ্রেমিকেরই খোঁজ করছিল, কুকুরের মতো, গন্ধ শুঁকে শুঁকে। সন্দেহভাজন যাকেই পেয়েছে হত্যা করেছে। কিন্তু ওই চরম নির্যাতনেও দেশপ্রেম নিহত হয়নি। নিহত হবে কী, উলটো শক্তিশালী হয়েছে, অগ্নি পরীক্ষিত ইস্পাতের মতো। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও বহু মানুষ সেদিন ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলতে সম্মত হয়নি, বরঞ্চ ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি দিতে দিতে বুক পেতে দিয়েছে, গুলিতে নিহত হওয়ার জন্য।

অমনভাবে পরীক্ষিত যে দেশপ্রেম, স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে যুগের পর যুগ ধরে যে যে লড়ছিল, স্বাধীনতার পরে এখন দেখছি তার ভীষণ দুর্দশা। স্বাধীনতার পর ক্রমাগত আঘাত পেয়েছে, পেয়ে পেয়ে এখন বেশ কাতর হয়ে পড়ে রয়েছে। এ এক আশ্চর্য ব্যাপার, একটি লক্ষ্য ধরে এগুচ্ছিল, লক্ষ্যে পৌঁছে দেখে সে আক্রান্ত, বিপদগ্রস্ত। এর অর্থ কী? স্বাধীনতার লক্ষ্য অর্জিত হয়ে গেছে তাই কি দেশপ্রেমের এই নিবীর্য অবস্থা? মোটেই তা নয়। ঘটনা সম্পূর্ণ বিপরীত। মুক্তি তো অনেক দূরের কথা, সে তো সহজে আসে না, এসেছে বলে শোনার পরেও বোঝা যায় যে আসেনি; এমনকি স্বাধীনতাও আসেনি। এসেছে যা তা হলো অল্পকিছু লোকের পক্ষে স্বৈরাচারী হওয়ার সুযোগ। এরাই রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে রেখেছে, কখনো নির্বাচনের মধ্য দিয়ে, কখনোবা সরাসরি অভ্যুত্থান ঘটিয়ে। এরাই বড় বড় আমলা, খুব বড় ব্যবসায়ী, কেউ বা মোল্লা, ফতোয়া দেয়, কেউ সরকার-সমর্থিত ষণ্ডা, ছিনতাই করে, ধর্ষণও করে থাকে। এরা অপচয় করে, পাচার করে দেয় সম্পদ। দেশকে উৎপাদনকারী হতে দেয় না, করে রাখে ব্যবসানির্ভর, যাতে তাদের সুবিধা হয়; কমিশন পায়। স্বাধীনতা এদেরই। আর এই স্বাধীনতার হাতেই দেশপ্রেম আহত হয়েছে, নিহত যে হয়নি, সেটা আমাদের কপালের জোর।

এসব বিলাসী ও উচ্ছৃঙ্খল ক্ষমতাধররা সবাই আত্মপ্রেমিক, এদের মধ্যে দেশপ্রেমের নামগন্ধ নেই। ইতিহাসের মস্তবড় পরিহাস এটা যে, পরাধীনতার কালে আমরা দেশপ্রেমিক ছিলাম, স্বাধীনতার পর উপক্রম হলো দেশপ্রেমকে হারাবার। অনেককাল আমরা পরাধীন ছিলাম। ব্রিটিশের দুইশ বছর, পাকিস্তানের চব্বিশ বছর; সেই দীর্ঘ সময় ধরে স্বপ্ন ছিল আমরা স্বাধীন হবো, আশা ছিল, ছিল ভরসা; স্বাধীনতার পর দেখা গেল মার খেয়েছে দেশপ্রেম স্বয়ং।

দেশপ্রেম এবং আত্মপ্রেম পরস্পর বিরুদ্ধ বটে। কিন্তু প্রকৃত ও আলোকিত দেশপ্রেমের সঙ্গে আত্মপ্রেমের বিরোধ অবশ্যম্ভাবী নয়। কেননা ব্যক্তির মুক্তি তো আসলে সমষ্টির মুক্তির মধ্যেই নিহিত। একা কোন মানুষটা কবে স্বাধীন হয়েছে? দ্বীপে যে থাকে, অথবা বনবাসে, তার তুলনায় পরাধীন আবার কে? দেবতা ও পশুর কথা আলাদা, স্বাভাবিক মানুষ স্বাধীন হয় সমাজের ভেতরে থেকেই। এবং সমাজ যদি নষ্ট হয়, তবে ব্যক্তি কী করে স্বাধীন হবে? যে পুকুরের পানি গেছে পচে, সেখানে কোন মাছটা নিরাপদ, শুনি? যে আত্মপ্রেমের চর্চা চলছে আজ বাংলাদেশে, তাতে ভবিষ্যতে এ দেশ মনুষ্য বসবাসের যোগ্য রইবে এমনটা ভরসা করা সহজ নয়। সত্যি কঠিন।

পরাধীনতার যুগে আমরা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়েছি। ব্রিটিশের রাষ্ট্র আমাদের শত্রু ছিল, পাকিস্তানি রাষ্ট্রও আমাদের শত্রু ছিল, কিন্তু বাংলাদেশি রাষ্ট্র? সেও কি শত্রু? শত্রু না হোক, এ রাষ্ট্র জনগণকে স্বাধীনতা দিচ্ছে না এটা ঠিক। এ রাষ্ট্রের কর্তারা স্বাধীনভাবে জনগণের ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছে। এই নির্মম সত্যটাকে তো সাধারণ মানুষকে দিনে দিনে ক্ষণে ক্ষণে প্রদক্ষিণ করতে হচ্ছে। পাকিস্তান আমলে বৈরী রাষ্ট্রের পক্ষে ছিল মুসলিম লীগ, বিপক্ষে আওয়ামী লীগ। এখন বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয় দলই রাষ্ট্রের পক্ষে, অর্থাৎ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার পক্ষে। জনগণের পক্ষে কেউ নেই। না, নেই। জনগণের জন্য বড় কোনো রাজনৈতিক দল নেই যারা ডাক দেবে দেশপ্রেমের নামে, বলবে রাষ্ট্রের এই পুরাতন স্বভাব বলবৎ রাখার জন্য আমরা লড়িনি; একে বদলানো চাই, বদলাতে হবে।

পাকিস্তানের পক্ষে লোকে একদিন জিন্দাবাদ দিয়েছিল, নইলে সে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলো কী করে? সেদিন বিপক্ষে ছিল কংগ্রেস, পক্ষে মুসলিম লীগ। লোকে ভাবল পাকিস্তান এলে তাদের জন্য স্বাধীনতা আসবে। পাকিস্তানের পক্ষে তাই ভোট পড়েছিল শতকরা ৯৭টি। সেই ভোট দেশপ্রেমের। কিন্তু দেখা গেল যে নতুন রাষ্ট্র প্রতিশ্রæতি রক্ষা করল না, স্বাধীনতা চলে গেল অল্পকিছু লোকের হাতে। সাত বছর পার হতে না হতেই ১৯৫৪ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে পূর্ববঙ্গের মানুষ আরো বর্ধিত হারে, এবার শতকরা ৯৮ জনই ভোট দিল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবিদার মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে। এ ভোটও দেশপ্রেমিক ভোটই। তারপরে, বাংলাদেশে ভোট হয়েছে, কিন্তু স্রোতের মতো মানুষ যে একদিকে এগোবে সেটা ঘটেনি। কেননা কোনো দলকেই মানুষ প্রকৃত অর্থে দেশপ্রেমিক মনে করেনি, মনে করেছে তারা ক্ষমতার জন্য লড়ছে। কামড়াকামড়িই করছে, বলতে গেলে।

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর থেকে দুটি ঘটনা একই সঙ্গে এবং ক্রমাগত বর্ধিত মাত্রায় ঘটেছে। প্রথমটি হলো দেশপ্রেমের পতন, অপরটি বৈষম্যের বৃদ্ধি। এদের আলাদা আলাদা ব্যাপার মনে হবে; কিন্তু আসলে এরা একই বিকাশের দুটি ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ মাত্র। আর সেই বিকাশটা হলো পুঁজিবাদের। পুঁজিবাদ ছাড়া যে বিকল্প নেই এবং ওটিই যে সবচেয়ে ভালো আদর্শ এই বোধ ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বের মধ্যে কার্যকর ছিল; পাকিস্তান-বিরোধী আন্দোলনের নায়করাও এই আদর্শেই দীক্ষিত ছিলেন। ফলে পুঁজিবাদই কায়েম হয়েছে। আর পুঁজিবাদের নিয়মইতো এটা যে, সে বৈষম্য বৃদ্ধি করবে; ধনীকে আরো ধনী এবং গরিবকে আরো গরিব করে ছাড়বে। সেটাই ঘটেছে; স্বাধীনতা চলে গেছে ধনীদের হাতে, গরিব হয়েছে বঞ্চিত মানুষ। আর ধনী যারা তারাতো আসলে দেশপ্রিমিক নয়, তারা অত্যন্ত স্থূল কদর্যরূপে আত্মপ্রেমিক বটে।

দেশপ্রেম থাকা না থাকার বাস্তবতাটা বেশ পরিষ্কারভাবে চোখে পড়ে যদি শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকাই। সেখানে ভবিষ্যতের নাগরিকরা সব প্রস্তুত হচ্ছে, আড়ামোড়া ভেঙে। যারা ইংরেজি মাধ্যমে পড়ছে, তারা তো স্বদেশপ্রেমের চর্চা করার জন্য মোটেই অঙ্গীকারবদ্ধ নয়। অনেক টাকা বিনিয়োগ করছে, সেই টাকা তুলে নেবে, মুনাফা করবে। মুনাফার এই নগদ লোভটা যে দেশপ্রেমের পৃষ্ঠপোষক নয় সে তো বলার অপেক্ষাই রাখে না। যারা মাদ্রাসায় পড়ছে তারাও দেশের কথাকে অগ্রাধিকার দেবে না, অন্ন চিন্তাকেই প্রধান করবে; এবং পরবর্তীতে যেহেতু তাদের অধিকাংশই জীবন-সংগ্রামে পরাভূত হবে তাই ধরে নিলে খুবই ভুল করা হবে যে, দেশের জনগণের প্রতি ভালোবাসা তাদের মধ্যে উথলে পড়বে। মূলধারা বাংলা মাধ্যমেরই; কিন্তু সেখানেও ভেজাল খুব বেশি; আর ভেজাল জিনিস কখনোই দেশপ্রেমের মতো খাঁটি বস্তুকে উৎসাহিত করতে পারবে না, পারাটা তার স্বভাববিরুদ্ধ।

পুঁজিবাদ যে দেশপ্রেমবিরোধী এটা স্বতঃসিদ্ধ। বাংলাদেশ ওই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অন্তর্গত একটি প্রান্তিক রাষ্ট্র। এর পক্ষে স্বাধীন হওয়া একটি কল্পকাহিনীতে পর্যবসিত হবে বলে আশঙ্কা। কেননা বাংলাদেশকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিশ্বব্যাপী আয়োজনের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হচ্ছে; যে নির্ভরশীলতা মোটেই কমছে না, বরঞ্চ দিনে দিনে বেড়েই চলেছে, ক্রমাগত।

২.

এই যে দেশপ্রেমের বিপুল প্রবাহকে রক্ষা করতে আমাদের ব্যর্থতা, এর জন্য দায়ী কে? এক কথায় বলতে গেলে দায়ী হচ্ছে নেতৃত্ব। নেতৃত্বকে আমরা দোষী করছি আমাদের নিজেদের দায়িত্ব এড়াবার জন্য নয়, করছি নেতারা দায়িত্ব নিয়েছিলেন বলে।

বারবার দেশপ্রেমিক আন্দোলন হয়েছে, আমাদের দেশে। সবক’টিই ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, অর্থাৎ অসংগঠিত নয়। সামনে নেতারা ছিলেন, কিন্তু তারা সংগঠন গড়ে তুলতে পারেননি। দ্বিতীয়ত, সেটাই আসলে প্রধান দুর্বলতা, নেতারা জানতেন না কোন লক্ষ্য অর্জনের জন্য তারা লড়ছেন। স্পষ্ট ধারণা ছিল না। হয়তো অস্পষ্ট একটা স্বপ্ন ছিল, কিন্তু তা কী করে অর্জন করতে হবে জানা ছিল না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বপ্নটাও ছিল অনুপস্থিত। ছিল কেবল একটি নেতিবাচক ধারণা। হটাবার ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন, কিন্তু গড়বার ব্যাপারে ছিলেন না।

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের কথাই ধরা যাক। সে তো এক বিরাট বড় ঘটনা, তার তাৎপর্যও বিপুল। কিন্তু সে আন্দোলন ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছিল না বললেই চলে। বরঞ্চ বলা যায় যে, জাতীয় যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, যারা সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেছিলেন, তারা প্রত্যাখ্যাত হয়ে গিয়েছিলেন একুশে ফেব্রুয়ারি সকালেই। তাদের সিদ্ধান্ত ছিল ১৪৪ ধারার নিষেধাজ্ঞা অমান্য না করার। ছাত্ররা তাদের সে নির্দেশ মানেনি, তারা এগিয়ে গেছে, প্রাণ দিয়েছে এবং আন্দোলন অভূতপূর্ব ব্যাপকতা নিয়ে এসেছে। বাইশে ফেব্রুয়ারি গায়েবি জানাজা হয়েছিল। একুশের আন্দোলনে জাতীয় পর্যায়ের সংগ্রাম পরিষদ নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছে, নেতৃত্ব দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি; বাইশ তারিখে গায়েবি জানাজার যে আহ্বান সেটিও বিশ্ববিদ্যালয় কমিটিই জানিয়েছে। জানাজা হবে সকালবেলা, মেডিকেল কলেজ চত্বরে। সকাল হয়েছে, সময় এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু জমায়েত দেখা যাচ্ছে না। অল্পকিছু ছাত্র উপস্থিত। অবাক কাণ্ড ঘটল কিছুটা পরে। গর্জন শোনা গেল জনতার। দেখা গেল সচিবালয়ের দিক থেকে হাজার হাজার সরকারি কর্মচারী আসছে জানাজায় যোগ দিতে। মিছিল ক্রমেই বড় হয়েছে। আরো মানুষ এসেছে। জানাজা শেষে আবার মিছিল বের হয়েছে। তাতে ছোট ছোট মিছিল যুক্ত হয়েছে। পুলিশ গুলি ছুড়েছে। মানুষ ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে। কিন্তু তারা আবার যোগ দিয়েছে। সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক আবদুল মতিন মিছিলেই ছিলেন। কিন্তু তার কমিটি মিছিলের নেতৃত্ব দিচ্ছিল না। আবদুল মতিন বরঞ্চ পরে বলেছেন, তখন তার মনে হয়েছিল যে, এই মিছিল কোথায় যাচ্ছে তা আমরা জানি না।

এটাই হচ্ছে বাস্তবতা। এক নেতৃত্ব ব্যর্থ হয়, অন্য নেতৃত্ব আসে, কিন্তু নতুন নেতৃত্বও বলতে পারে না কোথায় যেতে হবে, লক্ষ্যটা কী? বায়ান্নর পরে চুয়ান্নতে নির্বাচন হয়েছে। লক্ষ্য কী? লক্ষ্য ছিল লীগকে হটিয়ে লীগবিরোধী যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় বসবে। লীগ হটে গেল। কিন্তু ক্ষমতালোভীরা ঐক্যবদ্ধ রইল না, তারা ভাগ হয়ে ভয়ঙ্কর এক গৃহযুদ্ধ বাধিয়ে দিল। ঊনসত্তরের অভ্যুত্থানেও একই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। জনগণ সামরিক শাসনকে প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু তারপরে কী করতে হবে, কোনদিকে এগোতে হবে তার জন্য কোনো পরিচালক সংগঠন কিংবা নেতৃত্ব ছিল না। ছয় দফা আন্দোলনের সময় নেতৃত্ব ছিল আওয়ামী লীগের, কিন্তু ছয় দফা চাওয়া হয়েছিল পূর্ব আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের লক্ষ্যে, স্বাধীনতার কথা ছয় দফাপন্থিরা তখন কেউ বলেনি। একাত্তরেও বলত না, যদি সামরিক শাসকরা ছয় দফার ভিত্তিতে একটি সংবিধান রচনার উদ্যোগ নিত। আপসের পথে ওরা যায়নি, বরঞ্চ বাঙালি-হত্যায় নেমেছে, যে জন্য অনিবার্য হয়ে পড়েছিল একাত্তরের যুদ্ধ।

যুদ্ধ শুরুর আগে ৭ মার্চ তারিখে শেখ মুজিবুর রহমান যে বক্তৃতাটি দেন সেটি অসাধারণ, তাঁর দেয়া বক্তৃতার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ নিঃসন্দেহে। এতে তিনি চুয়ান্নর নির্বাচনের কথা উল্লেখ করেছেন; বলেছেন, ‘১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করেও আমরা গদিতে বসতে পারেনি’। এ বড় সত্য কথা, একাধিক অর্থে। প্রথমত, গদিতে বসাই ছিল নেতৃত্বের লক্ষ্য, তার চেয়ে বেশি কিছু নয়। দ্বিতীয়ত, গদিতে বসতে তারা ব্যর্থ হয়েছেন, যদিও কেন হয়েছেন তার কারণ উল্লেখ করেননি, ওই মুহূর্তে সেটা প্রাসঙ্গিকও ছিল না। বক্তৃতার এই কথাটা বলা হয়েছিল যে, চুয়ান্নতে যেমন আমাদের বঞ্চিত করা হয়েছে, আশঙ্কা হচ্ছে এবারও তাই করা হবে। তবে এবার জনগণ তা মেনে নেবে না। নেবে না যে তার লক্ষণ ও প্রমাণ সারা বাংলাদেশ জুড়ে তখন দৃশ্যমান। শেখ মুজিবুর রহমান যেখানে ওই বক্তৃতা দিচ্ছিলেন সেখানে লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিও একই কথা বলছিল। শেখ মুজিব তাঁর বক্তৃতায় মুক্তির কথা বলেছেন, স্বাধীনতার কথা বলেছেন। অমন বক্তব্য অমনভাবে, অত লোকের সামনে আগে কখনো আসেনি। কিন্তু তিনি আবার সমঝোতার পথও খোলা রেখেছিলেন; যে পথে তারা আসবে বলে ইয়াহিয়া ও তার জল্লাদেরা পরে ভান করেছিল, চূড়ান্তভাবে ঝাঁপিয়ে পড়বার আগে। মুজিব বলেছিলেন তিনি যদি হুকুম দিতে নাও পারেন তবুও জনগণের কাছে অনুরোধ রইল, ‘তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শক্রর মোকাবেলা করো।’ কিন্তু কীভাবে? শত্রুর আছে বিমানবাহিনী, ট্যাঙ্ক বাহিনী, আছে কামান, মর্টার, রকেট লঞ্চার, জনগণের আছে কী? দা, কোদাল কিংবা গাদা বন্দুক ছাড়া? তা দিয়ে কীভাবে লড়াই হবে? পথনির্দেশ ছিল না, কিন্তু অনুরোধ ছিল। জনগণ যুদ্ধ করেছে ঠিকই, তবে আবারো সেই স্বতঃস্ফূর্তভাবেই। আওয়ামী লীগের নেতারা জানতেন না কী করতে হবে, দিশাহারা হয়ে তারা শহর ছেড়েছেন, সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে গেছেন; সেখানে গিয়েও যে তারা ঐক্যবদ্ধ ছিলেন তা নয়, নানারকম বিরোধে লিপ্ত ছিলেন। সব মুক্তিযুদ্ধেরই একটি প্রস্তুতি থাকে, সংগঠিত নেতৃত্ব থাকে, থাকে আন্তর্জাতিক সমর্থন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এসব কিছুই ছিল না। তবু জনগণ লড়েছে এবং শত্রুকে পরাজিত করেছে।

জয়ের পর নেতারা ভাবলেন জয়টা তাদেরই। একাত্তরে যারা দিশাহারা হয়েছিলেন বিপদের আকস্মিকতায়, বছর না ঘুরতে তাদেরই দেখা গেল দ্বিতীয়বার বেসামাল হয়েছেন- বিজয়ের আকস্মিকতায়। কী করবে ভেবে উঠতে না পেরে তারা হাতের কাছে যা যা পেল দখল করতে শুরু করে দিল। ওটিই হয়ে দাঁড়াল আদর্শ। পাকিস্তানি হানাদারেরা লুটপাট করেছে, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ছিল; এখন যখন দেখা গেল যে যুদ্ধজয়ী বীরেরা নিজেরাই ওই একই কাজ করছে তখন প্রতিরোধ করবে কে, কার ঘাড়ে কতটা মাথা? প্রতিরোধ সম্ভব ছিল না। তাই দেখা দিল হত্যাকাণ্ড, দুর্ভিক্ষ, একদলীয় শাসন, সামরিক অভ্যুত্থান। এসব কোনো ঘটনাই মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম বৃদ্ধি করল না, উল্টো বরঞ্চ দেশপ্রেমকে আঘাত করতে থাকল, ক্রমাগত।

একাত্তরে বাঙালির রণধ্বনি ছিল, ‘জয় বাংলা’। ওই ধ্বনি এখন সর্বজনীনতা পেয়েছিল যে হানাদার বাহিনীর একজন কর্মকর্তা তার স্মৃতি কথায় লিখেছেন যে, তার তিন বছরের কন্যাটিও ওই ধ্বনি দিয়ে ছোটাছুটি করত। অথচ পরে ওই ধ্বনি খোদ বাঙালিদের মধ্যেই স্তিমিত হয়ে এসেছে। আসার কারণ ব্যর্থতার বোধ। বাঙালি পরিচয় একাত্তরে যে সম্মান বয়ে আনতো পরে তা মলিন হয়ে এসেছে- ধারাবাহিকভাবে।

নেতৃত্বের বর্থতার কথা বলছিলাম। নেতৃত্ব কেবল যে ব্যর্থ হয়েছে তা তো নয়, জুলুমও করেছে। একটি ছোট ঘটনায় উল্লেখ করা যায়, যেটি নেতৃত্বের চরিত্রকে ধরিয়ে দেয়। তারেক ও ক্যাথরিন মাসুদের প্রামাণ্যচিত্র ‘মুক্তির গান’-এ একটি দৃশ্য ধরা পড়েছে। এক যুবক খাঁচায় করে একটি টিয়া পাখি নিয়ে যাচ্ছে এবং পাখিটিকে বলছে, ‘বল, জয় বাংলা বল’। অবিকল হানাদার বাহিনীর মতো আচরণ, যারা আটকে-পড়া বাঙালিদের বলত, ‘বল, পাকিস্তান জিন্দাবাদ বল’। পাখি-বহনকারী ওই যুবকটি নেতা ছিল কিনা জানি না, কিন্তু তার মধ্যে বিলক্ষণ নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য ছিল। পুঁজিবাদী নেতৃত্বের।

২৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj