একুশের আলোকে প্রবাদ-বচন; আর বাঙালি রীতি : মোহাম্মদ জমির

বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

আমজনতার ব্যবহার করা ছোট ছোট সারগর্ভ কথাকে বলে প্রবাদ, বচন। উৎপত্তির দিক দিয়ে এবং বেশিরভাগের অবস্থান ধর্মীয় আর জাতির ইতিহাস মঞ্চে লোকগাথা ও লোকগীতির সমান্তরালে। মাঝে মধ্যে উপকথা আর ধাঁধার সঙ্গেও জড়ানো হয়ে থাকে এগুলোকে। প্রবচন, চুটকি কিংবা জনশ্রæতি নামে সাহিত্যেও অবাধ বিচরণ এদের।

পৃথিবীর প্রতি প্রান্তের প্রতিটি অঞ্চলের বাসিন্দাদের ভাষার অন্যতম অনুষঙ্গ এ বচন ও প্রবাদ। স্থানীয় সাংস্কৃতিক আবহ, ভাষা আর স্থানীয় ভাব প্রকাশের পার্থক্যকে ফুটিয়ে তুলতে এদের জুড়ি নেই। স্বভাবের কিছু অংশের নিয়ন্ত্রণে এদের ভূমিকা রয়েছে। আদিবাসী প্রজ্ঞা আর আচারবিধির দৃষ্টান্ত হিসেবেও এদের ব্যবহার কম নয়। আবার একই বচনের বহু রকম ব্যবহার দেখা যায়। বাংলা বচনের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একই। বাংলা ভূখণ্ডে ব্যবহার হওয়া বচনগুলোর সমার্থক জনশ্রæতি খুঁজে পাওয়া যায় উড়িষ্যা, আসাম, বিহার, তামিলনাড়ু এমনকি নেপালের ভাষা আর উপভাষাগুলোয়। এসব বচন শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, আবহাওয়া আর ভাগ্য গণনাকেই তুলে ধরে তা নয়; এগুলোর ব্যবহার হয় সামাজিক আচরণের বিভিন্ন পর্যায়েও।

ইউরোপ আর বাংলার প্রবাদ-প্রবচনগুলোর মধ্যে সাধারণ মিলটা হলো, এগুলো সবই ঘরোয়া দৃশ্যপট তুলে ধরে। কারণ এগুলোর অধিকাংশেরই উৎপত্তি পল্লীসমাজ থেকে। ইউরোপে প্রবাদ প্রবচনে উঠে আসে পাত্র-কেটলি, ভেড়া, ঘোড়া, মোরগ-মুরগি, গরু, কুকুর আর দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন ঘটনা।

বাংলা প্রবাদে ঘুরেফিরে আসে গৃহপালিত পশু আর দৈনন্দিন জীবন ঘিরে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। আর এর সবই শহুরে জীবনের বদলে গ্রামকেই বেশি তুলে ধরে। ইউরোপীয় প্রবাদের সঙ্গে বাংলার সবচেয়ে বড় অমিল ঐতিহাসিক ঘটনা ব্যবহারের ক্ষেত্র। ঊনিশ শতকে এসে বহু বিজ্ঞ ব্যক্তি বাংলা বচন সংগ্রহ করে সেগুলো ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সহযোগে প্রকাশ করার প্রয়াস নিয়েছেন। কিন্তু লিপিবদ্ধ সূত্রের অভাব থাকায় কার্যকর তেমন কিছু অর্জন করা সম্ভব হয়নি। সে কারণেই এখন পর্যন্ত কিছু কিছু বচনের উৎপত্তি সাল কিংবা লেখকের পরিচয় নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। আবার পুরনোগুলোকে উপজীব্য করে লেখা নতুন বচন জটিলই করে তুলেছে এ বিতর্ককে।

যাই হোক, সব প্রবাদ আর বচনের মূল বৈশিষ্ট্য একটাই- প্রতিটিরই রয়েছে দার্শনিক বিষয়াদি আর বিশেষ অর্থ। আবেগ নয়, দীর্ঘ অভিজ্ঞতাই তীক্ষèতর আর সংক্ষিপ্তরূপে তুলে ধরা হয় এসব বচনে। আচরণে এরা মানসিক আর স্বভাবে সামাজিক। এজন্যই কিছু বাংলা ভাষাবিদ বচনকে ডাকেন মানব অভিজ্ঞতার স্ফটিকায়িত রূপ হিসেবে।

বাংলা বচন প্রায়ই দ্ব্যর্থবোধক- একটি সাহিত্যিক, আরেকটি অন্তর্নিহিত। সাধারণত বচনের গুরুত্ব তার প্রতীকী অর্থের ওপর নির্ভরশীল। আর সে কারণেই রূপকাশ্রয়ী শ্রæতিগুলো প্রবাদ হিসেবে শনাক্ত করা সহজ। বাগধারার সঙ্গে এগুলোর মূল পার্থক্য সেখানেই। এদিক থেকে দেখলে বচনগুলো একেকটি আলাদা অস্তিত্ব- বলতে গেলে সেগুলো পোড় খাওয়া অভিজ্ঞতার খণ্ডাংশ। বিখ্যাত ইংরেজ সাহিত্যিক ফ্রান্সিস বেকন বচনের এ বৈশিষ্ট্য দেখতে পেয়েছিলেন। তার মতে, একটি জাতির প্রতিভা, রস আর চেতনা ফুটে ওঠে তাদের প্রবাদে।

বাংলা প্রবাদ আর বচনগুলো বর্ণনামূলক। তাতে থাকে একটি সুনির্দিষ্ট বিষয় এবং সংশ্লিষ্ট মন্তব্য। সাধারণ বোধ-বুদ্ধিভিত্তিক এ শ্রæতিগুলো গ্রামবাংলায় টিকে রয়েছে কয়েক শত বছর ধরে; হয়ে উঠেছে নৈতিকতার অলিখিত মানদণ্ড। একটি অঞ্চলের মূল্যবোধ শুধু নয়, সেখানকার সাংস্কৃতিক পরিচয়ও একাধিক উপায়ে তুলে ধরে বচনগুলো। একটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার, বছরের পর বছর ধরে বিবর্তিত হয়েছে বাংলা বচন। এ প্রেক্ষাপটে সুশীল কুমার দের সঙ্গে আমি একমত, গাঁয়ের লোকদের মুখে মুখে এগুলো তৈরি হলেও অধিকাংশ সময় সেগুলোর উৎস নির্দিষ্ট করা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে।

বাংলা বচনগুলোর রয়েছে নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু ও অর্থ। এদের মধ্যে কিছুর গঠন অসঙ্গতিপূর্ণ; আবার অন্যগুলো তুলনামূলক কিংবা পূরক ধরনের। কিছু প্রবাদ-বচন রয়েছে, যেগুলো আলোচনা করে সমাজবিজ্ঞানের নীতি, রাজনীতি কিংবা অর্থনীতি নিয়ে। আবার কিছু বচন রয়েছে আবহাওয়া, আবহাওয়ার ধরন, অতিপ্রাকৃতিক বিষয়বস্তু, গাছগাছালি বা জীবজন্তু নিয়ে। দৈনন্দিন ভাগ্য গণনার মতো বিষয়ও স্থান পেয়েছে বচনের আলোচ্যসূচিতে।

১৯৭৬ ও ১৯৮৫ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশ হয় মোহাম্মদ হানিফ পাঠানের বাংলা প্রবাদ পরিচিতি বইটি। এখানে উত্থাপিত একটি প্রসঙ্গ উল্লেখ বিশেষভাবে তুলে ধরতেই হয়- বাস্তবতার নিরিখে প্রবাদ সংগ্রহ ও তা প্রকাশের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেছেন হানিফ মোহাম্মদ। তিনিই প্রথম সঠিকভাবে তুলে ধরেছেন মুখে মুখে বচনের ছড়িয়ে পড়ার গুরুত্বটি। এ কারণে বচন পেয়েছে নিজস্ব একটি গতি আর দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগ ক্ষমতা। আবার এ বচনই পারে সামষ্টিক অভিজ্ঞতাকে একসূত্রে বেঁধে পরিভাষা এবং বাগধারার বিবর্তন ত্বরান্বিত করতে। এ কারণেই আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশের মতো একটি জাতির প্রতিভা আর চেতনাকে বুঝতে হলে প্রবাদের বিকল্প নেই বললেই চলে। সমাজবিদ্যার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ উপাদানের গুরুত্ব আরো বড় হয়ে যায়, যখন এ ধরনের বচন ধর্মীয় রীতির মতোই পল্লী অঞ্চলের নৈতিক মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।

বচনের ইতিহাস আর প্রাসঙ্গিকতার বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে ভবিষ্যৎদ্রষ্টা খনার নাম উল্লেখ না করলে। এ দেশের প্রথাগত কৃষি মানদণ্ডের অনেকটাই গড়ে উঠেছে খনার বচনের ওপর নির্ভর করে।

জনস্বাস্থ্য নিয়ে একরকম প্রায় অব্যর্থ পরামর্শ রয়েছে তার বচনগুলোয়। বহু শতক ধরে এ বচনগুলো এ দেশের সভ্যতা আর সংস্কৃতি গড়ে তোলায় রেখেছে অনবদ্য অবদান। এমনকি সভ্যতা আর সংস্কৃতি ভাঙা-গড়াতেও পরোক্ষভাবে কাজ করে গেছে এ বচনগুলো।

খনার বচনের সিংহভাগই ধান, কলা আর বিভিন্ন সবজি চাষের পদ্ধতি-উপকারিতা নিয়ে। পান, নারিকল, তুলাসহ দৈনন্দিন জীবনের আরো বহু কিছুই স্থান পেয়ে এসব বচনে। কিছু সময় এসব বচন ঘোরতর দার্শনিক। খনার ছন্দ আর প্রকরণে স্পষ্ট প্রভাব পড়েছে মধ্যযুগীয় বাংলা ব্যাকরণের বিশেষ একটি সময়ের। আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, খনার বচনের সঙ্গে মিল রয়েছে প্রায় একই সময়কার উড়িয়া, কানাড়া, তেলেগু আর নেপালি ভাষার প্রবাদগুলোর।

বাংলা ভূখণ্ডের ভাষা হিসেবে বাংলা আর বচনের মধ্যে রয়েছে অতি পুরনো সম্পর্ক। ইতিহাস থেকে অবশ্য জানার উপায় নেই যে, ঠিক কবে থেকে এ ভূখণ্ডের বাসিন্দারা পেশা হিসেবে চাষাবাদকে বেছে নিয়েছে।

অবশ্য অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ অব্দের কাছাকাছি কোনো এক সময় হবে সেটি। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা, মেদিনীপুর, মুর্শিদাবাদ আর বীরভূমে বিভিন্ন সময় খননকাজ চালিয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে, এখানে গড়ে ওঠা সভ্যতার মানুষ বহু আগে থেকেই কৃষিজ্ঞানে সমৃদ্ধ ছিল (দি ইস্টার্ন এনথ্রোপলজিস্ট, খণ্ড ৩১, নং ৪, ১৯৭৮, পৃষ্ঠা ৫৪৩-৫৫৫)। চব্বিশ পরগণার চন্দ্রকেতুগড়ে মাটি খুঁড়ে পাওয়া গেছে কৃষিসংশ্লিষ্ট কিছু টেরাকোটা। এগুলোয় ফুটে উঠেছে নারকেল, সুপারি ও তালগাছের মতো অতি পরিচিত দৃশ্যগুলোও। এ ধরনের তথ্যপ্রমাণ এটাই নির্দেশ করে যে, অতি প্রাচীনকাল থেকেই বাংলার ধর্ম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল কৃষির সঙ্গে। আবার এ সম্পর্কই ফুটে উঠেছে বিবর্তমান বাংলা বচনে।

বাংলার প্রাথমিক দিককার অর্থনৈতিক ইতিহাস ঘাঁটলে বোঝা যায়, এক সময় কৃষিকাজ আর এর সংশ্লিষ্ট পেশাকে খুবই সম্মানের সঙ্গে দেখা হতো। বাংলার অর্থনীতিতে কৃষকের অবদানের বিষয়টি বারবারই উঠে এসেছে খনার বচনে। মধ্যযুগের বিশিষ্ট কবি মুকুন্দরামের কবিতাগুলোয়, বিশেষ করে চণ্ডীমঙ্গলে উঠে এসেছে কৃষকের মাহাত্ম্য। একাধিকবার খনা বলেন- যার ঘরে নেই ঢেঁকি মশাল, সেই বৌঝির নেই কুশল, কিংবা গরু, জরু, ধান, এই তিনে রাখে মান, কিংবা যার গোলায় নাই ধান, তার আবার কোঠার টান; কিংবা যার নাই গরু, সে সবার হরু এসব বচনে স্বাস্থ্যবান গৃহপালিত পশু এবং কৃষি উপকরণের গুরুত্বের ওপরই বারংবার আলোকপাত করেছেন খনা। কারণ এগুলো গেরস্তের ধনসম্পদ বলে বিবেচিত।

নিকট-অতীতে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় জরিপ চালিয়ে এটা নিশ্চিত হওয়া গেছে, অধিকাংশ ব্যক্তি ডাক কিংবা খনার কথা না জানলেও তাদের বচনগুলো প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে জীবনের অংশ হয়ে গেছে স্থানীয় বাসিন্দাদের। বিশেষ করে ময়মনসিংহ (ত্রিশাল থানা), কুমিল্লা (ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা) এবং দিনাজপুরে (সেতাবগঞ্জ উপজেলা) মাত্র ৯ শতাংশ লোক ডাক কিংবা খনার লেখা পড়েছেন। আবার ৯৩ শতাংশ ব্যক্তিই খনা এবং কৃষির মধ্যকার সম্পর্কটা জানেন। এটা দেখা গেছে, বাংলাদেশের ৮৯ শতাংশ মানুষই গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বিষয়গুলোয় খনার বচন গুরুত্বের সঙ্গেই বিবেচনা করে থাকেন।

একুশের এই মাসে বচন নিয়ে লিখলাম। কারণ আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে প্রবাদ-বচনের অবদান কিংবা প্রভাব অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

২৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj