নির্বাচনের বছরে গণমাধ্যমের ভূমিকা : শাহরিয়ার কবির

বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

২০১৮ সালকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন নির্বাচনের বছর। নির্বাচনের এই বছর বাংলাদেশের জনগণ এবং গণমাধ্যমকে বহু অভূতপূর্ব ঘটনা, ষড়যন্ত্র ও সংঘাত প্রত্যক্ষ করতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করছি। এসব সংকট মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে যেমনটি আমরা দেখেছি ২০০১ সালে এবং ২০১৪ সালে।

২০১৪ সালে জামায়াতের প্ররোচনায় নির্বাচন বর্জন করেছিল বিএনপি। জামায়াত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারলে বিএনপি সেই নির্বাচনে যাবে না, বলা হয়েছে জামায়াতকে বাদ দিয়ে নির্বাচন ‘গ্রহণযোগ্য’ বা ‘ইনক্লুসিভ’ হবে না। ২০১৩ সালে প্রথমে উচ্চতর আদালত এবং পরে নির্বাচন কমিশন জামায়াতে ইসলামীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করেছিল। কারণ জামায়াতের গঠনতন্ত্র বাংলাদেশের সংবিধান এবং গণতন্ত্রের পরিপন্থী। গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত হচ্ছে আইনপ্রণেতারা হবেন জনগণের দ্বারা নির্বাচিত। যে কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক জনগণ। জামায়াত জনগণের সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করে না। জামায়াত রাষ্ট্র এবং দলের ভেতরও নারী-পুরুষ কিংবা মুসলিম-অমুসলিম নাগরিকের সমঅধিকার ও সমমর্যাদায় বিশ্বাস করে না। জামায়াত নারী নেতৃত্বকে হারাম মনে করে। এসব কারণে বাংলাদেশে জামায়াতকে রাজনীতি করারও অযোগ্য ঘোষণা করা উচিত ছিল। উচ্চতর আদালত অতদূর যেতে চায়নি- শুধু নির্বাচনের অযোগ্য ঘোষণা করেছে।

২০১৪ সালে জামায়াতকে এবং জামায়াতের প্রধান মুরব্বি পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইকে খুশি করতে গিয়ে বিএনপি শুধু নির্বাচন বর্জন করেনি, যারা তাদের বারণ অমান্য করে ভোট দিতে গিয়েছিলেন সেই সব মানুষের ঘরবাড়িতে আগুন দিয়েছে, জনপরিবহনে আগুন দিয়ে জ্যান্ত মানুষ পুড়িয়ে মেরেছে, শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভস্মীভূত করেছে। ২০০১-এর মতো ব্যাপকভাবে না হলেও বহু জায়গায় সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায় ও আদিবাসীরা জামায়াত-বিএনপির আগুন সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে।

১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে বিএনপি যে ভুল করেছিল তার মাসুল এখনো তারা দিচ্ছে। গণতন্ত্রের জন্য রাজনৈতিক আন্দোলনকে বিএনপি সন্ত্রাসের সমার্থক শব্দে পরিণত করেছে। ২০১৪ সাল থেকে মানুষ বিএনপির ডাকা হরতালে স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে অংশগ্রহণ করে না। সন্ত্রাসের ভয়ে দোকানপাট বন্ধ থাকে, লোকজন ঘর থেকে বেরোয় না। আমাদের ধারণা বিএনপি যদি বুঝতে পারে নির্বাচনে তারা সুবিধে করতে পারবে না, অবধারিতভাবে সন্ত্রাসের পথ বেছে নেবে, অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করবে। গত ৮ বছরে এরকম একাধিক ষড়যন্ত্র বিএনপি-জামায়াত করেছে এবং এর ফলে জনবিচ্ছিন্ন হয়েছে। তবে জামায়াত-বিএনপির জনসমর্থন না থাকলেও সন্ত্রাস ও অরাজকতা সৃষ্টি করার সামর্থ যথেষ্ট পরিমাণে আছে।

জামায়াত-বিএনপির টাকার অভাব নেই। টাকা দিলে শুধু সন্ত্রাসী নয়, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদেরও কেনা যায়। গত ৮ বছরে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে বহু জায়গায় স্থানীয় নেতাদের টাকা দিয়ে জামায়াতের নিবেদিত, পরীক্ষিত কেডাররা আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ করেছে। আওয়ামী লীগের সভাপতি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের বিভিন্ন ফোরামে বহুবার বলেছেন- আওয়ামী লীগ এত দেউলিয়া হয়ে যায়নি যে জামায়াত-বিএনপি থেকে লোক এনে দল ভারী করতে হবে। বহু জায়গায় দলের শীর্ষ নেতাদের অগোচরে জামায়াত-বিএনপির জেলা-উপজেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীরা আওয়ামী যোগ দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়ীও হয়েছে। জামায়াতের অন্যতম রণকৌশল হচ্ছে- আওয়ামী লীগের দুর্গকে যেহেতু বাইরে থেকে আঘাত করে পতন ঘটানো যাচ্ছে না সেহেতু দলের ভেতর অনুপ্রবেশকারী পাঠিয়ে ভেতর থেকে দুর্গ দখল করতে হবে। আগামী নির্বাচনে ১৪ দলীয় মহাজোটের জন্য বিএনপি বা জামায়াতের চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে নিজেদের দলের অনুপ্রবেশকারীরা, যারা দীর্ঘমেয়াদি ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই আওয়ামী লীগে ঢুকেছে।

বিএনপিকে দুর্বল করবার জন্য আওয়ামী লীগ কৌশল হিসেবে হেফাজতে ইসলামের প্রতি নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করছে। ২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে হেফাজতকে শিখণ্ডি হিসেবে ব্যবহার করে জামায়াত-বিএনপি সরকার উৎখাতের এক ভয়ঙ্কর চক্রান্ত করেছিল। আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থান এবং দক্ষ অভিযানের কারণে যা ফলপ্রসূ হয়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তখন বলেছিলেন, জামায়াত-হেফাজতকে আর ছাড় দেয়া হবে না। হেফাজতের শতাধিক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে হেফাজতের বাহ্যিক নমিত আচরণ দেখে আওয়ামী লীগ উগ্র মৌলবাদীদের এই সংগঠনকে কাছে টেনে নিয়েছে। ২০১৭ সালে হেফাজতের দাবি পূরণ করতে গিয়ে সরকার সাম্প্রদায়িক বিবেচনা থেকে স্কুলের পাঠ্যপুস্তকের তথাকথিত ইসলামীকরণ করেছে।

হেফাজতের নেতারা- যারা ২০১৩ সালে শেখ হাসিনার সরকারকে নাস্তিক মুরতাদদের সরকার বলেছিলেন তারা ২০১৫ সাল থেকে বলছেন আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের কোনো বিরোধ নেই, তারা শুধু নাস্তিকতার বিরুদ্ধে। এর পাশাপাশি হেফাজত নেতারা কিছুদিন পর পরই বলছেন- ২০১৩ সালে ঘোষিত তাদের ১৩ দফা দাবি থেকে তারা একচুলও নড়েননি। গত বছরের শেষে দিকে হেফাজতের এক নেতা বলেছেন আগামী নির্বাচনে যে দল ক্ষমতায় গিয়ে ব্লুাসফেমি আইন প্রণয়ন করবে তারা সেই দলকে সমর্থন দেবেন। হেফাজতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো নির্বাচনী সমঝোতা হয়েছে কি না আমরা জানি না। যদি হয় আওয়ামী লীগ বা মহাজোটের জন্য তা আত্মঘাতী হবে। কারণ মুখে যতই সমর্থনের কথা বলুক কিংবা সরকার যত নমনীয় হোক না কেন স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-হেফাজত কখনো আওয়ামী লীগকে ভোট দেবে না। কারণ একটি- আওয়ামী লীগ পাকিস্তান ভেঙেছে। জামায়াত-হেফাজত ১৯৭১-এ যেমন পাকিস্তানকে আল্লাহর ঘর মনে করত, এখনো তাই করে। আরেকবার যদি জামায়াত-বিএনপি ক্ষমতায় যায় বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত না হলেও দ্বিতীয় পাকিস্তানে রূপান্তরিত হবে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমরা ২০০১-এর মতো সাম্প্রদায়িক সহিংসতা আশঙ্কা করছি। ২০০১ সালে দলের ক্যাডাররা হিন্দুদের ওপর হামলা করেছিল। বর্তমান সরকারের আমলে তারা কৌশল পরিবর্তন করছে। বিভিন্ন অজুহাতে তারা অমুসলিম নাগরিকদের ওপর হামলার জন্য সাধারণ মানুষকে উত্তেজিত করছে; কখনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, কখনো মসজিদে নামাজের পর খুতবায়, কখনো বা ওয়াজের নামে। সাঈদীকে চাঁদে দেখার মতো অবিশ্বাস্য উদ্ভট কথা বলে গ্রামের অজ্ঞ মানুষকে উত্তেজিত করা যায়, ধর্ম অবমাননার কথা বলে মানুষকে উত্তেজিত করা যায়, ধর্মের বিকৃত ব্যাখ্যা করেও মানুষকে উত্তেজিত করা যায়। নির্বাচনের সময় মৌলবাদীরা ওয়াজ ও খুতবার নামে যেভাবে ভিন্নমত, ভিন্নধর্ম ও ভিন্ন জীবনধারায় বিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়ায় তা সামাজিক উন্মাদনা সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট। এসব ক্ষেত্রে সরকার বা নির্বাচন কমিশনের কোনো নজরদারি দৃশ্যমান নয়। আগামী নির্বাচনে ধর্ম একটি প্রধান বিষয়ে পরিণত হবে। কে কত বড় মুসলিম এটা প্রমাণের প্রতিযোগিতায় জানমাল যাবে অসহায় অমুসলিম নাগরিকদের।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রোহিঙ্গাও একটি বড় বিষয় হবে। সরকার মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পশ্চিমের গণমাধ্যমেই ‘মানবতার জননী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। রোহিঙ্গারা কত দিনে নিজেদের দেশে ফিরে যাবে, কিংবা আদৌ যাবে কিনা তা এখনো অনিশ্চিত। বার্মার সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে তাতে অনেক ফাঁক রয়েছে। বহুমাত্রিক উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক চাপ ছাড়া দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে বার্মা ফেরত পাঠানো সম্ভব হবে না। এই ধরনের চাপ প্রয়োগের ক্ষেত্রে যে সব উদ্যোগ প্রয়োজন সেগুলো দৃশ্যমান নয়। আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ‘ট্র্যাক টু ডিপ্লোম্যাসি’র কোনো ধারণা নেই। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে বার্মারও পেছনে পড়ে আছে।

রোহিঙ্গারা যাতে বার্মায় ফিরে না যায় এ জন্য জামায়াত-বিএনপি সর্বাত্মক তৎপরতা চালাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের বোঝানো হচ্ছে নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত না হলে তারা যেন বার্মায় ফিরে না যায়। ২০০১-২০০৫ সালে জামায়াত-বিএনপির জোট যখন ক্ষমতায় ছিল তখন এক লাখ রোহিঙ্গার নাম ভোটার তালিকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, এ তথ্য গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকেই আমরা জেনেছি। পরে ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে সেসব নাম বাদ দেয়া হয়েছে। জামায়াত রোহিঙ্গাদের সঙ্গে বাঙালিদের বিয়ে দিয়ে তাদের বাংলাদেশের নাগরিক বানাচ্ছে। জামায়াতের পোষা জঙ্গি সংগঠনগুলো রোহিঙ্গাদের জিহাদের খাতায় নাম লেখাচ্ছে। তাদের বলা হচ্ছে বার্মার বিরুদ্ধে জিহাদ করে আরাকান দখল করে স্বাধীন রোহিঙ্গা মুসলিম রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে, আরাকানসহ বাংলাদেশের বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলা এই রাজ্যের অংশ হবে। এ কারণে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে পুনর্বাসনেরও বিরোধিতা করছে বিএনপি-জামায়াত। তারা চায় নির্বাচন পর্যন্ত রোহিঙ্গারা যেন কক্সবাজারেই থাকে। রোহিঙ্গাদের নিয়ে জামায়াতের এই খেলা চলছে গত চার দশক ধরে। ১৯৯২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত নির্মূল কমিটির প্রথম ইশতেহারেও আমরা এর উল্লেখ করেছিলাম। সামান্য অর্থের বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের জঙ্গি বানিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করছে জামায়াত। জামায়াতের এ সব ষড়যন্ত্র বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও প্রতিহত করণের কোনো দলীয় বা সরকারি উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। এসব ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে নাগরিক সমাজেরও বিশাল দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

যে তরুণ নির্বাচকমণ্ডলী ২০০৮ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য শেখ হাসিনার মহাজোট সরকারকে ভোট দিয়েছিল, যারা নিজেদের জাহানারা ইমামের আন্দোলনের সন্তান ঘোষণা করে ২০১৩ সালে শাহবাগ চত্বরে ছাত্র-জনতার মহাজাগরণ সৃষ্টি করেছিল, তাদের অনেকেই হতাশ হয়ে দেশত্যাগ করেছে। গণহত্যাকারী ও যুদ্ধাপরাধী হিসেবে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের বিচার হলেও দল হিসেবে জামায়াতের বিচার ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এখনো পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আরম্ভ হয়নি। এই বিচার না করার কারণে পাকিস্তানিরা এখন ১৯৭১-এর গণহত্যার দায় মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর ওপর চাপাতে চাইছে। পাকিস্তানের অপপ্রচারের কারণে বাংলাদেশের গণহত্যা এখনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এখনো পশ্চিমা লেখকদের বয়ানে ‘গৃহযুদ্ধ’ থেকে গেছে। গত বছর (২০১৭) নির্মূল কমিটির ধারাবাহিক দাবি ও আন্দোলনের কারণে সরকার ২৫ মার্চ ‘জাতীয় গণহত্যা দিবস’ ঘোষণা করেছে। জাতীয় সংসদে গৃহীত প্রস্তাবে গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির উদ্যোগ নেয়ার কথা বলা হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমাদের নিরুৎসাহিত করবার চেষ্টা লক্ষ করেছি। আগামী নির্বাচনে তরুণ নির্বাচকমণ্ডলীকে এসব প্রশ্নের জবাব দিতে হবে।

আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট সরকারের অভূতপূর্ব সাফল্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হলেও বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার অব্যাহত রেখেছে। আওয়ামী লীগের বড় দুর্বলতা হচ্ছে প্রচারের ক্ষেত্রে। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ থেকে আরম্ভ করে শেখ হাসিনার বর্তমান সরকারের আমলে যে সব সাফল্য অর্জিত হয়েছে এগুলো দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরার ক্ষেত্রে যেমন ঘাটতি রয়েছে, তেমনি ঘাটতি রয়েছে বিরুদ্ধপক্ষের সমালোচনার উপযুক্ত জবাবে ক্ষেত্রেও।

জামায়াত-বিএনপি তাদের পক্ষে কাজ করবার জন্য বিদেশে বহু লবিস্ট নিয়োগ করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাইবার যুদ্ধে তারা আওয়ামী লীগের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে। এসব ক্ষেত্রে তরুণ প্রজন্মকে ব্যাপকভাবে যুক্ত করতে হবে। বিদেশে লবিস্ট নিয়োগের পাশাপাশি প্রবাসী বাঙালিদের মেধা ও দেশপ্রেম কাজে লাগাতে হবে। বাইরে দেখেছি অনেকে কাজ করতে আগ্রহী কিন্তু তাদের কাজে লাগানোর কোনো পরিকল্পনা নেই সরকারের। যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডন জামায়াত-বিএনপির প্রধান দুর্গে পরিণত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের যারা বিদেশে থাকেন, যারা দেশ ও জাতির জন্য কাজ করতে চান বহু জায়গায় তারা আওয়ামী লীগের দলীয় কোন্দলের কারণে হতাশ হয়ে নিজেদের গুটিয়ে রেখেছেন।

আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় পুঁজি হচ্ছে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৭২-এর সংবিধান। এই পুঁজি ব্যবহারে আওয়ামী লীগের কার্পণ্য কিংবা অনীহা জামায়াতের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অবস্থানকে শক্তিশালী করবে। মাঠ পর্যায়ে সরকারের জঙ্গি দমন কার্যক্রম আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হলেও তাবৎ জঙ্গি মৌলবাদী সন্ত্রাসের গডফাদার জামায়াতের কার্যক্রম নিষিদ্ধকরণের দাবি এখনো পূরণ হয়নি। গত বছর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার কারণে কোথাও বড় ধরনের জঙ্গি হামলা হয়নি বটে তবে এ কথাও অস্বীকার করা যাবে না- রাজনীতি, সমাজ, শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে মৌলবাদীকরণ ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাচ্ছে। নির্বাচনের বছর বাংলাদেশে জামায়াত ও আইএসআই-এর গোপন তৎপরতা ও ষড়যন্ত্র বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

বঙ্গবন্ধুকে মান্য করব, কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক দর্শন যা প্রতিফলিত হয়েছিল ১৯৭২-এর সংবিধানে, তা অমান্য করব- এমন ধারা চলতে থাকলে মাথাপিছু আয় বাড়তে পারে, কিন্তু সভ্য জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো যাবে না, যেখানে বঙ্গবন্ধু দেশ ও জাতিকে নিতে চেয়েছিলেন। সৌদি আরবের মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের ২০ গুণেরও বেশি। সভ্যতার বিচারে আমরা যে কোনো সূচকে সৌদি আরবের চেয়ে উন্নত। শুধু জিডিপি বাড়িয়ে সৌদি আরবের মতো অসভ্য দেশ নিশ্চয়ই আমরা হতে চাইব না। আওয়ামী লীগ ও মহাজোটের নির্বাচনী ইশতেহারে আমরা দেখতে চাই বাংলাদেশকে তারা কোথায় নিয়ে যেতে চান। আমরা দেখতে চাই মহাজোট আবার ক্ষমতায় এলে আর্থসামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও হীরকজয়ন্তীতে প্রগতিশীল শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মানবাধিকারের সূচকে বাংলাদেশের মর্যাদা কতটা বৃদ্ধি পাবে। মর্যাদার বৃদ্ধির এই নিদান নতুন করে আবিষ্কারের কিছু নেই, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন অনুসরণ করলেই আওয়ামী লীগ বাংলাদেশকে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে নিয়ে যেতে পারবে।

বাংলাদেশের গণমাধ্যমের সচেতন অংশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের সংগ্রামে সব সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। নির্বাচনের বছর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিনাশী অপশক্তিকে প্রতিহতকরণের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকে ইতিহাস নির্ধারিত দায়িত্ব সাহস ও সততার সঙ্গে পালন করতে হবে।

২৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj