ভাষার সক্ষমতা : হাসান আজিজুল হক

বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

সে দিন একজন তুখোড় সাংবাদিক আমাকে বললেন, একুশে ফেব্রুয়ারি এসে গেছে। যার কাছে যত রকমের বাদ্যিযন্ত্র আছে- ঢাক, ঢোল, ডুগি, তবলা, কাঁসি, খঞ্জনি- সেগুলো সব বের করা হয়েছে, রোদে শুকিয়ে চামড়ার বাদ্যযন্ত্রগুলো টনটনে করা হয়েছে, এবার প্রবল বাজনা শুরু হবে। এ কথা আপনি জানেন, আমরাও আজকাল জানি। এখন আবেগটাবেগ বাদ দিয়ে আপনি বলুন তো, বাংলা ভাষাটা টিকবে কিনা। কথাগুলো বলেই তিনি চুপ, আমি একটি মাত্র কথা বললাম, টিকবে।

আমার কাছ থেকে আরো কথা শোনার জন্য তিনি তখন উসখুস করছেন, কিন্তু তিনি আবেগ, বাগাড়ম্বর বাদ দিতে বলেছেন, কাজেই আমি আর কথা বলব কেন? টিকবে তো বলেছি। এখন আবেগ, সামান্য অসহিষ্ণুতা তার দিকেই দেখা গেল। তিনি বললেন, কী করে টিকবে? একটা ভাষা যে যে কারণে টিকে থাকে, প্রাধান্য বিস্তার করে, তার কিছুই তো আমাদের নেই, সারা পৃথিবীর দিক থেকে দেখতে গেলে, আমাদের এই রাষ্ট্রের না আছে রাজনৈতিক শক্তি, না অর্থনৈতিক শক্তি। আমাদের বাংলা ভাষা শাসনের ভাষা নয়, বরং অধীনের ভাষা। ভাষা ছাড়তে আমাদের বাধ্য করা হচ্ছে এবং বাধ্য আমাদের হতেই হবে। আজকের গ্লোবাল ভিলেজের কথা ভাবুন, সাম্রাজ্যবাদী, পুঁজিবাদী দানবের গ্রাস করার ক্ষমতার কথা ভাবুন আপনি, মানে মানে শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বাংলা ভাষাকে টা-টা বাই-বাই করতে বাধ্য। আপনাদের মতো পুরনো ক্ষয় পাওয়া লোকগুলো বাদ দিলে, তরুণদের দিকে চেয়ে দেখুন কী তারা শিখতে চায়। বাংলা যে বলে, তাকে কি মায়ের কাছ থেকে শেখা বাংলা বলা যায়? আমাদের তরুণদের মুখের বাংলা আড়াই ভাগ ইংরেজি, সিকিভাগ হিন্দি, আর বাকিটা বিকৃত উচ্চারণের বাংলা। এটাকে তো কোনো ভাষাই বলা যায় না, এখন তো আর কেউ বাংরেজিও বলছে না।

এখন বাং, হিং রেজি এটাকে কি ‘কথা বলা’ যায়! যে কোনো মাধ্যমের দিকে তাকিয়ে দেখুন, যত রকমের আমাদের চেনা বাংলাটাকে বিকৃত উদ্ভট অসম্ভব দায়িত্বহীন করে তোলা সম্ভব তা করা হচ্ছে, কেউ কারো তো মুখের ওপর হাতচাপা দিতে পারবে না। ভাষা ব্যবহারের জন্য কোনো আইনও করা যাবে না। এফএম রেডিওতে ব্যবহৃত মুখের কথাকে কী ধরনের বাচন বলা যায়! তার পরে বাংলা ভাষার এই চরম বেসামাল দশা থেকে উদ্ধারের জন্য নানারকম ব্যবস্থাপত্র দেয়া হচ্ছে। তরুণদের তরফ থেকে হচ্ছে, প্রবীণদের তরফ থেকেও হচ্ছে।

কথাগুলো একদম ঠিক। সত্যিই তো, ভাষার সঙ্গে ক্ষমতার যোগ আছে, শাসনের যোগ আছে, শিল্প-সাহিত্য-সঙ্গীত-সংস্কৃতির যোগ তো আছেই। পৃথিবীতে অসংখ্য উদাহরণ আছে, ভাষা জন্মায়, ব্যাধিগ্রস্ত হয়, জরাগ্রস্ত হয়, বিলুপ্ত হয়ে যায়। লেখা ভাষার অক্ষর বিস্মৃতির মধ্যে তলিয়ে যায়, মুখ থেকেও সরে যায়, লিখিত চেহারাও অদৃশ্য হয়ে যায়। বর্ণলিপি অদৃশ্য হয়ে যায়। স¤প্রতি জানা গেছে, প্রশান্ত মহাসাগরের ছোট্ট একটি দ্বীপে খুব ক্ষুদ্র একটি জনগোষ্ঠী এখনো আছে, দুশ আড়াই শ-র বেশি লোক সেখানে নেই এবং কোনো মানুষই কোনো মানুষ থেকে দুই-তিন কিলোমিটারের দূরত্বে কেউ থাকে না। তাদের একটা লিপি ছিল, মুখের কথা তো ছিলই, এখন লিপি বা বর্ণমালা আপনা আপনি হারিয়ে গেছে। কারণ তারা এতই কাছাকাছি থাকে যে, কোনো কারণেই কাউকে লিখে কিছু জানানোর প্রয়োজন হয় না। মুখে বললেই চলে, ইঙ্গিত করলেই কাজ হয়, খুব জোরে চেঁচিয়ে বললেই সবাই শুনতে পায়। তাহলে আর লিখিত ভাষার প্রয়োজন কী? কাজেই লিপি বা বর্ণমালাটি ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল। আমরা জানি, ভাষা বিষয়ে এ ধরনের অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যায়, কার্যকারণ ব্যাখ্যাও করা যায়।

বাংলা ভাষা টেকা না টেকার কথাটাকে ওরকম হাজার হাজার উদাহরণের সঙ্গে একই তুলনা দিয়ে কী বোঝা যাবে? আমার নিজের ধারণা বাংলাদেশে বাংলা ভাষাবিষয়ক সমস্যা সম্পূর্ণ অন্যরকম এবং প্রত্যেকটি প্রতিবন্ধকই অবশ্যই অতিক্রম্য- এই কথাটা আমি বাস্তব অবস্থা বিচার করে একটা সাধারণ উক্তি হিসেবে বলছি। এটাকে কেউ যেন প্রচলিত বাগভঙ্গিগত নির্বোধের আশাবাদ বলে মনে না করে। আমি তথাকথিত আশাবাদীদের আশা বাদ দিয়েই চূড়ান্তভাবে আশাবাদী। সেখান থেকে আমার নড়চড় নেই। বাংলা ভাষা নিয়ে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা পর্বতপ্রমাণ, উচ্চকণ্ঠের ঢক্কানিনাদ, আকাশস্পর্শী ফাঁকা এবং সম্পূর্ণত লক্ষ্যশূন্য ও লোভী ভণ্ডামি আমাদের সমগ্র বুদ্ধি ও বিচারবোধকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। এক্ষুনি এসব প্রতিবন্ধক সরিয়ে ফেলা যাবে বলে মনে হয় না। রাষ্ট্র নতিস্বীকার করেছে ক্ষমতার কাছে, ক্ষমতার লোভের কাছে, মুষ্টিমেয়র কাছে। আপস করতে বাধ্য হচ্ছে পৃথিবীজোড়া ভয়ানক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কাছে। ধর্মের জুজু এখন ভয় দেখাচ্ছে। সেই জুজু যোগ হয়ে গিয়েছে ক্ষমতা-কাঠামোর সঙ্গে। ভেঙে নতুন করে, গোটা দেশের মানুষের পক্ষে রাষ্ট্র গড়ে তোলার প্রতিশ্রæতি শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়ে যাচ্ছে আর শেষ হিসেবে চলে যাচ্ছে জনগণের বিপক্ষেই।

ভাষার, বাংলা ভাষার একটা খুব বড় ভূমিকা আছে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে। কতকাল থেকে বলা হচ্ছে একমুখী বাধ্যতামূলক শিক্ষাব্যবস্থা চালু করার কথা। প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধন নাকি করা হচ্ছে এবং সেটা অনেকটা এগিয়েও গিয়েছে। হয়ে তো গিয়েছে, কিন্তু ঠিক হয়েছে এবং হচ্ছে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলজুড়ে, বাংলাদেশের হাজার হাজার জনপদের বিদ্যালয়, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে? ঘর আছে এক রকম পুরনোগুলোই, সবই আগের, শুধু রদবদল হয়েছে আসবাবগুলোর, এখানকার চেয়ার ওখানে নিয়ে গিয়েছে- উত্তরমুখী শিক্ষক দক্ষিণমুখী হয়ে বসেছেন। শিক্ষার শরীর আত্মা কোনো কিছু পরিবর্তিত হয়নি। বদলায়নি শহর-নগর আর মফস্বলের পুরনো ব্যবস্থা। রাজধানীসহ বড় বড় নগর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক ভাড়া করা, বণিকী ইংরেজি চালু রাখা, মিডিয়াম ইংরেজি রেখে বাংলা পাঠ্যপুস্তক ইংরেজিতে অনুবাদ করে দেয়া- মিডিয়াম একই রাখা। সম্পূর্ণ পণ্য ও ব্যবসামুখী ব্যবস্থা বজায় রেখে দেয়া। শাসকদের মননে-মেজাজে উপনিবেশ না থাকলে এমন চলতে পারে না, স্বাধীন দেশে।

এই আলোচনা আপাতত দীর্ঘ করার প্রয়োজন দেখি না। একটা খুব মোটা দাগের সত্যের দিকে শুধু নজর ফেরাই।

তবে শুধু বলতে হয় প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে ১৬ কোটি মানুষ আছে। কতকাল ভুয়া প্রতিশ্রæতি, মিথ্যা আশ্বাস আর গাজোরি ক্ষমতা দিয়ে এই ১৬ কোটি মানুষকে বঞ্চিত রাখা যাবে! আমি টের পাচ্ছি বাংলা ভাষার প্রশ্নটিকে স্রেফ ভাষার গণ্ডির মধ্যে আর দেখা হচ্ছে না, তা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের সমগ্র কর্মকাণ্ডের মধ্যে। ভাষার ভরাডুবি হবে এ কথার অর্থ রাষ্ট্রেরই ভরাডুবি হবে। সে রকম শেষ পরিণতি আমি কখনোই আবেগ বা যুক্তি কোনো দিক থেকেই মানি না।

২৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj