এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নকে আরো তৎপর হতে হবে : নিরঞ্জন রায়

বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন যা সংক্ষেপে এসিইউ বা আকু নামে পরিচিত, সম্প্রতি একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে যেখানে জাপানি মুদ্রা ইয়েনকে আঞ্চলিক লেনদেন নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য মুদ্রা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। সিদ্ধান্তটি খুবই সময়োপযোগী এবং এটি আকুর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংঘটিত লেনদেন নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ভালো ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। ইতোপূর্বে শুধু ইউএস ডলার এবং ইউরো ছিল আকুর লেনদেন নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য মুদ্রা। বিগত কয়েক মাস ধরে ইউরোর মাধ্যমে লেনদেন নিষ্পত্তি স্থগিত থাকায় ইউএস ডলার ছিল একমাত্র লেনদেন নিষ্পত্তির মাধ্যম। এর ফলে আকুর আঞ্চলিক লেনদেন নিষ্পত্তিও অন্য আর দশটি সাধারণ আন্তর্জাতিক লেনদেনের মতো ইউএস ডলার নির্ভর হয়ে যায়। এহেন পরিস্থিতিতে জাপানি ইয়েনের অন্তর্ভুক্তি আকুর আঞ্চলিক লেনদেন নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে গতি আনবে বলেই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।

এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন বা আকু প্রাথমিকভাগে পাঁচটি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে যাত্রা শুরু করে ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বর মাসে।

ভারত, ইরান, নেপাল, পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কা হচ্ছে এই সংস্থার প্রাথমিক সদস্য। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার এই সংস্থায় যোগ দেয় যথাক্রমে ১৯৭৬ এবং ১৯৭৭ সালে। ভুটান এবং মালদ্বীপ যোগ দেয় ১৯৯৯ ও ২০১০ সালে। এই সংস্থা গঠনের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল এর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংঘটিত লেনদেনগুলো আঞ্চলিক ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করা এবং সেইসঙ্গে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক লেনদেন জোরদার করা এবং গতি আনা। এ ছাড়াও আকু গঠনের পেছনে অন্তর্নিহিত এক উদ্দেশ্য ছিল তা হচ্ছে আঞ্চলিক লেনদেনের ক্ষেত্রে কোনো একটি বৈদেশিক মুদ্রা বিশেষ করে ইউএস ডলারের ওপর নির্ভরশীলতা অনেকাংশে কমিয়ে আনা।

যাত্রার পর থেকে এই সংস্থাটি প্রায় চার দশকেরও অধিক সময় অতিবাহিত করলেও আকু তার উদ্দেশ্য পুরোপুরিভাবে অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে, এমন কথা বলা যাবে না। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আঞ্চলিক ক্ষেত্রে বাণিজ্য তথা আমদানি-রপ্তানির ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। কিন্তু সে তুলনায় আকুর মাধ্যমে আন্তঃআঞ্চলিক ভিত্তিতে লেনদেন নিষ্পত্তির মাত্রা বৃদ্ধি পায়নি। নব্বইয়ের দশকে আমরা যখন ব্যাংকে কর্মরত তখন আকুর মাধ্যমে আঞ্চলিক লেনদেন নিষ্পত্তি ছিল একটি নিয়মিত ঘটনা। আমাদের মধ্যে যারা বৈদেশিক বাণিজ্য শাখায় কাজ করত তাদের সবার কাছে আকুর মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানির অর্থ পরিশোধ ছিল খুবই একটি পরিচিত কাজ। এখন ব্যাংকাররা আর আগের মতো আকুর মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের কথা খুব একটা জানে না। এর কারণ আগের তুলনায় যে পরিমাণ আঞ্চলিক বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছে সে তুলনায় আকুর মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি। যেনতেন আকারের লেনদেনও, এমনকি পার্শ্ববর্তী দুটো দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে যে সামান্য মূল্যের আমদানি-রপ্তানি হয় সেখানেও রপ্তানিকারক ডলারে মূল্য পরিশোধের দাবি করে। এর মূল কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্য। এখন পর্যন্ত ইউএস ডলারই একমাত্র সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মুদ্রা হিসেবে স্বীকৃত। বিশ্বের আর কোনো মুদ্রাই ডলারের বিকল্প হিসেবে এখনো দাঁড়াতে পারেনি। তা ছাড়া আকুর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সরকারপ্রধান এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের স্ব স্ব দেশের ব্যবসায়ীদের মাঝে আকুর মাধ্যমে লেনদেন নিষ্পত্তির সুবিধা এবং গ্রহণযোগ্যতা তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রতিটা সদস্য দেশের ব্যবসায়ীদের মাঝে আকুর মাধ্যমে লেনদেন নিষ্পত্তির বিষয়টি জনপ্রিয় করে তুলতে আকু আদৌ সফল হয়নি। আকুর মাধ্যমে এবং ইউএস ডলারের মাধ্যমে লেনদেন নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে যে প্রকৃত কোনো ব্যাপক পার্থক্য নেই এবং এই ব্যবস্থা যে পারস্পরিক লেনদেন নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে শুধু কিছু ডলার ক্রয়-বিক্রয়ের বাড়তি ঝামেলা এড়ানো ছাড়া আর কিছুই নয়; সেটি আকুর সদস্য রাষ্ট্রগুলো এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের ব্যবসায়ীদের বোঝাতে সক্ষম হয়নি।

এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বর্তমান বিশ্ব বাণিজ্য এবং বিশ্ব অর্থনীতি যে পর্যায়ে উপনীত হয়েছে তাতে আন্তর্জাতিক বা বৈদেশিক বাণিজ্য ছাড়া কোনো দেশ বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে সমগ্র আন্তর্জাতিক বাণিজ্য যেন ইউএস ডলার কেন্দ্রিক হয়ে গেছে। যে কোনো বৈদেশিক লেনদেন এখন ডলার ব্যতীত অন্য কোনো মুদ্রায় কল্পনাই করা যায় না। এভাবে সমগ্র বিশ্ব বাণিজ্য শুধু নির্দিষ্ট একটি মুদ্রা, বিশেষ করে ইউএস ডলারের ওপর এভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়া মোটেই ভালো লক্ষণ নয়। এতে যে কোনো রাষ্ট্র বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান যে কোনো সময় সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে। এহেন পরিস্থিতিতে আঞ্চলিকভাবে লেনদেন নিষ্পত্তির ব্যবস্থার প্রবর্তন করা এবং তাকে জোরদার করা ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই।

এ ক্ষেত্রে আকু এক দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু সেটা তারা প্রত্যাশা অনুযায়ী করতে পারছে বলে প্রতীয়মান হয় না। অবশ্য এ ক্ষেত্রে শুধু আকুকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। বিগত পঞ্চাশ বছর ধরে অনেক আঞ্চলিক সংস্থা ও বিকল্প গ্রহণযোগ্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা সৃষ্টির প্রচেষ্টা কম হয়নি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সফলতা তেমন নেই বললেই চলে। এক সময় ইউরোপে আঞ্চলিক লেনদেন নিষ্পত্তির মাধ্যম হিসেবে একচেঞ্জ রেট মেকানিজম সংক্ষেপে ইআরএম চালু হয়েছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত টেকেনি এবং মুখ থুবড়ে পড়েছে। গঠিত হয়েছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন যার একক মুদ্রা হিসেবে চালু হয়েছিল ইউরো। মুদ্রাটি যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে বেশ জনপ্রিয়ও হয়ে উঠেছিল। এমনকি বলা যায় এই ইউরো ইউএস ডলারের বিকল্প মুদ্রা হিসেবে সবার কাছে ভালো গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। এখন এই ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং এর মুদ্রা ইউরো মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম। এক সময় বিরিকস (বিআরআইসিএস) অর্থাৎ ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চায়না এবং সাউথ আফ্রিকার সমন্বয়ে একটি সংস্থা গঠিত হয়েছিল। সেই সংস্থা বিশ্বব্যাংকের আদলে বিরিকস ব্যাংক নামে একটি ব্যাংকও প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু বর্তমানে এই সংস্থা এবং ব্যাংক উভয়ই শম্বুক গতিতে চলছে।

বর্তমানে যদিও আকুর সাফল্য তেমন প্রশংসনীয় নয়, তথাপিও আকু এখনো কার্যকর এবং আঞ্চলিক লেনদেন নিষ্পত্তিতে ভূমিকা রেখে চলেছে। তাদের তৎপরতা আরো জোরদার করতে হবে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আকুর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আন্তর্জাতিক লেনদেনের বড় একটি অংশ সংগঠিত হয় আকুর সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে, যা খুব সহজেই আঞ্চলিক লেনদেন নিষ্পত্তির মাধ্যমে মেটানো সম্ভব। আগেই উল্লেখ করেছি কোনো একটি বিশেষ মুদ্রার ওপর নির্ভর করে সমগ্র বৈদেশিক বাণিজ্য পরিচালনা করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট ঝুঁকি থাকে। ডলারের মূল্যমানের উত্থান-পতনের আর্থিক ঝুঁকি ছাড়াও রয়েছে কমপ্লায়েন্স লঙ্ঘনের মারাত্মক ঝুঁকি। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক আরোপিত বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গের মারাত্মক ঝুঁকি থাকে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে যে কোনো দেশ, ব্যক্তি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওপর যে কোনো সময় মার্কিন বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার খড়গ নেমে আসতে পারে। মার্কিন বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হয় ইউএস ডলারে সংঘটিত যে কোনো লেনদেনের ওপর। এ রকম মার্কিন বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা বলবৎ আছে আকুরই এক সদস্য রাষ্ট্রের ওপর। সেই রাষ্ট্রের সঙ্গে বিশ্বের কোনো দেশ বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানই ইউএস ডলারে কোনো রকম লেনদেন করতে পারে না। করলে লেনদেন সংশ্লিষ্ট দেশ বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান মার্কিন বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত হবে এবং এ জন্য চরম শাস্তি পেতে হবে। অতীতে এ রকম অভিযোগের কারণে বিশ্বের অনেক ক্ষমতাধর দেশের বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠানকেও অস্বাভাবিক আর্থিক মূল্যের জরিমানা গুণতে হয়েছে। যাই হোক মার্কিন বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপিত আকুর সেই সদস্য রাষ্ট্রটি দ্বিপাক্ষিক লেনদেনের মাধ্যমে এবং সংশ্লিষ্ট দেশ দুটোর নিজস্ব মুদ্রায় মূল্য পরিশোধ করে সেই নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে কোনো মতে টিকে আছে। আকুর মতো আঞ্চলিক লেনদেন নিষ্পত্তির ব্যবস্থা সক্রিয় থাকলে এবং একে জনপ্রিয় করে রাখতে পারলে এ ধরনের উটকো ঝামেলা খুব সহজেই মোকাবেলা করা সম্ভব হবে।

বর্তমানে দ্রুত অগ্রসরমান এবং জটিল বিশ্ববাণিজ্যের প্রেক্ষাপটে আকুর কর্মতৎপরতা আরো বেশি জোরদার করা প্রয়োজন। সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক লেনদেন নিষ্পত্তির বিষয়টি অধিক মাত্রায় জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য করে তোলার লক্ষ্যে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। আঞ্চলিক লেনদেন নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে তৃতীয় কোনো মুদ্রার ব্যবহারকে সম্পূর্ণরূপে পরিহার করতে হবে। আকুকে সত্যিকার অর্থে একটি আঞ্চলিক নিকাশ ঘর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে হবে। প্রয়োজনে সদস্য রাষ্ট্রের সংখ্যা আরো বাড়াতে হবে। তা ছাড়া প্রকৃত লেনদেন নিষ্পত্তি বা নেট সেটেলমেন্টের ক্ষেত্রে যাতে অন্য কোনো তৃতীয় মুদ্রা ব্যবহার করতে না হয় সেই প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।

সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত নিশ্চয়তাপত্র, গ্যারান্টি বা রাষ্ট্রীয় ঋণপত্র যাকে এক কথায় সার্বভৌম (সভারেন) বন্ড বলা হয়ে থাকে, সে সব ইনস্ট্রুমেন্ট আকুর প্রকৃত আঞ্চলিক লেনদেন নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এ ব্যাপারে আকুর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সরকারপ্রধান এবং স্ব স্ব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভালো ভূমিকা রাখার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তা না হলে আকু বা এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন একটি নাম-সর্বস্ব সংস্থা হিসেবেই টিকে থাকবে।

২৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj