কৃষিতে দেশ এগিয়েছে বহুদূর নিতে হবে আগামীর দীর্ঘ প্রস্তুতি : শাইখ সিরাজ

বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

দারিদ্র্য, ঘনবসতি, নগরজীবনের নানা অনিশ্চয়তা আর জলবায়ুর পরিবর্তনের ভেতর বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও টিকে থাকার মূল জায়গাটি হচ্ছে ভূমি ও কৃষক সম্প্রদায়। অনেকে অন্যভাবে ভাবতে পারেন। আমি কৃষি ও কৃষককেই আমাদের উন্নয়ন ও অস্তিত্বের প্রধান নিয়ামক ভাবতে চাই। নদীমাতৃক ও কৃষিপ্রধান অঞ্চল হিসেবে প্রাচীনকাল থেকে এই ভূমির রয়েছে আলাদা এক গুরুত্ব। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সময় থেকেই এই বাংলাকে শাসককুল ভেবেছে এক শস্যভাণ্ডার হিসেবে। হাজার বছরের ঐহিত্যে লালিত বাঙালিও নদী, বিল, হাওর লালিত প্রকৃতির খুব কাছাকাছি থেকে জীবনযাপন কিংবা ক্ষুধা নিবারণের চিন্তায় কখনো ব্যাকুল হতে হয়নি। শাসকদের শত রকমের শোষণের ভেতরও তারা প্রকৃতির দিকে তাকিয়েই টিকে থাকার নিশ্চয়তা পেয়ে গেছেন। প্রকৃতিই তাকে শক্তি ও স্বস্তি দুই-ই দান করেছে। সময়ের বিবর্তনে আমরা স্বাধীন সত্তায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছি। স্বাধীনতা সময়কালের ৭ কোটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব উৎপাদন ব্যবস্থার ভেতরে টিকে থাকা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ছিল না। খেয়ে পরে বেঁচে নিজস্ব ভূখণ্ডে নিজেদের মতো এগিয়ে যাওয়ার বিষয়টি ছিল সুনিশ্চিত। সেখানে ছিল জাতিসত্তার পরিপূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনের চিন্তা। নদীমাতৃক উর্বর ভূমির এই দেশে কখনোই খাদ্যে সংকট আসবে এই চিন্তা ছিল না কারোরই। নতুন দেশের কৃষিসহ সার্বিক উৎপাদন কাঠামো এগিয়ে নেয়ারও ছিল কার্যকর নানা পদক্ষেপ। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের পদক্ষেপগুলো এ জাতির টিকে থাকার ক্ষেত্রে এক বড় আশীর্বাদ হয়ে আছে এখনো। এক্ষেত্রে শুধু একটি উদাহরণই যথেষ্ট ১৯৭১ সালে সদ্য স্বাধীনতা অর্জনকারী দেশটিতে উৎপাদিত ১ কোটি টন খাদ্যশস্য ৭ কোটি মানুষের খাদ্যের নিশ্চয়তা দিয়েছে, আজ স্বাধীনতার পঁয়তাল্লিশ বছর পেরিয়ে এসে তার চেয়ে কম জমিতে সে সময়ের তুলনায় প্রায় চারগুণ বেশি খাদ্যশস্য উৎপাদিত হচ্ছে এবং প্রায় ১৬-১৭ কোটি মানুষ সেই খাদ্যশস্যের ওপর নির্ভর করে টিকে আছে। এই টিকে থাকাটিই আমাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য। পৃথিবীবাসীর সামনে বাংলাদেশ যতই ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত হোক, যতই উদ্বেগ ছড়িয়ে যাক না কেন, এই একটি সাফল্যই বলে দিতে পারে, আগামীর বাংলাদেশ নিশ্চয়ই যে কোনো ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সাফল্যের সঙ্গে টিকে থাকার শক্তি রাখে।

কৃষি, উৎপাদন ও খাদ্যচিন্তা নিয়ে কথা বলার যৌক্তিকতা তুলে ধরতে আমার ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে দুয়েক কথা বলতেই হয়। আমি গণমাধ্যম পেশার একজন মানুষ। প্রাইভেট টেলিভিশন চালাই। আমার গণমাধ্যম জীবন শুরু হয়েছিল সত্তরের দশকের মাঝামাঝিতে। যখন গণমাধ্যম বিকশিত কিছু নয় বরং মানুষের কৌত‚হল ও বিনোদনের কেন্দ্রবিন্দু। সেই গণমাধ্যমেই আমি গত শতকের আশির দশকের একেবারে গোড়ায় শুরু করেছিলাম কৃষিবিষয়ক একটি নিয়মিত টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘মাটি ও মানুষ’। বাংলাদেশের সব মানুষই অনুষ্ঠানটি সম্পর্কে জানেন। দশ এগারো বছর তখন আমাদের স্বাধীনতার বয়স। দেশটির কৃষি সম্ভাবনা ও কৃষি উদ্যোগগুলো নিয়ে কথা বলতাম। যারা টেলিভিশন দেখার সুযোগ পেতেন তারা খুব উদ্বুদ্ধ হতেন। মাছ চাষ, মুরগি পালন কিংবা অন্য যে কোনো কৃষি আবাদের লাভের গল্পটি পৌঁছে দিতাম, আর মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়তো এসব উৎপাদনের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে। এভাবেই গ্রামে গ্রামে, মানুষের বাড়িতে বাড়িতে, খামারে, উঠোনে সবখানে তৃণমূল মানুষের বোঝাপড়ার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে পথ চলেছি। এর মধ্য দিয়ে খুব নিচ থেকে আমাদের এই দেশটির ভালোমন্দ সম্পর্কে কিছু চিন্তা করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আমার কাজের গতি ও হিসেবের ক্ষেত্রটি একটু আলাদা। কৃষি বিভাগ, অর্থনীতিবিদ, রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ, সম্প্রসারণ ও নীতিনির্ধারণের জায়গায় মোটাদাগে অনেক বড় ভূমিকা রাখছে। আমি আমার জায়গা থেকে, আমার অনুষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে কৃষকের নিজস্ব উপলব্ধি, তাদের নিজস্ব হিসেব, তাদের ঝুঁকি ও প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির বিষয়টি তুলে আনার চেষ্টা করছি।

ঠিক আজকের কথা বলি, কোথায় আছি আমরা? মাত্র ১ লাখ ৪৭ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই উন্নয়নশীল দেশটিতে এখন প্রায় ১৭ কোটি লোকের বসবাস। যা কিনা সমগ্র বিশ্বে এক বিরল উদাহরণ। এ দেশেই সবচেয়ে বিস্ময়কর সাফল্য অর্জিত হয়েছে কৃষি খাতে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও ক্রমহ্রাসমান কৃষিজমির বিপরীতমুখী চাপ সত্ত্বেও বাংলাদেশের বর্তমান খাদ্যশস্য উৎপাদন ১৯৭২-৭৩ সালের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেড়েছে। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার তথ্য মতে, সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয়। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও বাংলাদেশের সা¤প্রতিক সাফল্য ছিল অভাবনীয়। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ সুপেয় পানির মাছ উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ স্থান অর্জন করে এবং শিগগিরই অভ্যন্তরীণ মৎস্য চাহিদা সম্পূর্ণভাবে পূরণে সক্ষম হবে।

জাতীয় পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের হিসাব অনুযায়ী, ক্রয়ক্ষমতার সমতা (চঁৎপযধংরহম চড়বিৎ চধৎরঃু) বিচারে বর্তমানে বাংলাদেশ পৃথিবীর ৩৩তম বৃহত্তম অর্থনীতি এবং ২০১৬ সালে প্রধান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ছিল অন্যতম দ্রুত প্রবৃদ্ধির দেশ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ১১, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। মাথাপিছু আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৬৫ মার্কিন ডলারে। বলা যায়, প্রায় সব নির্দেশকই একটি ভালো অর্থনৈতিক অবস্থার ইঙ্গিতবাহী।

প্রসঙ্গত বলে রাখা প্রয়োজন যে, এখানে কৃষি কখনোই কোনো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল না। এটি সময়েরই ফলাফল। বলা যায় কঠিন বাস্তবতাই দেশের নির্ধারণে অবদান রাখা প্রত্যেকটি মানুষের চোখকেই টেনে এনেছে কৃষির দিকে। দেশের নীতিনির্ধারক, সাংবাদিক, অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে সুশীল সমাজের বড় অংশটি এখন ভাবতে শুরু করেছে কৃষির উন্নয়ন ছাড়া এই দেশটিকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। সরকারও বর্তমান ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জগুলোকে সামনে এনে আগামীর কৃষি পরিকল্পনাকে রাখছে উন্নয়ন পরিকল্পনার শীর্ষবিন্দুতে। গোটা পৃথিবীর আজকের খাদ্য উৎপাদন প্রেক্ষাপট, আমাদের আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ, বিশ্ববাজার, বিশ্বের উন্নত কৃষি প্রযুক্তি ও ফর্মুলাগুলোর অনেকাংশই এখন সরকারের নীতিপরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এগুলো অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক চিত্র।

আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ জনসংখ্যার চাপ। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণই এখন সকল পক্ষের প্রধান তাগিদ। পরিবর্তিত জলবায়ু পরিস্থিতিই এই তাগিদকে যেন অনেক বেশি উসকে দিচ্ছে। পাশাপাশি নানা সংশয়ের মধ্যে ফেলছে আমাদের কৃষি তথা সকল উন্নয়ন কার্যক্রমকে। বৈশ্বিক উষ্ণতা আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ। আমরা ভূপৃষ্ঠের অভ্যন্তরে এবং ওপরে দু’দিকেই বিপদের দিকে ধাবিত হচ্ছি। আন্তর্জাতিক সমীক্ষার তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান হচ্ছে বন্যার ঝুঁকিতে প্রথম, সুনামিতে তৃতীয় এবং ঘূর্ণিঝড়ে ষষ্ঠ, যা বাংলাদেশের মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। উপক‚লীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা আবাদি জমি নষ্ট করছে এবং বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। বাংলাদেশে জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ও তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে মৎস্য ও মৎস্যজীবীদের জীবনযাত্রাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদীভাঙন ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে লাখ লাখ মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে পড়েছে। তারা শহরে পাড়ি জমাচ্ছে এবং সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট করছে। যে আশঙ্কার কথা এখন বাংলাদেশে সর্বত্র, সব আলোচনায় বারবার উচ্চারিত হয় তা হচ্ছে, ২০৫০ সাল নাগাদ বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের ১৮ শতাংশ ভূমি পানির নিচে তলিয়ে যাবে। ২ কোটি মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে এবং ৪ কোটিরও বেশি মানুষ তাদের জীবনযাত্রা হারিয়ে ফেলবে। বিজ্ঞানীদের মতে, ২০৫০ সাল নাগাদ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সারাবিশ্বে একশ কোটি মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়বে। এসব চ্যালেঞ্জ এবং আশঙ্কার ভেতর আমরা আছি সবচেয়ে ভীতিকর একটি জায়গায়।

কৃষি নিয়ে গণমাধ্যমে বহুমাত্রিক কাজ করার সুবাদেই বিগত তিন যুগে যে বিষয়গুলো আমার কাছে সাধারণ কৃষকের দাবি ও চাহিদা হিসেবে সবচেয়ে বেশি সামনে এসেছে, তার মধ্যে রয়েছে সময়মতো বীজ, সারসহ অন্যান্য উপকরণের সরবরাহ নিশ্চিত করা, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, কৃষককে একটি সংগঠিত অবস্থায় এনে তার শক্তিবৃদ্ধি তথা তার কণ্ঠস্বরকে উচ্চকিত করা, তার তথ্যের অধিকার নিশ্চিত করা সর্বোপরি রাষ্ট্রের প্রত্যেকটি সামগ্রিক নীতিনির্ধারণীতে কৃষকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৃষকের প্রত্যাশা ও দাবি মূল্যায়ন করতে গিয়ে দেখেছি কৃষকের এখন আর বীজ সারসহ কোনো কৃষি উপকরণ নিয়ে আগের মতো দাবি-দাওয়া নেই। কৃষক এখন চায় তার পণ্যের ন্যায্যমূল্য। এখানে অত্যন্ত ইতিবাচক একটি চিত্র হচ্ছে, টানা কয়েক বছর ধরে কৃষক বোরো ও আমন মৌসুমে ধানের মূল্য না পেলেও গত বছর ধানের বাজারদরে কৃষক যথেষ্টই সন্তুষ্ট কৃষক।

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণের স্বার্থেই কৃষির দিকে বহুমুখী দৃষ্টিপাত এখন সময়েরই চাহিদা। পৃথিবীর কৃষি উন্নত দেশগুলো যেভাবে তাদের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির স্বার্থেই কৃষির জন্য আধুনিক প্রযুক্তি, কলাকৌশল ও তথ্যপ্রযুক্তিকে কাজে লাগাচ্ছে, এই দৌড়ে এগিয়ে চলেছি আমরাও। আমাদের কৃষিক্ষেত্রে ফসল উৎপাদন পূর্ববতী প্রায় শতভাগ যান্ত্রিকীকরণ হয়েছে। কিন্তু ফসল উৎপাদন পরবর্তী যান্ত্রিকীকরণে আমরা পিছিয়ে আছি। বিভিন্ন ফল ফসলের প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা এখনো গড়ে ওঠেনি। কয়েকটি কৃষিভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেশকিছু কৃষিপণ্য শিল্পপণ্যে রূপ দিচ্ছে এবং দেশে বিদেশে ব্যবসার প্রসার ঘটাচ্ছে। এটি কৃষি অর্থনীতির জন্য অনেক ইতিবাচক দিক। কিন্তু এই ধারাবাহিকতায় সারা দেশেই বহুসংখ্যক কৃষি শিল্প গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

এ কথা আজ অকপটে বলতেই হচ্ছে যে, রাষ্ট্র ও সরকার গ্রামীণ অর্থনীতিকে কার্যকরভাবে আমলে নিয়েছে বলে মনে হয়। বাস্তবে গ্রামীণ জীবনে উৎপাদন বৃদ্ধির কর্মচাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে ঠিক কিন্তু এর ভেতর দিয়েই একটি পরিবর্তন সূচিত হচ্ছে। যে পরিবর্তনটি আমাদের চোখেই পড়ছে না। তা হচ্ছে কৃষি থেকে কৃষক পরিবারগুলো সরে আসছে। ভূমির মালিকানায় পরিবর্তন হচ্ছে। ভূমি মালিক কৃষক তার জমি স্থানীয় দিনমজুরদের মাঝে বিক্রি করছে অথবা ইজারা দিয়ে কৃষি থেকে মুখ ফিরিয়ে শহরমুখী হচ্ছে। সে বাণিজ্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে। চাকরি সন্ধানী হচ্ছে। কারণ ভূমি মালিকরা বলছেন, কৃষি তার জন্য লাভজনক নয়। কৃষিতে এখন দিনমজুরের ব্যয় বেড়ে গেছে। কৃষিকাজ নিজে মাঠে থেকে করতে পারলে লাভ নিশ্চিত করা সম্ভব কিন্তু বাণিজ্যিক কৃষির যুগে এসে দুয়েক বিঘা জমি ধরে পড়ে থেকে তার পোষাচ্ছে না। এখানে দিনমজুর শ্রেণি ওই জমি লিজ নিয়ে নিজে ও পরিবারের সদস্যরা মিলে আবাদ করে লাভ নিশ্চিত করতে পারছে। এই অবস্থাটি দেশের সব জেলাতেই ঘটছে। রাতারাতি আদি কৃষকের হাত থেকে সরে যাচ্ছে কৃষি। নতুন এক কৃষক শ্রেণি তৈরি হচ্ছে যারা ছিল ভূমিহীন দিনমজুর। এতে বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তার জন্য পারিবারিক কৃষি ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার যে আহ্বান রয়েছে তা উপেক্ষিত হচ্ছে। জমি থেকে বেশি লাভ তুলে গিয়ে প্রচুর পরিমাণে রাসায়নিক সার প্রয়োগ করছে। এতে জমি হারাচ্ছে তার সকল প্রাণশক্তি ও জৈবকণা। প্রয়োজন এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে কৃষি পরিকল্পনা করা। যাতে নানামুখী পরিবর্তনের মুখেও কৃষিজমির উর্বরতা ও উৎপাদন ক্ষমতা কোনোভাবেই হ্রাস না পায়।

আজকের কৃষির গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম আগ্রহী হচ্ছে কৃষিতে বিনিয়োগে। দেশের অধিকাংশ এলাকায় এক দুইজন করে শিক্ষিত তরুণ যুক্ত হচ্ছে কৃষির সঙ্গে। তারা বিনিয়োগ করছেন কৃষিতে। দ্রুত সাফল্যের উদাহরণও গড়ছে। এই শিক্ষিত তরুণদের উৎসাহকে ধরে রাখার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর কিছু উদ্যোগ থাকতে হবে। বিশেষ করে, তাদের ঋণ সুবিধা, কৃষি আবাদে প্রযুক্তিগত পরামর্শ প্রদান এবং কৃষির টেকসই ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাদের ধারণা দেয়া। কৃষিতে বিনিয়োগ কখনো দ্রুত লাভের মুখ দেখালেও অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বাজারের মন্দা পরিস্থিতি, রোগ-বালাইয়ের আক্রমণ ইত্যাদি কারণে সব সময়ই লোকসানের ঝুঁকি থেকে যায়। এ বিষয়গুলো মোকাবেলা করার মতো অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা এসব শিক্ষিত তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রদান করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আমি বেশ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কিছু তরুণ কৃষি উদ্যোক্তার তৎপরতা তুলে ধরেছি। দেখেছি তারা কৃষির মধ্যে অমিত সম্ভাবনা দেখতে পারছে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে সারাবিশ্বের কৃষি সম্ভাবনা, ফসল উৎপাদনের কৌশল, আমাদের চাষ পদ্ধতির ভেতরের ইতিবাচক-নেতিবাচক বিষয়গুলো তারা বিশ্লেষণ করতে পারছে। এটি অনেক ইতিবাচক দিক। এসব তরুণ উদ্যোক্তার কাজকে সহজ করার স্বার্থে সরকারের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন। ওই কর্মসূচির মধ্যে তরুণদের প্রণোদনামূলক নানান বিষয় থাকতে পারে, যা দেশের অনেক শিক্ষার্থীকেই গ্রামমুখী ও কৃষিমুখী হতে উদ্বুদ্ধ করবে।

কৃষিতে আরেকটি বড় পরিবর্তন হচ্ছে মাটিবিহীন নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে কৃষি আবাদ। উন্নত বিশ্বের ধারাবাহিকতায় এখন অনেক বড় বড় উদ্যোক্তা দেশে গড়ে তুলছেন স্বয়ংক্রিয় গ্রিন হাউস। সেখানে তারা মাটির পরিবর্তে কোকোপিট ব্যবহার করে সম্পূর্ণ হাইড্রোপনিক পরিবেশে পরিকল্পিত উপায়ে কৃষি আবাদ করছে। এটি কৃষির একটি আধুনিক পরিবর্তন ও প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার। গ্রিন হাউস কৃষিতে উদ্যোক্তা তার পরিকল্পনা অনুযায়ী বছরব্যাপী একই ফসল ফলাতে পারছেন। মৌসুমের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে না। ইউরোপ আমেরিকার এই অনুশীলনগুলো দেশের শৌখিন উদ্যোক্তারা অনুসরণ করতে শুরু করেছেন।

আজকের কৃষি অগ্রগতির পেছনে সরকারের নানামুখী পদক্ষেপ, বাইরে থেকে আনা ফসলের উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড বীজের সহজলভ্যতা, বাণিজ্যিক কৃষিকে কৃষকের মনোনিবেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সবজি উৎপাদনে ও মাছ উৎপাদনে আমাদের সাফল্যের পেছনে ব্যক্তি উদ্যোগের ভূমিকা সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এই উদ্যোগগুলোকে মূল্যায়নের দাবি রাখে। বর্তমান সময়ের কৃষি উদ্যোক্তারা তাদের বাণিজ্যিক সাফল্যের স্বার্থে যে কোনো নতুন উদ্যোগ নিতে আগ্রহী তারা শুধু চায় সরকারের নীতিগত সহায়তা। যেমন দেশে এখন প্রতি মৌসুমেই উচ্চমূল্যের ফল-ফসল, সবজি ও মসলা ফসল আবাদ হচ্ছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব ফসলের মূল মৌসুমে বাইরে থেকে ব্যাপকহারে আমদানির কারণে কৃষক কাক্সিক্ষত মূল্য পাচ্ছে না। এতে সে হতাশ হয়ে যাচ্ছে। এক ফসলের লগ্নি করা অর্থ তোলার জন্য তাকে অন্য ফসলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে বছর শেষে সে হয়তো লাভ কিছু পাচ্ছে কিন্তু কাক্সিক্ষত লাভ পাচ্ছে না। ফসল বৈচিত্র্যের সুফল ব্যাপকার্থে সে পাচ্ছে না। এ বিষয়গুলো সরকারের নীতি পরিকল্পনার মধ্যে আনতে হবে।

পরিশেষে যে কথা বলতে চাই, আগামীর কৃষি উপযোগী গবেষণা ত্বরান্বিত করা খুবই জরুরি। যে গবেষণার স্থায়িত্ব থাকবে। যে গবেষণা আগামীর কৃষির জন্য একটি বুনিয়াদ তৈরি করবে। প্রধান খাদ্যশস্য ধান থেকে শুরু করে সবজি ফসল, বিভিন্ন ফল এমনকি মাছ ও প্রাণিসম্পদ নিয়েও কার্যকর ও ফলপ্রসূ গবেষণা প্রয়োজন। যার মধ্য দিয়ে আমরা আগামী ২০-৩০ এমনকি ৫০ বছর পরের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার কথা ভাবতে পারবো। উন্নত দেশগুলো এভাবেই ভাবছে।

২৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj