শিক্ষার সংস্কৃতি, সংস্কৃতির শিক্ষা : লায়লা আঞ্জুমান ঊর্মি

বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

পশুপাখি জন্মগত ও স্বভাবগতভাবেই পশুপাখি, কিন্তু মানুষের বেলায় এ যুক্তি একেবারেই টেকে না। জন্মগতভাবে মানুষ সেরা জীবের অধিকার নিয়ে এলেও তা রক্ষা করার জন্য তাকে চিন্তা-চেতনা, আচার-আচরণে ও বোধের জায়গায় চিন্তাশীল, ক্রিয়াশীল ও সহনশীল হতে হয়। আর এ জন্যই মানুষ কেবল তার প্রয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান এই মৌলিক প্রয়োজন পূরণ হওয়ার পর মানুষ বেরিয়ে পড়েছে অজানাকে জয় করতে। প্রয়োজনকে অতিক্রম করে আজ মানবদর্পে চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-নক্ষত্র দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

মানুষ যে দিন নতুনকে জানার আগ্রহ বোধ করেছে সে দিন থেকেই শিক্ষার ভাবনাটির উদয় হয়েছে। শিক্ষার হাত ধরেই মানুষ একে একে আদিম যুগ, প্রস্তর যুগ, লৌহ যুগ ও শিল্প যুগের প্রসারতায় বর্তমান ডিজিটাল যুগে পদার্পণ করেছে। বর্তমান যুগকে অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বায়নের যুগ বলে অভিহিত করা হলেও এ যুগের প্রযুক্তিগত অভিধা হলো : ডিজিটাল এইজ।

শিক্ষা বলতে আমরা অধিকাংশ লোকই কেবল প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষিত হওয়াকেই বুঝি। কিন্তু শিক্ষার প্রকৃত অর্থ যে মানুষের মনকে উন্নত করা তা অধিকাংশ সময়ই ভুলে থাকি। একটা জাতির স্বরূপ অন্বেষায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি। মেধা ও মননের মাধ্যমে শিক্ষা আসে আর শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো হাজার বছরকার পুরনো সংস্কার, চিন্তা, অভ্যাস ও চর্চাকে বদলে দেয়া।

সংস্কৃতি হলো আত্মার পরিশুদ্ধি। তাই বলা হয়ে থাকে যে জাতি যত বেশি সাংস্কৃতিক, সে জাতি তত বেশি শিক্ষিত। তাই সংস্কৃতিকে এড়িয়ে যাওয়া বা অস্বীকার করার উপায় নেই। শিক্ষা ও সংস্কৃতি এ দুয়ের মধ্যে সম্পর্কটি খুব ঘনিষ্ঠ। সংস্কৃতির গতিশীলতার পশ্চাতে যেমন আছে শিক্ষা, তেমনি শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ করে সংস্কৃতি। কোনো শিক্ষাই পূর্ণ হয় না যদি তাতে সাংস্কৃতিক শিক্ষা যুক্ত না হয়। তাই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজ থেকে আমাদের সাংস্কৃতিক শিক্ষা নেয়া উচিত।

এক সময় বাংলাদেশের পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে নকলের মহোৎসব চলত। কিন্তু বর্তমান সময়ে আমরা নকলের কালো অধ্যায় থেকে বের হয়ে এলেও বিকল্প হিসেবে পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের আগ্রাসনে ঢুকে পড়ছি যা আরো ভয়ানক রূপ নিতে চলছে। একদিকে পরীক্ষায় পাসের হার বৃদ্ধি যেমন আমাদের আনন্দ দিচ্ছে, তেমনি পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি আমাদের আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলছে। এক পিঠে আমরা যেমন নিরক্ষর মুক্ত বাংলাদেশের চিত্র দেখতে পাচ্ছি, অপরদিকে শিক্ষা ব্যবস্থার নড়বড়ে ভিত্তি ও শিক্ষার মান নিয়ে হতাশ হচ্ছি।

যদি বাস্তবতা যাচাই করতে যাই তাহলে দেখা যাবে যে ছাত্রটা ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র দিয়ে পরীক্ষায় সোনা ঝরাবে, সে হয়তো এমনি করে দুর্নীতির আশ্রয়ে চাকরি নেবে, হয়তো আমলা হবে, হয়তো রাজনীতি করবে, দেশের নীতিনির্ধারক বা সাংসদ ইত্যাদি হবে। সে কাগজে-কলমে শিক্ষিত হলেও এমন শিক্ষার প্রয়োগযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সংশয় থেকে যায়। এমনকি তার রুচি ও মূল্যবোধের জায়গাটুকুও প্রশ্নবিদ্ধ।

গেল বছর যে বিষয়টা নিয়ে সচেতন মনে ও গণমাধ্যমে বেশ আলোচিত হয়েছিল তা হলো দ্বিতীয় শ্রেণির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার খবরটি যা আমাদের অভিভাবকত্ব ও শিক্ষা ব্যবস্থাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। কারণ প্রশাসনিক দক্ষ নজরদারি না থাকায় এমন ঘটনা পর্যায়ক্রমে বেড়ে চলছে। আর আমরা যারা অভিভাবক হয়েও কোমলমতি সন্তানের হাতে ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্নপত্র তুলে দিচ্ছি তাতে করে সেসব অভিভাবকের রুচি ও মূল্যবোধ নিয়ে যতটা না চিন্তিত হচ্ছি তার অধিক একটা প্রজন্মকে রুচিহীনতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ধ্বংসাত্মক পরিণতির কথা ভেবে শিহরিত হয়ে উঠছি। বোধের অবক্ষয়ের কারণে তথাকথিত শিক্ষিত নামের অশিক্ষিতের দৌরাত্ম্যের ফলে সমাজ জীবনে আজ পচন ধরে গেছে। তাই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও সাংস্কৃতিক শিক্ষার অসম্পূর্ণতার জন্য আমরা প্রসারতার বিপরীতে ধাবিত হচ্ছি। তাই আমরা সংকীর্ণতাই বেশি দেখি, প্রসারতা, গভীরতা দেখি না। স্বার্থপরতা, আত্মকেন্দ্রিকতা, অহমিকা হচ্ছে এই সংকীর্ণতা; আর প্রজ্ঞাবান, মানবিক ও সহনশীলতা হলো প্রসারতার লক্ষণ। শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল তোতাপাখি সৃষ্টি করা নয় বরং যুক্তিতর্ক ও বিচার বোধসম্পন্ন মনন সৃষ্টি করা।

ধর্মীয় বিভাজনের মধ্য দিয়ে সাতচল্লিশে দেশ ভাগ হলেও প্রথম থেকেই বাঙালিদের কাছে একটি স্বাধীন সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল ছিল মৌলিক দাবির বিষয়, আর ১৯৭১-এ স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে সেই দাবি পূর্ণতা পায় বাঙালি জাতির কাছে। স্বাধীন দেশে সংস্কৃতি চর্চার পরিধিটা বিস্তৃত ও মসৃণ হয়েছে ঠিকই কিন্তু উগ্র মৌলবাদী আগ্রাসনও থেমে নেই। শুরু থেকে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটের মধ্য দিয়ে একটি অন্যরকম ধারা তৈরি হয় এ দেশের শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির মধ্যে। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সাংস্কৃতিক আন্দোলন বাধাপ্রাপ্ত হলেও চর্চার পরিবেশটা বিস্তৃত হয়েছে। সামগ্রিকভাবে পহেলা বৈশাখ উদযাপন, ঋতু বন্দনা, নাট্যচর্চাসহ সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রেও যেমন সফল অর্জন আছে অন্যদিকে, শিল্পায়নের সঙ্গে অপসংস্কৃতির যে ছোবল তা নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতাও কম নয়। সংস্কৃতির অন্যতম মাধ্যম চলচিত্র অঙ্গন এখনো দৈন্যদশা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। বইমেলার পরিধি বাড়লেও সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রটি এখনো পুরোপুরিভাবে সংগঠিত হয়নি। তাই সৃষ্টিশীল কাজে সরকারি অনুদান ও উৎসাহ তৈরি আবশ্যক।

তাহলে দেখা যাচ্ছে বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা, যুক্তিবাদ এবং তার সঙ্গে সাংস্কৃতিক সংযোগেই তৈরি হয় আধুনিকতা, সামাজিক অগ্রগতি এবং মনুষ্যত্ববোধ। আর সাংস্কৃতিক ভিত্তি মজবুত না হলে সভ্যতা টেকে না। সামাজিক অগ্রগতি ঘটে না। পাশ্চাত্যের দেশগুলো তাই বর্তমান ডিজিটাল যুগে একটি উপযোগী সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত শক্ত অবস্থান নির্মাণের প্রয়াস চালাচ্ছে। বাংলাদেশেও বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু তার সাংস্কৃতিক ভিত্তি কোথায়? বিজ্ঞানমনস্কতা, যুক্তিবাদ, মূল্যবোধ এবং শিক্ষার সঙ্গে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির যে সমন্বয়ের ধারাটি আছে তা মূলত প্রশ্নবিদ্ধ রয়ে গেছে।

আমরা প্রতিনিয়ত শিক্ষিত হচ্ছি, শিক্ষার হারও আশানুরূপ বেড়ে চলছে, সেই সঙ্গে বৃদ্ধি পাচ্ছে পাসের হারও। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সফলতার সঙ্গে বৃদ্ধি পাচ্ছে ঠিকই কিন্তু সেই সঙ্গে আমাদের মানসিক উৎকর্ষতা বৃদ্ধি পাচ্ছে না। শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে আমরা যতোই এগিয়ে যাচ্ছি না কেন মানবিক মূল্যবোধ থেকে পিছিয়ে যাচ্ছি।

অর্থাৎ আমরা যন্ত্রে আধুনিক, মন্ত্রে আদিম। ব্যক্তি, সমাজ তথা রাষ্ট্রীয় জীবনে আত্মকেন্দ্রিকতা, স্বার্থপরতা, অরাজকতা, দুর্নীতি ইত্যাদির বাড়াবাড়ি চিরায়ত আদিমতাকেই প্রমাণ করে, আধুনিকতা নয়।

তাই বলা চলে শিক্ষা ও প্রযুক্তির অগ্রগতির পাশাপাশি আমাদের সাংস্কৃতিক জ্ঞান, চর্চা, অগ্রগতি এবং সমন্বয়ের বিষয়টি আমলে আনতে হবে।

কারণ মনোজগৎ সুন্দর হলেই বিশ্বজগৎ সুন্দর হবে।

২৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj