আবাসযোগ্য পৃথিবী কত দূরে? : মেজর (অব.) সুধীর সাহা

বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

আমি, আপনি, অন্য দশজন ঠিক যেভাবে বিষয়টিকে নিতে পারব, হলফ করে বলতে পারি বিষয়টি তার চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং ভয়াবহ। একটি জাতি নয়, একটি দেশ নয়, একটি মহাদেশও নয়- পুরো দুনিয়াটাই জড়িত হয়ে আছে বিষয়টিতে। খুব সাদামাটাভাবে অনেকেই বলেন জলবায়ু সমস্যার কথা। জলবায়ু নিয়েই সারা বিশ্ব ভবিষ্যতে চরম সংকটের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যেতে পারে- আজকের বিজ্ঞান এটুকুই আগাম সূত্র দিচ্ছে। বিষয়টিকে বিজ্ঞানীরা ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ বলে আখ্যা দিয়েছে। এই গ্লোবাল ওয়ার্মিং যদি কাল সমুদ্র জলরাশিকে সমুদ্র সীমার ওপরে তুলে আনে, তবে মানুষ-জীবজন্তু আর গাছপালা তাদের ঠিকানা খুঁজতে ন্যূনতম মাটি খুঁজে না-ও পেতে পারে। আজ যে শিশু কিংবা যুবা আনন্দে খালি জায়গাটুকুতে পিকনিক করে বেড়াচ্ছে, তাদের জীবদ্দশাতেই সি-লেভেল বা সমুদ্র স্তর অতিক্রান্ত পানির গহŸরে পড়ে যেতে পারে সেই শুকনো জায়গাটুকু। সমুদ্রের গহŸরে লুকিয়ে যেতে পারে আজকের অধিকাংশ জনপদ।

শুধু এটুকুই নয়, বিলিয়ন মানুষের বসবাসের বড় অংশ যদি চলে যায় সমুদ্রগর্ভে, তাহলে জেগে থাকা অল্প জায়গাজুড়ে এত মানুষের ভর কেমন করে সইবে সেই সময়ের ছোট্ট ধরণী? এটুকুতেও শান্ত হবে না প্রকৃতি। বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠতে পারে জেগে থাকা অংশটিও। গরমে, ভয়াবহ গরমে টিকতে পারাটা সহ্যসীমার বাইরে চলে যেতে পারে। বিজ্ঞানীরা সেই ১৯৯৮ থেকে এই গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের বিষয়টি উপলব্ধি করেছে, সতর্ক করতে চেয়েছে বিশ্ববাসীকে বারবার। কিন্তু তাদের বাণীর স্রোত ছিল ধীরগতি। যথাযথভাবে তা পৌঁছেনি মানব সমাজের কাছে। হালকা করে দেখেছে সবাই। কিন্তু যখন আজ এসে দেখছে, ১৯৯৮ সাল থেকে আজকের দিন পর্যন্ত দ্বিগুণ হয়েছে গ্লোবাল ওয়ার্মিং, তখন হয়তো ভ্রƒ কুঁচকে তাকিয়েছে কেউ কেউ। এই সেদিন ২০১৭-এর মে মাসে অ্যান্টার্কটিকার ১১ মাইলব্যাপী একটি বরফখণ্ড মাত্র ৬ দিনে ভেঙে গেল, গলে গেল; ঠিক তখনই কোনো কোনো বিজ্ঞানীর চোখে বড় বড় চিন্তার রেখা দেখা দিয়ে গেল। আজ পর্যন্ত ওখানে কী হয়েছে জানি না। হয়তো আরো কয়েক মাইলজুড়ে বরফখণ্ড গলে গিয়ে সমুদ্রের পানির সঙ্গে মিশে জলবায়ু সংকটের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। একদিকে বরফ গলে সমুদ্রের জলসীমা বৃদ্ধি করছে, অন্যদিকে বরফ গলে যাওয়ায় ঠাণ্ডা প্রকৃতি তপ্ত প্রকৃতির বুকে চলে যাচ্ছে। একদিকে বরফ গলে সমুদ্রের জলরাশি বাড়াচ্ছে এবং নতুন নতুন ভূমি দখল করে নিচ্ছে, অন্যদিকে বরফের কমতি হওয়ায় আবহাওয়া গরম হয়ে যাচ্ছে। তৃতীয় সমস্যা শুরু হবে যখন সমুদ্র নতুন নতুন জনপদ দখল করে নেবে এবং আক্রান্ত জনপদ আশ্রয়ের স্বার্থে সমুদ্রে জেগে থাকা স্বল্প ভূমিতে স্থানান্তরিত হতে ছুটবে। অল্প পরিসরে বেশি মানুষের বাস- নানা সমস্যার সঙ্গে তপ্ত আবহাওয়াও উপহার দিতে ভুল করবে না তখন প্রকৃতি। জলবায়ু বিশেষজ্ঞ জেমস হানসেন এই ভবিষ্যৎ ভয়াবহতাকে নামকরণ করেছেন ‘সাইন্টিকি রেটিসেন্স’। তিনি ২০১৬ সালেই বলেছেন, ‘জলবায়ুর এই ভয়াবহতা কোনো সাধারণ ভয়ের বিষয় নয়, এটি নীরবে খেতে আসছে বিশ্ব জনপদকে।’

এই কঠিন বিষয়ে লিখতে বসেছি কেননা জলবায়ু সংকটের একটি বিশেষ স্থানে বসে আছে বাংলাদেশের নাম। যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামি এবং এশিয়ার বাংলাদেশের কথা ওঠে এসেছে অনেক বিজ্ঞানীদের মুখ থেকেই। অনেকেরই ধারণা, এখনো টিকে থাকা মায়ামি এবং বাংলাদেশ আগামী শতকে হারিয়ে যেতে পারে সমুদ্রগর্ভে। পুরোটা না হলেও বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকা এই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে অনেক বেশি। মাত্র এক শতকের ব্যবধানে অর্থাৎ মাত্র একশ বছর পরই ঘটে যেতে পারে এমন ভয়াবহ ঘটনাটি বাংলাদেশের বুকে। আমরা বর্তমান সময়ে বেঁচে থাকা মানুষ হয়তো ভুক্তভোগী হা না সরাসরিভাবে এই ভয়াবহ পরিক্রমায়। কিন্তু আগামী প্রজন্মে আসছে যে শিশুরা, সেই শিশুরা তাদের জীবদ্দশাতেই দেখে যেতে পারে বাংলাদেশের সেই ভয়াবহ রূপ। সমুদ্র গ্রাস করে নিতে পারে বাংলাদেশের অধিকাংশ আবাসস্থল। বিজ্ঞানীদের ধারণা, জলবায়ুর উষ্ণতা এভাবে চলতে থাকলে তা প্রতি দশ বছরে গড়ে ২ ডিগ্রি করে বৃদ্ধি পাবে।

জাতিসংঘের অধীনে জলবায়ুর পরিবর্তন নিয়ে মারাত্মক কিছু রিপোর্টিং হয়েছে ইতোমধ্যেই। সম্প্রতি একটি রিপোর্ট এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করেছে যে, আমরা পৃথিবীর মানুষ আজ যেভাবে আছি সেভাবেই যদি চলতে চাই তাহলে আগামী একশ বছরে উষ্ণতা ৪ ডিগ্রি পর্যন্ত বৃদ্ধি হতে পারে। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে- আজকের দিনে পৃথিবীর যেখানে যখন যে তাপমাত্রা বিরাজ করছে, একশ’ বছর পর সেখানে যোগ হবে আরো ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কেউ কেউ তো এই উষ্ণতা ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে গিয়ে ঠেকতে পারে বলে ধারণা দিয়েছে। আমরা ডাইনোসরের কথা জানি। ইতিহাস বলে, ২৫২ মিলিয়ন বছর পৃথিবী নামক গ্রহে উষ্ণতা বৃদ্ধি পেয়েছিল ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর ফলে পৃথিবীর ৯৭ ভাগ জীবন মৃত্যুবরণ করেছিল। বর্তমানে আমরা অধিক দ্রুত হারে কার্বন নিঃসরণ করছি। কারো কারো ধারণা, বর্তমান সময়ে শতকরা ১০ ভাগ অধিক হারে নিঃসরিত হচ্ছে কার্বন। তাই তো স্টিফেন হকিং, এল্টন মাস্কের মতো বিজ্ঞানীরা মঙ্গল গ্রহসহ অন্যান্য গ্রহে আগামী ৪০ থেকে ১০০ বছরের মধ্যে বিকল্প বসবাসের জায়গা খোঁজার পরামর্শ দিয়েছেন। এর বিরোধিতা করে অন্য একদল বিজ্ঞানী বলেছেন, এত ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এমিশন কমিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন করে এখনো বাঁচার পথ খোলা আছে বলে তারা মতামত দিয়েছেন। কিন্তু এই দুই দলের কাছ থেকে যে পরামর্শই আসুক না কেন, বিষয়টি যে গভীরভাবে চিন্তাযুক্ত তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।

তাপে মত্যুর খবর আমরা প্রায়ই শুনতে পাই। এল সালভাদরের আখ চাষিরা দু’শ বছর আগেও যেখানে শান্তিতে চাষাবাদ করত, এখন তাদের অনেকেই কিডনি সমস্যায় জর্জরিত। অতি তাপে তারা আর আখ চাষের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারছে না। বর্তমানে কোস্টারিকার জঙ্গলে কখনো কখনো ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রা দেখা দেয়। তখন জঙ্গলের ভেতরে কোনো জীবন্ত প্রাণী আর থাকতে পারে না। বাঁচার জন্য তাদের জঙ্গলের বাইরে চলে আসতে হয়। এক যুগ আগেও সেখানকার জঙ্গলের প্রাণীদের মধ্যে এমন অবস্থার কোনো চিহ্ন ছিল না। বর্তমান পৃথিবীতে অধিকাংশ অঞ্চলে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ওঠে ২৬ থেকে ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। প্রাণীদের সহ্য ক্ষমতার শেষ মাত্রা হতে পারে ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। প্রতিনিয়ত পৃথিবী গরম তাপমাত্রা বাড়িয়েই চলেছে। প্রতি ১০ বছরে তাপমাত্রা যদি ২ ডিগ্রি করে বাড়তে থাকে এবং পৃথিবীর মানুষ যদি ঘুরে না দাঁড়ায়, তবে তা যে একদিন ৩৫ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যাবে না সে কথা কি কেউ জোর দিয়ে বলতে পারবে? জলবায়ু গভীর সংকটের মধ্যে প্রাণীকে ফেলছে- তা বুঝে জলবায়ু রক্ষার কাজে নেমে পড়তে হবে আজ থেকেই। এমন সতর্কবাণী আসছে সব বিজ্ঞানীর কাছ থেকে। শুধু আজ নয়, এমন সতর্কবাণী আসছে গত এক দশক ধরেই। বাস্তব অর্থে ১৯৮০ সাল থেকেই পৃথিবী তপ্ত আবহাওয়া বাড়িয়ে চলেছে। পৃথিবীর অনেকাংশই তা টের পাচ্ছে। এমন কি ১৫০০ সালের পর থেকে প্রথমবারের মতো ২০০২ সাল থেকে পরপর পাঁচবার সর্বাপেক্ষা তপ্ত আবহাওয়া গ্রীষ্মকাল লাভ করেছে। প্যারিস সম্মেলনে বিশ্ব নেতারা ২ ডিগ্রি তপ্ততা বৃদ্ধি নিয়ে যে আশঙ্কা করেছিল তা যদি বজায় থাকে, তবে একদিন কলকাতা এবং করাচিতে গ্রীষ্মকালে প্রাণীর বসবাসের মতো সুস্থ আবহাওয়ার অভাব পড়বে। জলবায়ু বিজ্ঞানী জোশেফ বস উল্লেখ করেছেন, বর্তমানে বাহরাইনে যে তপ্ত বায়ু আছে তার সমমানের উষ্ণতা যদি নিউইয়র্কে হয়ে পড়ে তবে নিউইয়র্কে হিটস্ট্রোকে বহু মানুষের মৃত্যু ঘটবে। উল্টোটা একটু ভাবুন, নিউইয়র্কে যদি তাপ বৃদ্ধি পায় তবে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটবে অন্য পৃথিবীতে। আর তখন বাহরাইনের প্রাণী বাঁচার রাস্তা খুঁজবে কোথায়? দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এরা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে অসহ্য এবং বসবাসের অযোগ্য গরম আবহাওয়ার দিকে। এসব অঞ্চলের মানুষ হয়তো সাময়িকভাবে এয়ার কন্ডিশনের সাহায্য নিতে পারবে কিন্তু এই যন্ত্রের অধিক ব্যবহারের জন্য সেখানে বেড়ে যাবে কার্বন সমস্যা।

জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটে আর সঙ্গে সঙ্গে কৃষিকাজের পরিবর্তন ঘটে- এ কথা হাজার বছর ধরেই প্রমাণিত সত্য। তবে কৃষি খাতে ফলন হওয়ার উপযোগী আবহাওয়া উষ্ণতা নয় বরং শীতকাল। বলা হয়ে থাকে, এক ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে তা শতকরা ১০ ভাগ কৃষি উৎপাদনে ক্ষতি করবে। তাহলে ভাবুন, পৃথিবী যখন ৪ ডিগ্রি বা ৫ ডিগ্রি উষ্ণতা বাড়াবে তখন শতকরা ৫০ ভাগ ফলনই হারিয়ে যাবে পৃথিবীর বুকে। খরা আরো বড় সমস্যা হতে পারে, পৃথিবীর অনেক ফলনযোগ্য মাঠ হঠাৎ করেই মরুভূমিতে পরিণত হয়ে যেতে পারে। যদি এভাবেই আমরা চলি, তবে ২০৮০ সালের মধ্যে দক্ষিণ ইউরোপ স্থায়ী খরার কবলে পড়বে- এমনটাই আশঙ্কা কৃষি বিজ্ঞানীদের। এই স্থায়ী খরার কবল থেকে রক্ষা পাবে না ইরাক, সিরিয়াসহ অন্যান্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশ। এমনকি খরার কবলে পড়বে অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা এবং পৃথিবীর ‘ব্রেড বাস্কেট’ বলে পরিচিত চীন। ইতিহাস বলে, ১১০০ থেকে ১৩০০ সালের মধ্যে সিয়েরা, নেভাদা পর্বতমালার পূর্বের সব নদী শুকিয়ে গিয়ে চরম খরার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল পৃথিবীকে একবার, যার ফলশ্রæতি ছিল আনাসাজী সভ্যতার সমাপ্তি। আমরা জানি আর না জানি, বর্তমানে কয়েকটি দরিদ্র দেশ সুদান, সোমালিয়া, নাইজেরিয়া এবং ইয়েমেন খরার জগতে বসবাস করছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, দেশগুলোতে খাদ্যের অভাবে এ বছর ২০ মিলিয়ন মানুষ মারা যেতে পারে। উষ্ণতার কবলে পড়ে একদিকে সমস্ত পৃথিবীতেই খাদ্যের উৎপাদন হ্রাস পাবে, আর অন্যদিকে উষ্ণতার কারণে খরার কবলে পড়ে কোনো কোনো এলাকা খাদ্য উৎপাদনের শক্তি হারাবে। ফলে খাদ্য ঘাটতি পৃথিবীর জলবায়ু সংকটের বাই-প্রোডাক্ট হিসাবে আমাদেরকে খাদ্যহীন করার সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে।

ক্লাইমেট প্লেগ নিয়ে অনেকেরই ধারণা আছে। এই প্লেগ ছড়িয়ে গেলে পৃথিবীর প্রাণীক‚লের যে কতখানি ক্ষতি হয়, তার ধারণাও আমাদেরকে কখনো কখনো হয়েছে। আজ পৃথিবীতে প্রায়ই শোনা যায় নতুন নতুন ভাইরাস আমাদেরকে আক্রমণ করছে। প্লেগকে হটিয়ে রাখছে বরফ নামের তাপমাত্রার ভারসাম্য রক্ষাকারী মহাশক্তি। ফ্রোজেন আর আনফ্রোজেন নিয়ে কি কখনো ভেবেছেন? ফ্রোজেন করা খাবার যদি কিছুটা সময় আনফ্রোজেন করে রেখে দেন, তাহলে দেখতে পাবেন কীভাবে তা প্লেগ নামের মহা ভাইরাসের বীজ বপন করছে। পৃথিবীর তাবৎ বরফ সব সময়ের জন্য প্লেগকে ঠেকিয়ে রাখছে হাজার হাজার বছর ধরে। তাই প্রাণীক‚ল জানে না প্লেগের বিরুদ্ধে কীভাবে যুদ্ধ করবে। জানার প্রয়োজন হচ্ছে না, তাই তারা জানে না। তবে উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে যদি বরফ গলতে শুরু করে, তাহলে তো প্লেগ বেরিয়ে আসার সুযোগ পাবেই। মানুষের ইমুইন সিস্টেম এসব প্লেগ থেকে রক্ষা পাওয়ার পদ্ধতি জানে না। এ সমস্যা কিন্তু ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে। আলাস্কাতে আবিষ্কার হয়েছিল ‘রেমন্যান্ট ১৯১৮’ নামের এক প্লেগ ফ্লু, যা আক্রান্ত করেছিল ৫শ মিলিয়ন মানুষকে এবং এর ফলে মৃত্যু হয়েছিল ১শ মিলিয়ন মানুষের। আলাস্কার এ মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ছয় গুণ বেশি ছিল বিশ্বযুদ্ধে মৃত্যুর সংখ্যা থেকে। কাজেই বুঝতেই পারছেন, জলবায়ু সমস্যাটি কতখানি ভয়াবহ সমস্যা পৃথিবীর মানুষের জন্য। আর একটি বিশ্বযুদ্ধ ঠেকাতে মরিয়া সব পরাশক্তি। বিশ্বযুদ্ধ বেধে গেলে কীভাবে জয়ী হবে এমন প্রস্তুতিও পরাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে জাগরিত। কিন্তু আরো ভয়াবহ ক্ষতি বয়ে আনতে পারে যে জলবায়ু সমস্যা, তার দিকে খেয়াল দেয়ার অবকাশ নেই যেন কারো। অথবা বড় বড় দেশগুলো সম্ভবত ধরেই নিয়েছে যে, এ সমস্যার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা খুবই দুরূহ ব্যাপার হবে। তার চেয়ে বরং পৃথিবী ত্যাগ করে অন্য গ্রহে বসবাসের চিন্তা করার ও প্রস্তুতি গ্রহণের ব্যবস্থা নেয়া তাদের জন্য অনেক সহজ। এমনটাই হয়তো তারা মনে করছে। শুধু আলাস্কার ভাইরাস নয়, আমরা আরো কিছু ভাইরাসের কথা জানতে পেরেছি ইতোমধ্যে। প্রায় ৩২ হাজার বছরের পুরনো ব্যাকটেরিয়া ‘এক্সট্রি মোফাইল’ ২০০৫ সালে আবার পৃথিবীতে আবির্ভাব করেছিল; ৮ মিলিয়ন বছরের পুরনো ব্যাকটেরিয়া আবার প্রাণীকে আক্রমণ করেছিল ২০০৭ সালে; রাশিয়ার একজন বিজ্ঞানী ধারণা দিয়েছেন, পৃথিবীতে ৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন বছরের পুরনো একটি বাগ রাশিয়াতে ফিরে এসেছিল ইদানীংকালে। এসব ব্যাকটেরিয়া হয়তো হাজার হাজার বছর পর পৃথিবীতে মহামারী রূপে ফিরে আসছে। কিন্তু এরা পৃথিবীর বরফের কারণে ঠিক প্রাণিজগতের সেই ক্ষতি করতে পারছে না, যা পুরনো সময়ে তারা প্রাণীক‚লের ক্ষতি করতে পেরেছিল। তবে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে যখন বরফ গলতে শুরু করবে তখন এসব ব্যাকটেরিয়া আবার হয়তো জীবন্ত রূপে ফিরে এসে কোটি কোটি মানুষের ক্ষতি করার শক্তি সঞ্চয় করতে পারবে। আধুনিক দুনিয়ায় প্রাণীর জীবন্ত টিকে থাকার কৌশল অনেকটাই স্থায়ী। অন্তত প্রকৃতিগত দুর্যোগ থেকে বেঁচে যাওয়ার কৌশল মানুষ ইতোমধ্যেই আবিষ্কার করে নিয়েছে। কিন্তু যখন উষ্ণতা বৃদ্ধি পাবে তখন এই ভারসাম্যতার সীমা নষ্ট হয়ে পড়বে, মানুষের টিকে থাকার জীবনীশক্তি অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়বে। অন্যদিকে, উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে প্লেগ আবার নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করবে। যে বরফ তাদের এত বছর ধরে আটকে রেখেছিল, তা যখন গলে যাবে তখন প্লেগ বা বাগ বা ব্যাকটেরিয়া বাধা না পেয়ে প্রাণীক‚লের শরীরে আঘাত হানবে। সেই পুরনো দিনে, যখন প্লেগের আঘাতে ধ্বংস হয়ে যেত পুরো সভ্যতা, পুরো অঞ্চল- ঠিক যেন সেই ভয়াবহতার ইঙ্গিতই করছে আগামী প্রজন্মের জলবায়ু সমস্যা। উগান্ডার ‘জিকা ভাইরাস’ আমাদেরকে এমন কথাই মনে করিয়ে দেয়। পৃথিবীর বহু মানুষ এক সময় যে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে প্রাণ দিত, সেই ম্যালেরিয়া শুধু তপ্ত এলাকায় বসবাসই করে না বরং এক ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ম্যালেরিয়া শতকরা দশ ভাগ দ্রুত ছড়ায়। বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যে তাই ধারণা দিয়েই দিয়েছে যে, ২০৫০ সালে পৃথিবীর ৫ দশমিক ২ বিলিয়ন মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে।

ধারণা করা হচ্ছে, এ শতাব্দীর শেষ দিকে এসে দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা এবং প্যাসিফিক অঞ্চলে শীতকালের সবচেয়ে ঠাণ্ডা মাসের আবহাওয়া সেই দেশের বর্তমান সময়ের সবচেয়ে গরমকালের চেয়েও বেশি গরম হবে। ভাবতে পারেন, তাহলে সেখানে এ শতাব্দীর শেষ দিকে এসে গ্রীষ্মকালের তাপমাত্রা গিয়ে কোথায় দাঁড়াবে! প্রাণীর নিঃশ্বাস নিতে অক্সিজেন প্রয়োজন। কিন্তু শুধু অক্সিজেন নিয়েই প্রাণী নিঃশ্বাস নিতে পারে না। নিঃশ্বাস নিতে যা যা প্রয়োজন, অক্সিজেন তার একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। বাতাসে যেভাবে কার্বন ডাই-অক্সাইড বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে প্রাণীর শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়ার শক্তি ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। গরম বাতাস, উষ্ণতা সবই ওজোনের স্তরকে ভারী করছে। এ শতাব্দীর মধ্যেই আমেরিকানদের জন্য শতকরা ৭০ ভাগ অস্বাস্থ্যকর ওজোন সৃষ্টি হতে পারে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা অনুযায়ী ২০৯০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রায় দুই বিলিয়ন মানুষের জন্য অস্বাস্থ্যকর শ্বাস-প্রশ্বাসের আবহাওয়া বিরাজ করতে পারে।

বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী পৃথিবীতে বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার লোক প্রতিদিন মৃত্যুবরণ করে ‘ফোসিল-ফোয়েল বার্নিং’-এর কারণে। দাবানল বা জঙ্গলে আগুন থেকে উদ্ভূত ধোঁয়ার কারণে প্রতি বছর মারা যায় প্রায় ৩ লাখ ৩৯ হাজার মানুষ। জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে দাবানলের সংখ্যা, শক্তি সবই বৃদ্ধি পাচ্ছে ক্রমান্বয়ে। বলা হচ্ছে, দাবানল আজ পৃথিবীর যে ক্ষতি করছে ২০৫০ সালে ঠিক তার দ্বিগুণ করতে পারবে সেই সময়ের দাবানল। ইতোমধ্যেই আমরা জানি, গত ২০১০ সালে রেন ফরেস্ট অ্যামাজন শত বছরের সর্বাপেক্ষা বেশি খরার শিকার হয়েছিল। অ্যামাজন নামের এই জঙ্গলটিই পৃথিবীর প্রায় ২০ ভাগ অক্সিজেন সরবরাহ করে থাকে। অ্যামাজন যদি ভবিষ্যতে খরার কবলে পড়ে যায়, তবে ভেবে দেখুন আমাদেরকে বাঁচার জন্য যে অক্সিজেন লাগবে তার অবস্থাটা ঠিক কীরকম ভয়াবহ হতে পারে! শুধু কি তাই, পৃথিবীর পলিউশন বা দূষণ তো একটি হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে মানুষকে। ২০১৩ সালে আর্কটিক বরফ গলে গিয়ে পুরো এশিয়ার আবহাওয়ার ধরনটাই পরিবর্তন করে দিয়েছে। যার ফলে উত্তর চীনের পুরো অঞ্চলকেই ঢেকে দিয়েছে ঘন কুয়াশা। ফলে এ অঞ্চলে রেসপিরেটরি সমস্যা বেড়েই চলছে। এই বায়ু সমস্যাকেই চীনের প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ মৃত্যুর জন্য দায়ী করা হয়। এর ফল ভোগ করছে সিরিয়া, লেবাননসহ অনেক প্রতিবেশী দেশও।

প্লেগের কথা বাদ দিলে আমরা সম্ভবত বলতে পারি যে, গত ৫শ বছরের ইতিহাসে যেকোনো সময়ের মানুষ তার পিতা-পিতামহ কিংবা পূর্বপুরুষ থেকে আরো ভালোভাবে বসবাস করতে পারেনি। নতুন নতুন আবিষ্কার, আধুনিক জীবনের যাবতীয় উদ্ভাবন, তার ওপর জলবায়ু সমস্যা আমাদেরকে পূর্বপুরুষদের থেকে আরো নিরাপদ, আরো উন্নত, আরো স্বাস্থ্যসম্মত করতে পারেনি। চীনের বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ স্যাং এবং তার সতীর্থরা একটি চমৎকার অর্থনীতি ও গ্লোবাল উষ্ণতার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তারা বলেছেন, প্রতি ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে গড়ে শতকরা ১ দশমিক ২ ভাগ অর্থনীতির ক্ষতি সাধিত হয়। অর্থনীতির এই ক্ষতির সঙ্গে তারা মিলিয়ে নিয়েছেন কৃষি উৎপাদন, ক্রাইম, ঝড়, এনার্জি এবং লেবারকেও। এভাবেই তারা গ্লোবাল উষ্ণতার সঙ্গে অর্থনীতির সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন। গ্লোবাল উষ্ণতাকে স্পর্শ না করে বা পাশ কাটিয়ে অর্থনীতির উন্নয়ন করার চিন্তা করে প্রায় সবাই অসফল হয়েছে বলে মনে হয়। অ্যামিশনকে বাদ দিয়ে প্রবৃদ্ধি এবং কারিগরি উন্নয়নের কথা চিন্তা করার তত্ত্ব যেন ব্যবসা-বাণিজ্যে একবারেই অচল হিসেবে গণ্য হয়েছে যুগে যুগে।

একটি পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে, লন্ডন ও নিউইয়র্কের মধ্যে একটি রাউন্ড ট্রিপ ফ্লাইটের কারণে আর্কটিক বরফ গলতে পারে প্রায় তিন বর্গমিটার। এই বরফ গলা থেকে আধুনিক উন্নয়ন কিভাবে বেরিয়ে আসবে? তাই তো আধুনিক বিশ্বের অর্থনৈতিক উন্নয়ন আর আধুনিক পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি দুটো যেন হাত ধরাধরি করেই সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে উন্নয়ন আর ধ্বংস যেন হাত ধরাধরি করে আগামী শতকে আমাদেরকে নিপাতিত করছে। উন্নত দেশগুলো তাদের অর্থনৈতিক উন্নতির পথে ধাবমান হচ্ছে এবং আরো আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ করছে; পাশাপাশি ওই প্রযুক্তির সঙ্গে প্রবেশ করছে পরিবেশগত বিপর্যয়। উন্নতির বৃদ্ধি করছে দেশটি আর পরিবেশ অবনতির অভিশাপ বয়ে বেড়াচ্ছে পুরো পৃথিবী। উড়োজাহাজ, রকেট, আণবিক শক্তি সবকিছু হয়তো একটি দেশের উন্নয়নের মাপকাঠি নির্ধারণ করে দিচ্ছে। আবার অন্যদিকে এসব উন্নত যন্ত্রাদি চালাতে গিয়ে পরিবেশের ক্ষতি করছে ওইসব উন্নত দেশ। এতে উন্নত দেশ থেকে অনুন্নত অথবা উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষতি হচ্ছে বেশি। উন্নত দেশগুলো হয়তো পৃথিবী ছেড়ে একদিন অন্য গ্রহে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখতে পারবে। কিন্তু অনুন্নত যারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ওইসব স্বপ্নচারী উন্নত দেশের উন্নয়নের বাই-প্রোডাক্ট থেকে, তাদের ভবিষ্যৎ একেবারেই যেন অন্ধকার থেকে অন্ধকারাচ্ছন্ন হচ্ছে। ভূগর্ভস্থ তেল পেয়ে সৌদি আরবসহ অন্যান্য আরব বিশ্ব হয়তো ধনী দেশে রূপান্তরিত হয়েছে; আর সেই তেল পুড়িয়ে উন্নত দেশগুলো পৃথিবীকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অর্থনীতির চাকা ঘুরছে, মধ্যপ্রাচ্য সমৃদ্ধ হচ্ছে, উন্নত বিশ্ব আরো অর্থনৈতিক উন্নতির রাস্তা খুঁজে পাচ্ছে। কিন্তু এই পদ্ধতির উন্নতির ফাঁক গলে কখন যে পৃথিবীর ঘরে উষ্ণতার চাপ বেড়েছে তা যেন বুঝেও বুঝতে পারছে না উন্নত বিশ্ব।

ইতোমধ্যেই আমরা সমুদ্রের জলসীমাকে চার ফুট ওপরে উঠতে দেখেছি। জলরাশি সমুদ্র স্তরের ওপরে ওঠার অর্থ কী তা তো বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয় পৃথিবীর মানুষের। সেই সমুদ্রসীমার জলরাশি চার ফুট ওপরে ওঠে বসে আছে ইতোমধ্যেই। এ শতাব্দীর শেষ দিকে ১০ ফুট উচ্চতায় এ সীমা লঙ্ঘন হতে পারে। অর্থাৎ শতাব্দী শেষে সমুদ্র স্তর থেকে ১০ ফুট উচ্চতায় দেখা যেতে পারে সমুদ্রের জলরাশিকে। সমুদ্রের চারপাশে যেসব শহর আছে, যেসব আণবিক শক্তি কেন্দ্র আছে, যেসব বন্দর আছে, যেসব ফসলি জমি ও মাছ উৎপাদন কেন্দ্র আছে তাদের অবস্থা এই শতকের শেষ দিকে কী হতে পারে একবার ভেবে দেখুন। এমনকি যেসব স্থাপনা এবং যেসব মানুষ সমুদ্রসীমার ১০ ফুট ওপরে অবস্থান করছে তাদের মধ্যেও বন্যা লেগে থাকবে প্রতিনিয়ত যদি পানি একটু অশান্ত হয়ে ওঠে। আমরা জানি, বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় ৬শ মিলিয়ন মানুষ সমুদ্র স্তরের ১০ মিটারের মধ্যে বসবাস করে।

ভারতের ঔপন্যাসিক অমিতাভ ঘোষের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলতে ইচ্ছে করে- ‘পৃথিবীর এত বড় বিষয় জলবায়ু নিয়ে অধিক হারে নভেল, সাহিত্য লেখা হচ্ছে না কেন? কেন পৃথিবীর মানুষ আরো বেশি বেশি জলবায়ু নিয়ে রিপোর্ট পড়ছে না? কেন এ নিয়ে আরো বেশি বেশি হৈচৈ হচ্ছে না?’ আপনারা জানেন ক্যান্সার বর্তমান পৃথিবীর মানুষদের কত বড় শত্রু। নতুন নতুন ক্যান্সার আবির্ভূত হচ্ছে, আরো বেশি বেশি মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে, মৃত্যুবরণ করছে। শুনেছি ক্যান্সারের নাকি প্রতিষেধক মহৌষধও আবিষ্কার হয়ে গিয়েছে- ওটা টিকা, ইনজেকশনের মতো। একবার নিলেই নাকি আর ভয় নেই ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার। কিন্তু আবিষ্কৃত ওষুধটি বাজারে আসছে না। অনেকদিন ধরেই ওটা নাকি পরীক্ষাধীন আছে। ক্যান্সার অসুখটি ওষুধ বাণিজ্যে একটি বড় ধরনের ব্যবসার নাম। এই ক্যান্সারের নানাবিধ দামি দামি ওষুধ নিয়ে বসে আছে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। পৃথিবীর নামি দামি ওষুধ কোম্পানিগুলো নাকি ভয় পাচ্ছে যদি প্রতিরোধক টিকা বাজারে আসে, তবে তো লোকের ঘরে ক্যান্সার ঢুকতে পারবে না। তাহলে কী হবে এত এত ওষুধের, যা কাজে লাগে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পরের সময়ে। তাই প্রতিরোধক সহজ টিকা কিংবা মহৌষধটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার ইতিহাস পেরিয়ে উন্নত দেশের বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ছাড়পত্র পাচ্ছে না এখনো বাজারজাত হতে। এমনই হয়, সুবিধাবাদী মাফিয়া ব্যবসায়ী স্বার্থের কাছে হার মানতে হয় আবিষ্কারকদেরকে। এমনই অবস্থা যেন জলবায়ু সমস্যার ক্ষেত্রেও। তবে জলবায়ু সমস্যাকে হালকা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এটি এখন জীবন আর মরণের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। তাও আবার এ সমস্যাটি সারা মানব জাতির, পুরো পৃথিবীর। আস্তে আস্তে, একটু একটু করে পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি করে যাচ্ছে পৃথিবীরই উন্নত দেশগুলো। আর তার বাই-প্রোডাক্ট যে কতখানি ক্ষতি করার জন্য ধেয়ে আসছে তা যেন তারা দেখতে পাচ্ছে না। আসলে তারা তা না দেখার ভান করছে। প্রত্যেকেই ভাবছে, অন্যরা কেন বিষয়টি নিয়ে ভাবছে না; অন্যরা কেন পৃথিবী ধ্বংসের কারণ হিসেবে কাজ থেকে বিরত থাকছে না। তবে এটা নিশ্চিত যে, আর বেশিদিন এমন অন্ধ অন্ধ খেলা চলবে না। পৃথিবী বেশিদিন এমনটা সহ্য করবে না। মাত্র ৬ ডিগ্রি উষ্ণতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই পৃথিবীর চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে টাইফুন, টর্নেডো, হ্যারিকেন, বন্যা আর খরা। বিগত ইতিহাসেও এমন করেই ধ্বংস হয়েছিল বিভিন্ন সভ্যতা। বিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমরাও এক শতাব্দী পর এমন করে বর্তমান সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার একটি করুণ ইঙ্গিত লক্ষ করছি। আমেরিকা, রাশিয়া, চীন পৃথিবীর বাইরে অন্য গ্রহের সন্ধান চালাচ্ছে। মানুষ বসবাসের বিকল্প পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। কিন্তু আরো সহজ যে রাস্তা তাদের হাতে ছিল সেই জলবায়ু রক্ষা করার চেষ্টা তারা করছে না। অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার দাবানলে কেউ তার ভোগের পথ ছেড়ে আসতে পারছে না। পরিবেশকে রক্ষা করার স্বার্থে তার অর্থনৈতিক স্বার্থ বিসর্জন দিতে পারছে না। তাই তো উন্নত দেশগুলো জলবায়ু সমস্যা নিয়ে সোচ্চার হতে পারছে না। চুপ করে, অন্ধ হয়ে যেন সত্যকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা! কিন্তু তাতে কি শেষ রক্ষা হবে? জলবায়ু সমস্যা নিয়ে ‘দি আনইনহেবিটেবল আর্থ’ নিউইর্য়ক ম্যাগাজিনে প্রকাশ করেছিলেন ড্যাভিড ওয়েলেস-ওয়েলস ২০১৭-এর ১০ জুলাই। লেখাটি প্রথম পড়ে যেন কিছুই বুঝিনি এমন অবস্থা হয়েছিল আমার। একেবারে চুপ হয়ে গিয়েছিলাম। কী সাংঘাতিক বার্তা! তারপর এ নিয়ে যতই পড়েছি ততই শিউরে উঠেছি। জলবায়ু নিয়ে লেখালেখি তো আমেরিকা কিংবা অন্য কোনো উন্নত দেশেই প্রকাশিত হচ্ছে। তারপরও এই দেশগুলো চুপ কেন? কেউ কি কখনো যুক্তরাষ্ট্র কিংবা রাশিয়া কিংবা চীনের প্রেসিডেন্টের কোনো বক্তব্যে জলবায়ু নিয়ে বিশেষ উৎকণ্ঠার কোনো বিবৃতি লক্ষ করেছেন? আমি তো কখনো করিনি। এর কারণ দুটো। প্রথমত এ সমস্যাটি বর্তমানে কোনো রাষ্ট্রনায়ককেই আঘাত করবে না। কেননা এর প্রভাব দেখা দেবে আরো শত বছর পর। দ্বিতীয়ত এ সমস্যা সমাধানের সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত আছে। তেল উৎপাদন করবে না, তেল ব্যবহার করবে না, বিকল্প উপায় বের করবে- এমনটা হলে তো উন্নত দেশগুলো পথে বসবে। আজ যদি বলা হয় আণবিক বোমা তৈরি করা যাবে না, ব্যবহার করা যাবে না, আণবিক শক্তির বিকল্প খুঁজতে হবে- তবে তা সরাসরি সেসব উন্নত দেশের অর্থনীতিকে আঘাত করবে যারা এগুলো নিয়েই এত বড় হয়েছে। তাই তারা স্বীকারই করতে চাইবে না যে, তাদের আবিষ্কার এবং প্রযুক্তিগত ব্যবহার এসবই বৃদ্ধি করছে জলবায়ু সমস্যা।

পৃথিবীতে এক সময় শিল্প বিপ্লব ঘটেছিল। এর ফলে পৃথিবী উন্নত হয়েছিল। ধাপে ধাপে উন্নতির দিকে এগিয়ে গিয়েছিল পৃথিবী। বিশেষ করে পৃথিবীর কোনো কোনো দেশ। এই বিপ্লবের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সময় ছিল অষ্টাদশ শতাব্দী। কার্বন নিঃসরণের তখনই বুঝি শুরুর সময়। তখন তো সবকিছুই চলত ব্রিটিশ পদ্ধতিতে। ব্রিটিশ আজ যা করত, আগামীকাল অন্য দুনিয়াও তা করত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে কার্বন নিঃসরণের দামামা চারদিকে। ‘পার্ল হারবার’ পরিস্থিতি এক সময় পৃথিবীকে কার্বন প্রদানের পথকে প্রশস্ত করে দিয়েছিল। সেই যে শুরু, আর কেউ পিছনে তাকায়নি। বাতাসে কার্বনের আধিক্য বেড়েই চলেছে। আজ তো মহা প্রতিযোগিতা। কার রকেট কত আগে যাবে! পেছনে কার্বন যে খেলাই করুক, কে আর তা দেখতে যাচ্ছে? কার্বনকে বাগে নিয়ে এর খারাপ প্রভাবকে ঘুরিয়ে দিয়ে ভালো প্রভাবের কিছু করার কথা আর কেউ ভাবেনি পৃথিবীতে। তবে এ কথাও ঠিক, এই ভাবনাটা কিংবা ভাবনার কাজটা করা অত সহজ বিষয় ছিল না কখনো। ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের খেলা চলত তাতে। আর তা করেই যে নিশ্চিত ভালো ফল লাভ করা যাবে এমনও নিশ্চিত আভাস ছিল না কোনো। তাই সাহস করে নিজের অর্থনীতি জলাঞ্জলি দিয়ে কেউ এগিয়ে আসেনি এককভাবে কিংবা যৌথভাবে। জাতিসংঘ শুধু শুধু ভয়ঙ্কর রিপোর্টই তৈরি করে গিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সবগুলো উন্নত দেশকে এক সারিতে এনে সম্মিলিত বাজেটের মাধ্যমে পৃথিবী রক্ষার এ জলবায়ু সমস্যার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারেনি কখনো।

জিম হ্যানসেন নাসার প্রধান ছিলেন এক সময়। সরকারের চাকরি করেও সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিলেন জিম। একটাই কথা- আজকের শিশুকে বাঁচাতে হবে; কার্বন ধ্বংসের রাস্তা খুঁজতে হবে, উষ্ণতা কমানোর কৌশল বের করতে হবে। কিন্তু সবশেষে কিছুই হয়নি। বরং শেষ দিকে এসে জিম তার গবেষণায় ভেনাস নামক গ্রহে বসবাস করা যায় কিনা তেমনটা খুঁজে দেখেছেন। শুধু জিমই নন, ভিনগ্রহে প্রাণী বসবাসের সম্ভাব্যতা নিয়ে অনেক বিজ্ঞানীই কাজ করেছেন। তাই উন্নত দেশগুলো গোপনে গোপনে তেমন গবেষণায় কতদূর এগিয়েছে তা বলার উপায় নেই। যত জ্বালা আমাদের মতো গরিব দেশগুলোর। এ অঞ্চলের মানুষগুলো সমুদ্রে তলিয়ে যাক কিংবা আগুনের তাপেই পুড়ে যাক কে তার খোঁজ রাখবে। পৃথিবীর বড় বড় বিজ্ঞানীদের মধ্যে একটা বিশ্বাস কাজ করে যে, ইউনিভার্স অনেক বড়। তাদের মতে, পৃথিবীর যে কোনো সভ্যতার লাইফ টাইমের একটি সীমাবদ্ধতা আছে। এক সভ্যতা ধ্বংস হয়ে অন্য একটি সভ্যতা গোড়াপত্তন করে- এটাই ইউনিভার্সের খেলা। এক সময় ডাইনোসর ছিল, আজ মানুষ আছে। পরে হয়তো পৃথিবী ছেড়ে কিছু মানুষ অন্য রূপে অন্য কোনো গ্রহে প্রাণী হিসেবে বসবাস করে আর একটি সভ্যতার জন্ম দেবে। বিজ্ঞানী পিটার ওয়ার্ড তো বলেই দিয়েছেন যে, গ্রিন হাউজ গ্যাস থেকে এক সময় গড়ে উঠেছিল যে সভ্যতা, সেই সভ্যতা পরিবেশগত ফিল্টার দিয়ে এক সময় শেষও হয়ে যাবে। পৃথিবী কবে শেষ হবে তা হয়তো বিজ্ঞানীদের বলার উপায় নেই। তবে ধ্বংসলীলার বহিঃপ্রকাশ সুস্পষ্ট। উষ্ণতা বৃদ্ধি, সমুদ্রসীমার জলরাশির সীমালঙ্ঘন, মহামারী রূপে নতুন নতুন প্লেগ, ভাইরাস, টর্নেডো, জলোচ্ছ¡াস, বন্যা, দাবানল সবকিছুই যেন আগাম জানিয়ে দিচ্ছে আমাদেরকে- ধেয়ে আসছে সেই দিনটি, যেদিন আমরা পৃথিবীর প্রাণীরা ধ্বংস হয়ে যেতে পারি। পৃথিবীর উষ্ণতা কমিয়ে আনার চেষ্টা পৃথিবীর মানুষ অর্থনৈতিক কারণে করছে না। বড় বড় দেশগুলো কি নিশ্চিত হয়েছে এই ধ্বংস ফেরাবার নয়? তাই তারা এর পিছনে না ছুটে বিকল্প কিছু কি ভাবছে? মঙ্গল গ্রহ কিংবা অন্য কোনো গ্রহ কি তাদের হাতছানি দিচ্ছে ভবিষ্যতের সভ্যতা গড়ার? কে জানে, কোন উন্নত দেশ গোপনে সেই পথে কতদূর এগিয়ে যাচ্ছে। গোপনে গোপনে কে যে কতদূর এগিয়ে যাচ্ছে তা কেউ জানে না। জানার কথাও নয়। কেননা তা হয়ে থাকলে তা হবে ওই দেশের রাষ্ট্রীয় টপ সিক্রেট। তবে জলবায়ু সমস্যা কাটিয়ে ওঠার জন্য, পৃথিবীর উষ্ণতা কমানো কিংবা ঠেকিয়ে রাখার জন্য কোনো দেশই যে বিশেষ কাজ করছে না তা ইতোমধ্যে সবাই নিশ্চিত হয়েছে। তাই একশ’ বছরের মধ্যে মায়ামি আর বাংলাদেশ সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যেতে পারে তা বুঝতে পেরেও তারা রক্ষা করার কোনো পরিকল্পনা জানাচ্ছে না।

আজকের দিনের দেশটি কিংবা আজকের দিনের রাষ্ট্রপ্রধান তো কোনো না কোনোভাবেই এর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ক্ষতি হওয়ার দিন সামনে, অনেক সামনে- হয়তো শত শত বছর পর, হয়তো হাজার বছর পর। তবে নতুন করে যে বরফ গলে চলছে, সমুদ্রের জলসীমা যে দিনের পর দিন ওপরে লাফিয়ে যাচ্ছে, পৃথিবীর উষ্ণতা যে বৃদ্ধি পাচ্ছে, খরা-প্লাবন- বন্যা-টর্নের্ডো যে বেড়ে যাচ্ছে, হাজার হাজার বছরের পুরনো ভাইরাস যে প্রাণীর মধ্যে আবার নতুন করে আক্রমণ করছে- এসবের লক্ষণ কিন্তু সুস্পষ্ট। এগুলোকে অস্বীকার করার মতো কোনো সুযোগ নেই। পৃথিবীর মানুষের কাছে তাই দুই ধরনের উপায় আছে। হয় তারা প্রকৃতিগত এ সমস্যাকে মোকাবিলা করার প্রতিযোগিতায় নামবে, নয়তো সমস্যার কাছে পরাজিত হয়ে পৃথিবী ছেড়ে অন্য গ্রহের সন্ধান করবে নতুন সভ্যতা গড়ার। আজ যদি কেউ এমনটা চিন্তা না করে, প্রস্তুতি না নেয়- তাহলে আগামী শতাব্দীতে যখন বিপদ সত্যি সত্যি ঘাড়ে বসে যাবে, তখন মৃত্যু ছাড়া, ধ্বংস ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকবে না কারো হাতে।

জ্ঞানে, বিজ্ঞানে এবং বুদ্ধিমত্তায় বিংশ শতাব্দীর মানুষ অগ্রগণ্য। তাই তারা জলবায়ু সমস্যা সমাধানের পথে তাদের মেধা কাজে লাগাতে পারে। কে বলতে পারে, তাতে তারা সফল হবে না? সফল হোক না হোক, চেষ্টা তাদের করা উচিত। ভবিষ্যতের বিশ্বকে বাঁচাতে আজকে দিনের বিশ্বকে সমস্ত শক্তি উজার করে যদি জলবায়ু সমস্যার মোকাবিলায় এগিয়ে যেতে দেখা যেত, তবে আনন্দের সঙ্গে বলতে পারতাম- মানুষ শ্রেষ্ঠ জাতি। মানুষ বেঁচে থাকবে, টিকে থাকবে অনন্তকাল ধরে। কিন্তু এমনটা বলতে পারছি না। ক্ষুদ্র পরিসরে আমি যেটুকু পেরেছি, তাই করেছি। বিষয়টি নিয়ে পড়াশোনা করেছি এবং চিন্তা করার জায়গাগুলো সুনির্দিষ্ট করে বুঝতে চেষ্টা করেছি। আমার কাছে বেরিয়ে পড়া সত্যটি তাই অগণিত পাঠকের দৃষ্টিগোচরে আনার চেষ্টা করলাম।

২৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj