বাংলাদেশ ও আ মরি বাংলা ভাষা : অধ্যাপক মোহীত উল আলম

বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

বাংলাদেশ হওয়ার পর যে ক্ষেত্রে এখনো আমরা একটা সদুত্তর তৈরি করতে পারিনি সেটা হচ্ছে বাংলাভাষার ব্যবহার নিয়ে। যদিও বাংলাদেশ সৃষ্টি হওয়ার মূল উৎস হিসেবে কাজ করেছে মাতৃভাষার সার্বভৌমত্বের জন্য অধিকার আদায়ের সংগ্রাম, কিন্তু বাস্তবে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু রাখার দাবি কখনো পূরণ হয়নি। পূরণ হওয়ার মতো নয়ও সম্ভবত। ভাষা নিয়ে আমাদের বঞ্চনার ক্ষতটা বড় হচ্ছে, কিন্তু ঠিক কী করলে এর প্রতিবিধান হবে সেটা আমাদের জানা নেই। এ সমস্যাটা অর্থাৎ কী করলে বাংলাভাষা সর্বস্তরে চালু রাখা যাবে, কিংবা চালু রাখা না গেলে কী করতে হবে সেটা একটু তলিয়ে দেখার জন্য আমার আলোচনা।

একবার ইতালি ও স্পেন যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। দু’দেশ ঘুরে দেখলাম যে সাধারণ ইংরেজি শব্দ- যেমন মিল্ক, স্পুন, টিকেট যেগুলো আমাদের কাছে বাংলা শব্দ বলেই মনে হয়, সে রকম ইংরেজি শব্দও ঐ দু’দেশের রাস্তার লোকেরা জানে না। মিলানো নগরীর কাছে একটা ছোট শহরে ঢুকলাম এবং রাতের খাবারের সময় হয়ে গিয়েছিল তাই একটি চীনা রেস্তোরাঁয় গেলাম। ইতালিয়ান পরিচারিকাকে বললাম চিকেন দিতে। সে চিকেন বোঝে না। টিস্যু পেপারের ওপর একটা মুরগি এঁকে যখন দেখালাম সে ইউরেকা করে বলল, ওহ, পোলো! মুরগিকে ইতালিয়ানরা পোলো বলে। ব্যাপারটা মজাদার ছিল, কিন্তু আমার ভেতরে খুব লাগল। কই আমরা তো কখনো চিকেন বিস্মৃত হয়ে মুরগি চিনব না। মুরগি শব্দটা আমাদের মনোজগৎ দখল করতে পারেনি, যে অর্থে পোলো শব্দটা ইতালিয়ানদের করেছে। বুঝলাম, ইতালি, স্পেন এরা নিজেরাই সাম্রাজ্যবাদী দেশ ছিল, ছিল ইংরেজদের আগে। ফরাসিরাও ইংরেজদের আগে সাম্রাজ্যবাদী দেশ ছিল। নেপোলিয়ন তো আর এমনি এমনি ইংরেজদের ‘আ ন্যাশন অব শপকিপার্স’ বলে গালাগাল করেননি।

ইংরেজদের সঙ্গে আমরা ঐতিহাসিক যোগাযোগের কারণে ঋদ্ধ হয়েছি এ কথা সত্যি- কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে এ কথাটা যৌক্তিক বলে মেনে নেয়ার মধ্যে যে পরাজয়ের গন্ধ আছে সেটা দূর করার জন্য কোনো উপযুক্ত স্প্রে আমরা তৈরি করতে পারিনি। এ ব্যর্থতাবোধকে সম্প্রসারিত করে কোনো একটা যুৎসই জবাব খুঁজে পাওয়া যায় কিনা- তারই সন্ধান করছি বর্তমান লেখাটিতে।

নাইজেরিয়ার ইবো এবং হাউসা ভাষার লিখিত বর্ণমালা থাকলেও নাইজেরিয়ার সরকারি ভাষা ইংরেজি। নাইজেরিয়ার প্রথম সারির লেখক চিনুয়া এচেবে সিদ্ধান্ত নিয়েই ইংরেজিতে লিখেছিলেন এবং কেন তাঁর সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল এটিও তিনি একটি প্রবন্ধে বলে গেছেন। ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত তাঁর মর্নিং ইয়েট অন ক্রিয়েশন ডে গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত এ প্রবন্ধে তিনি বলছেন ইংরেজিতে না লিখলে বিশ্ববাসীর কাছে নাইজেরিয়ার কথা বলা যাবে না। শুধু তাঁর শর্ত ছিল ইংরেজিতে অবশ্যই নাইজেরিয়ার কথা বলতে হবে। তাঁর বিখ্যাত থিংস ফল এপার্ট (১৯৫৮) উপন্যাসে ইবো লোকজ সংস্কৃতির শব্দ ও উপাদান অকাতরে ঢুকিয়ে তিনি তাঁর শর্ত পূরণ করেছিলেন। তাঁর আরেকটি যুক্তি ছিল নাইজেরিয়া যেহেতু বহু গোত্রের বহু আঞ্চলিক ভাষার দেশ সে জন্য ইংরেজি হলো সে ভাষা যেটা সবাই বোঝে। ভারতে ঐ একই কারণে ইংরেজি হিন্দির চেয়েও অগ্রাধিকার পেয়েছে সংযোগ ভাষা হিসেবে। দক্ষিণ ভারতের লোকেরা হিন্দি ব্যবহারই করতে চায় না কারণ তাতে তারা নিজেদের উপনিবেশিত মনে করে, মনে করে উত্তর ভারতের ভাষা কেন তারা ব্যবহার করবে? এচেবের উপন্যাস প্রকাশের ৪৬ বছর আগে রবীন্দ্রনাথের কী ঐ একইরকম তাগিদ থেকে গীতাঞ্জলির কবিতাগুলো ইংরেজিতে অনুবাদ করার প্রয়োজনীয়তার কথা মনে আসেনি? এবং তাঁর ধারণাই তো সঠিক ছিল, কারণ আইরিশ ইংরেজ কবি ইয়েটস সং অফারিংস গ্রন্থের অনবদ্য ভূমিকাতে কী স্বীকার করেননি যে রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়ে তিনি ভারতীয় দর্শনের সাত্তিক রূপটির সঙ্গে পরিচিত হতে পেরেছিলেন। ২০০৫ সালে প্রকাশিত সমীর সেনগুপ্ত তাঁর রবীন্দ্রনাথের আত্মীয়স্বজন গ্রন্থে রথীন্দ্রনাথের বালিকা বধূ প্রতিমা মুখোপাধ্যায়/ঠাকুরকে ইংরেজি শেখানোর ক্ষেত্রে বলছেন রবীন্দ্রনাথের “খাঁটি ইংরেজ বা আমেরিকান মহিলাই তাঁর পছন্দ [ছিল]- নিজের সন্তানদের জন্য শিলাইদহে যেমন রেখেছিলেন লরেন্সকে” (পৃ. ১৬৮)। এ কথা প্রমাণ করে যে রবীন্দ্রনাথ ইংরেজি সাম্রাজ্যবাদী ভাষার ভারতীয়দের জন্য রাজনৈতিক গুরুত্ব যেমন বুঝেছিলেন, তেমন করে আর হয়তো কেউ বোঝেননি। তুলনামূলক প্রেক্ষিত আনলে বলতে হয় শেক্সপিয়ার যদি তাঁর শ্রেষ্ঠ নাটক হ্যামলেট তৎকালীন পড়ন্ত কিন্তু শক্তিশালী ভাষা ল্যাতিনে অনুবাদ করার বা করানোর চেষ্টা করতেন তা হলে যে প্রভাবটি ল্যাতিন ভাষার পক্ষে তৈরি হতো ঠিক সেরকমেরই কাজটি হয়েছিল গীতাঞ্জলি ইংরেজিতে সং অফারিংস-এ পরিণত হওয়ায়। বাংলাভাষার পরিচিতি বাড়লো, কিন্তু সেটি ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে। অর্থাৎ প্রকারান্তরে ইংরেজি ভাষায় নতুন মাত্রা যুক্ত হলো। ভারতীয় বাঙালি কিন্তু ইংরেজিতে লিখে বিশ্বখ্যাতি অর্জন করেছেন, শ্যাডোলাইনস উপন্যাসটি খ্যাত সে অমিতাভ ঘোষ ঢাকায় এলে তাঁকে একটি আলোচনা সভায় উপস্থিত দর্শকদের একজন জিজ্ঞেস করেছিলেন, তিনি কেন বাংলায় না লিখে ইংরেজিতে লেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ইংরেজির মাধ্যমে পড়ালেখার কারণে ইংরেজিতে লেখা তাঁর পক্ষে সহজাত ছিল, কোনো সিদ্ধান্তের ব্যাপার ছিল না। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে যেটা সিদ্ধান্তের ব্যাপার ছিল সেটাই সহজাত ব্যাপার হয়ে পড়ল অমিতাভদের কাছে। ইংরেজরা ভারত ছেড়ে যাওয়ার পর কিছু ভারতীয় নিজেদের মাতৃভাষায় না লিখে সেই ইংরেজি ভাষায় লিখতে যে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছিলেন, তা’তে আমি পূর্বে যে জ্বলুনির কথা বলেছিলাম সে জ্বলুনির একটা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছি বলা যায়। অর্থাৎ বাংলাভাষার সার্বভৌমত্বের কথা যে বলব, তা হয়তো মুখে বলা সহজ, কিন্তু তাকে কার্যকর করার ক্ষেত্রে বহু আগে থেকেই বাধার দেয়াল তৈরি হয়ে আছে। ইংরেজি ভাষার প্রাধান্যকে পরের তোলা দেয়াল মনে না করে নিজের তৈরি আত্মরক্ষামূলক দেয়াল মনে করার একটি আত্মপ্রবঞ্চনাবোধ উপনিবেশিতদের মনে মুক্তির রাস্তা এ যুক্তি হিসেবে দেখা দিয়েছে। যেমন ওয়েস্ট ইন্ডিজের লেখক জর্জ ল্যামিং বলেছিলেন, ইংরেজি ইংরেজদের ভাষা হবে কেন, ইংরেজি এখন বিশ্বভাষা, সে হিসেবে ইংরেজি তাঁরও ভাষা। এ যুক্তিটা হয়তো বাংলাদেশে আমরাও তুলে ধরতে পারি এ কথাটা ভুলে যে ল্যামিংয়ের জন্য ইংরেজি ভাষা ছাড়া উপায় ছিল না, কিন্তু আমাদের জন্য সবসময় উপায় থাকে, কারণ বাংলাভাষা অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাষা। ল্যামিং ইংরেজির বশ্যতা মেনে নিলেও কিছু এসে যাবে না। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ইংরেজির আভিজাত্য মেনে নিলে আমাদের ক্রমেই মনে হতে পারে যে বাংলা যেন ইংরেজির কাছে পরাস্ত হলো। যুক্তিটা একটু লম্বা করলে এ অস্বাভাবিকতার কথা বলতে হবে যে ইয়েটস যদি রবীন্দ্রনাথকে বলতেন যে তাঁর কবিতা তিনি বাংলায় তর্জমা করবেন এবং রবীন্দ্রনাথ বাংলায় তাঁর গ্রন্থের একটা ভূমিকা লিখে দেবেন- তা হলে হয়তো বাংলা ভাষা নিয়ে এত দুর্ভাবনায় পড়তে হতো না।

তবে রবীন্দ্রনাথের অনুবাদকর্মের একটি প্রবল নৃতত্ত্ব ও রাজনীতি- স্পৃষ্ট দার্শনিক ভিত্তি আছে যা অনস্বীকার্য।

যেমন বাঙালি সংস্কৃতি বলতে যে ভালোবাসা আমাদের মধ্যে উথলে ওঠে, এটার দুঃখজনক দিকটা হলো এটার আসলে কোন অবিনশ্বর মৌলিক রূপ নেই। যেমন বাংলাদেশ সৃষ্টি হওয়ার পর প্রথমে সবাই ভেবেছিলাম বাংলাদেশ বুঝি শুধু বাঙালিদেরই হবে, কিন্তু অব্যবহিত পরে বঙ্গবন্ধুকে একটি ভাষণে বলতে হলো বাংলাদেশে আরো জাতি আছে যারা বাঙালি নয়। কাজেই নৃতাত্তি¡কভাবে একটি জাতির মৌল রূপ থাকলেও সামাজিক ও রাষ্ট্রিক সংস্কৃতি অবধারিতভাবে কৌম রূপ নেয়। ভাষার ক্ষেত্রেও তাই হয়- মৌল রূপ ছেড়ে এটা ক্রমশ কৌম রূপ নেয়। তাই কোনো সংস্কৃতিরই এবং ঐ সংস্কৃতির অন্তর্গত ভাষার অবিনশ্বর মৌলিক রূপ থাকে না। বস্তুত আধুনিক বিষয় কালচারাল স্টাডিজ বা সংস্কৃতি পাঠের বিষয় নিয়ে যাঁরা কাজ করছেন, যেমন হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হোমি কে ভাবা, তিনি তাঁর দ্য লোকেইশন অব কালচার (১৯৯৪) গ্রন্থে ভালোমতো ব্যাখ্যা করেছেন যে সংস্কৃতির মূল আদল কেন্দ্রে নির্ণিত না হয়ে প্রান্তে নির্ণিত হয়। অর্থাৎ সংস্কৃতির একক রূপ দিয়ে কিছুই প্রকাশ করা যায় না, বরঞ্চ এক সংস্কৃতি ও অন্য সংস্কৃতির মধ্যে সর্বক্ষণ যে লেনদেন- যেটাকে নব্য ইতিহাসবাদের প্রবক্তা স্টিফেন গ্রিনব্লু্যাট নোগোসিয়েইশন বা দেয়া-নেয়ার অর্থে বুঝেছেন, সেটাই সংস্কৃতির ব্যাখ্যামূলক চরিত্র। সংস্কৃতির বহুত্ববাদের সঙ্গে আধুনিক সময়ের সাংস্কৃতিক নৃতত্ত্ববাদের মধ্যে বেশ মিল আছে। অমিতাভ ঘোষের উপন্যাসসমূহ আলোচনা করার সময় রবার্ট ডিক্সনের একটি প্রবন্ধে আমেরিকান সাংস্কৃতিক নৃতত্ত্ববিদ রেনাটো রোসাল্ডোর একটি উক্তি উদ্ধৃত আছে যেটাতে তিনি বলছেন সংস্কৃতির ধ্রæপদী ও প্রচলিত চিন্তা হচ্ছে যে সংস্কৃতি যেন একটি মৌল উপাদান। বস্তুত সংস্কৃতি আসলে তা নয় বরঞ্চ এটি একটি পোরাস বা বহু ছিদ্রবিশিষ্ট উপাদান যেখানে ভেতর থেকে এবং বাইরে থেকে সর্বক্ষণ ভাব, ভাবনা, চিন্তা, আদর্শ ও প্রাত্যহিকতার মধ্যে গ্রহণ বর্জনের বিনিময় চলছে। ডিক্সন নিজেই সংস্কৃতির জগৎকে রেলওয়ে স্টেশনের লাউঞ্জের সঙ্গে তুলনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত গান, “আসা-যাওয়ার পথের ধারে”র কথাও মনে পড়ছে এ প্রসঙ্গে। ইংরেজ নৃতত্ত্ববিদ জেইমস ফ্রেজার তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ দ্য গোল্ডেন বাউ (১৮৯০) গ্রন্থে মিথ এবং ধর্মের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা করার হেতু হচ্ছে মানুষের কৌমবাদী সমাজের চরিত্রটা তুলে ধরা।

দ্বিতীয়ত, ভাষান্তর হলো পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষাভাষী লোকদের মধ্যে যোগাযোগের অন্যতম সেতু। সাহিত্যে অনুবাদকর্ম যে দিন থেকে সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে সে দিন থেকে চলে আসছে। সাহিত্যের বিশ্ব ইতিহাসের ধারা অনুযায়ী এ কথাটা বলতে হবে যে প্রাচীনতর অগ্রগণ্য সমাজের লেখক ও কবিদের কাজ কম অগ্রগণ্য সমাজে অনূদিত হওয়ার রেওয়াজ। যেমন প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সাহিত্য আরবি ভাষায় ও ইউরোপীয় আধুনিক ভাষায় অনূদিত হয়েছিল। হোমার, ভার্জিল, হোরেস এবং প্লুটার্ক প্রমুখ প্রাচীন মনীষীদের কাজ আধুনিক ফরাসি ও ইংরেজি ভাষাসহ অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষায় অনূদিত হয় রেনেসাঁর যুগে। প্লুটার্কের লাইভস অব দ্য নোবল গ্রিকস এন্ড রোমানস ইংল্যান্ডের রানী এলিজাবেথের সময় টমাস নর্থ ইংরেজিতে অনুবাদ করে একটি কালজয়ী কাজ করেছিলেন।

আবার, বিংশ শতাব্দীর শেষ অর্ধে যখন ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর বলয় থেকে উপনিবেশগুলো একে একে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে থাকে, তখন একটি তাড়নার সৃষ্টি হয় যে সাম্রাজ্যবাদের বলয়ে বিরাজমান সাংস্কৃতিক মণ্ডল যেহেতু খ্যাতি ও প্রচারণায় অগ্রসরমান সে জন্য উপনিবেশিত লেখকদের কাজ সাম্রাজ্যবাদী ভাষায় অনূদিত হলে বিশ্বসভায় পরিচিতির অবকাশ মেলে। আগেই বলেছি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ ধারার একটি বড় উদাহরণ। তাঁর কাজটি- গীতাঞ্জলি বা সং অফারিংস তিনি ইংরেজিতে অনুবাদ না করলে হয়তো বিশ্ববাসীর কাছে অপরিচিত থেকে যেতেন এবং নোবেল পুরস্কার পাওয়াও তাঁর দুরূহ হতো।

এখনো এ ধারা বজায় আছে বলা যায়। প্রাক-সাম্রাজ্যবাদী যে কোনো একটি ভাষায় অনূদিত না হলে বিশ্ব পুরস্কার সভায় যোগ্য বলে বিবেচিত না হওয়ারই কথা। একটা উদাহরণ দিই- মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস পুতুল নাচের ইতিকথা ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত। এটির দার্শনিক ভিত্তি অস্তিত্ববাদ। আর ফরাসি লেখক আলবেয়ার কাম্যুর উপন্যাস লে পেস্ট বা দ্য প্লেগও অস্তিত্ববাদ সংকটের ওপর রচিত, যেটি প্রকাশিত হয় ১৯৪৭ সালে। কিন্তু বাংলা ভাষায় রচিত হওয়াতে এবং কোনো সুযোগ্য অনুবাদ না হওয়াতে মানিক অপরিচিতই থেকে যান কিন্তু কাম্যু নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন। মিসরের নগিব মাহফুজ বা তুরস্কের ওরহান পামুক এঁদের কাজ ইংরেজিতে অনুবাদ করা না হলে তাঁরা নোবেল পুরস্কার পেতেন কিনা সন্দেহ।

বাংলাদেশে বাংলা ভাষার বর্তমান উত্তরণের প্রক্রিয়ায় অনুবাদকর্ম সবিশেষ প্রাধান্য পাবে।

২.

আরেকটি দূরের প্রেক্ষাপট তুলে ধরি। ইংল্যান্ড সাম্রাজ্যবাদী শক্তিতে পরিগণিত হওয়ার প্রাক্কালে এর নৃপতি ছিলেন রানী এলিজাবেথ। তাঁর রাজত্বের সময়কাল ১৫৫৮ থেকে ১৬০৩। প্রায় একই সময়ে ভারতবর্ষের সম্রাট ছিলেন মহাপরাক্রমশালী আকবর, যাঁর রাজত্বকাল ছিল ১৫৫৬ থেকে ১৬০৫। আকবর সম্পর্কে পড়েছি তাঁকে যখন নৌবাহিনী গড়ে তোলার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল তিনি নাকি এর প্রয়োজন নেই বলেছিলেন। অন্যদিকে ১৬০০ সালের শেষদিনে লন্ডনের কিছু উচ্চাভিলাষী বণিক রানী এলিজাবেথের কাছে গিয়ে ভারত মহাসাগরে বাণিজ্য করার অনুমতির জন্য প্রার্থনা করলেন। রানী অনুমোদন দিলেন, আর সেই বণিকেরাই গঠন করল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, যারা ১৭৫৭ সালে বাণিজ্যের নামে দেশ দখলের জোগাড়ে নেমে পলাশীর যুদ্ধে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদ্দৌলাকে (যদিও সিরাজদ্দৌলা বাঙালি ছিলেন না) পরাজিত করলে ভাষার ক্ষেত্রে বলা যায় বাংলার সঙ্গে ইংরেজির যোগসূত্র স্থাপিত হয়। প্রথমদিকে কোম্পানির সাহেবেরা শিখতে চাইতো বাংলা, কিন্তু সেটি মাত্র কয়েক দশক। পরে ১৮৩৫ সালে ম্যাকলের ভারতের শিক্ষানীতি চালু হওয়ার পর এবং কোম্পানির কাছ থেকে ১৮৫৭ সালের ভারতের প্রথম স্বাধীনতা আন্দোলনের পর ব্রিটিশ সরকার ভারতের শাসনভার গ্রহণ করলে, ভারতীয়দের মধ্যে ইংরেজি শেখার হিড়িক পড়ে।

ইংরেজরা যখন ভারতবর্ষ দখল করে, মুসলমান মুঘল নৃপতিদের হাত থেকে ইংরেজদের কাছে চলে আসে শাসনভার। শত্রুর শত্রু বন্ধু এ তত্ত্ব অনুযায়ী হিন্দু জনগোষ্ঠী হয়ে পড়ে ইংরেজদের বন্ধু আর মুসলমানেরা শত্রু। মুসলমানেরা ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করে না ইংরেজ আমলেই প্রায় একশ বছর। পৃথিবীজোড়া সাম্রাজ্য গড়ে তুলে ইংরেজি তখন বিশ্বের সবচেয়ে সড়গড় ভাষা। কিন্তু ভারতে মুসলিম জনগোষ্ঠীর কাছে ইংরেজি ভাষা ছিল ততোটাই অনধিগম্য যতোটা সেটা ছিল হিন্দুদের কাছে অধিগম্য।

মুসলমানদের কথা তুললাম এ জন্য যে ভারতে ইসলামের প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের ভাষা যথাক্রমে ফার্সি ও আরবি (এবং পাকিস্তান আমলে উর্দু) সংস্কৃতিও ব্যাপকভাবে বাংলা ভাষার বিকাশকে প্রভাবান্বিত করেছে। যদিও প্রাচীন ভারতের বৈদিক সংস্কৃতির সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সুফিবাদী ইসলাম মিলে বাংলাদেশে প্রায় সাতশ বছর ধরে একটি অসাম্প্রদায়িক সামাজিক বাতাবরণ তৈরি হয়েছিল, কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে মৌলবাদী ইসলামের ব্যাপক উত্থানের ফলে বাংলাভাষার ব্যবহার ও বাংলা সাহিত্য পাঠের বিষয়ে একটি লক্ষণীয় সাম্প্রদায়িক সচেতনতা কাজ করছে দেখা যায়। এর ফলে লক্ষ করা যায় বাংলাদেশের সাধারণ মুসলমান জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাংলাভাষা নিয়ে একটি দ্বিধান্বিত মনোভাব কাজ করছে। বাংলা ভাষা আমাদের মাতৃভাষা, কিন্তু নিজের ভাষা নিয়ে হীনমন্যতা তৈরি করা যেমন রাজনৈতিক ঔপনিবেশিকতার লক্ষ্য, তেমনি ধর্মীয় ঔপনিবেশিকতারও লক্ষ্য। বাংলাদেশে বাংলা ভাষা তাই ইংরেজি ভাষা দ্বারা আক্রান্ত, আর বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতি দ্বারা আক্রান্ত।

কিন্তু এ বাস্তবতা- অর্থাৎ ইংরেজির শক্তিশালী প্রভাব এবং মধ্যপ্রাচ্যের আরো শক্তিশালী সাংস্কৃতিক প্রভাব থেকে বাংলাদেশ কোনোদিন মুক্ত হতে পারবে না। বিশ্বজুড়ে সাংখ্যিক প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের ফলে যেভাবে সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে, তাতে এ কথা আরো নির্দ্বিধায় বলা যায় যে বাংলাদেশের জন্য ভাষার ব্যবহার আর সাহিত্য রচনার জন্য মহামিলনের দিকে এগোতে হবে।

এ সিদ্ধান্ত দিয়ে রচনাটি শেষ করার আগে অনুবাদ সম্পর্কিত দু’টো কৌশলগত দিক তুলে ধরতে চাই।

প্রথমত, আমরা যখন বাংলা বা ইংরেজিতে তলস্তয় বা ফ্লবেয়ারের উপন্যাস পড়ে তৃপ্তি পাই, তখনো আমাদের মনে এ কৌত‚হল থাকে যে তাঁদের মূল রুশ বা ফরাসি ভাষায় (এল ওয়ান) পড়তে পারলে আরো কতই না মজা পেতাম। কিন্তু এ স্বাদ তো বাস্তবভাবে কোনোদিন মিটবে না। পৃথিবীর সব সাহিত্য তো আর মূল ভাষায় বা এল ওয়ানে পড়া যাবে না। তাই অনুবাদ ছাড়া বিকল্প নেই। কিন্তু অনুবাদের দিক থেকে অর্থাৎ এল টু-এর দিক থেকে এটার একটা উত্তর আছে। যে বাংলাভাষী লোক ইংরেজি ভালো জানেন তিনি হয়তো চার্লস ডিকেন্সের উপন্যাসের বাংলা অনুবাদের উৎকর্ষ নিয়ে কথা বলতে পারবেন- অনুবাদটা কেমন হলো বা হলো না ইত্যাদি। কিন্তু যিনি ইংরেজি ভাষায় উপন্যাস বোঝার মতো প্রাগ্রসর নন তাঁর কাছে অনুবাদকর্মটিই হবে একমাত্র বিবেচ্য। তাঁর কাছে সেরা হলে সেটাই সেরা অথবা নয়। কিন্তু তাঁর কাছে যে উপন্যাসটা সেরা মনে হলো তারও তো একটা মূল্য আছে। এল ওয়ানে কী আছে না আছে সেটা তাঁর জন্য বিবেচ্য নয়, কিন্তু এল টু-তে তাঁর কাছে উপন্যাসটাই সেরা মনে হয়েছে সেটাই হচ্ছে বিবেচ্য। যেমন রবীন্দ্রনাথের “সোনার তরী”র বাংলায় আবেদনটি অন্য ভাষায় হুবহু অনুবাদ করা নিশ্চয়ই সম্ভব নয়, তাই বলে কি ঐ কবিতাটার রসাস্বাদন অন্য ভাষার পাঠকেরা পাবেনই না বলে ধরে নিতে হবে? আসলে তা নয়, মানুষের জীবনের বহু সীমাবদ্ধতার মধ্যে এই সীমবদ্ধতাটাও মেনে নিতে হবে যে ভাষার পার্থক্যের কারণে একই মানের মূল ভাষার পাঠক আর অনূদিত ভাষার পাঠক একই রস আস্বাদন করতে পারবেন না সেটা ধরে নিতে হবে। আবার সঙ্গে সঙ্গে এ কথাটাও বলতে হবে যে যতোক্ষণ পর্যন্ত এল ওয়ানের ভাষায় এল টু-এর পাঠকের জ্ঞান থাকবে না, ততোক্ষণ পর্যন্ত তার কাছে তুলনা করার উপকরণ থাকবে না এবং ততোক্ষণ পর্যন্ত তাকে এল টু-এর মাধ্যমে আস্বাদিত রসকেই মোক্ষম হিসেবে গণ্য করতে হবে। যেমন পৃথিবীর সেরা বিশ্ববিদ্যালয় ধরলাম হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়, আর সেখান থেকে যে পিএইচডি পাচ্ছে তার যে আনন্দ, তার চেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে পিএইচডি পাচ্ছে তার আনন্দ কি কম? যে দম্পতির সন্তান আছে তাদের যে আনন্দ, আর যে দম্পতির সন্তান নেই কিন্তু দত্তক সন্তান আছে তাদের আনন্দ কি কোনো অংশে কম?

দ্বিতীয়ত, দেখা যাচ্ছে সভ্যতা ও ভাষার ঐক্য অনুযায়ী সাংস্কৃতিক সাযুজ্যপূর্ণ এলাকা নিয়ে পৃথিবী বহু অংশে বিভক্ত। যেমন বলতে পারি, ভাষা ভিন্ন ভিন্ন হলেও ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে সাংস্কৃতিক সাযুজ্য অনেক বেশি। সে সুবিধাটা অনুবাদের ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হয়। যেমন শেক্সপিয়ারের নাটক ফরাসি, স্প্যানিশ বা জার্মান ভাষায় অনুবাদের ক্ষেত্রে অনুবাদক যতটা ইন-বিল্ট বা নিহিত সুবিধাদি (একই ধরনের সমাজ, একই ধরনের অবকাঠামো, একই ধরনের জীবন-যাপন এবং একই ধরনের ধর্মচর্চা ইত্যাদি) পাবেন, বাংলাভাষার অনুবাদক তা পাবেন না। ফার্সি থেকে বাংলায় ওমর খৈয়ামের রুবাইয়াৎ অনুবাদের সময় কাজী নজরুল ইসলাম, কিংবা সংস্কৃত থেকে বাংলায় মেঘদূত অনুবাদ করার সময় বুদ্ধদেব বসু যে সহজিয়া সাংস্কৃতিক উপকরণগুলো পেয়েছিলেন, শার্ল বোদলেয়ারের কবিতা অনুবাদের সময় বুদ্ধদেব বসু নিশ্চয় তা পাননি।

২৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj