বাঙালির স্বাধীনতা : সংস্কৃতির সংগ্রাম : ফরিদ আহমদ দুলাল

বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

২৬ মার্চ ১৯৭১-এর প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার যাত্রা শুরু, কিন্তু বলা হয় ১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারিতে উপ্ত ছিল আমাদের স্বাধীনতার বীজ, আবার ১৯৭১-এর ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স মাঠে বঙ্গবন্ধু যে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন তার মধ্যেই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা। স্বাধীনতা-উত্তর সময়ের সাংস্কৃতিক যাত্রার বিষয়টি অনুধাবন করতে চাইলে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের ইঙ্গিত বুঝতে হবে। বঙ্গবন্ধু তার সেই ১৮ মিনিটের ভাষণে বলেছেন, ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সব কিছু- আমি যদি হুকুম দিবার না-ও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে! …. যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মুক্তি না হচ্ছে, ততদিন খাজনা ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হলো- কেউ দেবে না। শুনুন মনে রাখবেন, শত্রুবাহিনী ঢুকেছে নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটতরাজ করবে। এই বাংলায়- হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি, অ-বাঙালি যারা আছে তারা আমাদের ভাই, তাদের রক্ষার দায়িত্ব আমাদের উপর, আমাদের যেন বদনাম না হয়। মনে রাখবেন, রেডিও-টেলিভিশনের কর্মচারীরা যদি রেডিও আমাদের কথা না শোনে তাহলে কোনো বাঙালি রেডিও স্টেশনে যাবেন না। যদি টেলিভিশন আমাদের নিউজ না দেয়, কোনো বাঙালি টেলিভিশনে যাবেন না। ২ ঘণ্টা ব্যাংক খোলা থাকবে, যাতে মানুষ তাদের মাইনাপত্র নিতে পারে। পূর্ববাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে এক পয়সাও চালান হতে পারবে না। টেলিফোন, টেলিগ্রাম আমাদের এই পূর্ববাংলায় চলবে এবং বিদেশের সঙ্গে দেয়া-নেয়া চলবে না। …. আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোকদের হত্যা করা হয় তোমাদের উপর আমার অনুরোধ রইলো, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো, মনে রাখবা আমরা যখন মরতে শিখেছি কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না। এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম! জয় বাংলা!” বঙ্গবন্ধুর ভাষণে ‘স্বাধীনতা’র পাশাপাশি ‘মুক্তি’র যে ঘোষণা তিনি দিয়েছিলেন, সেটাই সংস্কৃতি।

সংস্কৃতি হচ্ছে প্রাগ্রসরমানতার ধারণা। আমাদের মুক্তির যুদ্ধ দিয়ে বাঙালি জাতির স্বাধীনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক-সামাজিক ও রাজনৈতিক মুক্তির আকাক্সক্ষা সেটিই প্রাগ্রসরতার ধারণা, তাই সংস্কৃতি। সংস্কৃতি ক‚পমণ্ড‚কতা এবং অচলায়তনের বিপরীত শব্দ। ১৯৪৭-এ যে স্বপ্ন নিয়ে পূর্ববঙ্গের মানুষ পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল, তা যে সংস্কৃতিকে ধারণ করে না, তা বুঝতে বাঙালির বেশিদিন সময় নিতে হয়নি; সুতরাং বাঙালির যে লড়াই-সংগ্রাম তা মূলত সংস্কৃতিরই সংগ্রাম। সংস্কৃতি প্রবহমানতার অন্য নাম, প্রাগ্রসরতার ভিন্ন নাম, সংস্কৃতি প্রগতিশীলতারই বিকল্প নাম।

১৯৭১-এ বাঙালি পাকিস্তানি দুঃশাসনের জগদ্দল সরিয়ে প্রাগ্রসরতা খুঁজেছে; অচলায়তন ভেঙে সমতার পৃথিবী খুঁজতে চেয়েছে; ক‚পমণ্ড‚কতা সরিয়ে নাব্য নদী স্রোত খুঁজে নিতে চেয়েছে জাতীয় জীবনে। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের মাধ্যমে বাঙালি প্রগতির একটা মাইলফলক স্পর্শ করেছে। বিজয় অর্জনের মাধ্যমে সংস্কৃতির সংগ্রামের যে মাইলফলক আমরা ¯পর্শ করেছিলাম, আজ বিজয়ের ৪৬ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর আমাদের পিছনে ফিরে দেখা প্রয়োজন, মূল্যায়ন করা প্রয়োজন সংস্কৃতির যাত্রা আজ কোন পথে চলছে, বিজয় অর্জনের প্রায় ৪ যুগ পর আমাদের আত্মপর্যালোচনা করা উচিত, সংস্কৃতির যাত্রা সঠিক পথে চলছে কি-না। আজকের রচনায় সেই সত্যটিই উন্মোচন করতে সচেষ্ট হবো।

সংস্কৃতির সম্পর্ক মানুষের জীবনাচারের সঙ্গে, যে কারণে কেউ চাইলেই কাউকে তার সংস্কৃতির শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে না। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টির পর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যখন বাঙালির ভাষার ওপর আঘাত হানলো তখনই প্রতিবাদে ফুঁসে উঠলো গোটা বাংলা; আর ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই বাঙালি এগিয়ে গেল স্বাধিকারের পথে। ভাষা যেহেতু সংস্কৃতির প্রধানতম অনুষঙ্গ, সঙ্গত কারণেই বাঙালি তার ভাষার অসম্মান সহ্য করতে পারেনি। সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হলে কোনো জাতিই তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে না। সংস্কৃতির প্রবহমানতার সঙ্গেই জাতির অস্তিত্ব এবং অগ্রগতি বজায় রাখার সম্পর্ক। সংস্কৃতি সব সময়ই প্রাগ্রসর চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। ৭ মার্চের ভাষণে ‘স্বাধীনতা’র সঙ্গে উচ্চারিত ‘মুক্তি’কে তাই সংস্কৃতি বলে উল্লেখ করেছি। সংস্কৃতিমান না হলে কেউ শিষ্ট হতে পারে না, সংস্কৃতিমান না হলে কেউ ন¤্র-বিনয়ী-ব্যক্তিত্ববান হতে পারে না, সংস্কৃতিমান না হলে কেউ সৃষ্টিশীল হতে পারে না; সংস্কৃতিমান না হলে কেউ সহিষ্ণু হতে পারে না, সংস্কৃতিমান না হলে কেউ চলিষ্ণু হতে পারে না; আধুনিক এবং বিজ্ঞানমনষ্ক হতে পারে না। কেন না সংস্কৃতি মানেই প্রগতি-সংস্কৃতি মানেই প্রাগ্রসরতা। মানুষের এই এগিয়ে চলার সংস্কৃতিই তাকে গুহাজীবন থেকে ডিজিটাল পৃথিবীতে নিয়ে এসেছে। আজকের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় আজ যা পরিত্যক্ত-পশ্চাৎপদ, অতীতকালের দার্শনিকদের নিজ নিজ সময়ে তাই ছিল আধুনিকতাই ছিল প্রাগ্রসর। প্রাগ্রসরতার স্বার্থেই একজন সংস্কৃতিকর্মী সমাজের অতন্দ্র প্রহরী। সংস্কৃতি যেমন প্রবহমান সংস্কৃতিকর্মী তেমনি নিত্য ক্রিয়াশীল।

সংস্কৃতিকর্মীর পরিচয় অনেক বিস্তৃত। এক অর্থে মাঠের রাখাল থেকে ধর্মপ্রচারক, সৃজনশীল শিল্পকর্মী থেকে নিমগ্ন দার্শনিক, সবাই সংস্কৃতিকর্মী। পৃথিবীর প্রাণিকুলের মধ্যে একমাত্র মানুষরই রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতিজগৎ; যে কারণে মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব বলে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। মানুষের এই শ্রেষ্ঠত্ব কেবল কিতাবে থাকলেই তাকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে মেনে নেয়া যায় না, শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ তার নিজেকেই করতে হয়। কেন না মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের প্রচার করেছে মানুষ নিজে; সুতরাং শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ করতে হবে তাকে তার আচরণে, তার ব্যবহারে, তার সৃষ্টিশীলতায়-উদ্ভাবনে-তার প্রাগ্রসরতায়, তার শিষ্টাচারে-ন¤্রতায়, তার মননে-মনীষায়, তার ব্যক্তিত্বে ও বিনয়ে। শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের জন্য চাই সংস্কৃতিমান হয়ে ওঠার প্রয়াস এবং সাফল্য। সংস্কৃতিকে তুলনা করা যায় প্রবহমান নদীর সঙ্গে। প্রবহমান নদী যেমন নিত্য বয়ে চলে সংস্কৃতিও তেমনি নিত্য প্রবহমান। যা প্রবহমানতাকে ধারণ করতে জানে তার নামই তো সংস্কৃতি। আমরা যদি সংস্কৃতির স্বরূপ সন্ধান করতে পারি এবং জীবনচর্চায় সমন্বয় করতে পারি, তাহলেই আমরা হয়ে উঠতে পারি সম্পন্ন মানুষ। কেননা মানুষের মানুষ হয়ে ওঠা, আর মানুষের সংস্কৃতির সঙ্গেই আছে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের আবশ্যিক পূর্বশর্ত এবং এভাবেই ‘সংস্কৃতি’ শব্দটি দুর্বোদ্ধতা ও জটিলতার আবর্তে আবৃত হয়ে যায়, যে আবর্ত থেকে সংস্কৃতি শব্দটিকে সাধারণ্যে গ্রহণীয় এবং প্রাঞ্জল করে তুলবার দায়িত্বটি পালন করতে হয় সংস্কৃতিকর্মীকে; বোধগম্য কারণেই সংস্কৃতিকর্মীর পরিচয় অনেকটাই বিস্তৃত হয়ে পড়ে। একজন কবি যখন সংস্কৃতিকর্মী হন তখন তিনি নিজেকে কেবল কাব্যচর্চায় সীমাবদ্ধ রাখেন না, সমাজ-প্রগতির স্বার্থে তিনি লড়াই করেন গদ্যে-বাগ্মিতায়-চিন্তনে ও সমাজতত্ত্ব গবেষণায়ও।

দেশে দেশে সংস্কৃতিকর্মীকে নিজের ভাষা-কৃষ্টি-লোকাচার-লোকজ্ঞানকে আত্মস্থ করে দেশজ আবহের আলোকে নিজস্ব সমাজ-জলবায়ু-আবহাওয়া বিবেচনায় সমাজ-পরিপার্শ্বকে এগিয়ে নিতে তৎপর থাকতে হয়। সব সময় সে উদ্যোগ সযতœ-প্রয়াস নাও হতে পারে। স্বতঃস্ফূর্তভাবেও সমাজের মানুষ নিজেদের পরম্পরাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে ভূমিকা রাখে। সমাজের স্বতঃস্ফূর্ত ভূমিকার মাধ্যমেই প্রধানত প্রচলিত লোকবিশ্বাস-লোকজ্ঞান আর লোকাচারগুলো টিকে আছে যুগ যুগ ধরে। আমাদের লোকভাষা, প্রবাদ-প্রবচন, লোকগান-লোকছড়া, লোকধাঁধা-শিলুক, লোকমেলা, লোকচিকিৎসা, লোক উৎসব, লোকখেলা আর লোকাচার সবই সাধারণের মুখে মুখে এবং সাধারণের জীবনচর্চায় এগিয়ে চলেছে সমকালের সঙ্গে গলাগলি করে। একজন যোগ্য সংস্কৃতিকর্মীর দায়িত্ব আধুনিকতার সঙ্গে লোকজীবনকে সমন্বয় করে নেয়া।

সংস্কৃতি বিষয়ক অসাধারণ গ্রন্থ ‘সংস্কৃতি-কথা’য় মোতাহের হোসেন চৌধুরী যখন বলেন, ‘ধর্ম্ম সাধারণ লোকের কালচার, আর কালচার শিক্ষিত, মার্জ্জিত লোকের ধর্ম্ম’। ধর্ম যখন ‘অর্থডক্স’ হয়ে যায়, ধর্ম নিজেই যখন সমাজের বোঝা হয়ে পড়ে তখন সেই ধর্মের আদ্যোপান্ত বদলে নেয়ার প্রয়োজন পড়ে মানুষের সংস্কৃতিমান থাকার স্বার্থেই। পৃথিবীতে তেমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি বিভিন্ন সমাজে বারবার হয়েছে। ধর্মের মর্ম থেকে যখন তথাকথিত ধার্মিকগণ সরে যান তখন তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়াটাই বরং তাকওয়াসমৃদ্ধ ধার্মিকের কাজ। মুহাম্মদ (দ.) সেই বিপ্লবের অন্যতম হোতা একজন। ১৯৭১-এর প্রেক্ষাপটে মুক্তির সপক্ষে যারা কাজ করেছেন, জীবন উৎসর্গ করেছেন, যারা যুদ্ধ করেছেন মুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে; প্রত্যেকেই একজন যোগ্য সংস্কৃতিকর্মী।

এবারে আমরা দেখতে চেষ্টা করবো ১৯৭১-এর যুদ্ধকালীন বাংলাদেশের মানুষের সংস্কৃতির মান আর ছিচল্লিশ বছরের অগ্রযাত্রার পর সে মানের উচ্চতা কোনো পর্যায়ে আছে আজ। আমরা কি ঊর্ধ্বগতির সূচকে আছি নাকি অধোগতির সূচকে অবস্থান করছি। সংস্কৃতির সম্পর্ক যেহেতু মানুষের জীবনাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, সুতরাং সংস্কৃতির সূচক নির্ধারণে জীবনাচারের অজ¯্র অনুষঙ্গের গতি-প্রকৃতির পর্যালোচনা প্রয়োজন। যদি ভোগের কথা বিবেচনা করা যায়, তবে নিশ্চয়ই বলা যায় আমাদের জীবনযাত্রার মানে প্রভূত অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। ১৯৭১-এর বাঙালির ভোগের সামগ্রী আজকের তুলনায় যথেষ্ট নগণ্যই ছিল, জীবনযাত্রার ব্যয়েও বিপুল উল্লম্ফন দেখতে পাই। বাঙালির আবাস-বাসস্থান, শক্তির উৎপাদন ও ব্যবহার ইত্যাদি ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু যদি দেশপ্রেম, সামাজিক মূল্যবোধ, ঐক্য-সৌহার্দ্য-পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ-প্রেম-বিশ্বাস-পরস্পরে আস্থা ইত্যাদির দিকে দৃষ্টি দিই, দেখবো অনুষঙ্গগুলোতে বিপুল নৈরাজ্য লক্ষণীয়। একদিকে ধর্মীয় ক‚পমণ্ড‚কতা, অন্যদিকে আধুনিকতা ও বিজ্ঞানমনস্কতা প্রবল প্রতিযোগিতায় আজ অনেকাংশে প্রশ্নবিদ্ধ। যে চার নীতির ওপর ১৯৭১-এ বাংলাদেশের মানুষ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল, সেই চার নীতির দুটিই আজ আমাদের সংবিধান থেকে অপনোদিত। চারনীতির বিতাড়িত দুই নীতি আবার প্রগ্রসরতার সঙ্গে সম্পৃক্ত। ‘ধর্ম নিরপেক্ষতা’র মতো প্রাগ্রসর চিন্তাকে বাদ দিয়ে যখন ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ ধারণাকে সংবিধানে যুক্ত করে জাতির স্থ‚লতার বহিঃপ্রকাশ করা হয় কখন সংস্কৃতির অগ্রযাত্রা থমকে দাঁড়ায় বটে; সংস্কৃতির যেসব অনুষঙ্গ আমাদের সাংস্কৃতিক অগ্রযাত্রাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে, সেসব অনুষঙ্গ কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে সমাজকে দ্বিধাবিভক্তও করে ফেলতে চাইছে; সমাজের দ্বিধাবিভক্তি আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যও ব্যবহৃত হচ্ছে। ক্ষমতারোহণের স্বার্থে যখন সংস্কৃতির অনৈতিক ব্যবহারকে উৎসাহিত করার প্রবণতা লক্ষ করা যায়, সমাজতাত্তি¡কদের দুশ্চিন্তা তখন কিছুটা হলেও বেড়ে যায়। সমাজবাস্তবতার প্রেক্ষাপট বিবেচনায় আমাদের মনে যখন জেগে ওঠে জীবনানন্দ দাশের সেই কবিতা-

অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ,

যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা;

যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই- প্রীতি নেই-করুণার আলোড়ন নেই

পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া

যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি

এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক ব’লে মনে হয়

মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা

শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়।

(অদ্ভুত আঁধার এক \ জীবনানন্দ দাশ)

অথবা সমাজচিত্র ফুটিয়ে তুলতে যখন আমাদের আশ্রয় নিতে হয় হুমায়ুন আজাদের ‘সবকিছু নষ্টদের দখলে যাবে’;

‘আমি জানি সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।

নষ্টদের দানব মুঠোতে ধরা পড়বে মানবিক

সব সংঘ পরিষদ;-চ’লে যাবে অত্যন্ত উল্লাসে

চ’লে যাবে এই সমাজ সভ্যতা- সমস্ত দলিল-

নষ্টদের অধিকারে ধুয়েমুছে, যে রকম রাষ্ট্র

আর রাষ্ট্রযন্ত্র দিকে দিকে চ’লে গেছে নষ্টদের

অধিকারে। চ’লে যাবে শহর বন্দর গ্রাম ধানখেত

কালো মেঘ লাল শাড়ি শাদা চাঁদ পাখির পালক

মন্দির মসজিদ গির্জা সিনেগগ নির্জন প্যাগোডা।

অস্ত্র আর গণতন্ত্র চ’লে গেছে, জনতাও যাবে;

চাষার সমস্ত স্বপ্ন আঁস্তাকুড়ে ছুড়ে একদিন

সাধের সমাজতন্ত্রও নষ্টদের অধিকারে যাবে।

(সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে \ সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে)

তখন সংস্কৃতির অগ্রযাত্রা নিয়ে সংবেদনশীল যে কোনো সচেতন মানুষের মনে দ্বিধার উদ্রেক হয় বটে। সমাজে অনাচার-দুর্বৃত্তায়নের প্রতিবাদ করবে কে? সংস্কৃতিকর্মী। সমাজে সন্ত্রাস-বিশৃঙ্খলা-মাদকাসক্তি রুখে দাঁড়াবে কে? সমাজে অনৈক্য-বিভেদ, অসহিষ্ণুতা দূর করতে অবদান রাখবে কে? ঐক্যের কথা-সহিষ্ণুতার কথা বলবে সংস্কৃতিকর্মী। সমাজে প্রতিহিংসা-সম্প্রীতি সংকট; সম্প্রীতির জন্য চিৎকার করবে কে? সমাজে মহামারি-দুর্ভিক্ষ-সমাজে হতাশা-বঞ্চনা; সাহস জোগাবে কে? অর্থ দাঁড়াচ্ছে যা কিছু শুভ, যা কিছু কল্যাণকর সব কিছুর জন্য তৎপর একমাত্র সংস্কৃতিকর্মী! অন্যভাবে বলতে পারি শুভ-কল্যাণ-প্রগতি আর অগ্রসরতার জন্য যারা লড়েন তারাই তো সংস্কৃতিকর্মী। যে কারণে সংস্কৃতিকর্মীর সংগ্রাম নিত্য চলমান; যে কারণে সংস্কৃতিকর্মী সমাজের জন্য অনিবার্য একজন। জুতো সেলাই থেকে চণ্ডিপাঠ- যদি তা হয় শুভ উদ্যোগ সবই করবে সংস্কৃতিকর্মী। সংস্কৃতিকর্মী তাই অকুতোভয়- সংস্কৃতিকর্মী তাই সংশপ্তক-যোদ্ধা। সংস্কৃতিকর্মীর সংগ্রামকে বেগবান করার স্বার্থে নীতিনির্ধারক এবং প্রশাসনকে তৎপর হতে হবে। সে তৎপরতার জন্যও প্রয়োজন তাদের নিজেদের সংস্কৃতিমান করে তোলা। অর্থাৎ এ কথাটি গুরুত্বের সঙ্গে উচ্চারণ করতে চাই আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সামাজিক নেতৃত্ব এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা, প্রত্যেকেরই সংস্কৃতিকর্মী হিসেবে বিকশিত হওয়ার ব্রত গ্রহণ করতে হবে। নিজেদের মধ্যে গড়ে তুলতে হবে পরমতসহিষ্ণুতা এবং অন্যকে সম্মান করার সংস্কৃতি। যখন নীতিনির্ধারক এবং প্রশাসনের কর্তারা সংস্কৃতির আলোকধারায় পুণ্য এবং পূর্ণ হয়ে উঠবেন তখন সমাজ প্রগতির পথে কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকবে না; সংস্কৃতির সংগ্রাম ছড়িয়ে যাবে সব জনপদে। অন্যভাবে বলা যায় সমস্ত জনপদই হয়ে উঠবে সংস্কৃতিমান। ছিচল্লিশ বছরের যা- কিছু অর্জন করা যায়নি, সবই করায়ত্ত হবে সংস্কৃতির শক্তিতে। এবং এ সত্যের গূঢ়ার্থ উপলব্ধি করতে হবে নীতিনির্ধারকদের সবার; তাহলেই একনদী রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা অর্থবহ হয়ে উঠবে ‘মুক্তি’ হবে বাঙালির, যে স্বপ্নের কথা শুনিয়ে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রাণিত করেছিলেন।

২৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj