রাজস্ব আহরণ আইনের দৃষ্টিভঙ্গি ও এর গতি-প্রকৃতি : ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

চিন্তা থেকে যেমন কাজের উৎপত্তি, যে কোনো আইনের প্রয়োগ তেমনি আইনের দৃষ্টিভঙ্গি ভেদে বিভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে। আইনের ভাষা ও মেজাজ এবং প্রক্ষেপণ ও দর্শন-এর ‘উদ্দেশ্য বিধেয়’তে বিধৃত থাকে। আইন প্রণেতার মনোভাব, দূরদৃষ্টি, আচার-আচরণ, সংস্কৃতি, স্বভাব চরিত্র এবং আশা প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটে আইনের ভাষায়। যারা আইন তৈরি করেন তাদের সঙ্গে, যাদের জন্য আইনটি তৈরি করা হয়, অর্থাৎ যাদের ওপর এটির প্রয়োগ হবে তাদের মধ্যকার সম্পর্কেরও একটা বিশেষ ভূমিকা আছে আইনের দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণে। এখানে তৃতীয় আরেক শরিকের কথাও এসে যায়, যাদের মাধ্যমে আইনটির প্রয়োগ হবে, তাদের সক্ষমতা-অক্ষমতার ব্যাপারটিও বিশেষভাবে বিবেচ্য থেকে যায় আইনের প্রয়োগ তথা বাস্তবায়নযোগ্যতার ক্ষেত্রে। আইন পরিষদ যে আইন তৈরি করে তার প্রয়োগ হয় যারা আইন তৈরির ক্ষমতা দিয়েছে তাদের ওপর। আর এই আইন প্রয়োগের দায়িত্বও আইন প্রণেতার নয়, নির্বাহী বিভাগের। এখন পরিবেশ পরিস্থিতি যদি এমন হয় বা আইন পরিষদ যদি মনে করে এ আইন অন্যের জন্য, পরিষদ সদস্যদের ওপর বর্তাবে না এবং নির্বাহী বিভাগও যদি ভাবে এ আইন অন্যের ওপর প্রয়োগের জন্যই, তাহলে যাদের ওপর আইনের প্রয়োগ তারা হয়ে পড়ে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ, প্রয়োগের প্রতিক্রিয়া প্রকাশের ক্ষেত্রেও তারা যেন হয়ে পড়েন প্রতিপক্ষ আইন প্রণেতা ও প্রয়োগকারীর। এই প্রতিপক্ষতার পরিবেশেই আইন এর দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে যায় নিবর্তনমূলক, প্রতিরোধাত্মক। এই প্রেক্ষাপটে আইন অমান্যের ও অগ্রাহ্যের পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

আইন মানুষের জন্য, মানুষ আইনের জন্য নয় কিংবা মানুষের জন্য আইন, আইনের জন্য মানুষ নয় এই স্বতঃসিদ্ধ ব্যাপারটি বিশ্লেষণে গেলে এটা স্পষ্ট হয়ে প্রতিভাত হয় যে মানুষের কল্যানেই আইনের প্রয়োজন। তবে মানূষ আগে আইন পরে। আইন মানুষকে মুক্তির জন্য, তাকে বন্দি করার জন্য নয়। মানুষের মৌলিক অধিকার আইনের আওতায় স্বীকৃত, নিশ্চিত, নির্ধারিত, নিবন্ধিত হয়ে থাকে। মানুষ তার চিন্তার, বিশ্বাসের, শরীরের, দেহের, চলাচলের, সম্মানের ও মর্যাদার প্রতিষ্ঠা, বিকাশ ও নিরাপত্তা দাবি করতে পারে আইনের কাছে। তাই যে কোনো আইনের দৃষ্টিভঙ্গিতে সর্বজনীনতা এবং প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা এর একটি অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য হওয়ার আবশ্যকতা অনস্বীকার্য। নিবর্তনমূলক কিংবা প্রতিরোধাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি সঞ্জাত আইন কল্যাণপ্রদ আইন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। যে আইন যত সর্বজনগ্রাহ্য, সর্বজনমান্য, সর্বজনবোধ্য, সর্বজন অনুসৃতব্য সে আইন তত কল্যাণকর সে আইন তত কার্যকর।

আইনকে সর্বজনগ্রাহ্য, মান্য, বোধ্য, অনুসরণযোগ্য হতে হলে সে আইনের ভাষা বা দৃষ্টিভঙ্গিতে সর্বজনীনতার, ন্যয়নীতিনির্ভরতার ও নিরপেক্ষতার প্রতিফলন থাকা চাই। যাদের জন্য আইন প্রণয়ন কিংবা যারা করবেন এর প্রয়োগ তাদের থেকে আসা উচিত আইন প্রণয়নের তাগিদ, মালমশলা, যুক্তিতর্কানুমোদিত সুপারিশ বা পরামর্শ। ওপর থেকে চাপিয়ে দেয়া নির্দেশনা নিচে যে আছে তার পক্ষে পরিপালন যথা সিদ্ধ হয় না। কেন আইনের প্রয়োজন, কতটুকু প্রয়োজন, কার কার জন্য প্রয়োজন, কীভাবে তা প্রয়োগ এ সব বিষয়ে ক্ষৈত্রিক পর্যায় থেকেই আসবে উপাত্ত। আইনের উৎস হবে তারাই যাদের জন্য এটি প্রণীত হচ্ছে। এখানে অবরহ অর্থাৎ ওপর থেকে নয় আরোহ অর্থাৎ নিচ থেকেই আসা আবশ্যক ধারণা, যৌক্তিকতা এবং পন্থা পদ্ধতির প্রবেশক। আইন যে সমাজে বা সময়ে প্রয়োগযোগ্য হবে সে সমাজ বা সময়ে এটি ডাইজেস্টেবল কিনা সেটা দেখাও আবশ্যক হয়ে যায়। বিদ্যমান বা চলমান আইনের সংস্কারের প্রশ্নটি সে নিরিখেই এসে যায়। আনেক ভালো বা মন্দ আইন সময় ও সমাজের পরিবর্তন প্রেক্ষাপটে সংস্কারের অনিবার্যতায় আপতিত হয়। আইন যুগধর্মবিস্মৃত হয়ে অনড় হতে পারে না, একে যুগোপযোগীকরণে, সরলীকরণে সংশোধন সংযোজন বিয়োজনের জন্য ফ্লেকজিবল হতে হয়। যে অইন যত সংস্কারযোগ্য সে আইন তত সচল সজিব ও দীর্ঘজীবী। আইনের ভাষা ও গতি-প্রকৃতিতে এই প্রাগ্রসরমানতার বৈশিষ্ট্য বিশেষ জরুরি।

উপরের তাত্তি¡ক ধ্যান-ধারণার আলোকে বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজস্ব আহরণ আইনসমূহকে জন্মগতভাবে ব্রিটিশ, দৃষ্টিভঙ্গির বিচারে ঔপনিবেশিক এবং প্রায়োগিক দিক থেকে নিবর্তন ও প্রতিরোধাত্মক বলে প্রতীয়মান হতে পারে। এ দেশে ভূমি কর বা রাজস্ব আদায় এর প্রথা প্রাগৈতিহাসিক আমল থেকে। রাষ্ট্র্রীয় নিরাপত্ত প্রদান, বিভিন্ন সেবার বিনিময, কিংবা উৎপাদন বা সম্পদ ব্যবহার বাবদ নানান নামে নানান উপায়ে রাজস্ব বা টোল বা সেস আদায়ের প্রথা সেই আদি যুগ থেকে চলে আসলেও আধৃনিক আয়কর বলতে যে বিশেষ কর রাজস্বের সঙ্গে আমরা পরিচিত, এ দেশে তথা ভারতীয় উপমহাদেশে তার প্রবর্তন ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে, সাত সাগর তের নদীর পার থেকে আসা বিদেশি বেনিয়ার দ্বারা। তাদের তৎকালীন সমাজে শিল্প বিপ্লবের পর পুঁজির প্রসার ঘটে এবং সেখানে সম্পদের ওপর, সম্পদ সৃষ্টি ও বিনিময় প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত আয় অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। রাষ্ট্র ঐ অতিরিক্ত আয়ের ওপর একটা হিস্যা দাবি করে বসে, যুক্তি এই, তুমি রাষ্ট্রের তৈরি অবকাঠামো ব্যবহার করে আয় উপার্জন করছ, রাষ্ট্রের সেবা ও সুবিধা ভোগ করে লাভবান হচ্ছ সুতরাং এ সব অবকাঠামো নির্মাণ, এসব সুযোগ-সুবিধার সমাহার বাবদ রাষ্ট্রের বিনিয়োগে তোমার অংশগ্রহণ চাই। ‘নো লাঞ্চ ইজ ফ্রি’ অংশীদারিত্বের দর্শন থেকে ইউরোপে আধুনিক আয়কর ধারণার উৎপত্তি। ‘নেবে আর দেবে, দেবে আর নেবে এভাবে মিলাবে নিকাশ’, পরস্পরের প্রতি আস্থা ও দায়িত্ববোধের বিকাশ ধ্রæপদ আয়কর ব্যবস্থাপনার প্রভাতসঙ্গীত।

এ দেশে যারা আয়কর আইন আমদানি করেছিলেন, যে সময়ে এনেছিলেন, যাদের জন্য এনেছিলেন এবং যাদের ওপর অর্পিত হয়েছিল এর প্রয়াগ-প্রবর্তনের ভার তাদের প্রত্যেকের নাড়ি নক্ষত্র পরীক্ষা পর্যালোচনায় বিদ্যমান আয়কর আইনের চরিত্র ও চারিত্র্য, এর শরীর ও শারীর শনাক্তকরণ সহজ হতে পারে। আমরা জানি এ দেশ ১৭৫৭ সালে ঈস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্তৃত্বাধীনে চলে যায়। রেজাখান সেতাব রায়দের মাধ্যমে মাসোহারা প্রাপ্তির পর্ব পেরিয়ে ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে কোম্পানি মূলত এবং মুখ্যত লাভজনক ব্যবসায়িক দৃষ্টি ও রীতি পদ্ধতিতেই চালিয়েছিল শাসন কার্য। কোম্পানির স্বার্থে ও সুবিধার জন্য ১৭৬৫ সালে বাংলার কৃষিপণ্যকে বাণিজ্যিকীকরণ, ১৭৭৩ সালে রেগুলেটিং এ্যাক্ট পাস, ১৮১৩ সালে ভারতে ফ্রি ট্রেড প্রবর্তন এবং ঐ বছরই বাংলার মূখ্য শিল্পখাত টেক্সটাইল এক্সপোর্ট বন্ধ, ১৮২০ সালে টেক্সটাইলকে ইম্পোর্ট পণ্য হিসেবে ঘোষণা, ১৮৩০ এ কলকাতা ডকিং কোম্পানি প্রতিষ্ঠা, ১৮৩৫ সালে ইংরেজিকে অফিস আদালতের ভাষা হিসেবে ঘোষণা, ১৮৩৮ বেঙ্গল বন্ডেড অয়ার হাউজ এসোসিয়েশন গঠন এবং ১৮৪০ সালে বেসরকারি খাতে চা বাগান স্থাপনের মাধ্যমে এদেশীয় অর্থনীতির স্বনির্ভর সত্তাকে পরনির্ভরকরণের কার্যক্রম শুরু হয়। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর এ দেশের শাসনভার কোম্পানির থেকে ব্রিটিশ সরকারের হাতে ন্যস্ত হয়। ব্রিটিশ শাসনামলেই শাসকের সাথে শাসিতের দায়দায়িত্ব পালনের প্রশ্ন সামনে আসে এবং ইউরোপীয় শিল্পবিপ্লবের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ প্রভাবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যবসা বাণিজ্য ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয় এ দেশের অর্থনীতি। এ প্রেক্ষাপটেই উৎপাদন, বিপণন, বাণিজ্য ব্যবস্থায় সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে আয়কর আদায়ের যৌক্তিকতা দেখা দেয়। ভারতে ব্রিটিশ সরকারের প্রথম অর্থমন্ত্রী উইলসন আয়কর প্রবর্তন করেন ১৮৬০ সালের বাজেট বক্তৃতায়। এরপর প্রথমে ১৮৬২ থেকে ১৮৬৭ অবধি সীমিত অবয়বে আয়কর আদায়ের আয়োজন চলে। মাঝে বন্ধ হয় কার্যক্রম। আবার ১৮৮০’র পর কয়েক বছর পরীক্ষামূলকভাবে চলে, সরকার স্থায়ীভাবে কোনো আইন না করে, স্থানীয়ভাবে এস আর ও বা সার্কুলার জারি করে আয়কর আদায় কার্যক্রম পরিচালনা করে। তবে এ সব সার্কুলার ব্রিটিশ আইনের আদলে ও দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রণীত হলেও এ দেশীয় করদাতাদের প্রতি তাদের বশংবদ অদায়িত্বশীল আচরণ, পারস্পরিক অবিশ্বাস, ফাঁকিঝুঁকি দেয়ার প্রবণতা প্রতিরোধমূলক দৃষ্টিভঙ্গি সেই সার্কুলারের বাক প্রতীমায় প্রাধান্য পায়।

আহরণযোগ্য আয় বা মূল্য সংযোজন কিংবা শুল্করাদি নির্ধারণ থেকে শুরু করে সব পর্যায়ে পরিপালনীয় বিধিবিধানের ভাষায় এমন এক ধরনের কুটিল কিংবা জটিল মনোভাবের প্রকাশ পেয়ে তা জটিল, দ্ব্যর্থ ও ক‚টার্থবোধক হয়ে ওঠে। এ দেশে প্রবর্তিত রাজস্ব আহরণ সংক্রান্ত সার্কুলারসমূহে জটিলতা যুগলবন্দি হয়ে ওঠে। ঔপনিবেশিক সরকারের তরফে করদাতাদের কল্যাণ নিশ্চিত করার বিষয়টি মুখ্য বিবেচনায় না এলেও কর আদায়ের ক্ষেত্রে জমিদার পাইক পেয়াদা সুলভ যুদ্ধংদেহী মনোভাব প্রকাশ পায়। উদ্দেশ্য থেকে যায় ‘তোমার আয় হোক আর না হোক অর্থাৎ বাঁচা মরা রাজস্ব আমার চাই। এ ধরনের আইনগত দৃষ্টিভঙ্গির বদৌলতে কর আদায়কারী বিভাগের সঙ্গে করদাতাদের সম্পর্ক জবরদস্তিমূলক, পরস্পরকে এড়িয়ে চলার কৌশলাভিমুখী হয়ে পড়ে। অন্তরালে ব্রিটিশ প্রশাসনে বহুল কথিত একটা সাধারণ নির্দেশনা ছিল যেন এরকম, ‘চোর তো চুরি করিবেই কিন্তু গৃহস্থকে সজাগ থাকিতে হইবেই’। করদাতাদের এরূপ বিরূপ ধারণায় বিবেচনা এবং তাদের ধরার ইন্ধন কর আইনের ভাষ্যে যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এপ পরস্পর অবিশ্বাসের ও প্রতিদ্ব›দ্বী পরিবেশে কর নির্ধারণ ও পরিশোধের ক্ষেত্রে পরস্পরকে এড়িয়ে চলার এবং সে লক্ষ্যে অনৈতিক আঁতাতের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকির সং¯কৃতির সূত্রপাত ঘটে। ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থায় দুর্নীতিগ্রস্ততার এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টিতে সেই সময়কার আয়কর আইনের ভাষার যেন ছিল পরোক্ষ প্রেরণা বা সুযোগ। এমন অনেক আইন আছে যা বেআইনি আচরণকে উসকে দেয়। এরকমই পরিবেশে কর দাতাদের সঙ্গে আঁতাতের মাধ্যমে কর ফাঁকি কার্যক্রমে করদাতা আর আদায়কারীর মধ্যবর্তী সাহায্যকারীও যেন সহায়ক ভূমিকায় চলে আসে। এই জটিল, অনভিপ্রেত ব্যবস্থাদি আয়কর সার্কুলারের ভাষায় প্রতিফলিত হতে থাকে। তদানীন্তন ব্রিটেনে বিদ্যমান আয়কর আইন ও প্রয়োগ পদ্ধতি প্রক্রিয়া থেকে সে সময় এ দেশে প্রণীত ও প্রবর্তিত আইন ও পদ্ধতি প্রক্রিয়ায় ব্যাপক বিচ্যুতি ও পরিবর্তন পরীক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও তাই-ই ‘ভারতীয় আয়কর আইন’ আকারে ১৯২২ সালে সংকলিত ও প্রবর্তিত হয়।

১৯২২ সালের ভারতীয় আয়কর আইন ১৯৪৭-এ ভারত বিভাগের পর যেখানে ‘ভারত’ লেখা সেখানে ‘পাকিস্তান’ প্রতিস্থাপন করত সমগ্র পাকিস্তানে প্রবর্তিত হয়। শাসকের ও শাসিতের মধ্যকার হরিজেন্টাল ও ভার্টিকাল সম্পর্কের শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তন সত্ত্বেও আয়কর সংক্রান্ত ধ্যানধারণা মতিগতি স্বভাব চরিত্র সবই সেই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার আদলে থেকে যায়। আয়কর ব্যবস্থা যেখানে সামাজিক সুবিচার ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে পারষ্পরিক পরিপূরক দায়িত্ব পালনের বিষয়, ঔপনিবেশিক শাসনকাঠামোয় সঙ্গত কারণেই যার যথার্থতা অনুসরণ ছিল অনুপস্থিত, পাকিস্তান প্রজাতন্ত্রেও সেই একই ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি অব্যাহত থাকা বা অনুসরণ ছিল অত্যন্ত দুঃখজনক। আজকের বাংলাদেশ তখন তদানীন্তন পাকিস্তানের অধীনে উপনিবেশসম একটি প্রদেশ হিসেবে ব্যবসা বাণিজ্য বিনিয়োগ তথা আর্থসামাজিক রাজনৈতিক দিক দিয়ে বিপুল বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার ছিল। আর আয়কর রাজস্ব আদায়ের পুরো প্রশাসনিক দায়িত্ব ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে। প্রসঙ্গত যে ভারতীয় প্রজাতন্ত্র ১৯৬১ সালে ১৯২২ সালের আয়কর আইনকে নিজস্ব সমাজ ও সময়ের দাবির সঙ্গে সাযুয্য রেখে পুনর্গঠন করত নতুন আয়কর আইন প্রবর্তন করে।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরও, এক যুগেরও বেশি সময় সেই ১৯২২ সালের আয়কর আইন ভারত স্থলে পাকিস্তান, পাকিস্তান স্থলে বাংলাদেশ প্রতিস্থাপিত ও নামাঙ্কিত হওয়া ছাড়া একইভাবে বলবৎ ও প্রযোজ্য থাকে। আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪ (১৯৮৪ সালের ৩৬নং অধ্যাদেশ) জারির মাধ্যমে বাংলাদেশে নিজস্ব আয়কর আইন প্রবর্তিত হয় ১৯৮৪ সালে। তবে তখন দেশে আইন পরিষদ বিদ্যমান না থাকায় রাষ্ট্র ও নাগরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট ও গণগুরুত্বপূর্ণ আয়কর আইনটি অধ্যাদেশ হিসেবে জারি হওয়ায় এটির প্রণয়ন ও প্রয়োগযোগ্যতা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। বারবার দাবি উঠেছে আয়কর অধ্যাদেশের স্থলে সংসদে আয়কর আইন প্রণয়নের। আইনসভার অনুমোদনে প্রণীত না হওয়ায় লক্ষ্য করা যায় অধ্যাদেশের সংশ্লিষ্ট ধারা-উপধারাসমূহ তথা বিধানাবলি মূলত ১৯২২ সালের মূল আইনেরই স্বাভাবিক ধারাবাহিকতায় দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ প্রণীত প্রেসক্রিপশন মাত্র এবং এটি সে হিসেবেই বিবেচিত হয়ে আসছে।

বাংলাদেশে বিদ্যমান আয়কর অধ্যাদেশের ভাষা ও গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণে গেলে এটা প্রতীয়মান হয় যে, বছর বছর অর্থ আইনে যে সব ছিটেফোঁটা শব্দগত সংযোজন, বিয়োজন এবং মূল ধারণার আওতায় যোগ্যতার মাপকাঠির পরিবর্তন বা পরিমার্জন অনুমোদিত হয়েছে তা ধারণ করা ছাড়া ১৯২২-এর মূল আইনের ভাব ভাষা দৃষ্টিভঙ্গিগত তেমন কোনো পরিবর্তন বা সংস্কার দৃশ্যগোচর হয় না। বরং প্রতি বছর কর নির্ধারণ, শুনানি, বিচার আচার এ কর কর্মকর্তাদের ক্ষমতা বা এখতিয়ার, কর অবকাশ-নিষ্কৃতি-ছাড় কিংবা বিশেষ সুবিধাবলির ধারা-উপধারা সংযোজন-বিয়োজন করতে করতে অনেক ক্ষেত্রেই করারোপ, আদায় ও করদাতার অধিকার, কর অবকাশ নিষ্কৃৃতিও সুবিধা সংক্রান্ত মৌল দর্শন হয়েছে বিভ্রান্ত, বিকৃত ও বিস্মৃত। পক্ষান্তরে, যুগধর্ম এর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কর নির্ধারণ ও আদায় সংক্রান্ত বিধানাবলি সহজীকরণ-সরলীকরণ তথা করদাতা বান্ধবকরণ এর পরিবর্তে ক্ষেত্রবিশেষে আরো জটিল হয়েছে। বাংলাদেশ অর্থনীতর সমকালীন পরিবেশ পরিস্থিতির আলোকে আয়কর ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ সংবলিত সংশোধন-সংযোজন-বিয়োজন প্রয়াস বারবার যেন উপেক্ষিতই থেকে গিয়েছে।

একটি স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী দেশের অর্থনীতি মুক্তবাজার অর্থনীতিতে অবগাহন করে অধুনা মনস্ক হতে চাইলেও সে দেশের আয়কর আইনের ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি এখনো যেন ঔপনিবেশিক আমলের পারস্পরিক অবিশ্বাসের, সংশয় সন্দেহের, জটিলতার আবর্তে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের নামে বরং আইনের আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ার ভীতিপ্রদ পরিস্থিতির পথ পরিক্রমায়। স্বেচ্ছায় করদানে সক্ষম করদাতাকে উদ্বুদ্ধকরণের ক্ষেত্রে স্বতঃস্ফ‚র্ততায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়, নিরুৎসাহিতবোধের কারণ হয়ে দাঁড়ায় বিদ্যমান আইনের ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি। সেই আইন প্রয়োগে অভ্যস্ত আয়কর বিভাগ এবং সেই আইনের আওতায় করদাতাকে সহায়তাদানকারী সমাজও তাদের মেধা ও বিজ্ঞ কৌশলেও সময়ের দাবির প্রেক্ষাপটে আন্তরিক হয়েও যথা সংস্কারে সফল অবস্থায় উত্তরণে গলদঘর্ম হন। আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার অর্থে ভাড়া করা দেশি-বিদেশি রাজস্ব আইন বিশেষজ্ঞ দ্বারা বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজস্ব আইনকে পুনর্লিখিত করে ইংরেজি ভাষায় প্রণীত খসড়ার ওপর মতামত চাওয়া হয়েছে। ১৯৮৭ সালে বাংলাভাষা প্রয়োগ আইন পাসের পর দেশের সব আইন বাংলাভাষায় প্রণয়নের বিধান থাকলেও আয়কর (খসড়া) আইনটি এবং ২০১২ সালে জারিকৃত ভ্যাট আইনটিতে ইংরেজি ভাষায় দুর্বোধ্য ও দ্ব্যর্থবোধক প্রাকরণিক ও পদ্ধতি প্রক্রিয়ার সমাহার ঘটানো হয়েছে যা বাংলাদেশের অর্থনেতিক আবহাওয়া ও সংস্কৃতিতে তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সঙ্গত প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এ দেশের আয়কর আইন হবে এ দেশেরই আবহমান অর্থনীতির আবহে লালিত ধ্যান-ধারণার প্রতিফলক, তবেই বাড়বে এর গ্রহণযোগ্যতা এবং এর বাস্তবায়নযোগ্যতা।

এ কথা অনস্বীকার্য থেকে যাবে যে, এই বাংলাদেশের রাজস্ব আইনসমূহের ভাষা হবে সহজবোধ্য, জটিলতা পরিহারী এবং এর প্রয়োগ হবে স্বাচ্ছন্দ্যে সর্বজনীন ব্যবহার উপযোগী। করদাতা যেন নিজেই নিজের আয়কর ফরম পূরণ, কর নির্ধারণ এবং সরাসরি তা দাখিলে সক্ষম হন। অর্থনীতির বিভিন্ন পর্য়ায়ে অবস্থানরত আয়কর দাতাগণ যেন অভিন্ন আচরণে আইনগতভাবে আয়কর প্রদানে দায়িত্বশীল হতে স্বতঃস্ফ‚র্ততা বোধ করেন। কর আদায় নয়, কর আহরণে করদাতা ও কর আহরণকারীর মধ্যকার দূরত্ব যত কমে আসবে, যত অধিকমাত্রায় করদাতা কর নেটের আওতায় আসবেন, তত কর রাজস্ব আহরণে সুষম, সহনশীল ও দায়িত্ববোধের বিকাশ ঘটবে। এরূপ পরিস্থিতিতে করদাতাকে তাড়া করে ফেরার স্পর্শকাতরতার অবসান ঘটবে। তবে এ সব কিছুই নির্ভর করবে আয়কর আইনের ভাষা আর দৃষ্টিভঙ্গিতে কার্যকর ও কল্যাণপ্রদ পরির্বতন আনয়নের ওপর। আর সে প্রত্যাশা পূরণ প্রয়াসে আইন পরিষদ, নির্বাহী বিভাগ এবং করদাতা নির্বিশেষে সবার সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ আবশ্যক হবে।

২৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj