অগ্রগতির যাত্রায় সংস্কৃতির সংকট : মতিন বৈরাগী

বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

আমাদের সংস্কৃতির অগ্রযাত্রা নিয়ে কিছু বলতে গেলে প্রথমেই অগ্রযাত্রা শব্দটির মৌলিক অর্থকে বোধগম্যে আনা দরকার। অগ্রযাত্রা মানে সম্মুখযাত্রা, সামনে এগুনো। যে গমন করে সে অগ্রপথিক, যে এগিয়ে থাকে সে অগ্রগামী এমনি অগ্র মানে সম্মুখ মানে সামনে অর্থাৎ একটা পজিটিভ ধারণা সংবলিত শব্দ। এই যাত্রা সংকুচিত নয়, অস্বাচ্ছন্দ্যের নয়, বরং প্রতি মুহূর্তে নতুনের দিকে শোভন গমন সুন্দরের দিকের। আমরা বলতে পারি প্রগতির দিকে গমন মানে আধুনিকতার দিকে যাত্রা। সেখানে সংকট অতিক্রমণের প্রবণতা থাকে। নানাবিধ বিপত্তি থাকাও স্বাভাবিক। কিন্তু অগ্রযাত্রা তাতে থেমে থাকেনা বা মুখ থুবড়ে পড়ে না। তার শক্তি সাহস যাত্রার প্রস্তুতি ও উদ্যম সবই পরিকল্পিত রীতি ও নীতির মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়, এগিয়ে নেয় মানুষ।

‘নৃবিজ্ঞানীরা বলেন মানুষের জীবনের সাংস্কৃতিক বিকাশ ও মনন-উৎকর্ষ জীবিকা-পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। জীবিকা-পদ্ধতি আবার প্রকৃতিক প্রতিবেশের সঙ্গে যুক্ত। দুনিয়ার সর্বত্র সে প্রতিবেশ অভিন্ন নয়।’ [ড. আহমদ শরীফ, সমাজ সংস্কৃতির স্বরূপ]। এ কথা যেমন সত্য তেমনি এও সত্য যে সংস্কৃতি স্থবির কোনো বিষয়ও নয়। এক জাতির সংস্কৃতি সেই যুগ থেকে এই যুগ পর্যন্ত জাতিতে জাতিতে আদান-প্রদান হয়ে পরস্পরের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ ও নতুন ভাবনার সুযোগ করে দিচ্ছে। আবার চক্রান্তমূলকভাবে উৎকট উগ্র-সংস্কৃতি আধিপত্যবাদী টাইপ চালান দিয়ে কোনো একটি জাতির সুদীর্ঘকালের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে দুর্বল করে নিজস্ব ফায়দা লুটছে। ফলে আমরা আমাদের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক জীবনবোধে ভাঙন দেখছি।

জাতির সুদীর্ঘকাল ধরে ব্যবহারিক জীবনের ভাবনা, চিন্তা, অভ্যেস, রুচির মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা মানস যা একই সমাজে রাষ্ট্রে বসবাসরত মানুষকে পরস্পররের সঙ্গে যুক্ত করে এবং জাতির অস্তিত্বের ভিত্তিভূমি সুদৃঢ় করে। তাই একটি জাতিকে পদানত করতে হলে তার সংস্কৃতির অহংকে বিনাশ করতে হয়। সে কাজটি যত নিপুণভাবে চক্রান্তকারী শক্তি করতে পারে ততই জাতির আত্মিক পরিচয়ে ক্ষয় ধরে এবং দুর্বল হয়ে পড়ে। সমায়ন্তরে পদানত হয়। জাতীয় অহংকে চূর্ণ করে জাতিকে অন্যের সেবাদাসে পরিণত হওয়ার মানসিকতা তৈরি কারে দেয়। জাতীয় জীবন টেরই পায় না কখন কীভাবে তার সিন্দুকের চাবিটি ম্যাজিকের মতো তার হাতছাড়া হয়ে গেছে।

০২.

সংস্কৃতি যদিও নিজ পরিমণ্ডলের ব্যবহারিক রীতিনীতি, অভ্যেস-রুচি, বিশ^াস-অবিশ^াস, ধর্ম ও সাহিত্য ইত্যাদি নিয়ে প্রতিমুহূর্তে বিবর্তিত হয়, হচ্ছে আর এতে করে নতুন চিন্তা নতুন ভাবনা নতুন বোধও গড়ে উঠছে সমাজ রাষ্ট্র পরিমণ্ডলে। এই যে বিবর্তন এতে রয়েছে পারস্পরিক যোগাযোগ, পরস্পরের সঙ্গে প্রতক্ষ-পরোক্ষ রাষ্ট্রীয় সংযোগ। যা অতীতে বেশি ঘটেছে গ্রেট এক্সসোডাসের কালে আবার মধ্যযুগে দখলবাজদের আগমন অবস্থানের মধ্য দিয়ে। এ ছাড়া ব্যবসায়িক ক্রিয়ায়ও এক স্থান থেকে অন্যস্থানে একদেশের মানুষ অন্যদেশে, গমনাগমন সূত্রে স্ব-সংস্কৃতিতে নতুন উপাদান যোগ করেছে। তাই মূল ভিত্তিটি সুদৃঢ় থাকলেও কিছু না কিছু রদবদল ঘটে গেছে সময়ের ব্যবধানে, তবে রাজনৈতিক কারণেও অনেক সময় শাসকের সংস্কৃতি জনগণের মধ্যে প্রভাব ফেলেছে। ভারতের আর্য আগমন মোগল আগমন আফগান ও তুর্কি দখল কেবলমাত্র ব্যক্তিকেই স্থাপন করেনি, তাদের সংস্কৃতিকেও অনেকটা স্থান দিতে হয়েছে আর তা কেবল হুবহু নয়, খানিকটা মিশ্র-আকারে। তেমনি বাঙালি সংস্কৃতি যার ধারাবাহিকতা আর্য-অনার্য সংস্কৃতি তাতেও স্থানীয় সংস্কৃতির রূপটি মিলে তৈরি করেছিল জাতীয় বোধ। আবার ব্রিটিশরা এসে তাদের সংস্কৃতিও যুক্ত করে ভারতীয় সংস্কৃতির রূপের খানিকটা বদল ঘটিয়েছে। সনাতনী মহাভারতীয় সংস্কৃতি আর টিকে থাকেনি হুবহু, বরং তাও যুক্ত থেকে মিশে গেছে বৃহৎ ¯্রােতে। নানাভাবেই একটি জাতীয় সংস্কৃতি কলুষিত আবার অন্যধারায় বিকশিত হয়েছে আর এভাবেই গ্রহণ বর্জনের মধ্য দিয়ে রীতি, রীতি থেকে নীতি আর নীতি থেকে যেটুকু অটুট টিকে গেছে তাই হয়েছে ঐতিহ্য। হ্যাঁ, যদি নিজ সংস্কৃতি মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষের মনে মননে স্থায়িত্বেও রূপ পায় সে ক্ষেত্রে বাহ্যিক এই আক্রমণগুলো খুব বেশি শক্তিশালী হয়ে দেহকাণ্ডকে দুর্বল করতে পারে না ঐতিহ্যের সুঠাম দেহ কাণ্ডের কারণে। বরং ওই সব প্যারাসাইড ও সঙ্কুচিত সম্প্রসারিত হয়ে মূল সংস্কৃতির কাণ্ডে পুষ্টি জোগায়। ক্রমাগত এই সংস্কৃতির বিবর্তন ধারা জাতির সমাজজীবনকে আধুনিকায়নের দিকে প্রসারিত করে। যুক্ত করে জ্ঞান-বিজ্ঞান চেতনায়।

০৩.

আসলে ‘সংস্কৃতি সমাজবদ্ধ মানুষের জীবনসংগ্রাম থেকে জন্ম নেয়। সমাজজীবনে মানুষের টিকে থাকার লড়াইয়ে তার বেদনা ক্ষোভ ক্রোধ বীরত্ব জীবনতৃষ্ণা আনন্দ ও সৃজনশীলতার যে বোধ তার চেতনায় আলোড়িত হয়, তারই নানামুখী প্রকাশ সংস্কৃতি’। এর ব্যবহারিক দিক যা সমাজের মানুষ তাদের দৈনন্দিন জীবনে নিত্য ব্যবহারে, অভ্যেসে আচরণে প্রয়োগ করে, অন্যটি নানা মাধ্যমে চেতনা জগতে যে ভাব বিরাজমান তার প্রকাশ ঘটায় সৃষ্টিশীল কাজে। যদিও আমরা শিল্প-সাহিত্য-কাব্য-সঙ্গীত-নৃত্য-অঙ্কন-নির্মাণে ব্যবহার করি তার শুভ দিকগুলো প্রতিফলিত হয় জাতীয় চরিত্রে এবং সংস্কৃতির মূলধারাকে বলবান করে। সংস্কৃতির বিশুদ্ধতা আকস্মিক নয়, ধারাবাহিকতা জাতীয় জীবনে প্রতিফলিত হয় এবং রাষ্ট্রীয় ঐক্যে, সংহতিতে অবদান রাখে। আবার রাষ্ট্রীয় নীতি, সুশাসন, যদি জন্মলগ্ন না হয়, জনকল্যাণে উন্মুখ না থাকে, তাহলে বুঝতে হবে অপসংস্কৃতির ছায়া ঘন হয়েছে এবং জাতীয় জীবনে তা আসর করেছে। ফলে লুট, পাচার, আত্মসাৎ, দখল, অসততা, টাউটবাজি, ভেজাল ইত্যাদির আধিক্য বেড়ে যায় এবং দেখা যায় উন্নয়ন মানব লগ্ন না হয়ে একশ্রেণির প্রকৌশলী ও ঠিকাদার ও রাজনৈতিক দলবাজির লোকদের উন্নয়নে খরচ হয়ে যায়। কারণ সংস্কৃতি যে নৈতিকতা যে ঐতিহ্য এতকাল জাতির মানসে একটা বর্ম হিসেবে কাজ করেছিল তাতে ক্ষয় ধরেছে এবং এর ফাঁক দিয়ে কতিপয় যেমন উগ্রধনলোভে ঝাঁপিয়ে পড়েছে অন্যদিকে জনগণ চেতনা হারিয়ে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ নতুন নির্মাণে তাদের করণীয় ভুলে গেছে। সংস্কৃতি যে কত শক্তিশালী একটি বিষয় রাষ্ট্রশক্তি যতদিন গুরুত্ব সহকারে উপলব্ধি করতে না পারবেন ততদিন নানা জাতীয় দুর্যোগ মোকাবেলায় মুখোমুখি হতে হবে বিব্রতকর পরিস্থিতির।

০৪.

আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গনটি এক সময় কতটা শক্তিশালী ছিল তা আমরা বিগত ৬০ বছরের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর দিকে আলোকপাত করলে সহজেই উপলব্ধি করতে পারব। ভাষা, সংস্কৃতি বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম যার মধ্য দিয়ে আমরা পরস্পরের সঙ্গে যোগ-বিয়োগ ঘটাই। এই ভাষা নির্মাণে কবি সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদদের যে অক্লান্ত শ্রম রয়েছে রাষ্ট্রশক্তি তার দিকে নজর দিয়েছে সব কালেই ভাসা ভাসা। না দিলে যেন নয় এমন একটা ভাব থেকে। বঙ্কিম, মাইকেল, রবীন্দ্র, নজরুল এই মহাত্মারা বাংলা ভাষাকে সমাজ মানসের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে স্তরিক উন্নতিতে অবদান রেখে গেছেন। ফলে ভাষার গম্যতাও মানুষকে সংস্কৃতি লগ্ন করেছে। রবীন্দ্রনাথই ভাষার গতিবেগ সৃষ্টিতে, বলার বেগ তৈরিতে ভাষার আরষ্টতাকে মুক্ত করে আমাদের সংস্কৃতিকে বলবান করে গেছেন। তাদের এই বর্ম পরবর্তী সময়ে আমাদের অত্মরক্ষা ও নতুন রাষ্ট্র সৃষ্টিতে যে ঐক্য ও একাত্মবোধ সৃষ্টির প্রয়োজন ছিল তা গড়ে তুলেছিল। পাকিস্তানিরা যখন প্রথম অগণতান্ত্রিক আধিপত্যবাদী মনেবৃত্তি দ্বারা বাঙালি সমাজকে ভেঙে সংস্কৃতিহীন এবং ভাষাহীন করার পাঁয়তারা করেছিল, এই ভাষা সংস্কৃতিই তাকে রুখতে পেরেছিল। যদি সেদিন এই মহান মানুষদের তৈরি সংস্কৃতির বর্মটি আমাদের সামনে রক্ষাব্যুহ হয়ে না দাঁড়াতে পারত তা হলে আমরা পাকিস্তানিদের পদানতই থাকতাম।

সুতরাং সংস্কৃতির অখণ্ড রূপটির মধ্যে শিল্প-সাহিত্য-নাটক-কাব্য-অঙ্কন-স্থাপত্য-জারি, নৃত্য, ধর্ম-দর্শন, যোগাযোগ, টেকনোলজি, সঙ্গীত- কীর্তন-ভাবসঙ্গীত এমন কী শরীর ভঙ্গি, শিক্ষা ও ব্যবহার, লোকজ জনপ্রিয় বিষয় ও বিশ^াস সবগুলোর যুক্ততায় সংস্কৃতির ভূমি এবং এগুলোই সংস্কৃতির পুষ্টি। চলন-বলন-পরন-কথন-অভ্যেস-রুচি-লেনদেন-ক্রয়-বিক্রয়-ঘুম, আহার বিশ্রাম এসবই হচ্ছে সংস্কৃতির ব্যবহারিক রূপ। মোট কথা কোনো একটা মানব গোষ্ঠীর একই সমাজে রাষ্ট্রে বসবাসরত আকারে প্রকারে সব কাণ্ডই সংস্কৃতির গোটা অবয়ব। যেমন একজন মানুষ সমাজ সত্তার একটি ক্ষুদ্রতম অংশ তেমনি একজন মানুষ আবার গোটা সমাজেরই অংশ। এমনিভাবে উল্লেখিত ক্রিয়াগুলো সংস্কৃতির একটি ক্ষুদ্র এককের তেমনি মিলেমিশে আবার সংস্কৃতিরই বৃহৎরূপের তল একই তলের।

০৫.

অনস্বীকার্য সংস্কৃতির এই রূপটি একদিনে এককালে এক সমাজের আবদ্ধতায় গড়ে ওঠে না। একটি জাতির গঠন ক্রিয়ায় এর যেমন গুরুত্বপূর্ণ এবং অনস্বীকার্য ভূমিকা থাকে তেমনি এর রূপটি নানা কিছুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে নানা ব্যবহারিক ও প্রয়োজনীয় ক্রিয়ায় বদলাতে থাকে। এই বদল যখন সমাজবদ্ধ মানুষের সম্মতি পায়, গ্রহণের সীমায় উপনীত হয় তখন সে মূলধারার সঙ্গে যুক্ত হয়ে চলমান সংস্কৃতিতে পুষ্টি জোগায়। আর্য সমাজের আধিপত্যে যারা নিজ সংস্কৃতি হারিয়েছিল কালধারায় আর্যসংস্কৃতিও প্রাগ-সমাজের চলমান সংস্কৃতির সঙ্গে মিলে একটা নতুন সংস্কৃতির জন্ম দিলে ও এই দেশের এই মাটির সন্তানরা তাকে আত্মীকরণ করে নিয়েছিল এক শাসকের অভিপ্রায়, দুই নতুন সংস্কৃতিতে সহজতর কতগুলো উপাদান বিদ্যমান থাকায় ব্যবহারিক সুবিধা পাওয়া যাচ্ছিল বলে। অবশ্য তা না করে তো তাদের উপায়ও ছিল না। বিশে^র বহু জনগোষ্ঠী এরূপ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে ঔপনিবেশিক শাসনের কারণে। বর্তমান বিশে^ অনেক দেশ ও জাতি ভৌগোলিক স্বাধীনতা পেয়েছে কিন্তু লুক্কায়িত রয়েছে সেই সব সংস্কৃতির বীজ যা মোচন খুব শিগগিরই এবং দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর পক্ষে ত্বরিত নিদান সম্ভব নয়। সামন্তবাদী সংস্কৃতি দাসভিত্তিক সংস্কৃতির চেয়ে উন্নত ছিল। প্ল্যাটো বা এরিস্টটল যে সমাজের দার্শনিক সে সমাজটি ছিল দাস সমাজ। ফলে সেই সমাজের মধ্যের চিন্তাগুলোও আরো পরিপূর্ণরূপে বাঁধনহারা হয়ে উঠতে পারেনি এবং দর্শনচিন্তাও ভাববাদকে মুক্ত করে বস্তু ও বস্তুজগৎকে মৌলিক ভাবতে দ্বিধান্বিত ছিল। যদিও এরিস্টটল বলেছেন প্রেরণা বস্তু লগ্ন, কিন্তু তিনি নানা রূপ দেব-দেবীতে বিশ^াস রেখে গেছেন। বিশ^াস রেখেছেন অভিজাত শ্রেণির শাসনের ওপর। দাসদের তিনি নিকৃষ্ট মানুষই মনে করেছেন। সে সময়ও অভিজাত শ্রেণির বিরুদ্ধে কোনো মতো প্রকাশ প্রচার খুব একটা সুনজরের বিষয়ও ছিল না।

সমাজ বদলের সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতির রূপটিরও বদল ঘটে, বহু কিছু ঝরে পড়ে, বহু কিছু যুক্ত হয়। এই যুক্ততাকে গ্রহণ করায় সংস্কৃতি লাভবানই হয় বটে কিন্তু ভয়ও থাকে। যদি সমাজ কাঠামোটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিতে দাঁড়িয়ে না থাকে যদি ভিক্ষাবৃত্তি জাতীয় চরিত্রের উপাদান হয়, তা হলে ভিক্ষাদাতা তার সুবিধা হাতিয়ে নেয়ার জন্য দাস্যবৃত্তি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে উগ্র-নোংরা-আধিপত্যবাদী সংস্কৃতির সংযোগ ঘটায় কৌশলে। কারণ এটা না করলে একশ্রেণির দালাল তৈরিতে পারঙ্গম না হলে তার ভিক্ষা প্রদানের সুফলটি সে ঘরে তুলতে পারে না। যেমন ব্রিটিশ এসে তার শাসনের শিখণ্ডি তৈরি করেছিল সামন্ত শ্রেণির বোধবুদ্ধিতে তার সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে এবং যদিও কালধারায় তার বহুকিছু আমাদের মূল সংস্কৃতির ¯্রােতে মিশে আছে, যাকে আমরা শনাক্তও আজ আর করতে পারি না এবং এর জন্য জাতিগতভাবে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে, তেমনি সা¤্রাজ্যবাদী উগ্র সংস্কৃতিও মূল সংস্কৃতির ভেতর ঢুকে পড়ছে, যা দেখতে অনেকটা প্রগতিশীল কিন্তু তার ভিতর চরিত্রটির ধার অনেক খানি ক্ষতিগ্রস্ত করছে আমাদের সংস্কৃতির কর্মকাণ্ডকে। সে কারণেই মূল্যবোধের অবক্ষয় তীব্র হয়েছে এবং সৃষ্টিতে তার প্রতিফলন ঘটছে।

০৬.

সংস্কৃতির অনুভব ও উপলব্ধি মূর্ত হয় বাকবাহনে তথা শব্দে বা ভাষায়। জীবন তো অনুভবের সমষ্টি মাত্র। আর এই অনুভব প্রকাশিত হয় ভাষায়, ভাষাই জীবন। বিশেষ স্থানের কালের পরিসরে মানুষের আচরণ ভাব ভাষা আত্মিক নৈতিক ক্রিয়া-বিক্রিয়া মানসিক অবস্থা ইত্যাদি হলো তার চেতনার রূপ। আর এর প্রকাশ ধ্বনি বা শব্দ। শব্দই মূল ও মৌলিক। একটি জাতির মূল ভাষা থেকেই স্থানে স্থানে নানা কথ্যভাষার উদ্ভব ঘটে। তাই ভাষা যার উন্নত ও আয়ত্তে যাদের পারঙ্গমতা রয়েছে তাদের সংস্কৃতির শক্তিটাও বেশি। ভাষাই মানুষকে মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে সফলতা দেখায়। এই ভাষা যার বেশি সম্মোহনী [যা দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল] তা অন্যকে সম্মোহিত করে। এইভাবে সেই আদিকাল থেকে তন্ত্র-মন্ত্র দখল আয়াত্বাধীন করার ক্ষেত্রে এবং সম্মোহিত করার ক্ষেত্রে এক শ্রেণির মানুষকে পারঙ্গমতা দিয়েছে। ভাষা বিশেষ স্থানে বিশেষ কালে সর্বজনীন হয়েও আবার প্রত্যেক ব্যক্তি একক ব্যবহৃত সম্পদ। ভাষার এই উৎকর্ষতায় কাজ করে একটি দেশের সৃজনশীল মানুষ। লেখক শিল্পী আঁকিয়ে গাইয়ে বাজিয়েরা ভাষার গম্যতাকে উৎকর্ষতার দিকে স্থাপন করে এবং তার অগ্রযাত্রাকে সহজ সহনীয় করে তোলে। ফলে সমাজ মানুষের ঐক্যের সুদৃঢ়তা গড়ে ওঠে এবং নিজ সংকটসহ বিশ^ সংকটে সে তার ভূমিকা রক্ষায় অবস্থান তৈরি করতে পারে।

সংস্কৃতির সংকট মূলত রাজনৈতিক। রাজনৈতিক আচার-আচরণ সংস্কৃতির শক্ত ভূমিকাকে দীর্ণ-জীর্ণ করে। এক সময় শিক্ষা ছিল আদর্শ ও নৈতিকতা গড়ার ও জীবন উপলব্ধির মৌলিক উপায়। শিক্ষিত মানুষ কেবল নিজ বিশ^াসকেই অর্থপূর্ণ করে তুলতে পারতো না সে সমাজে তার জ্ঞানালোক দ্বারা সমাজ মানুষকে অনগ্রসর মানুষকেও আলোকিত হতে নৈতিকতার অটুট বাঁধনে বাঁধতে অবদান রাখতো। সে অন্যায়কে চিহ্নিত করতে পারতো এবং করতো। ফলে সমাজে শিক্ষিত মানুষের মর্যাদা নতুন করে নতুনভাবে স্থাপিত হতো। এখন শিক্ষা ব্যবস্থাটি এমনই কুমতলবে গড়ে তোলা হচ্ছে যে এর দ্বারা কোনো সংস্কৃতিবান মানুষের উপস্থিতি তৈরি হওয়া সম্ভব না। এখন ছাত্ররা তার প্রতিষ্ঠান ভাঙে, শিক্ষককে অপমান করে, শিক্ষকও দলবাজি হলবাজি তে আত্মনিয়োগ করে শিক্ষর্থীদের কুশিক্ষায় প্রেরণা জোগায়।

কবি-সাহিত্যিক-লেখকরা ছিল আশা ও আস্থার মানুষ। মানুষ সব সময়ই তাদের বিশেষ মর্যাদা দিতো। জাতির বিপদকালে, শাসকের অন্যায় শাসনের বিরুদ্ধে সমাজ মানুষকে চেতনাশীল করার ক্ষেত্রে তাদের লেখা বলা ও প্রকাশ মানুষের প্রেরণা হয়ে থাকতো। এখন তারা হয়ে উঠেছে লুটবাজ ঠকবাজ প্রতারক ও স্বার্থান্ধ। ফলে শিল্পী কবি গায়ক সবাই অন্যায় কর্মকে আদর্শ করে লুটতে চাইছে জাতির ভাগ্য। নিজ ভাগ্য যে বিশৃঙ্খল সমাজে নিরাপদ নয় এবং এর দ্বারা যে সে সমাজের মানুষেরই ক্ষতি করছে সেই বোধটুকু আর অবশিষ্ট নেই। কোনো কবি সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীকে দেখা যাচ্ছে নানা ছলে তদবিরে পুরস্কার খুঁজে বেড়াচ্ছেন এবং মর্যাদাশীল পুরস্কার বাগিয়ে আবার তথাকথিত অপরিচিত অজ্ঞাত গুরুত্বহীন পুরস্কারের জন্য স্টেজে উঠছেন এও সংস্কৃতি বোধের অভাবেই ঘটছে। ফলে ওই পুরস্কারটির গুরুত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে জনগণকে হতবাক করছে। আর এভাবে দিনে দিনে আমাদের সংস্কৃতির শরীর নানাভাবে জীর্ণ হয়ে আমাদের ঐতিহ্যকেই গ্রাস করছে। এটাকে অগ্রযাত্রা বলে চালিয়ে দেয়ার অর্থ আরো একটা মস্ত ভুলের মধ্যে ডুবে যাওয়া এবং চলমানতাকে স্বীকৃতি দেয়া। প্রকৃতি সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি রয়েছে রাজনৈতিক সৎ-ইচ্ছার মধ্যে। রাজনীতির মানুষরা তাদের বলায়, চলায়, জীবনযাপনে যে বিকৃত মানসিকতার বিস্তার ঘটাচ্ছেন তা সমাজের নি¤œতলকেও স্পর্শ করছে এবং গড়ে উঠছে এক উৎকট জনজীবন।

০৭.

সন্দেহ নেই যে আজকের বিশ^পরিমণ্ডলে সংস্কৃতির সংকট চলছে। এ হলো পুঁজিবাদের বিকৃত রূপ। এই রূপ ভোগের ত্যাগের নয়। ফলে সংস্কৃতির মনোভূমিটিও কলুষিত হয়ে হয়ে উঠছে মানব সমাজের অটুট বন্ধনের বিপরীত ভোগের, যৌনতার এবং বিকৃত যৌনতার উদগ্র বাসনার ক্রিয়া। নিশ্চয়ই এক দেশের একধারা সংস্কৃতির অন্যকে সমৃদ্ধ করে, কিন্তু আমরা গ্রহণ করছি বিকৃত অংশটুকুই। ফলে জাতীয় জীবনের দুর্যোগ এখন প্রায় দরজায় এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে। অগ্রযাত্রার সংকটটাই এখন প্রবল। এর সমাধান রাজনীতির মানুষের হাতে। তারা কি নিয়ন্ত্রণের দিকে চোখ ফিরাবে?

২৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj