সাংবাদিকতা নিয়ে ভাবনা >> পুরাকাল থেকে একাল : কামাল লোহানী

বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

একটি পত্রিকা অর্থাৎ সংবাদপত্র জন্ম নেয় প্রবল উৎসাহ নিয়ে। স্বত্বাধিকারীর মনোবাসনা থাকে দেশসেবার। মনে মনে ভাবেন, এই কাজটি করে তিনি বা তারা জনকল্যাণে নিজেদের নিবেদন করলেন। মনের কোণে গোপনে ব্যবসায়ে লাভবান হওয়ার ইচ্ছেটাও নিশ্চয়ই পোষণ করেন। না হলে পুঁজি খাটাবেন কেন? পত্রিকাটা ভালোভাবে চলুক, এটা তাদের আশা থাকে এবং সেই কথা মনে রেখে উদ্যোক্তারা সম্পাদক এবং তার সহযোগীদের বাছাই করে নেন। অবশ্যই নিজেদের মন-মানসিকতার মতো লোকবল সৃষ্টি করেন। সম্পাদকীয়, বার্তা, রিপোর্টিং, সংশোধনী, বিজ্ঞাপন, সার্কুলেশন, হিসাব রক্ষণ বিভাগের কাজের লোক বাছাই করে সংবাদপত্রটাকে আকর্ষণীয় করে সাজান, যেন তার বা তাদের পত্রিকা বাজারে পাঠকসমাজের নজর কাড়ে এবং বিক্রি হয়, পত্রিকা চেহারায় সুন্দর হোক, তার জন্য ফটোগ্রাফার নিয়োগ দেন। আবার এক বা একাধিক শিল্পীকে চাকরি দেন যারা সে পত্রিকার প্রকাশনা ও প্রকাশনায় সংকলিত লেখাগুলোর অলংকরণ করে পত্রিকাকে দৃষ্টিনন্দন করতে পারেন। পিওন, দারোয়ান থাকেন ফুট-ফরমায়েশ খাটা আর নিরাপত্তা প্রহরার জন্য। নিজেদের ছাপাখানা বসাতে হয়, যথাসময়ে প্রকাশনার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার জন্য। ফলে মুদ্রণে কারো নির্ভর করতে হয় না। কাগজ প্রকাশ করলে বাজারজাতকরণের জন্য হকার প্রয়োজন। আমাদের দেশেও বিলিবণ্টন ব্যবস্থায় নিজেরা প্রাথমিক দায়িত্বটা পালন করেন বটে কিন্তু সর্বত্র পাঠকের হাতে তুলে দেয়ার জন্য এখনো হকারদের ওপর নির্ভর করতে হয়। হকার ইচ্ছে করলে একটি কাগজকে তুলতে, আবার ডোবাতে পারেন। এদের কাছে কাগজ বিলি কিংবা পৌঁছে দেয়ার জন্য দপ্তরি রয়েছেন, যারা প্রিন্টিং মেশিন থেকে কাগজগুলো সংগ্রহ করে ভিন্ন ভিন্ন প্যাকেট করে রেল, বাস, স্টিমারে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে ছোটাছুটি করেন। পাঠকের হাতে পত্রিকা পৌঁছলে যদি পাঠক পছন্দ করেন, তবেই সবার পরিশ্রম সার্থক হয় এবং মালিকও লাভের মুখ দেখে তৃপ্তি লাভ করেন।

পত্রিকা প্রকাশনা একটি স্বচ্ছ, ধারাবাহিক কর্মযজ্ঞের ফসল। পুঁজি না খাটালে কাগজ তো প্রকাশই হবেই না, কিন্তু প্রকাশ করতে হলে উপরে বর্ণিত ব্যবস্থা ও লোকবল অবশ্যই থাকতে হবে। তাছাড়া যদি ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে না হয় তবে ভেতর-বাইরে কাগজ চালানো কঠিন হয়ে যাবে। শুষ্ঠু পরিবেশন ও ব্যবস্থাপনা না থাকলে সংবাদপত্র খ্যাতিমান হতে সহায়ক হয় না।

এই যে উপরি কাঠামোর কথা বললাম এতক্ষণ, তার সবকিছুই ঠিকঠাক থাকলেও যদি সাংবাদিকদের বহর না থাকে তবে কিন্তু সংবাদপত্র প্রকাশ করা যায় না, যাবেও না। কারণ সম্পাদকীয় বিভাগে সহকারী না থাকলে প্রতিদিনকার লেখালেখি সম্ভব হবে না, তবে আজকাল তো বাইরের লেখা নিয়ে পাতাটাকে সাজানো হয়। বার্তা বিভাগের দিকে যদি তাকাই, তাহলে দেখব সহসম্পাদক আছেন তবে আমাদের সময়ে যেমন টেবিল ভর্তি তিন তিনটি শিফটে ওরা কাজ করতেন নির্দিষ্ট পৃষ্ঠাগুলো ভরাতে, আজ এত ব্যাপকতা হয়তো নেই। কিন্তু রিপোর্টারদের কাজের বহর বেড়ে গেছে, শুধু কি তাই? তাদের কাজে অর্থাৎ রিপোর্ট সংগ্রহে যে ঝুঁকি বেড়েছে সার্বক্ষণিক, তা কিন্তু আগের জমানায় ছিল না। ভাবুন তো রাজনীতি আর রাষ্ট্র ব্যবস্থা কেমন কঠিন হয়ে গেছে, ফলে যে কোনো সাংবাদিককেই নানা বিপন্নতার শিকার হতে হয়, হচ্ছে। তবে রিপোর্টারদের দক্ষতা বেড়েছে বিপুলভাবে। আজ তারা সাংবাদিক হিসেবে অনেক বেশি অভিজ্ঞতা ও ঝুঁকি সমঝে চলতে শিখছেন, তবু তাদের বেঘোরে প্রাণ দিতে হয়। আগে এমনটি ছিল না। ফটোগ্রাফারকেও জানের মায়ার কথা ভেবে ক্যামেরা বন্ধ রেখে চলাফেরা করলে চলবে না। যত বিপদই আসুক না কেন, তাকে ছবি নিতেই হবে। না হলে আবার অন্য পত্রিকার কাছে মার খেতে হবে। অফিসে কৈফিয়তও দিতে হবে। এ পেশায় এখন আনন্দও আছে। একজন ফটোগ্রাফার ক’টি শট নেবেন, তা নিয়ে এখন কোনো চিন্তা করতে হয় না। চাইলেই একটার পর একটা ছবি তুলতে পারেন। যা আগে সম্ভব ছিল না। ফিল্মের রোলের ওপর নির্ভর করে একটা কিংবা দুটো শট নিতে হত। ছবি সুন্দর হবে ভেবে যখন তারা একাধিক শট নিতেন তখন কিন্তু জবাবদিহি করতে হতো, কেন এত ফিল্ম নষ্ট করলেন? প্রযুক্তিগত উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে মুদ্রণ ব্যবস্থা বিকশিত হয়েছে। ট্রেডেল মেশিন থেকে অফসেট, রোটারি এমনকি মাল্টি কালারে ছাপার সুযোগ হয়ে গেছে। এই যে অভূতপূর্ব প্রগতি মুদ্রণশিল্পকে ক্রমশ সমৃদ্ধ করেছে, তাতে সংবাদপত্র প্রকাশনা এবং সাংবাদিকতার দক্ষতাও বেড়েছে ক্রমাগত।

বিজ্ঞাপনের অগ্রগতির কারণে আজ আমরাও এর ফল লাভ করেছি বলেই সংবাদপত্র শিল্প অগ্রসর হয়েছে দ্রুত এবং এর সাজসজ্জা ও রংচং বেড়েছে বেধড়ক। ছাপাখানার এই উন্নতি, মুদ্রণ ও কম্পোজ পদ্ধতির ক্রমবিকাশ সংবাদপত্রকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে এবং বিজ্ঞাপনদাতাদের আগ্রহ বেড়েছে বটে, কিন্তু বিজ্ঞাপনের দৌরাত্ম্যের কাছে পত্রিকা কর্তৃপক্ষ ক্রমশ ‘আত্মসমর্পণ’-ই করেছে। বিজ্ঞাপনদাতারা যেমন খুশি তেমনি আকারে, স্থানে পণ্যের বিজ্ঞাপন দিতে শুরু করেছেন আর সংবাদপত্র তার মৌলিক উপাদান ছেড়ে লভ্যাংশ বা অর্থ সমাগমের দিকটাতেই নজর দিয়েছে বেশি। ফলে অনেক সময় পত্রিকা ‘বিরক্তিকর’ প্রচলিত রীতিবিরুদ্ধও মনে হয়েছে। বিজ্ঞাপনের দৌরাত্ম্যে দুয়েকটি সংবাদপত্র তাদের প্রথম পৃষ্ঠাকে ঢেকে বিজ্ঞাপনের প্রাধান্য দিয়ে নতুন বা বাড়তি প্রথম পৃষ্ঠা সৃষ্টি করছে এবং ‘পৃষ্ঠা ওল্টালেই প্রথম পাতা’ লিখে পাঠককে নামমাত্র কৈফিয়ত দিচ্ছেন। বিজ্ঞাপন ছাড়া সংবাদপত্রের অর্থ সমাগম হবে না, এটা নিশ্চিত কিন্তু তাই বলে পত্রিকার নির্ধারিত প্রচলিত মূল্যবোধকে হত্যা করে কেন? আবার বিজ্ঞাপন পয়সার শক্তিতে পত্রিকার যে কোনো স্থানে যে কোনো আকারে স্থান পেয়ে যায়, এটা কি সংবাদপত্রের নৈতিকতাবিরোধী নয়? এই প্রবণতা বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রের মধ্যেই দেখা যায়।

আমার ধারণা সংবাদপত্র যদি কেউ প্রকাশ করতে চান, তাকে পুঁজি নিয়োগের আগে অর্থকরী দিকটা ভেবে এগুনো উচিত। কারণ সংবাদপত্রকে কেবলমাত্র লাভ গোনার হাতিয়ার মনে করাটা ঠিক নয়, সেইসঙ্গে পাঠকসেবা, সমাজ উন্নয়ন, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংবাদ, সমালোচনা পরামর্শমূলক রচনা প্রকাশ করে রাষ্ট্র ও সরকারকে মানুষের কল্যাণে ব্রতী হতে সাহায্য করা উচিত। খেয়াল রাখতে হবে, এমন কাজ করতে গিয়ে পত্রিকা আবার যেন ‘অগ্রহণযোগ্য’ না হয়ে যায়।

সাংবাদিক তথা সংবাদপত্রসেবী সবারই মনে রাখা উচিত তারা চাকরি করছেন বটে তা সত্ত্বেও তাদের তৎপরতা কিন্তু দেশকে প্রগতির পথে এগিয়ে যেতেও যথেষ্ট পরিমাণ সহযোগিতা করছে। সংবাদপত্রের ভাষা সহজ সরল হওয়া খুব প্রয়োজন কারণ এটি স্বল্পশিক্ষিত জনগোষ্ঠীও পড়ে থাকেন। ভাষা যেন পাঠকের বোধগম্য হয়, সংবাদ রচনা কিংবা নিবন্ধ নির্মাণে, বাক্য বিন্যাস ও শব্দ প্রয়োগে সতর্ক থাকা উচিত। এটাও মনে রাখা প্রয়োজন, এই পত্রিকাটি পড়তে না পারলেও পত্রিকায় লেখা সংবাদ শুনবেন অশিক্ষিত মানুষও। আগের কালে সংবাদপত্রের উপসম্পাদকীয় রচনা করতেন চাকরিতে থাকা সহকারী সম্পাদক অথবা সম্পাদকীয় সহকারীরা। কিন্তু আগের যে রেওয়াজ ভেঙে এখন বহু বছর থেকেই বাইরের লেখকের লেখা সংগ্রহ করে নিয়মিত ছাপানো হয়, তাতে শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, এমনকি নানা পেশার নানা বিশেষজ্ঞ তাদের লেখায় সমাজ-সংস্কৃতি, রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনীতি-রাজনীতি বিষয়ে মন্তব্য প্রকাশ করে থাকেন। তাতে ভাষার তারতম্য তো আছেই, তার ওপর লেখক তার জ্ঞান প্রকাশের জন্য যে লেখা তৈরি করেন, তা হয়তো ব্যক্তি সুনাম অথবা খ্যাতির জন্য ছাপাতে বাধ্য হন পত্রিকা কর্তৃপক্ষ, কিন্তু তা পাঠক সাধারণের বুঝতে অসুবিধা হয় কিনা, তা কি আদৌ যাচাই করে দেখা হয়? হয়তো সম্ভব না।

আরেকটা জরুরি বিষয়, আমাদের সন্তানরা যারা জাতীয়-আন্তর্জাতিক বিষয়াদি জানতে সংবাদপত্রের সহায়তা নেন, তারা কিন্তু প্রকাশিত বাক্যে, শব্দে এবং বানানে প্রভাবিত হন। ফলে সহজ-সরল প্রকাশের পথটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওরা তো কাগজ পড়েই শব্দ শিখবে, বাক্য লেখায় জ্ঞান আহরণ করবে। বানান শুদ্ধ না হলে উচ্চারণেও বিড়ম্বনা দেখা দেয় এবং তাই শিশু-কিশোর-বালক-তরুণরা সেটাই শেখেন। যেমন ছোটবেলায় আমরা বেতার শুনে নিজেদের উচ্চারণ শুদ্ধ করার চেষ্টা করতাম। আজ তা তরুণরা পারে না। কারণ রেডিওরগুলো ভাষাটাকেই বিকৃত করে বিদেশি প্রভাবে কিম্ভূতকিমাকার উচ্চারণে প্রচার করে থাকে। অথচ আমরা আমাদের মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষার জন্য গত শতাব্দীতে রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলন করে পাকিস্তানি দুঃশাসকদের বুঝিয়ে দিয়েছিলাম আমাদের কেবল নয়, সব মাতৃভাষার কী মর্যাদা। মহান মুক্তিযুদ্ধে সেই শোষক পাকিস্তানিদের পরাজিত করে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে ৯ মাস সশস্ত্র এবং চূড়ান্ত লড়াই করে মাতৃভূমিকে ঔপনিবেশিক শাসক পাকিস্তানিদের পরাজিত করে বিজয়ী হয়েছি। বায়ান্ন আর একাত্তরের বিপুল খরচে যে দেশ আজ স্বাধীন-সার্বভৌম সেই গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে বাংলা মাতৃভাষা, রাষ্ট্র ভাষা হওয়া সত্ত্বেও কী যে বিড়ম্বনায় পড়েছে তা আমরা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছি, সেদিকেও সংবাদপত্রকে নজর রাখতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন স্খলিত না হয় সেটা দেখাও কিন্তু আমাদের গণমাধ্যমের পবিত্র দায়িত্ব।

আজ ‘দৈনিক ভোরের কাগজ’-এর শুভ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে হৃদ্যতাপূর্ণ-পাঠকনন্দিত অভিনন্দন জানাই এবং সেইসঙ্গে অকপটে সত্য উচ্চারণে সাহস অব্যাহত রাখার শুভ কামনা জানাই।

সাংবাদিকতার ভাগ্যে কী আছে ভবিষ্যতে, কে জানে। সাংবাদিক নিপীড়নের ধারা ৫৭ সুবিবেচনায় এখন ৩২-এ রূপ নিয়েছে আরো ভয়াবহ হিসেবে। নিয়ন্ত্রণ দরকার সবখানেই কিন্তু যদি সে নিয়ন্ত্রণ কণ্ঠরোধ করে, লেখার স্বাধীনতাই হরণ করে তবে সাংবাদিকতার চরিত্র কী হবে? আজ নতুন করে এ প্রশ্ন আলোচিত হচ্ছে।

২৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj