চার দশকের সত্য মিথ্যা : সুশান্ত মজুমদার

বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

সত্যের প্রতি আমাদের আনুগত্য কতখানি? প্রশ্নটি স্বাধীনতার চার দশক পরও এই দেশের জলহাওয়ায় ধীরে ধীরে বেড়ে উঠেছে। উত্তর অনেক সজ্ঞান মানুষের জানা। জেনে শুনে সবাই নীরব- নিজের ভেতর নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি। কি দেখছি? বর্তমান ও চারপাশের অসহ্য বাস্তবতায় সত্যকে দেখি অসহায়; আর মিথ্যার দেখি প্রতাপ। বাস্তবতা কেমন? রং-রস-গন্ধহীন এক শুকনো, ক্ষয়াটে, সারশূন্য বাস্তবতায় মনোযোগ দিলে বুঝি, মানুষ এখন ছিন্নভিন্ন, অনৈক্যের শিকারে ঘায়েল, উদ্যম-উদ্যোগ, মুক্তবুদ্ধি, মেধাচর্চা সব ছিপিবন্দি। এটা ধার করে বোঝা নয়, অন্যের মুখ পড়ে ধরা নয়, নিজেদের জীবন দিয়ে উপলব্ধি করছি, বারবার উচ্চারিত হতে হতে মিথ্যা পেয়েছে ক্ষমতা। মিথ্যা জঙ্গি মেজাজে সত্যকে ছিঁড়ে এলোমেলো করে তার ওপর চাপিয়ে দিয়েছে বিবিধ ক্ষতি, অপবাদ, অবনতি ও অন্যায়। ধসে গেছে স্মৃতি। স্মৃতি মানে অতীত, এই অতীতেরও কখনো কখনো তাপ-তেজ আলো থাকে যদি তা হয় আয়ুষ্মান। তেমন এক প্রেরণাপূর্ণ উজ্জ্বল অতীতের শরিক হয়েও স্বাধীনতার পরের প্রবংশের কাছে ধরিয়ে দিতে পারিনি উত্তরাধিকার। অতীতের মধ্য থেকে উঠে এসেও আমাদেরই রচিত ইতিহাস আমরা মনে রাখিনি। সাতচল্লিশ বছর আগে এই জাতির জীবনে এসেছিল দারুণ সুসময় ও প্রচণ্ড দুঃসময়। সুসময় মানে মানুষ লড়েছিল, মানুষ এক দেহে এক প্রাণে ছিল সংঘবদ্ধ, হাজার নগর-গ্রাম-প্রাণ উজাড় সত্ত্বেও জয়ের লক্ষে ছিল জঙ্গম। দুঃসময় মানে রাস্তাঘাট, ক্ষেত-খামার ভরে গিয়েছিল নিরপরাধীর শবদেহে; ধ্রæবমানবকে মেনে নিতে হয়েছিল অসময়ের মৃত্যু। নিষ্ঠুর জিঘাংসা সব সময়ই নির্বিচার। যুদ্ধ দিনে আমাদের চোখ খুলে গিয়েছিল পরিষ্কার চিনতে পেরেছি শত্রু-মিত্র। চিরকালের জন্য চিনে নেই আমাদেরই কতিপয় স্বভাষী ঘাতক ও বিশ্বাসঘাতককে। ধিক তাদের! চারপাশে মৃত্যু নিয়েও আমাদের লক্ষ্য ছিল নির্দিষ্ট-স্বাধীনতা। কখনো কখনো জাতির জীবনে মৃত্যু হয় তুচ্ছ ও ভয়হীন। চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের বিরুদ্ধে যুদ্ধই একমাত্র প্রত্যুত্তর এবং তা ন্যায়সঙ্গত। এই যুদ্ধ কি ছিল শুধু সশাসনের ইচ্ছা ও সভূমির উদ্ধার? যুদ্ধের সঙ্গে নিবিড় জড়িয়ে ছিল স্বপ্ন ও আশা। স্বপ্নই যদি না থাকবে তবে গুলির সামনে মানুষ বুক পেতে দেবে কেন? একাত্তরে আমাদের স্বপ্ন পেয়েছিল শরীরী আকার। দৃঢ় এই আশার ছিল দাঁত-মুখ-শ্বাস অবিকল মানুষেরই প্রতিরূপ। এই আশাকে কেতাবী বিদ্যায়, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞায়, রাজনীতির ভাষণে যাই-ই বলা হোক, নিতান্ত সাধারণ মানুষের আদি অকৃত্রিম মৌলিক দাবিতে তা খেয়ে-পরে বেঁচে থাকা। বাঁচার জন্য, প্রতিদিনের বাঁচার তাগিদে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১-চব্বিশ বছরে পাকিস্তানি শাসকের সঙ্গে বাঙালির দ্ব›দ্ব উচ্চগ্রামে পৌঁছে গেলে শুরু হয় পরিবর্তনের গুণগত প্রক্রিয়া। পাকিস্তানি শাসক মানে উর্দি আর বুটপরা পা। আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধে তাই বিরাজ করেছে সামরিকতন্ত্র বনাম সিভিল সমাজের সংঘাত। খাওয়া-পরার কথা উঠলে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের প্রধান দায়িত্ব মানুষের জীবন-জীবিকা, জীবনযাপন সুনিশ্চিত করা। আজ আমরাই আমাদের স্বাধীনতার সাতচল্লিশ বছরে জীবনকে করে তুলেছি অনিশ্চিত, জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শস্যহীন। স্বপ্ন ও আশা হয়েছে নস্যাৎ। যে সত্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছি, সেই সত্যকে ঘেরাও করে আটকে রেখেছি।

শুধু সম্প্রতি নয়, আগে থেকেই অযতœ, অবহেলা, যথাযথ ব্যবস্থার অভাবে সীমাবদ্ধ হতে হতে ঘোলাটে হয়ে পড়ে সত্য। স্বাধীন দেশ বিধ্বস্ত, তখনো মুছে যায়নি মানব রক্তের জমাট শুকনো কালচে দাগ, মাটি পুরোপুরি আত্মসাৎ করেনি শহীদের মরদেহ, তখন নতুন দেশ পাওয়ার আবেগ ডামাডোলে আমাদের অমনোযোগের কারণে যুদ্ধ-অর্জিত সত্যের ওপর জমে যায় এক পরত ধুলো। সব সময় সংস্কারহীন ধ্যান-ধারণায়, আচার-আচরণে পুরনো মতাদর্শই বৃষ্টির জলের মতো চুঁইয়ে জমা হয়। ভেতরে ফাটল ধরে, খোড়ল হয়; এক সময় পেছন থেকে পরাজয় এসে জয়কে গ্রেপ্তার করে- সদর দপ্তরে এসে পড়ে বিশৃঙ্খলার আক্রমণ।

এ তো সেই মোটা দাগের পুরনো খেলা। যে মানুষের সমর্থন পুঁজি করে এক একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এল, তাদের প্রথম কাজই হয়ে দাঁড়াল ওই মানুষদের বিভক্ত ও দমন করা। দাবির মুখগুলোকে চুপ করিয়ে দেয়া। মুক্তিযুদ্ধের সত্য, বহুমুখী প্রভাব, জায়মান চেতনা, প্রত্যাশা এভাবে চাপা পড়ে যেতে থাকে। ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জমুক্ত রাখার স্বার্থে মানুষ হলো লক্ষ্যবস্তু। আশ্চর্য, ¯্রষ্টা সৃষ্টিতে মরে, সৃষ্টির পরেও মরে। পরিণতি অবশ্য আছে। মনে পড়ছে নাইজেরিয়ার লেখক চিনুয়া আচেবের ‘নো লংগার এ্যাট ইজি’ উপন্যাসের একটা চুম্বক কথা : হত্যা করে যারা ক্ষমতায় থাকে হত্যার মধ্য দিয়ে তারা বিদায় নেয়। বাংলাদেশের সাতচল্লিশ বছরে অবাঞ্ছিত বিদায়ের মধ্য দিয়ে একাধিকবার ক্ষমতার বদল হয়েছে। মসনদে আসীন শাসকের স্বার্থে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ও সংবিধান প্রতিবার কাটাছেঁড়া হয়েছে। গণসমর্থন আদায়ে সাধারণ মানুষের সেন্টিমেন্ট ব্যবহারের জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে ধর্মীয় ভাণ্ডারে। সত্য নিজেই এবার কুঁকড়ে যায়। আমাদের অর্জন থেকে খসে পড়ে গৌরব। প্রশ্ন হচ্ছে, হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে যে পরিবর্তন তার পেছনে কি জনসমর্থন ছিল? হত্যার দায়িত্ব কি খুনিদের ওপর দেশবাসী ন্যস্ত করেছিল? সচরাচর হত্যাকাণ্ড যারা করে তারাই ক্ষমতা দখল করে। কোনো হত্যাই প্রাপ্তিশূন্য ও লক্ষ্যহীন থাকে না। এ দেশে ঘটেছে উল্টোটি। এখানে পঁচাত্তরের হত্যাকারীরা ক্ষমতাসীন হয়নি। ঘাতকের হীন কাজ ছিল ঠিক ভাড়াটে খুনির মতো। যারা হত্যার সুবাদে ফল পেয়েছে তারা ভালো মানুষের মুখোশ পরে চড়ে বসেছে সিংহাসনে। প্রত্যেকের প্রথম বক্তৃতায় স্মরণ করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধকে। হত্যাকাণ্ড ও ক্ষমতার এসব পরিবর্তন কি মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত সত্যকে আরো সম্প্রসারিত বা দীপ্তিমান করেছে? তারচেয়ে বড় কথা, ক্ষমতার পরিবর্তন কি সাধারণ মানুষের জন্য কোনো সুফল বয়ে এনেছে? পরিষ্কার ও সোজা উত্তর- না। সর্বগ্রাসী ক্ষয়-পতন-হতাশা মানুষকে দিয়েছে লাঞ্ছিত, অধপতিত, নাভিশ্বাস তোলা জীবন। এক পাথুরে অনুর্বর জমিনের বাসিন্দা যেন সব। তবে কি আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ভুল ছিল? কেবল স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী ছাড়া কোনো মানুষই মুক্তিযুদ্ধকে অতো খাটো করে দেখবে না। সত্যকে বহুপল্লবিত, বিকশিত, জীবনমুখী করার ব্যর্থতা থেকে আমরাই জন্ম দিয়েছি নৈরাজ্য, অস্থিতিশীলতা ও অনিশ্চিত এক ভবিষ্যৎ।

এখানে কোন সত্যের কথা বলা হচ্ছে? বাংলাদেশ নামের যে সত্য, ঘুরিয়ে বললে যে সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশের জন্ম। কিন্তু এটা নয় একটা ভূখণ্ডের নাম। মানুষ? মানুষ ছাড়া কোনো রাষ্ট্র নেই। ভূখণ্ড, সার্বভৌমত্ব সরব, জীবন্ত, অর্থবহ হয় মানুষের উপস্থিতিতে। এই মানুষের ওঠা-নামার সঙ্গে সত্যের ওঠা-নামার সম্পর্ক অবিচ্ছিন্ন। মানুষ যদি দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যায় তবে সত্যও নিচে নেমে যায়। উপযুক্ত ব্যবস্থা ও নেতৃত্বের অভাবে জীবন হয় স্থবির, স্বার্থান্ধ, বিপথগামী। তখন গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, বড় বড় সংস্কার ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রæতির কোনোই মূল্য নেই। শূন্য কলস বাজে বেশি। নেতাদের ভাষণও হতে থাকে শাসন ছাড়া। অথচ কোনো ভাষণই মানুষ গ্রহণ করে না। শ্রম নিংড়ে ও আয়ুর শেষ দানা খরচ করে মানুষকে যদি বাঁচার জন্য লড়তে হয় তবে মানুষ সংঘবদ্ধ হতে যাবে কেন? একাত্তরে নির্দিষ্ট একটা লক্ষ ছিল। অন্তত তেমন কোনো স্থির জীবনমুখী লক্ষ, কর্মসূচি, আয়োজন বা মতাদর্শ দেশবাসীর সামনে এখন নেই। বরং ভাঙনের পর ভাঙনের শিকার হয়েছে মানুষ। যুদ্ধ দিনের একতাবদ্ধ মানুষকে তাই সাতচল্লিশ বছরে আর ফিরে পাওনা যায়নি। মানুষের পাশ থেকে মানুষ সরে গেলে এই শূন্যতার সুযোগ নেয় লুটেরা, ক্ষমতার ছায়ায় থাকা কায়েমি মহল ও নষ্ট উচ্চবর্গ। এমনকি রাষ্ট্রের একমাত্র সংগঠিত শক্তি হিসেবে সেনাবাহিনীও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে ক্ষমতার ভাগ চায়। তখন জটিল থেকে জটিলতর হয়ে ওঠে উপর কাঠামো। রাজনীতি আর নির্মল চরিত্র পায় না। সুস্থ রাজনীতির অনুপস্থিতিতে সমাজে দেখা দেয় ব্যাধি, সহিংসতা ও অস্বাভাবিক আচার। এর উদাহরণ ও সত্যতা এ দেশের সাতচল্লিশ বছরের গাটে গাটে রয়েছে। অথচ রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের কোনো উদ্ভাবনা নেই। নেই বলে প্রধান অবলম্বন হয়েছে মিথ্যাচার। পৌনঃপুনিক মিথ্যার বেসাতি করে জখম করা হয়েছে সত্যকে। কথার মারপ্যাঁচ যতই করা হোক, প্রকৃতপক্ষে সত্যকে আমরা ভয় পাই। সত্যকে তাই প্রতি পদক্ষেপে এড়িয়ে যেতে চাই। মিথ্যা এত দূর বেড়েছে যে, স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস পর্যন্ত আজ বিকৃত। নতুন প্রবংশ মিথ্যার আবহাওয়ায় শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ে মিথ্যাই শিখছে কেবল।

প্রশ্ন হচ্ছে, সত্যকে নিষিদ্ধ রেখে মিথ্যার ওপর ভর রেখে একটা জাতি কি বিকশিত হতে পারে? সাতচল্লিশ বছরে সভ্যতায় দানের জোগান দেয়ার বদলে আমরা কেবল হাত পেতে নিয়েছি। তাহলে আমাদের অবস্থান কোথায়? চরম এক সর্বনাশের খাদের কিনারে। পুরোপুরি পতন এখন কোলাহল করে চাপা রেখেছি। কোলাহলের অংশ হিসেবে উন্নয়নের যে বাগাড়ম্বর কোষাগারের অর্থ খরচ করে প্রচারিত হয়, তা হচ্ছে, মিথ্যাকে বিচিত্র পোশাক পরিয়ে বাজারজাত করা। অথচ বিদেশি সাহায্য ছাড়া আমরা অচল। পরনির্ভরশীল জাতি কখনো সম্মানিত পর্যায়ে যেতে পারে না। একটা কাজ ভালোভাবে পারে। নিজের জন্য সংকট রচনা। সুচারুভাবে এই কাজটি করার সময় আমাদের হাত গিয়ে পড়ছে সত্যের শরীরে। সত্য যখনই আঘাত পায় তখন সামনে যাওয়ার দরজাও বন্ধ হতে থাকে। অবিমৃষ্যকারীদের পরিষ্কার কোনো ভবিষ্যৎ থাকে না। আপাতত বর্তমানের মধ্যে আমাদের বাঁচা-মরা। এই বর্তমানও হাঁটু ভেঙে পড়ে আছে মিথ্যার কাদাজলে।

আমাদের সব আলো কি তাহলে নিভে গেছে? আজো টুকরো টুকরো যে সত্য পাই তার গায়ের ধুলোবালি ঝেড়ে ফেললে দেখি, সাতচল্লিশ বছর আগে সম্মিলিতভাবে আমাদের যাত্রা শুরু। আমাদের মায়েরা সব অনুভূতি জড়ো করে শক্ত করেছিলেন। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ছেলেকে নিজ হাতে সাজিয়ে গাড়ি ড্রাইভ করে যুদ্ধ যাত্রায় নামিয়ে দিয়েছেন। রুমীর মতো আমাদের হাজার ভাইকে মুক্তিবাহিনীতে দেখেছি। মুখভর্তি দাড়ি, চুল ঘাড় পর্যন্ত লম্বা, তামাটে গায়ের রং রোদে পুড়ে কালচে, দুই চোখে উজ্জ্বল ঝকঝকে দৃষ্টি, গোঁফের জঙ্গল ভেদ করে ফুটে রয়েছে ভুবন ভোলানো হাসি। আমরা জানি, মুক্তিযোদ্ধা সন্তান স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী আত্মীয়কে হত্যা করতে কুণ্ঠিত হয়নি। আমরা লক্ষ করি, জাতির পতাকার লাল অংশে এসে মিশেছে বোনের ত্যাগও। আমরা হাসান আজিজুল হকের গল্পের রগচটা, দড়ির মতো পাকানো পেশি, মজবুত শরীরের গ্রামের পিতাকে পর্যন্ত দেখেছি। নিজ হাতে শহীদ সন্তানের কবর দিয়েছে সে। এই কবরটা কার- প্রশ্নে নির্বিকার অবলীলায় তিনি উত্তর দেন- ‘আমার বড় ছেলের। ও কি আপনাকে বলে গিয়েছিল? উত্তর, যেতে চেয়েছিল ও নিজেই মুক্তিদের সঙ্গে। তবে আমি বারণ দিলি হয়তো যেত না। তা আমি বারণ দিইনি বরং যেতেই কয়েছিলাম। সবারই কিছু কিছু দেয়ার কথা বলতিছিলেন না আপনি একটু আগে?’ রফির কর্তিত মুণ্ডুও আমরা দেখেছি। রাজাকাররা রফির মাথা কেটে বাজারের ভেতর সুপারি গাছে ঝুলিয়ে রেখেছিল। রফির মৃত মুখে ছিল না যন্ত্রণার কোনো চিহ্ন। ক্রুশবিদ্ধ খ্রিস্টের মতো সেই মুখে ছিল ভাবীকালের স্বপ্নমাখানো।

ভাবীকালের স্বপ্নকে বাস্তব করার জন্য এত রক্তদান, জীবন বলি ও ধ্বংস গ্রহণ। একটি জাতির উত্থান লগ্নে থাকে ভাঁড়ার উজাড় করা ব্যয়। তবু অস্তিত্বের নির্ঘোষ, অটুট মৈত্রী, অফুরান প্রাণচাঞ্চল্যে কমতি থাকে না। এমন ত্যাগের সত্য সামনে থাকা সত্ত্বেও সত্যে ভেজাল দিতে আমাদের বিবেক কেঁপে উঠছে না। যে মুক্তিযুদ্ধের সুবাদে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা সেই যুদ্ধ, যোদ্ধা, নেতৃত্ব এবং যুদ্ধের পেছনের ইতিহাসের ওপর চড়িয়ে দিয়েছি মিথ্যার আবরণ। রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রশ্নে ভিন্নমত থাকতে পারে, আর্থ-সামাজিক কাঠামোর মূল্যায়নে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ক্রিয়া করতে পারে, কিন্তু ইতিহাস ইতিহাসই, তাকে উপেক্ষা-অবজ্ঞা-বিকৃতি করা ঘোরতর অসুস্থ মানসিকতা। চরম অসুস্থতাই আজ স্বাভাবিকতা, উচ্চারিত মিথ্যা হচ্ছে পেশ করা সত্য, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বার্থবিরোধী কার্যক্রম হয়েছে চিৎকার করে বলা উন্নয়ন। মেধাহীন নেতৃত্বের চেয়ে আর কি করার আছে। তাহলে কি আমরা স্থায়ী অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছি? অন্ধকার থেকে আলোয় যাওয়ার যে সুযোগ এখনো অবশিষ্ট আছে তার যথাযথ ব্যবহারে অনিবার্যভাবে প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। চেতনা মানে সত্যকে গ্রহণ। কেননা সত্য সত্যকেই উদ্বুদ্ধ করে, মানুষকেও।

২৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj