পাকিস্তান আমলেই কি ভালো ছিলেন? : আন্দালিব রাশদী

বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

উনিশ শত একাত্তরের পরে যাদের জন্ম তাদের স্মৃতিতে ‘পাকিস্তান আমল’ থকার কোনো কারণ নেই। এমনকি উনিশ শত পঁয়ষট্টির ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর যাদের জন্ম একাত্তরের মার্চে তাদের সর্বোচ্চ বয়স সাড়ে পাঁচ বছর। তাদের স্মৃতিতেও পাকিস্তান আমল জেগে থাকার কথা নয়। ১৯৪৭-এর দেশ ভাগের সময় যাদের জন্ম একাত্তরের মার্চে তারা সাড়ে তেইশ। তাদের স্মৃতিতে এবং তাদের আগে এবং কিছুকাল পর পর্যন্ত পরে জন্মগ্রহণকারী বয়স্ক প্রজন্মের স্মৃতিতে পাকিস্তান জেগে থাকার কথা। বয়স্ক প্রজন্মের হাতে গোনা কারো কারো দীর্ঘশ^াস হয়তো কেউ কেউ শুনে থাকবেন : পাকিস্তান আমলেই ভালো ছিলাম! পাকিস্তান থাকলেই ভালো হতো! হতেই পারে- পাকিস্তানি তাহজিম ও তমুদ্দুন, পাকিস্তানি আনার ও আখরোট, পাকিস্তানি সালোয়ার ও কামিজ, ক্লিফটন সি বিচ, বন্ধু খানের কাবাব, পাকিস্তানি ক্রিকেট, নূরজাহানে দমাদম মস্ত কালান্দর আপনার ভালো লাগে- ভালো লাগাটা দোষের কিছু নয়। কিন্তু সব নিয়ে তারা আসলে কতটা ভালো ছিলেন তা খতিয়ে দেখতেই এই নিবন্ধটি রচনা করা হয়েছে।

এই নিবন্ধে পাকিস্তানি অত্যাচার, অনাচার, শোষণ, হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ ও নিপীড়ন, লুণ্ঠন এসব নিয়ে কোনো কথাই বলব না। অর্থনীতির ছোটখাটো কয়েকটি বিষয় উপস্থাপন করে জিজ্ঞেস করব, পাকিস্তান আমলে সত্যিই কি ভালো ছিলেন?

যারা সব যুগে ভালো থাকতে জানেন- একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর মধ্যাহ্ন পর্যন্ত শিরোস্ত্রাণ হিসেবে জিন্নাহ টুপি ধারণ করে মাস দুয়েক এদিক-ওদিক মাজার জেয়ারত করে স্বাধীন বাংলাদেশে ঢুকে মুজিব কোট ধারণ করেছেন; যে সব যুবক পেয়ারে পাকিস্তানের সাচ্চা সৈনিক হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়ের বিরোধিতা করেছেন তারা ১৬ ডিসেম্বরের পর হাতে বন্ধুক নিয়ে ছবি তুলে মুক্তিসেনা সেজেছেন, জলের দামে মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট কিনে সদ্য স্বাধীন দেশটিকে আর এক দফা শুষে খেয়েছেন আমার এ নিবন্ধের লক্ষ্য তারা নন। আমার লক্ষ্য হা-হুতাশ করা নিবীর্য মধ্যবিত্তের বয়স্কজন।

১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে একটি পোস্টারে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্যের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল। স্মৃতি জাগাতে বিষয়টি আবারো উপস্থাপন করছি :

রাজস্ব খাতের ব্যয় পূর্ব পাকিস্তানে ১৫০০ কোটি রুপি, পশ্চিম পাকিস্তানে ৫০০০ কোটি রুপি। উন্নয়ন খাতে ব্যয় পূর্ব পাকিস্তানে ৩০০০ কোটি রুপি, পশ্চিম পাকিস্তানে ৬০০০ কোটি রুপি। বৈদেশিক সাহায্য পূর্ব পাকিস্তানে শতকরা ২০ ভাগ, পশ্চিম পাকিস্তানে শতকরা ৮০ ভাগ। বৈদেশিক দ্রব্য আমদানি পূর্ব পাকিস্তানে শতকরা ২৫ ভাগ, পশ্চিম পাকিস্তানে শতকরা ৭৫ ভাগ। কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরি পূর্ব পাকিস্তানে শতকরা ১৫ জন, পশ্চিম পাকিস্তানে শতকরা ৮৫ জন। সামরিক বিভাগে চাকরি পূর্ব পাকিস্তানে শতকরা ১০ জন, পশ্চিম পাকিস্তানে ৯০ জন। চাল (মণ প্রতি) পূর্ব পাকিস্তানে ৫০ রুপি, পশ্চিম পাকিস্তানে ২৫ রুপি। আটা (মণ প্রতি) পূর্ব পাকিস্তানে ৩০ রুপি, পশ্চিম পাকিস্তানে ১৫ রুপি। সরিষার তেল (সের) পূর্ব পাকিস্তানে ৫ রুপি, পশ্চিম পাকিস্তােন ২.৫০ রুপি। স্বর্ণ প্রতি ভরি পূর্ব পাকিস্তানে ১৭০ রুপি, পশ্চিম পাকিস্তানে ১৩৫ রুপি।

২০১৭-১৮ সালের বাংলাদেশ বাজেটের আকার ৪,০০,২৬৬ কোটি টাকা। ১৯৭২ সালে তা ছিল ৭৮৬ কোটি টাকা। এই তালিকার প্রথম ছয়টি সূচকে এখন আর ভাগাভাগির কোনো সুযোগ নেই। শতভাগই বাংলাদেশের। ২০১৭-এর ডিসেম্বরে ৬০ টাকায় বাংলাদেশের যে মানের এক কিলোগ্রাম চাল কিনেছেন, সে মানের সমপরিমাণ চালের মূল্য ১১৯ রুপি। যদি পুরনো ধারাটি অব্যাহত থাকতো এবং পশ্চিম পাকিস্তানের দ্বিগুণ দামে কিনতে হতো, আপনি ব্যয় করতেন ২৩৮ রুপি।

এমনকি দুই অংশে যদি পৃথক মুদ্রাও হতো (পশ্চিমে ‘রুপি’, পূর্বে ‘টাকা’) তাহলে হালের কনভার্সন রেট অনুযায়ী (১.০০ পাকিস্তানি রুপি = ০.৭৪৯ টাকা) আপনাকে ব্যয় করতে হতো ১৭৮.২৬ টাকা। অন্তত চালের দামের হিসাবে বলুন : পাকিস্তান আমলে কি ভালো ছিলেন? পাকিস্তান থাকলেই কি ভালো হতো?

ব্রোকেন বাসমতি (বাসমতির খুদ) সস্তা, ৭০.৫০ রুপি; পাঞ্জাবি ও সিন্ধি ইরি-৬ চাল এক কেজি ৫১.০০ রুপি। আটার দামও ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের ঠিক দ্বিগুণ। সে হিসেবে পূর্বাংশে কিনতে হতো প্রতি কেজি ৬৬ রুপি দরে। সর্ষের তেলের দামও ছিল দ্বিগুণ। পূর্বাংশে প্রতি সের ৫ টাকা, পশ্চিমে আড়াই টাকা।

সাধারণ মানের সর্ষের তেলের দর প্রতি কেজি ১৮৫ রুপি, এখানে হতো ৩৭০ রুপি। এমনকি স্বর্ণের দামের যে বৈষম্য ছিল (পশ্চিমে ১৩৫, পূর্ব ১৭০) তাও বিলীন হয়ে গেছে। এখন পাকিস্তানে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের প্রতিগ্রাম ৪,৪৫৫ রুপি; বাংলাদেশে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের প্রতিগ্রাম ৪,৪৮০ টাকা।

এরপরও বলবেন ওটাই ভালো ছিল? নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের যে মূল্য তালিকা আমি পরীক্ষা করেছি তাতে পাকিস্তানে কেবলমাত্র গরুর মাংস ও চিনির দাম বাংলাদেশের তুলনায় কম। পাকিস্তানি ক্রিকেট দলে বাঙালির কোনো পাত্তাই ছিল না। একাত্তরের অগ্নিঝরা দিনের ঝাপটায় একজন বাঙালি রকিবুল কমনওয়েলথ একাদশের বিরুদ্ধে জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্ত হন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে পাকিস্তান ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড এতটা সহৃদয় হতো না- এ তো জোর দিয়েই বলা যায়।

সেই পাকিস্তানকে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সব ফরমেটেই হারিয়ে দেখিয়েছে শোষণ ও বঞ্চনা কেবল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নয়, ক্রিকেট মাঠেও চূড়ান্ত বঞ্চনা হয়েছে।

পাকিস্তান আমলেই ভালো ছিলাম কিংবা পাকিস্তান থাকলেই ভালো ছিল বলে যারা মনে করেন তারা বাংলাদেশের হাতে পাকিস্তানের পরাজয়টা তিক্ত বটিকার মতো নিশ্চয়ই গিলে ফেলেন এবং গিলতে গিলতে বলেন, সামনের ম্যাচে পাকিস্তান দেখিয়ে দেবে।

আবার আর্থিক খাতে ফিরে আসি, অসুবিধে হচ্ছে এখানে আবেগমথিত ভোঁতা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার সুযোগ কম। এখানে ১, ২, ৩, ৪ জাতীয় সংখ্যা ও অঙ্ক কথা বলে। গোলাভরা ধান, গোয়ালভরা গরু আর পুকুরভরা মাছের সোনার বাংলার দোহাই এখানে তেমন খাটে না।

স্বব্যাখ্যাত সংখ্যাই বাংলাদেশ এবং ‘প্যায়ারে পাকিস্তান’-এর অবস্থান বেশ স্পষ্ট করে বলে দিচ্ছে। ২০১৭-এর বাংলাদেশের বার্ষিক বাজেটের আকার যুক্তরাষ্ট্রীয় হিসাবে ৫৩ বিলিয়ন ডলার; আর একই সময় পাকিস্তানের ঘোষিত বাজেটের আকার ৪৫ বিলিয়ন ডলার। এখনই পাকিস্তানের চেয়ে ১৭% বেশি। দ্রষ্টব্য, এই প্রথম বাংলাদেশ তারচেয়ে সাড়ে ৫ গুণ বড় এবং একাত্তর-পূর্ব বাংলাদেশের চেয়ে বেশি সমৃদ্ধ পাকিস্তানকে বাজেটের মাপে ডিঙ্গিয়ে গেল। অর্থনীতির যে গতিপ্রকৃতি তাতে বাংলাদেশকে ধরতে পারা পাকিস্তানের জন্য প্রায় অসম্ভব একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

পাকিস্তানের এই পিছিয়ে পড়া কিংবা বাংলাদেশের এই ডিঙ্গিয়ে যাওয়া যদি আপনাকে কষ্ট দেয় তাহলে মনে করার সঙ্গত কারণ রয়েছে যে, আপনি নিশ্চয়ই পাকিস্তান আমলে ভালোই ছিলেন।

রপ্তানির টাকাকড়িতে বছর চারেক আগে বাংলাদেশ পাকিস্তানকে ডিঙ্গিয়েছে। গত বছর বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ছিল ৩৪.৩৪ বিলিয়ন ডলার আর পাকিস্তান আয় ১৮.৭ বিলিয়ন ডলার- শতকরা ৮৩ ভাগ বেশি।

স্বাধীনতার পর প্রথম বাজেট ৭৮৬ কোটি টাকার এবং শতকরা প্রায় ৯৩ ভাগই বৈদেশিক অর্থায়ন নির্ভর; এখন দৃশ্যপট ঠিক উল্টে গেছে- ৯২ কি ৯৩ ভাগই নিজস্ব অর্থায়ন। সে সময় মোট জাতীয় উৎপাদনে (জিডিপি) শিল্প খাতের অবদান ছিল ৬-৭ ভাগ আর তখন পাকিস্তানে শিল্প খাতের অবদান ছিল ২০ ভাগেরও বেশি। শিল্প খাত বাংলাদেশের জিডিপিতে এখন প্রায় ৩০ শতাংশ অবদান রাখছে।

গত বছর ডলারে রূপান্তরিত মাথা পিছু আয় বাংলাদেশির বেলায় ১৫৩৮ ডলার আর পাকিস্তানির বেলায় ১৪৭০ ডলার। অবশ্য ইকনমিস্ট বাংলাদেশের পাকিস্তানকে ডিঙিয়ে যাওয়ার ঘটনায় পরিসংখ্যানগত হিসাবকে কৃতিত্ব দিয়েছে। যে জনসমষ্টির হিসাব করে মাথাপিছু আয় নির্ধারণ করা হয়েছে পাকিস্তানের বেলায় বড় গলদ ছিল সেই হিসাবে। শেষ আদমশুমারি দেখিয়েছে মোট হিসাবে জনসংখ্যা প্রকৃত হিসাবের চেয়ে ৯০ লাখেরও বেশি কম দেখানো হয়েছে। গণিতের হিসাবে মাথা কমলে মাথা পিছু আয় তো বাড়বেই। এই ৯০ লাখ যোগ হওয়ার পর পাকিস্তান জনসংখ্যার হিসাবে এমনকি ব্রাজিলকে ছাড়িয়ে পঞ্চম বৃহত্তম অবস্থানে চলে এসেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে যোগ হয়েছে গায়েবি ভোটার। সব মিলিয়ে পরিসংখ্যান চলে এসেছে বাংলাদেশের পক্ষে। পরিসংখ্যান নিয়ে কৌতুকটি বহুলচর্চিত হলেও আবার বলা যায়- মিথ্যে তিন প্রকার : সাধারণ মিথ্যে, ঢাকা মিথ্যে এবং পরিসংখ্যান। ভুল পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে প্রণীত পরিকল্পনা যে সফল হবে না এটাই তো স্বাভাবিক। স্মরণ করিয়ে দেয়া ভালো যে, উন্নয়ন চর্চাকারীরা বাংলাদেশের পরিসংখ্যানকেও যথেষ্ট সন্দেহের চোখে দেখে থাকেন। ২০১১-তে বাংলাদেশ যে আদমশুমারি করিয়েছে তা যথার্থ মনে করতে পারলে আশ^স্ত থাকতে পারতাম। বিশ^খাদ্য সংস্থার একটি হিসাব বাংলাদেশকে উজ্জীবিত করেছে। মৎস্য খামারে বাংলাদেশের চাষি ও মৎস্যজীবীরা ২ মিলিয়ন টন মাছ উৎপাদন করে থাকেন- মাছ উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ৪র্থ স্থানে, এর আকার পোশাকশিল্প খাতকেও ছাড়িয়ে গেছে।

মাথাপিছু আয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এসব সংখ্যাভিত্তিক নিস্পৃহ হিসাব-নিকাশ থেকে বেরিয়ে এসে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি যে হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স (মানব উন্নয়ন সূচক) প্রণয়ন করেছে, বাংলাদেশ অনেক বছর পাকিস্তানের চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও ১৯৯৮-তে এসে পাকিস্তানকে টপকে যায়:

মানব উন্নয়ন সূচক

সাল বাংলাদেশ পাকিস্তান

১৯৯৮ ০.৪৫০ ০.৪৪১

২০০৮ ০.৫২৩ ০.৫১৪

২০১৩ ০.৫৭০ ০.৫৪২

২০১৫ ০.৫৭৯ ০.৫৫০

যে ১৮৮ দেশকে এই মানব উন্নয়ন সূচকের নিরিখে বিচার করা হয়েছে, তাতে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৯ আর পাকিস্তানের ১৪৭।

পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনায় কিঞ্চিত গর্ববোধ করার মতো ব্যাপার- কিন্তু সূচক ০.৬৩১-এ না পৌঁছা পর্যন্ত আমরা সম্মানজনক অবস্থানে যেতে পেরেছি বলার সুযোগ নেই। গুম, খুন, মানবাধিকার লঙ্ঘন, কালো আইন প্রণয়ন ও বহাল, লিখিত ও অলিখিত সেন্সরশিপ, নারীর অবস্থান, শিক্ষা, আয়ু, আয় সবই বিবেচ্য। কাজেই পাকিস্তানকে ডিঙানোর তৃপ্তির ঢেঁকুর ভুলে আমাদের প্রতিযোগিতায় নামা দরকার শ্রীলঙ্কার সঙ্গে। শ্রীলঙ্কার সূচক মান ০.৭৬৬ আর দেশটির অবস্থান ৭৪তম স্থানে।

অধিকতর মানবিক সূচকটির নাম ইনক্লুসিভ ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স- অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন সূচক। উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতির ১০৯টি দেশের ওপর সমীক্ষা চালায় ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরাম। অন্তর্ভুক্তিমূলক সূচকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশীয় বড় প্রতিযোগী পাকিস্তান, ভারত এবং এমনকি শ্রীলঙ্কাকেও পেছনে ফেলে ৩৪তম স্থান দখল করেছে। এই সূচক প্রণয়নে ও স্টেকহোল্ডারের অবদান, দারিদ্র্যবান্ধব উন্নয়ন কর্মসূচি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বিশেষভাবে বিবেচনায় আনা হয়। এই সূচকে ভারত ৬২তম অবস্থানে, পাকিস্তান ৫২তম এবং শ্রীলঙ্কা ৪০তম অবস্থানে। প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন এবং অন্তর্ভুক্তিকরণ- বাংলাদেশ তিনটিতেই এগোচ্ছে। ভালো থাকা মানে তো কেবল নিজের আয়েশ ও স্বাচ্ছন্দ্য নয়, সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করেই ভালো থাকতে হবে। সন্দেহ নেই পাকিস্তানও এগোচ্ছে, তবে বাংলাদেশের এগোনোটা চোখে পড়ার মতো।

অবশ্য রিপাবলিকান উগ্র জাতীয়তাবাদী ডোনাল্ড ট্রাম্প গদিনসীন হওয়ার পর থেকে বৈশি^ক উদারতাবাদ, ঐক্য এবং অন্তর্ভুক্তির সম্মিলিত যে অবয়ব তার ওপর আঘাত এসেছে- বিভক্তি-সংঘাত এবং জাতীয়তাবাদ প্রশ্রয় পাচ্ছে।

বাংলাদেশ মুসলিম প্রধান দেশ হলেও ইসলামি রাষ্ট্র নয়- উদারতাবাদের চর্চায় ঘাটতি তখনই প্রকট হয়ে ওঠে যখন সেক্যুলারখ্যাত রাজনৈতিক দলও ভোটের প্রলোভনে ধর্মীয় দলের সঙ্গে হাত মেলায়। বাংলাদেশের প্রধান দলগুলো এদিক দিয়ে সক্রিয়। সৌভাগ্য রাজনীতির হীনমানের ফাঁদে অর্থনীতি চাপা পড়ে থাকেনি। প্রয়োজন, উদ্যোগ পুঁজি ও শ্রম অতীতের খোয়াবমগ্ন অর্থহীন ও অবাস্তব প্রতিশ্রæতিজীবী রাজনীতিবিদদের হাতের ঘেরের বাইরে এসে অর্থনীতিতে বিকশিত হচ্ছে।

পৃথিবীর দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতিগুলোর অন্যতম প্রধান বাংলাদেশ। এমনকি অর্থনীতির আকারেও পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে যাবে পারচেজিং পাওয়ার ক্যাটাগরিতেও। এরপরও কি বলবেন, পাকিস্তান আমলেই ভালো ছিলেন? যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক রক্ষণশীল থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক হেরিটেজ ফাউন্ডেশন ২০১৮-এর ইকনিমক ফ্রিডম ইনডেক্স প্রকাশ করেছে। ১৮৬ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান অপরিবর্তিত (২৮তম) থাকলেও স্কোর বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫.১। সাম্প্রতিককালে বাণিজ্য স্বাধীনতা, শ্রমিক স্বাধীনতা, সম্পদ অধিকার- তিনটিতেই অবনতি লক্ষ করেছে হেরিটেজ বিশ্লেষকরা। তারপরও বাংলাদেশ, ভারত এবং অবশ্যই পাকিস্তানকে ডিঙিয়ে গেছে। ভারতের অবস্থান ৩০তম স্থানে, পাকিস্তান ৩১-এ। ইকনমিক ফ্রিডম পরিমাপে যে সব উপাদান বিশ্লেষণ করা হয় তার মধ্যে রয়েছে আইনের শাসন, সরকারের আকার, বিধিগত দক্ষতা, মুক্তবাজার, বাণিজ্য স্বাধীনতা, শ্রমিক স্বাধীনতা, সরকারের ন্যায়নিষ্ঠা ও বিচার বিভাগীয় দক্ষতা।

এই প্রতিবেদন কতগুলো জ্ঞাত উন্নয়ন অন্তরায় তুলে ধরেছে : রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, দুর্বল ও হীনমান অবকাঠামো, মজ্জাগত দুর্নীতি, অপর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ, আর্থিক সংস্কারে শ্লথগতি, সেইসঙ্গে ট্যারিফ ও নন-ট্যারিফ বাধা। অনস্বীকার্য সুশাসন প্রতিষ্ঠিত থাকলে বাংলাদেশের স্কোর অনেক বেড়ে যেত।

বিশ^ব্যাংক আইএমএফ এবং সিআইএ ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুক-এ বাংলাদেশ ও পাকিস্তান পাশাপাশি রেখে মেলালে পাকিস্তানপ্রিয় বাংলাদেশিদের মোহভঙ্গ হবে। প্রায় সব ধরনের সূচকে বাংলাদেশ পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে গেছে বেশক’টিতে ভারতকে।

গড় আয়ুতে বেশি, শিশুমৃত্যু রোধে এগিয়ে, নারী বিষয়ক অনেকগুলো উপ-সূচকে পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে। শিক্ষার বেশ ক’টি সূচকে বাংলাদেশ পাকিস্তানকে পেছনে ফেলেছে।

অবশ্য বাংলাদেশের শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে যে সব প্রশ্ন উঠেছে তার কোনোটিই অমূলক নয়। গণতন্ত্র বাংলাদেশে প্রোথিত হওয়ার কয়েকটি সুযোগ পেয়েছে, কিন্তু গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয়নি, পাকিস্তান সেনা নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। আপনি কি সত্যিই পাকিস্তান আমলে ভালো ছিলেন? কিংবা যারা পাকিস্তানে আছেন তারা বাংলাদেশিদের চেয়ে ভালো আছেন?

অর্থনীতির বিচারে মানব উন্নয়ন বিচারে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের বিচারে বাংলাদেশ অবশ্য পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে এবং যে ধারাটি বহমান- পাকিস্তান বিস্ময়ের সঙ্গে দেখবে বাংলাদেশের সঙ্গে এ দূরত্ব আরো বেড়ে যাচ্ছে। তারপরও যদি আগের কথায় ফিরে আসেন তাহলে ইসপের গল্পটাই মনে করিয়ে দেব ।

স্বাধীন নেকড়েকে যখন হৃষ্টপুষ্ট কুকুর বলল, চলো আমার মনিবের বাড়ি, ভালো খাবে-দাবে, রাতে পাহারা দেবে। তখনই রাজি নেকড়ে কুকুরের মনিবের বাড়ির কাছাকাছি এসে হঠাৎ দেখল কুকুরের গলায় কালো দাগ। এটা কি জানতে চাইলে কুকুর বলল, এমন কিছু নয়, গলায় শেকল দিয়ে আমাকে বেঁধে রাখে কি না- দাগটা শেকলেরই। নেকড়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়, বরং না খেয়ে থাকব কিন্তু স্বাধীনতা বিসর্জন দেব না।

এই নিবন্ধে স্বাধীনতার মূল্য আমলেই আনা হয়নি। কেবল অর্থনীতির টুকিটাকি হিসাবই বলে দেয় আপনি পাকিস্তান আমলের চেয়ে এবং হালের পাকিস্তানিদের চেয়ে অনেক বেশি ভালো আছেন, ভালো থাকবেন।

২৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj