স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে বাংলাদেশ; বৈশ্বিক মডেল : ড. শাখাওয়াৎ নয়ন

বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

গত ২০-৩০ বছরে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে অবিশ্বাস্য ধরনের বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছে। অবিশ্বাস্য হলেও পরিবর্তনগুলো ইতিবাচক। শুধু ইতিবাচকই না, ইতোমধ্যে বাংলাদেশ এখন উন্নয়ন দেশগুলোর জন্য বৈশ্বিক মডেল। তাই প্রাসঙ্গিকভাবেই বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের বৈপ্লবিক উন্নতিগুলো এখন সারা পৃথিবীর স্বাস্থ্য বিজ্ঞানী, স্বাস্থ্য বিষয়ক নীতি নির্ধারক, স্বাস্থ্য বিষয়ক দাতা সংস্থাদের কাছে রীতিমতো ‘মীরাকেল’। ‘হাভার্ড’, ‘ক্যামব্রিজ’, ‘অক্সফোর্ড’, ‘লন্ডন স্কুল অফ হাইজিন এন্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন’, ‘জন হফকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়’, ‘ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ সিঙ্গাপুর’সহ বর্তমান পৃথিবীর এমন কোনো নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় নেই, যেখানে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের জাদুকরী উন্নতির মডেলগুলো পড়ানো হচ্ছে না। উল্লেখ্য, ‘লন্ডন স্কুল অফ হাইজিন এন্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন’, ‘জন হফকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়’, ‘হাভার্ড স্কুল অফ পাবলিক হেলথ’, ‘আইসিডিডিআরবি’ এবং ‘ব্র্যাক’ বাংলাদেশে অনেকগুলো বড় বড় আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা পরিচালনা করেছে এবং করছে। উক্ত গবেষণার ফলাফলসমূহ পৃথিবীর সবচাইতে নামি-দামি জার্নাল ‘ন্যাচার’, ‘নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিন’ এবং ‘ল্যাঞ্চেট’ এ প্রকাশিত হয়েছে। একই সঙ্গে ‘পেঙ্গুইন’, ‘থমসন’সহ পৃথিবীখ্যাত বড় বড় প্রকাশকরা বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের সফলতার গল্প নিয়ে বই প্রকাশ করেছে। এবার আসুন আমরা দেখি, বাংলাদেশের প্রধান প্রধান অর্জনসমূহ কি কি? আমাদের অর্জনগুলো পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনামূলকভাবে দেখা যাক :

এক. ১৯৮০ সালে বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ মায়ের মধ্যে ৭৬৯ জন মা সন্তান জন্মদান করতে গিয়ে মারা যেতেন; ২০১৫ সালে তা কমে ১৩৮ জনে দাঁড়িয়েছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে এই সংখ্যা ১৭৪ জন, পাকিস্তানে ১৭৮ জন এবং নেপালে ২৫৮ জন।

দুই. আপনি নিশ্চয়ই জানেন, বাংলাদেশের গড় আয়ু কত? ১৯৮০ সালে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ছিল ৫৪ বছর। ২০১৫ সালে এসে তা বেড়ে এখন ৭১ বছর হয়েছে; এটাও অবিশ্বাস্য, তাই না? বর্তমানে ভারতের মানুষের গড় আয়ু ৬৬.৪০ বছর, পাকিস্তানে ৬৫.৫৮ বছর এবং নেপালে ৬৮ বছর।

তিন. বাংলাদেশে বর্তমানে শিশু মৃত্যু হার প্রতি হাজারে ৩৬ জন, ১৯৮০ সালে বাংলাদেশে শিশু মৃত্যুর হার ছিল ১৪৯ জন। বর্তমানে ভারতে শিশু মৃত্যু হার প্রতি হাজারে ৪৩ জন, পাকিস্তানে ৫৭ জন, নেপালে ৪০ জন এবং মিয়ানমারে ৪৫ জন।

চার. পরিবার-পরিকল্পনা তথা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে উদাহরণ; ১৯৮০ সালে বাংলাদেশে সন্তান জন্মদানে সক্ষম প্রতি নারী গড়ে ৭ জন সন্তান জন্মদান করতেন; আর ২০১৫ সালের গবেষণা তথ্যানুযায়ী সেই সংখ্যা কমে এসে দাঁড়িয়েছে ২ জনে। ভারতে এবং পাকিস্তানে এই সংখ্যা ৩ জন। ১৯৮০ সালে বাংলাদেশে জন্ম নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণকারীর হার ছিল শতকরা মাত্র ১০ জন আর এখন সেটা শতকরা ৬১ জন।

পাঁচ. বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি (৬টি রোগের টিকা : য²া, পোলিও, ডিপথেরিয়া, ধনুষ্টংকার, হুপিং কাশি, হাম) জাতিসংঘ কর্তৃক পুরস্কৃত হয়েছে। এশিয়া, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকায় এখনো অনেক দেশ টিকাদান কর্মসূচিতে বাংলাদেশের মতো সফলতা পায়নি। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ এখন পোলিওমুক্ত দেশ।

ছয়. পুষ্টিহীনতা দূরীকরণে ভিটামিন এ ক্যাপসুল বিতরণ প্রকল্পের সফলতা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।

সাত. বাংলাদেশের আইসিডিডিআরবি কর্তৃক ডায়রিয়া এবং কলেরার প্রতিষেধক (খাবার স্যালাইন) আবিষ্কার; ব্র্যাক কর্তৃক সারা বাংলাদেশে খাবার স্যালাইন বানানো প্রশিক্ষণ এবং সচেতনতা বৃদ্ধি পৃথিবীর ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী জীবন রক্ষাকারী ঘটনা। এই মহাষৌধ পৃথিবীব্যাপী প্রতি দিন লাখ কোটি মানুষের জীবন রক্ষা করছে।

আট. বাংলাদেশের মা ও শিশুদের স্বাস্থ্য বিষয়ক সেবাদানকারী ‘কমিউনিটি ক্লিনিক মডেল/সবুজ ছাতা প্রকল্প’ এখন এশিয়া, আফ্রিকার অনেক দেশে অনুসরণ করা হচ্ছে।

নয়. বাংলাদেশের ‘য²া রোগ নিয়ন্ত্রণ ও নিরাময়ক মডেল’ সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকাতে এইডস এবং এইচআইভি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োগ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, য²ার সঙ্গে এইডস সম্পর্ক আছে।

দশ. ২০১৫ সালের আগেই বাংলাদেশ তার সহ¯্রাব্দের লক্ষ্যমাত্রা (মিলিনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলস) অর্জনকারী দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে নন্দিত হয়েছে।

এই যে এত এত সাফল্য, এসবের কোনোটাই কিন্তু খুব সহজ কোনো কাজ ছিল না। কারণ বাংলাদেশ কোনো স্বল্প সংখ্যক জনসংখ্যার ধনী দেশ নয়। বরং সম্পদের সীমাবদ্ধতাসহ ঘন বসতিপূর্ণ বিপুল জনসংখ্যার একটি দেশ। জনসংখ্যার দিক থেকে পৃথিবীতে ৮ম। সুতরাং এমন একটি দেশে এত বড় বড় সাফল্য অর্জন কোনো বিচারেই সহজ সাধ্য ছিল না। অথচ বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় অনেকগুলো সূচকে তার প্রতিবেশীদের চেয়ে অনেক এগিয়ে। বাংলাদেশের সমান কিংবা কাছাকাছি পরিমাণ মাথাপিছু আয়ের দেশগুলোর তুলনায়, স্বাস্থ্যখাতে বাংলাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা বিস্ময়ের সঙ্গে প্রশ্ন তুলছেন : রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জনসংখ্যার ভারে নুয়ে পড়া একটি স্বল্প উন্নত কিংবা নি¤œ মধ্যম আয়ের দেশ কীভাবে এত সব মীরাকেল সম্পাদিত করল? তাই এখন বড় বড় জনস্বাস্থ্য বিজ্ঞানী, একাডেমিক, অর্থনীতিবিদ, স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের কাছে বাংলাদেশ একটি সফলতম উদাহরণ।

বাংলাদেশের সাফল্যের রহস্য সম্পর্কে এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে গবেষকরা প্রধানত চারটি বিষয়কে চিহ্নিত করেছেন :

এক. জাতীয়তাবাধ কিংবা জাতীয় ঐক্য :

মহান স্বাধীনতার লক্ষ্যে গড়ে তোলা জাতিসত্তা তথা জাতীয় ঐক্য এবং মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন, বাংলাদেশের মানুষের চেতনায় যে কোনো কিছু অর্জনের ক্ষেত্রে এক ধরনের অদম্য সাহস সঞ্চার করেছে। যা পরবর্তী সময়ে দারিদ্র্য দূরীকরণ, নারীর ক্ষমতায়ন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা এবং নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। এক কথায় মুক্তিযুদ্ধে অর্জনের মধ্য দিয়ে আমাদের সামাজিক এবং মনস্তাত্তি¡ক জগতে এক ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। এই ইতিবাচক পরিবর্তনের মূলমন্ত্রকেই বাংলাদেশের রেনেসাঁ বলে আখ্যায়িত করেছে বিশ্বখ্যাত বৈজ্ঞানিক জার্নাল ‘ল্যাঞ্চেট’। উক্ত রেনেসাঁই বাংলাদেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, অর্থনীতি এবং উন্নয়নকে ব্যাপকভাবে সামনের দিকে চালিত করেছে। সুনির্দিষ্টভাবে বলা যেতে পারে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে সফলতা এসেছে মূলত বহুমুখী এবং অংশীদারিত্বমূলক প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ; সরকার এবং জনগণের ইতিবাচক মানসিকতা এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের ফলে একই সঙ্গে সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং এনজিওরা একযোগে কাজ করতে পেরেছে; ফুলে-ফলে বাংলাদেশ আজ পৃথিবীর কাছে ‘মীরাকেল’।

দুই. গবেষণা এবং কর্মসূচি বাস্তবায়ন :

আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআরবির গবেষণা এবং ডায়রিয়া ও কলেরার মতো মহামারি রোগের প্রতিষেধক আবিষ্কার, ব্র্যাক, প্রশিকাসহ অন্যান্য এনজিওদের স্বাস্থ্য বিষয়ক কর্মসূচি, বাংলাদেশ সরকারের পরিবার-পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সাফল্য, ছয়টি প্রাণঘাতী মহামারী রোগের (য²া, পোলিও, ডিপথেরিয়া, ধনুষ্টংকার, হুপিং কাশি, হাম) প্রতিরোধে সফল টিকাদান কর্মসূচি, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিসহ সব ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে।

তিন. ন্যায্যতা :

উন্নয়ন পরিকল্পনায় ক্ষুদ্রঋণ প্রদানে দরিদ্রবান্ধব এবং শিক্ষা খাতে নারীসহায়ক কর্মসূচিসমূহ বাংলাদেশের পিছিয়েপড়া বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য দূরীকরণে যেমন যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছে; অন্যদিকে নারীর ক্ষমতায়নেও অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। যেহেতু একটি দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী এবং নারীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে অধিক সংখ্যক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে থাকে, সেহেতু এই দুই জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিক্ষার মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ক্ষমতায়িত করার ফলে তাদের স্বাস্থ্য খাতের বৈপ্লবিক উন্নতি সাধিত হয়েছে।

চার. আন্তর্জাতিক সহযোগিতা :

আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাসমূহের সহযোগিতা বাংলাদেশের যে কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের অন্যতম জ্বালানি। বাংলাদেশের প্রায় সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডই এক বা একাধিক সহযোগী কিংবা দাতা সংস্থার বুদ্ধিবৃত্তিক এবং অর্থনৈতিক সাহায্য-সহযোগিতার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা কখনো কখনো সামগ্রিক উন্নয়নের গতিকে শ্লথ করেছে বটে কিন্তু একেবারে থামাতে পারেনি। প্রসঙ্গত, বলা যেতে পারে, বাংলাদেশের মতো এমন একটি স্বল্প উন্নত দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ব্যতিক্রম কিছু নয়; এরকম অনেক দেশেই এসব ঘটে থাকে। কিন্তু ওইসব দেশে বাংলাদেশের মতো শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়নি। আপনারা জেনে হয়তো আনন্দিত হবেন, আজকাল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ, আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং দাতা সংস্থাসমূহ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বাংলাদেশের কাছ থেকে শিক্ষা নিতে পরামর্শ দিচ্ছে। এমন আনন্দের খবরে একজন বাংলাদেশি হিসেবে গৌরবে বুকটা অনেকখানি চওড়া না হয়ে পারে?

২৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj