ভারতীয় রাজনীতিতে বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধার লোকটিই নিখোঁজ : অমিত গোস্বামী

বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পরে, সে বছরের ১৫ অক্টোবর মুখ্যমন্ত্রীদের লেখা প্রথম চিঠিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নেহরু লিখেছিলেন, ভারতীয় মুসলমানদের উন্নতি প্রয়োজন। উদাহরণ হিসাবে নেহরু সেই সময় জিন্নার একটি বক্তৃতার কথাও উল্লেখ করেন। যে বক্তৃতায় জিন্নাহ বলেছিলেন, পাকিস্তানের ভিতরে সংখ্যালঘুদের উন্নয়নের দিকটিও দেখতে হবে। যদি পাকিস্তানের ভিতরে ধর্মীয় সংহতি প্রতিষ্ঠিত করা যায় তা হলে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের হামলার আশঙ্কাও কমবে। জিন্নাহর ওই বক্তৃতার দৃষ্টান্ত দিয়ে নেহরু মুখ্যমন্ত্রীদের বলেছিলেন, ভারতেও সংখ্যালঘু এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের মিলন প্রয়োজন। ভারতীয় মুসলমানরা ভারতীয়। কিন্তু মুসলমান সমাজকে তোষণ করার নীতি সম্পূর্ণ অর্বাচীনের কাজ। কোনও ধরনের তোষণ অথবা রাজনৈতিক দুর্বলতা প্রকাশের প্রশ্নই ওঠে না। নেহরুর আশঙ্কাই ছিল, সংখ্যালঘু তোষণ করা হলে ভবিষ্যৎ ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সমাজেও প্রতিক্রিয়া শুরু হবে। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠবাদ- সেও কিন্তু দেশের সংহতি এবং অখণ্ডতা রক্ষার ক্ষেত্রে একটা বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

যে নেহরু আরএসএসের কার্যকলাপকে হিটলারের ফ্যাসিবাদের সঙ্গে তুলনা করছেন, সেই নেহরু সংখ্যালঘু তোষণের বিরুদ্ধেও সোচ্চার ছিলেন। বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। সঙ্ঘ পরিবারের মত, নেহরু বাস্তবে কিন্তু তোষণের নীতিকে বর্জন করেননি, বা চাইলেও বর্জন করতে পারেননি। কংগ্রেস ভারতে ৬০ বছরের বেশি সময় ধরে রাজত্ব করেছে। কাজেই নেহরু যে সংখ্যালঘু তোষণকে ‘কমপ্লিট ননসেন্স’ বলেছেন সেটিকে কংগ্রেস নেতৃত্ব বাস্তবে যদি ‘ননসেন্স’ করতে পারতেন, তা হলে হয়তো মুদ্রার অন্য পিঠ বিজেপি তথা সঙ্ঘ পরিবারের এই শ্রীবৃদ্ধি হতো না।

ভারতের রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে কংগ্রেস প্রসঙ্গ সর্বাগ্রে আসবেই। কারণ তাদের তীব্র আন্দোলনে ইংরেজ ভারত ছেড়েছিল এবং তথাকথিত স্বাধীনতা এসেছিল। কিন্তু কংগ্রেস নিয়ে আগে কিছু বলে নেওয়া যাক। পরাধীন ভারতবর্ষে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে কংগ্রেস নামক বৃক্ষের যে চারাটি রোপিত হয়েছিল ১৮৮৫-এর ২৮ ডিসেম্বর মুম্বাইর গোকুলদাস তেজপাল সংস্কৃত কলেজের হলঘরে। ১৮৮৫-এর যে কংগ্রেস; সেটা ছিল অনেকদিন পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘ডিবেটিং সোসাইটি’, যার কাজ ছিল, সরকারের কাছে আবেদনপত্র পাঠানো। মডারেট নেতা বাঙালি সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেসে ঢুকেই একটা ঝাঁকি লাগালেন। লালা লাজপত রায়, বালগঙ্গাধর তিলক এবং বিপিনচন্দ্র পাল- চরমপন্থি রাজনীতিক ‘চেঞ্জার আর নো চেঞ্জারের’ দল স্বরাজপন্থি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এবং মতিলাল নেহরুর নেতৃত্ব পার হয়ে অবশেষে বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে গান্ধীর আবির্ভাব। চরিত্রে পরিবর্তন এলো আবার কংগ্রেসের। গান্ধী কংগ্রেসকে শিক্ষিত ও অভিজাতদের হাত থেকে বের করে নিয়ে গেলেন দেশের নিম্নস্তরের জনগণের মধ্যে। গান্ধীর ভাবশিষ্য নেহরু একদিকে যেমন জাতীয়তাবাদী সংগ্রামকে অপেক্ষাকৃত পেছনের সারিতে রেখে অর্থনৈতিক বিপ্লবের দিকে ঝুঁকেছেন, তেমনই অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সুযোগের সদ্ব্যবহার করে সুভাষ চন্দ্রের বিদেশি শক্তিকে পর্যুদস্ত করার অভিপ্রায়; কমিউনিস্টদের গান্ধীকে লেনিনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার জিগির ছাপিয়ে গান্ধী স্থিতপ্রজ্ঞ অবস্থানে ছিলেন। তিনিই হয়ে ওঠেন জাতীয় সংহতির মূর্তপ্রতীক থেকে জাতির পিতা। গান্ধীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও অবশ্য মুসলিম রাজনীতি আঞ্চলিক নেতৃত্বে নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। স্বাধীন ভারতে কংগ্রেসেরও বিভাজন হয়েছে। ১৯৬৬ সালে দু’টুকরো হলো দলটি। একদিকে পুরনো সব নেতা, অন্যদিকে ইন্দিরা গান্ধী। ইন্দিরার আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে কংগ্রেস প্রশাসননির্ভর হয়ে পড়ে। ইন্দিরার সময় থেকেই যিনি প্রশাসনের মাথা তিনিই কংগ্রেসের কর্ণধার। রাজীব গান্ধীর আমল পর্যন্ত সেই ব্যবস্থাই চালু ছিল। সোনিয়া যখন হাল ধরেন, তখন পরিবারতন্ত্রের তামাদি অভিযোগ মাথা চাড়া দিয়েছিল কংগ্রেসের অভ্যন্তরে। সঙ্গে ছিল আরও এক ইস্যুবিদেশিনী সোনিয়া। কিন্তু যাবতীয় অভিযোগকে রীতিমতো চুপসে যেতে দিয়েছেন সোনিয়া নিজেই। প্রধানমন্ত্রিত্ব ফিরিয়ে দিয়েছেন। দলকে দু’দফায় ক্ষমতায় আনতে পেরেছেন। কিন্তু সরকারের মধ্যে সোনিয়া-রাহুলের অবস্থান ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ থাকায় খেসারত দিয়েছে কংগ্রেস। মনমোহন সিংয়ের প্রধানমন্ত্রিত্বকালে সিদ্ধান্তহীনতা, অপশাসন, দুর্নীতি, শরিক দলগুলোকে অবিশ্বাস দলকে ক্ষমতায় যেতে দেয়নি। মা-পুত্র জোটের মাধ্যমে মনমোহন সিং কতটা অসহায় ছিলেন, তা পদে পদে প্রমাণিত হয়েছে। সর্বশেষ নির্বাচনে কংগ্রেস ক্ষমতাচ্যুত হবার পর কলকাতায় কাগজে লেখা হয়েছে ‘রাহুল গান্ধী কতটা অপ্রাসঙ্গিক ও অপ্রয়োজনীয়তার দলের ও দেশের কাছে, তা আঙুলে আঙুলে প্রমাণিত। দরকার তাঁর দলকে বোঝা, যে দল এহেন রাহুল গান্ধী ছাড়া আর কোনো নেতা অতীত-বর্তমানে খুঁজে পায়নি।

বিজেপির পথ চলা শুরু হয় ভারতীয় জনসংঘের হাত ধরে। যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। ১৯৭৭ সালে এই ভারতীয় জনসংঘ মিশে যায় জনতা পার্টির সঙ্গে। এরপরে জনতা পার্টির সঙ্গে জনসংঘের নেতাদের মতানৈক্য ক্রমেই বাড়তে থাকে। ১৯৭৯ সালে জনতা পার্টির সরকার কেন্দ্রে পড়ে যাওয়ার পরে ১৯৮০ সালে তৈরি হয় নতুন দল বিজেপি। আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের পুত্র শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের তৈরি জনসংঘই আজকের বিজেপিতে রূপান্তরিত হয়েছে। শ্যামাপ্রসাদ প্রথমে কংগ্রেসের বেঙ্গল লেজিসটেটিভ কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। তবে পরে পদ থেকে ইস্তফা দেন। নির্দল হিসাবে নির্বাচনে লড়ে জয়লাভ করেন। পরে ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীন হলে পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় স্থান দেন। তবে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের চুক্তি পছন্দ না হওয়ায় ১৯৫০ সালের ৬ এপ্রিল তিনি ফের পদত্যাগ করেন।

এরপরে ১৯৫১ সালে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের সাথে আলোচনার পরে ১৯৫১ সালের ২১ অক্টোবর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তৈরি করেন ভারতীয় জনসংঘ এবং তার প্রথম সভাপতি নিযুক্ত হন। ১৯৫১-৫২ সালের লোকসভা নির্বাচনে জনসংঘ মাত্র ৩টি আসন পায়। তার মধ্যে একটি জিতেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ নিজে।

কাশ্মির ইস্যুতে বরাবর আক্রমণাত্মক ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। সংবিধানের ৩৭০ ধারা নিয়েও তিনি বারবার সরব হয়েছেন। হিন্দু মহাসভা ও রামরাজ্য পরিষদের সঙ্গে মিলে ভারতীয় জনসংঘ ৩৭০ ধারা নির্মূল করার জন্য সত্যাগ্রহ করেন। এরপর ১৯৫৩ সালে তিনি কাশ্মিরে গিয়ে গ্রেপ্তার হন। গ্রেপ্তার অবস্থাতেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন ও ১৯৫৩ সালের ২৩ জুন প্রয়াত হন।

বিজেপির উৎস ১৯৫১ সালে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ভারতীয় জনসংঘ দলটি। ১৯৭৭ সালে জরুরি অবস্থার পর জনসংঘ একাধিক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে মিশে জনতা পার্টি গঠন করে। ১৯৭৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে জনতা পার্টি ক্ষমতাসীন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসকে পরাজিত করে সরকার গঠন করে। ১৯৮০ সালে জনতা পার্টি অবলুপ্ত হলে জনসংঘের প্রাক্তন সদস্যরা বিজেপি গঠন করেন। প্রথম দিকে বিজেপি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছিল। ১৯৮৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজেপি মাত্র দুটি আসনে জয় লাভ করেছিল। কিন্তু রাম জন্মভূমি আন্দোলনের সময় আবার এই দলের শক্তি বৃদ্ধি পায়। একাধিক রাজ্য নির্বাচনে জয় লাভ এবং জাতীয় স্তরের নির্বাচনে ভালো ফল করার পর অবশেষে ১৯৯৬ সালে বিজেপি সংসদে বৃহত্তম দলে পরিণত হয়। যদিও সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারায় এই দলের সরকার মাত্র ১৩ দিন স্থায়ী হয়েছিল।

১৯৮৮ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর বিজেপি-নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট বা এনডিএ এক বছরের জন্য অটলবিহারী বাজপেয়ীর প্রধানমন্ত্রীত্বে সরকার গঠন করে। পরবর্তী নির্বাচনে এনডিএ আবার অটলবিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বেই সরকার গঠন করেছিল। এই সরকার পূর্ণ সময়ের জন্য স্থায়ী হয়। এটিই ছিল ভারতের প্রথম পূর্ণ সময়ের অ-কংগ্রেসি সরকার। ২০০৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে এনডিএ অপ্রত্যাশিতভাবে পরাজিত হয়। এরপর দশ বছর বিজেপি ছিল ভারতের প্রধান বিরোধী দল। ২০১৪ সালের নির্বাচনে গুজরাতের দীর্ঘকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি পুনরায় বিপুল ভোটে জয়ী হয়। সেই থেকে নরেন্দ্র মোদির প্রধানমন্ত্রিত্বে এনডিএ সরকার ভারতে ক্ষমতাসীন রয়েছে।

১৯৮০ সাল থেকে হিন্দু জাতীয়তাবাদ একটা নতুন চেহারা নেয়। ২০০১ সালের সেন্সাস অনুসারে, ১০০ কোটির মধ্যে শতকরা ৮০.০৫ ভাগ ছিল হিন্দু। মুসলিম ছিল শতকরা হিসেবে ১৩.০৪ ভাগ। ১৯৮০ এবং ১৯৯০ সালে এই হিন্দু সত্তাটিকে ভারতীয় রাজনীতিতে একটি জাতীয় সত্তায় পরিণত করতে বিজেপি তৎপর হয়। সম্প্রতি ‘রাউটলেজ হ্যান্ডবুক অফ রিলিজিয়ন অ্যান্ড পলিটিক্স’ গ্রন্থে হিন্দু জাতীয়তাবাদ সম্পর্কিত এক প্রবন্ধে গবেষক জেমস চিরিয়ানক্যান্ডাথ দেখিয়েছেন যে, ইন্দিরা গাঁধী তাঁর জনপ্রিয়তা রক্ষার জন্য যত বেশি করে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার শুরু করেন এবং তাতে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ সত্তাকেও কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন গণমাধ্যমে তার প্রভাব ফেলে। এবং ইন্দিরা গাঁধীর সময়েই ভারতে প্রথম টেলিভিশন আসে। সেই সময়েই টেলিভিশনের মাধ্যমে একটা সমসত্ত্ব জাতীয় ধারণা হিসাবে হিন্দুধর্ম প্রতিষ্ঠিত হয়। রোমিলা থাপার বলেন, হিন্দু ধর্ম তখন আধুনিকীরণের মতাদর্শ হয়ে উঠেছিল। রাজীব গাঁধীর সময়ে ১৯৮৮ এবং ’৮৯-এ ‘রামায়ণ’ এবং ‘মহাভারত’ সিরিয়াল দুটি এই হিন্দু জাতীয়তাবাদকে আরও এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু এর ফলে ভারতীয় সমাজে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাও বাড়তে থাকে। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে তার ভয়াবহ পরিণতি দেখা যায় বাবরি মসজিদ ধ্বংসের মধ্যে দিয়ে। রামমন্দির আন্দোলন সেই মেরুকরণকে আরও তীব্র করে তোলে।

সমস্যা হচ্ছে, ভারতে হিন্দু ধর্মের ঐতিহ্য বহুত্ববাদের মধ্যে নিহিত। আকবরের দীন ইলাহি থেকে সম্রাট অশোকের সাম্রাজ্যে সর্বধর্ম সমন্বয়ের মতাদর্শ ভারতীয় ঐতিহ্য হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। আর্যরা আসার আগে ভারতীয় সভ্যতা ছিল বলে জানিয়েছেন ক্ষিতিমোহন সেনের মতো দার্শনিক। আর্যরা আসার পরে নানা সংমিশ্রণ হয়েছে। ভারতে রাজনৈতিক একদলীয় শাসন হলেও ভারতীয় সমাজের সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ কিন্তু থেকেই গিয়েছে। তাই হিন্দু সত্তাকে একটি একক সত্তা হিসেবে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা কতটা সফল হবে সে প্রশ্ন থেকেই যায়। বরং যদি সময়ের হাত ধরে হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রকৃতি বদলানো সম্ভব হয়, সর্বধর্ম সমন্বয়ের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ, তাতে হয়তো হিন্দু জাতীয়তাবাদেরও অস্তিত্ব সুরক্ষিত হবে।

ভারতের ইতিহাসে সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতা কিন্তু নতুন ঘটনা নয়। স্বাধীনতার আগে এবং পরে সা¤প্রদায়িক দাঙ্গা বার বার ঘটেছে। প্রত্যেকটি বড় দাঙ্গার পর বাইরে থেকে, বিশেষত বাংলাদেশ থেকে উদ্বাস্তুরা ভারতে, মূলত পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করেছেন। ভারতের ও পশ্চিমবঙ্গের সমাজ এবং অর্থনীতির পক্ষে এই ধাক্কা সামলানো যে সহজ কাজ নয় সে কথা অম্নান দত্তের মতো মানুষও লিখে গিয়েছেন। আর্থিকভাবে আমাদের চেয়েও সবল জার্মানি উদ্বাস্তুদের ধাক্কা সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। সমস্যা হচ্ছে, হিন্দু উদ্বাস্তু এবং মুসলমান অনুপ্রবেশকারীর ভেদজ্ঞান দেশের ভিতর আবার অসহিষ্ণুতা বাড়িয়ে দেয়। এ সব নতুন কথা নয়। কিন্তু নরেন্দ্র মোদির শাসনে এই বিষয়টি নিয়ে আবার নতুন করে এত বিতর্ক হচ্ছে শুধুমাত্র একটি কারণে। সেটি হলো, ভারতের স্বাধীন হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত যে নেহরুবাদী বহুত্ববাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতি রক্ষিত হয়েছে, নরেন্দ্র মোদি এবং তাঁর সঙ্ঘ পরিবার ভারতীয় রাজনীতির সেই ভিত্তিভূমিকেই বদলাতে চাইছেন- এমন একটা ধারণা জনমানসে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ঐকমত্যের রাজনীতির পরিবর্তে উগ্র হিন্দু মনোভাবের ভিত্তিতে একটা বিচ্ছিন্নতা প্রতিষ্ঠিত করার সচেতন তাত্তি¡ক প্রচেষ্টাও রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বার্থরক্ষার নামে ভারতের মতো এতগুলো ধর্ম এবং জাতির রাষ্ট্রে সেটা করা সম্ভব কি না, করা উচিত কি না, সেটা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। ভারতের জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ১৭২ মিলিয়ন মানুষ মুসলমান। কাজেই ভারত দেশটা গ্রেট ব্রিটেনের মতো একটা কার্যত রাষ্ট্রব্যবস্থা নয়। তাহলে এই মানসিকতা কি আমাদের বিভেদের রাজনীতি এবং অসহিষ্ণুতার রাজনীতিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে না?

ভারতের রাজনীতিতে অনেকে অবশ্য বলেন এই সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করেছিলেন বালগঙ্গাধর তিলকের মতো চরমপন্থি কংগ্রেস নেতা। এমনকী, ভারতীয় উপমহাদেশের সেই ‘অর্ধনগ্ন ফকির’ গাঁধীজি স্বয়ং। বালগঙ্গাধর তিলকের গণপতি উৎসব এবং পরবর্তীকালে চরমপন্থি বিপ্লবীদের ধর্মীয় উন্মাদনা যে ধর্মাশ্রয়ী জাতীয়তাবাদ তৈরি করেছিল, কালক্রমে তাই সাম্প্রদায়িকতা এবং বিরোধের পথ প্রশস্ত করেছিল। আবার ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ সেই বিরোধকে নিজের স্বার্থে উসকে দিয়েছে। তবে শৈলেশকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর দাঙ্গার ইতিহাস গ্রন্থে বলেছেন, শুধু ব্রিটিশদের একতরফা দায়ী করাটা বোধহয় ঠিক নয়। ভারতীয় সমাজে হিন্দু-মুসলমানদের একটা বিভেদ ঐতিহাসিকভাবেই ছিল। ব্রিটিশ হয়তো তাকে কাজে লাগিয়েছে, কিন্তু শুধুমাত্র ব্রিটিশকেই এই ভেদনীতির বলির পাঁঠা করাটা বোধহয় অবৈজ্ঞানিক। রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত লিখেছেন, ‘ইতিহাসে বারেবারে দেখা গেছে, যখন কোনো মহাজাতি নবজীবনের প্রেরণায় রাষ্ট্রবিপ্লব প্রবর্তন করেছে তার সঙ্গে সঙ্গে প্রবল ভাবে প্রকাশ পেয়েছে তার ধর্মবিদ্বেষ’। ফরাসি বিপ্লব থেকে স্পেন, মেক্সিকো থেকে তুরস্ক- ধর্ম হননের আগুন বারবার তীব্র হয়েছে। আর রবীন্দ্রনাথ বলছেন, হিন্দু সমাজে ধর্মের জায়গা আচার নিয়ে নেয়ায় আচারের পার্থক্য পরস্পরের মধ্যে কঠিন বিচ্ছেদ ঘটায়। মৎস্যাসী বাঙালি নিরামিষ প্রদেশের প্রতিবেশীকে আপন মনে করতে গিয়ে কঠিন বাধা পায়। আজ দাদরি-র গরু-বিতর্কে যখন পক্ষে-বিপক্ষে অসহিষ্ণুতার চরম অভিযোগ উঠেছে- বিজেপি গরু জাতীয়তাবাদ আমদানি করছে, ঠিক সেই সময় রবীন্দ্রনাথের এই মন্তব্য ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক।

বঙ্গভঙ্গ, পশ্চিমবাংলায় এই ধর্মীয় মেরুকরণ বাড়িয়েছিল। পাকিস্তান আন্দোলনের মাধ্যমে যে নীতির ভিত্তিতে ভারত বিভক্ত হয়েছিল, সেই একই সাম্প্রদায়িক নীতির ভিত্তিতে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলা এবং সেই সঙ্গে অসম ও পঞ্জাব ভাগ হয়েছিল। ব্রিটিশ ভারতে আসার আগে মোগলরা ভারতীয় উপমহাদেশের ওপর তাদের রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব স্থাপন করেছিল এবং সেই সময় থেকেই দিল্লি সামরিক এবং রাষ্ট্রীয় শক্তির কেন্দ্রস্থল হয়ে ওঠে। অন্য প্রান্তগুলো গুরুত্ব কম পেতে শুরু করে। মোগল সাম্রাজ্যের অবক্ষয়ের পর ভারতের সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চলগুলো ইউরোপীয় বণিকদের জন্য আবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু গোটা দেশ জুড়ে এই রাজ্য শাসনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একটা টানাপড়েন ছিল। ১৮৭০-এর দশক থেকে ব্রিটিশরাও পরিকল্পিতভাবে ভারতীয় হিন্দু-মুসলমানদের সরাসরি সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল গঠনে উৎসাহিত করতে থাকে। আর তাই আজ যে উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি আমরা দেখতে পাচ্ছি তার শিকড়ও কিন্তু অতীতের মধ্যে নিহিত। যেমন সুমিত সরকারের মতো ঐতিহাসিক সব সময় বলেন যে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের যে হিন্দু শভিনিজম, তা মুসলিম বিচ্ছিন্নতাবাদকে ভাঙাতে সাহায্য করেছে এ দেশে। যেমন অনেকে বলেন, গাঁধীর রামরাজ্য বা রামধুন কংগ্রেসের অসাম্প্রদায়িক মঞ্চে বিভাজন এনেছে। এবং পরবর্তীকালে কংগ্রেসের মধ্যে থেকেই গাঁধী এবং জিন্না, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং ডাঙ্গে- সব ধরনের নেতৃত্বেই জন্ম গিয়েছে। বিজেপির উগ্র জাতীয়তাবাদের জনসমর্থন পাওয়ার পিছনেও হয়তো এই রাজনৈতিক সংখ্যালঘু তোষণের একটা ক্রিয়া থেকে গিয়েছে যার প্রতিক্রিয়াটিও আজ ভয়াবহ।

এই উপমহাদেশে বাম রাজনীতির ইতিহাসের শুরু বিশ শতকের বিশের দশকে। মানবেন্দ্রনাথ রায়ের উদ্যোগে কিছু নির্বাসিত ভারতীয় ১৯২০ সালের ১৭ অক্টোবর সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের তাসখন্দ শহরে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিআই) গঠন করেন। চল্লিশের দশকের শেষ দিক পর্যন্ত বর্তমান বাংলাদেশ এলাকায় এ পার্টির তেমন তৎপরতা ছিল না। বিশ ও ত্রিশের দশকে মধ্যবিত্ত শ্রেণির তরুণদের বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে প্রধানত সন্ত্রাসবাদী রূপ পরিগ্রহ করে এবং ব্রিটিশ নাগরিক ও পুলিশ কর্মকর্তা হত্যা তাদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে। বৃহত্তর ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা ও বরিশাল জেলা ছিল এ ধরনের তৎপরতার মূলকেন্দ্র। অনেক সন্ত্রাসবাদী তখন পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হন, অনেককে জেলখানায় ফাঁসি দেয়া হয়। তদুপরি, শত শত কর্মী বছরের পর বছর জেলখানায় আটক থাকেন এবং অনেককে দ্বীপান্তর দণ্ড দিয়ে আন্দামানে পাঠানো হয়। জেলখানায় আটক এই সন্ত্রাসবাদীরা কমিউনিস্ট পত্রপত্রিকা পাঠের সুযোগ পান এবং অনেকে কমিউনিস্ট দলে যোগ দেন। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির অধিকাংশ হিন্দু সদস্য সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও সরকারের দমনমূলক ব্যবস্থার কারণে ভারতে চলে যান।

১৯৪৮ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসে পূর্ববাংলা থেকে ১২৫ জন এবং পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ৫ জন প্রতিনিধি যোগ দেন। ভারত বিভাগের বাস্তবতার পটভূমিতে তারা পাকিস্তানে পার্টির একটি স্বতন্ত্র কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তদনুসারে পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির ৯ সদস্যের একটি কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয়। পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা ১৯৪৮ সালের ৬ মার্চ। পশ্চিম পাকিস্তানে পার্টির তেমন কোনো প্রভাব বা সংগঠন না থাকলেও পূর্ব বাংলায় পার্টির দ্রুত বিকাশ ঘটে। ১৯৬৪ সালের ৩১ অক্টোবর থেকে ৭ নভেম্বর কলকাতায় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিআই) সপ্তম কংগ্রেসে সিপিআই ভেঙে এই দল গঠিত হয়। ১৯৬৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টি দুভাগ হলো। সোভিয়েতপন্থি সিপিআই-এর থেকে আলাদা হয়ে গেল চীনপন্থি সিপিআই এম। পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ সিপিআই নেতা, জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে চলে গেলেন সেই নতুন দলে।

১৯৬৭ সালেই হল নকশালবাড়ি কৃষক বিদ্রোহ। কট্টরপন্থা এবং সংস্কারপন্থার বিভেদের জেরে আবার ভাঙন ধরল কমিউনিস্টদের মধ্যে। ১৯৬৮তে পশ্চিমবঙ্গ এবং অন্ধ্রপ্রদেশে দল ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন কট্টরপন্থিরা, যারা মনে করছিলেন সংসদীয় রাজনীতি নয়, শ্রেণিসংগ্রামই একমাত্র পথ। ১৯৬৯ সালে নতুন করে নির্বাচন হলো পশ্চিমবঙ্গে। আবারো সিপিএমই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জিতে ফিরল। সিপিআই এবং বাংলা কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মিলিয়ে গঠিত হলো দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকার। কিন্তু সিপিআই এবং বাংলা কংগ্রেসের সঙ্গে গোপন সমঝোতায় সেই সরকারকেও ফেলে দিল কংগ্রেস। জারি হলো রাষ্ট্রপতির শাসন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ভোট হল দেশজুড়ে। ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে বিপুলভাবে জিতে ক্ষমতায় এল কংগ্রেস। পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোটেও গঠিত হল কংগ্রেস সরকার। পরের বছরই দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করলেন ইন্দিরা গান্ধী। জরুরি অবস্থার শেষে, ১৯৭৭ সালের বিধানসভা ভোটে হার হলো কংগ্রেসের। পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম-এর নেতৃত্বে ক্ষমতায় এল বামফ্রন্ট। মুখ্যমন্ত্রী হলেন জ্যোতি বসু। ১৯৭৭ থেকে ২০০৯, টানা ৩২ বছর পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম-এর নেতৃত্বে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় বহাল। ১৯৯৬ সালে কেন্দ্রে তৃতীয় ফ্রন্টের সরকার গঙার সময় প্রধানমন্ত্রী পদে সর্বসম্মত প্রার্থী হিসেবে জ্যোতি বসুর নাম উঠে এসেছিল। কিন্তু সরকারে যোগ না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সিপিএম পলিটব্যুরো। যে সিদ্ধান্তকে জ্যোতি বসু চিহ্নিত করেন ঐতিহাসিক ভুল হিসেবে।

২০০৪ সালের লোকসভা ভোটে কট্টর হিন্দুত্ববাদী বিজেপিকে দূরে রেখে ধর্মনিরপেক্ষ সরকার গঙ্গার স্বার্থে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোটকে বাইরে থেকে সমর্থন জোগায় সিপিএম তথা বামফ্রন্ট। কিন্তু মার্কিন পরমাণু চুক্তি ইস্যুতে সেই সমর্থন তারা প্রত্যাহার করে নেয়। ২০০৯ লোকসভা ভোটে, কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে, বিজেপিকে দূরে রেখে তৃতীয় ফ্রন্ট গড়তে উদ্যোগী হয়েছে সিপিএম। তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের মূল কথা, ধর্মনিরপেক্ষ সরকার, বাজারমুখী নয়, সমাজমুখী অর্থনীতি এবং মার্কিন প্রভাবমুক্ত বিদেশ নীতি। ২০১৪ সালে বিজেপির উত্থানে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায় বামপন্থিরা।

১৯৮৯ সালে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংহ মণ্ডল কমিশনের রিপোর্ট কার্যকর করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন, ভারতের রাজনীতিতে একটা যুগান্তর ঘটে গেল। মণ্ডল কমিশন রিপোর্ট অনেক দিন টেবিলে পড়েছিল। ভি পি সিংহ রাজনৈতিক কারণে এটা খুঁজে বের করলেন এবং গ্রহণ করলেন, বিজেপির অগ্রগতি রোধ করার জন্য, যাতে হিন্দু সমাজের মধ্যে একটা বিভাজন উসকে দেয়া যায়। অর্থাৎ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা আছে কি নেই, এই প্রশ্নটা নিয়ে কোনো বিতর্ক ছাড়াই, শুধু রাজনীতি করার জন্যই এই রিপোর্ট বলবৎ করা হলো।

রামজন্মভূমি ইস্যুটা কে আটের দশকের শেষের দিকে নিজেদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির বহু কষ্টে উদ্ধার হওয়া অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতেই আন্দোলনের গতিপথ কে জঙ্গি করতে আর এস এস বেশি উদগ্রীব ছিল না? ভি পি সিং মণ্ডল কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করার দৃঢ় অবস্থান দেখিয়েছিলেন। সেই অবস্থান কতখানি সামাজিক স্বার্থে আর কতখানি ভিপির নড়বড়ে রাজনৈতিক ভিত্তিকে শাস জল দিতে তা বিচার করার সময় এখন এসেছে। কারণ, এ কথা খুব স্পষ্টভাবেই বলতে হয় যে, মণ্ডলকে কেন্দ্র করে যে উত্তাপ তৈরি হয়েছিল তা হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তির কপালে কিছুটা হলেও চিন্তার ভাঁজ ফেলেছিল।

আরএসএস সাতের দশকে তাদের নিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর খেলাটা সব সময়ে ঠিকমতো বুঝে উঠতে পেরেছিল কিনা তা নিয়ে গবেষণা আগামী দিনেও চলতে থাকবে। বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের সময়ে সঙ্ঘের একটা আপাতভাবে শ্রীমতি গান্ধীর সঙ্গে দূরত্ব কমে আসাটার পিছনে বাস্তবতা কতখানি ছিল- তা নিয়েও চুলচেরা বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। নয়ের দশকের শুরুতে ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ চূড়ান্তভাবে ভাঙতে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি সক্ষম হয়েছিল কেবলমাত্র উত্তর প্রদেশে নিজেদের সরকার থাকার দৌলতে নয়। কেন্দ্রে সেই সময়ে ক্ষমতাসীন নরসিংহ রাও সরকারের চরম অপদার্থতার পাশাপাশি নীরবতার বিষয়টিকেও এক্ষেত্রে আলোচনার ঊর্ধ্বে রাখা যায় না। ’৯২-এর ৬ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু আসন্ন বিপদের আশঙ্কায় বারবার ফোন করেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাওকে। তার বাড়ির থেকে বসুকে জানানো হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী পূজাতে ব্যস্ত রয়েছেন। যুগ যুগান্তের ভারতবর্ষ যখন ধ্বংসের মুখে ভারত সম্রাট হিসেবে রাও কি তখন রোম সম্রাট নিরোর ভূমিকার পুনর্নির্মাণে ব্যস্ত ছিলেন? মতাদর্শের বিষয়টিকে কংগ্রেস কোনোদিনই সেভাবে পাত্তা দেয় না। ক্ষমতাই তাদের কাছে এক এবং একমাত্র উপজীব্য বিষয়।

ভারত এখন ধর্ম রাজনীতির দাস। ভারতে বিজেপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী এখন হিন্দুত্বের পতাকা উড়িয়ে মুসলমান ও খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে যে অবস্থান গ্রহণ করেছেন এটা এক ধরনের রাজনৈতিক উল্লম্ফন বটে। গান্ধী ছিলেন আম্বেদকারের ঘোর বিরোধী, তাকে তিনি আখ্যায়িত করেছিলেন হিন্দু ধর্মের সব থেকে বড় শত্রু হিসেবে। এর কারণ আম্বেদকার উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের হাত থেকে নিম্ন বর্ণের লক্ষ্য হিন্দুকে নিয়ে নিজে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন। নরেন্দ্র মোদির ওপরওয়ালা দল আরএসএস তখন ছিল আম্বেদকারের ঘোরতর শত্রু। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি দলিতদের প্রতারিত করার উদ্দেশ্যে এখন হয়েছেন আম্বেদকারের মহাভক্ত! তার জন্ম-মৃত্যু দিবস তিনি মহাআড়ম্বরে পালন করে তার প্রস্তর মূর্তিতে মালা পরিয়ে অনেক ভণ্ডামী করছেন দলিতদের ভোট ব্যাংককে ধরে রাখার জন্য। এ জন্য তিনি মুসলমানদের বিরোধিতাকেও কাজে লাগাচ্ছেন। এক্ষেত্রে তিনি যে বড় রকম সাফল্য অর্জন করেছেন এর বড় প্রমাণ সদ্য অনুষ্ঠিত উত্তর প্রদেশের নির্বাচন। সেখানে ২০ শতাংশ লোক মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও, তিনি একজন মুসলমানকেও মনোনয়ন দেননি। ২০১৪ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনেও উত্তর প্রদেশে বিজেপি একই কাজ করেছিল।

নরেন্দ্র মোদির কৌশল এক্ষেত্রে হলো, দলিতদের মুসলমানদের থেকে শুধু সরিয়ে রাখা নয়। তাদের মধ্যে শত্রুতা তৈরির চেষ্টাও তিনি করছেন। এই দলিতরা যতদিন পর্যন্ত তাদের জাত শত্রু নরেন্দ্র মোদি এবং তাঁর দল বিজেপির পক্ষে থাকবে। ততদিন বিজেপির শক্তি খর্ব হবে না। এ জন্য নরেন্দ্র মোদিকে ও তার হিন্দুত্বের রাজনীতিকে পরাজিত করার জন্য অপরিহার্য প্রয়োজন দলিতদের থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করা। কিন্তু করবে কে? বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধার লোকটিরই তো হদিস নেই।

২৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj