দৃশ্যমাধ্যমের ভালমন্দ : সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

১. ভোরের কাগজ-এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দৃশ্যমাধ্যম নিয়ে আলোচনা কেন, এ প্রশ্ন উঠতেই পারে কিন্তু এর পেছনের কারণটা বলে নিলে উত্তরটা নিজে নিজেই তৈরি হয়ে যায়। ভোরের কাগজ যে মুদ্রণ-সংস্কৃতির বহমানতা নিশ্চিত করে যাচ্ছে, তার ওপর একটা আঘাত হেনেছে দৃশ্য-সংস্কৃতি। এখন দেখার যুগ, চমকের যুগ। এখন মানুষ চিন্তার নির্মাণসূত্র হিসেবে ছবি-কে অনেক ক্ষেত্রেই প্রাধান্য দেয়। একসময় ধারণা করা হত যে দৃশ্যমাধ্যম আমাদের চিন্তার জগৎটি হয়তো দখল করে নেবে। তা অবশ্য হয়নি। কিন্তু দৃশ্যমাধ্যম অনেক ক্ষেত্রে মুদ্রণ মাধ্যমকে গৌণ করে দিচ্ছে। পশ্চিমে অনেক সংবাদপত্র বন্ধ হয়ে গেছে। নিউইয়র্ক টাইমস-এর মতো পত্রিকাও এখন প্রথম পৃষ্ঠায় বিজ্ঞাপন ছাপতে বাধ্য হচ্ছে।

ভোরের কাগজ এক সময় এক নাম্বার সংবাদপত্র ছিল। এখন সেই অবস্থানটা পত্রিকাটা হারিয়েছে। এর এক প্রধান কারণ দৃশ্যমাধ্যম। ভোরের কাগজ যদি চটকদার ছবি ছাপত, দৃশ্যমাধ্যমের চমক প্রতি পাতায় দিতে পারত, তাহলে হয়তো এর পাঠকরা এর সঙ্গে থাকত। কিন্তু পত্রিকাটি চটকদারিত্বের ফাঁদে পড়েনি। এজন্য এর একটা আলাদা ভাবমূর্তি আছে। এর পাঠকরা সমাজ, রাজনীতি ও দেশ নিয়ে ভাবেন; এই পত্রিকায় এমন অনেক বিষয়ে লেখা ছাপা হয় (আমি নিজেও এরকম অনেক লেখা ভোরের কাগজ-এর জন্য লিখেছি) যেগুলো অন্যান্য পত্রিকায় ছাপা হয় না, ভাবা হয় এগুলো ‘সিরিয়াস’। কিন্তু এসবের প্রয়োজন আছে। একটি পত্রিকা যদি নানা ইস্যুতে চিন্তা জাগায়, তাহলে তা এর একটি বড় দায়ও মেটাও। ভোরের কাগজ-এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এরকম একটি ইস্যু নিয়ে তৈরি লেখা প্রকাশের জন্য পাঠিয়েছি। আমি নিশ্চিত আমাদের সংস্কৃতির স্বার্থে দৃশ্যমাধ্যমের ভালোমন্দ নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত। টেলিভিশন এবং ব্যাপক অর্থে দৃশ্যমাধ্যম, বাঙালির আবিষ্কার অথবা উৎপাদন নয়, আমদানি মাত্র। এবং আমদানির ক্ষেত্রেও পুঁজি এবং পণ্য অর্থনীতিই ছিল মূল নিয়ন্তা শক্তি। পশ্চিমা পুঁজি যেমন নিজের স¤প্রসারণের উদ্দেশ্যে আমাদের দেশে অনেক প্রয়োজনীয় ওষুধ-প্রযুক্তির আগে আমদানি নিশ্চিত করেছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের অথবা বিলাসী মোটর কারের, টেলিভিশনের ক্ষেত্রেও বহু মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য উপযোগী/সহায়ক প্রযুক্তির আগেই এই অগ্রাধিকার আরোপ চলেছে। বাংলাদেশে টেলিভিশন আসে ১৯৬৫ সালে, যখন দেশে ওই যন্ত্র¿টি কিনতে সমর্থ-মানুষের সংখ্যা ছিল নগণ্য, মোট জনসংখ্যার ১%-এর নিচে। কিন্তু বৃহৎ পুঁজির হিসেব-নিকেশ শুধু বর্তমানকে ঘিরে হয় না, ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে সে কড়ায় গণ্ডায় মেলাতে চায়। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপ এবং জাপানের নির্মাতারা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে উদীয়মান বাজার হিসেবে ততদিনে চিহ্নিত করে ফেলেছে। কাজেই টেলিভিশন কেন্দ্র স্থাপনে উদার জাপানি অনুদান ও কারিগরি সাহায্য পাওয়া গেল। পুঁজির সঙ্গে এক্ষেত্রে যুক্ত হলো আরেক শক্তি- পাকিস্তানি স্বৈরশাসক। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রচারণা শক্তি সম্পর্কে খুব পরিষ্কার ধারণা ছিল ওই শাসকগোষ্ঠীর। হয়তো মার্শাল ম্যাকলুহনের একটি তত্ত্বও তাদের মাথায় ঢুকে গিয়েছিল ইমেজ বা ছবির একটি শক্তি আছে বাস্তবতার জায়গা দখল করে নেয়ার। টেলিভিশনে ছবিসর্বস্ব প্রচার যদি চলে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর, তাহলে ওই পর্দার বাস্তবতাটাই একদিন সত্য হয়ে দাঁড়াবে। পর্দার অতিশয় পাতলা উপরিতলের পেছনে যে অসত্য লুকিয়ে আছে, মানুষ তা খুঁজতে যাবে না। আশির দশকে এসেও বাংলাদেশের আরেক স্বৈরশাসক টেলিভিশনের পর্দায় তার গৃহীত নানান ‘উন্নয়নমূলক’ কর্মকাণ্ডের প্রচার চালিয়ে গ্রামের মানুষজনের মনে একটা বেশ জায়গা করে নিয়েছিলেন। গ্রামেগঞ্জে তখন অল্পস্বল্প টেলিভিশন পৌঁছেছে। পরে অবশ্য তার পতনের পর ওই টেলিভিশনই গণতন্ত্রের জন্য মানুষের মনে একটা উন্মাদনা সৃষ্টিতে সহায়তা করল। তাকে মানুষ ভুলে গেল, কারণ ততদিনে তিনি মিলিয়ে গেছেন পর্দা থেকে।

এ দেশে টেলিভিশনের আগমনের পেছনে দু’টি প্রধান শক্তি তাই পুঁজি এবং সরকার। এ দুয়ের নিয়ন্ত্রণ খুব দৃঢ়। বলা যায়, পুঁজি নিয়ন্ত্র¿ণ করছে টিভির (এবং বৃহৎ অর্থে দৃশ্য মাধ্যমের) হার্ডওয়্যার, সরকার নিয়ন্ত্রণ করছে, অথবা করতে চাইছে সফটওয়্যার। একটির উদ্দেশ্য স¤প্রসারণ ও বিকাশ; অন্যটির প্রচারণা ও তথ্যের ওপর আধিপত্য। এর সঙ্গে আরো যুক্ত হয়েছে দু’এক বিমূর্ত কারণ- সংস্কৃতি কর্মীদের মিডিয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ ও বৈশ্বিক অঞ্চলে প্রবেশের আকাক্সক্ষা; বিশ্বের প্রযুক্তিগত অর্জনের এবং অবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার ইচ্ছা এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির অনিবার্যতা। একটা কপট অথবা অপ্রকৃত দেশপ্রেমের বিষয়ও এখানে জড়িত। প্রতিবেশী একটি বা দুটি দেশে টেলিভিশন এসে গেছে, সেসব দেশের মানুষ দেখছে টেলিভিশন, আমরা কেন পিছিয়ে থাকব?

এতসব কারণে টেলিভিশন একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও বিনোদন মাধ্যম আমাদের দেশে। যদিও, এখনো গোটা দেশের পঞ্চাশ ভাগের বেশি মানুষ এর আওতার বাইরে- তাদের এ যন্ত্র কেনার ক্ষমতা নেই, অথবা এসব মানুষের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি অথবা, অন্তত ৫ থেকে ১০ শতাংশ মানুষের ক্ষেত্রে তারা টেলিভিশনের স¤প্রচার এলাকার বাইরে। তারপরও টেলিভিশন অত্যাবশ্যকীয় এবং অনিবার্য একটি উপস্থিতি মানুষের গৃহে এবং জীবনে। যে কোনো সন্ধ্যায় কোটি কোটি মানুষ টেলিভিশন দেখেন, এর ছবিসমূহের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যান। প্রতিবেশীর ঘরে, পাড়ার ক্লাবঘরে হয়তো টেলিভিশন দেখেন অনেকে, কিন্তু একে নিতান্ত আপনই ভাবেন তারা। দৃশ্যমাধ্যম নিজেদের উৎপাদন না হলেও এটি এখন পুরোপুরি স্থানীয় একটি মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাতঘড়ি অথবা ঝর্না কলমের মতো একান্ত নিজস্ব এবং অপরিহার্য। বাঙালি টিভিকে আত্মস্থ করেছে নিজের করে নিয়েছে। সফটওয়্যারের বাঙালিয়ানা হার্ডওয়্যারের মালিকানা পর্যন্ত গড়িয়েছে। বৈদ্যুতিক বাতি অথবা ছাপাখানার মতো টেলিভিশনও এমনি একটি আবিষ্কার, যাকে ইতিহাস এবং সংস্কৃতিগতভাবে আর ভিনদেশী কোনো বস্তু হিসেবে আমরা দেখছি না। অথচ, তিন দশক ধরে আপন করে নেয়া এই মাধ্যম সম্পর্কে নিজেদের কোনো মতাদর্শ তৈরি করতে পারিনি আমরা। চলচ্চিত্রকে নিজেদের মেধা ও সাংস্কৃতিক প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করে একটা নিজস্বতা বাঙালি সৃষ্টি করতে পেরেছে; সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক অথবা জহির রায়হান- সকলেই চলচ্চিত্রকে একটি বাঙালি পরিচয়ে উদ্ভাসিত করতে পেরেছেন। সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা বলতে বিশ্ব একটি একক বিশিষ্টতা মণ্ডিত নান্দনিক সৃজনকে বুঝে থাকে। এই অর্জনটি কেন এবং কীভাবে সম্ভব হলো, এ প্রসঙ্গে একটু পরে আসছি। কিন্তু টেলিভিশন বলতে সেরকম কোনো স্বতন্ত্র, নান্দনিক এবং একক বিশিষ্ট শিল্পকে আমরা চিহ্নিত করতে পারি না। বাঙালির টেলিভিশন বলতে এখনো একবাক্যে আলাদা করা যায় এরকম বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত কোনো সৃজন প্রয়াস বোঝায় না। বাঙালির টেলিভিশনে যা আছে- নাটক, বিনোদন অনুষ্ঠান, সিরিয়াল, মেগা সিরিয়াল, আলোচনা চক্র, সাক্ষাৎকার, গেম শো, টক শো- এসব মৌলিক কোনো উৎপাদন নয়। প্রধানত পশ্চিমের- সিবিএস, এবিসি, এনবিসি, বিবিসি অথবা সিএনএন হচ্ছে টেলিভিশন অনুষ্ঠানের আদি অনুপ্রেরণা। খুব সামান্য পরিমাণ অনুষ্ঠানই- যেগুলোকে আমরা ‘গণমুখী’ বলে থাকি (যেমন কৃষিবিষয়ক কার্যক্রম, দূরশিক্ষা ও পল্লী কেন্দ্রিক অনুষ্ঠান)- নিজস্ব তাগিদ অথবা প্রেরণা থেকে উদ্ভূত। তাদের পশ্চিমা প্যারাডাইম হয়তো সেরকম নেই। হয়তো নাটক বা পার্বাণিক অনুষ্ঠানেও নিজস্বতা প্রতিষ্ঠার প্রয়াস গুরুত্ব পায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একান্ত মৌলিক, পূর্বসূরি প্রভাবমুক্ত স্বাধীন নির্মাণ সংখ্যার দিক থেকে পশ্চিমের অথবা একে অপরের অনুকরণে তৈরি অনুষ্ঠান থেকে অনেক কম। সেজন্য টেলিভিশন বা বিস্তৃত অর্থে দৃশ্যমাধ্যম স¤পর্কে বাঙালির মতাদর্শ- যদি তা প্রণিধানযোগ্যভাবে থেকে থাকেও- মৌলিক নয়। আমাদের দেশে বৈশাখী মেলা বা বৈশাখ উদযাপন অথবা নবান্ন উৎসবের পেছনে একটা মতাদর্শ আছে- যা একটি চিরায়ত, সেক্যুলার এবং ব্রাত্যসংস্কৃতির গুরুত্বকেই তুলে ধরে। কিন্তু টেলিভিশন ও দৃশ্যমাধ্যমের ক্ষেত্রে সেরকম মতাদর্শ আমাদের তৈরি হয়নি।

চলচ্চিত্রের ব্যতিক্রমী অর্জনের বিষয়টি এখানে উত্থাপন করা যায়। চলচ্চিত্রও পরবর্তীতে টেলিভিশনের মতো পশ্চিম থেকে আমদানি। কিন্তু এদের ভেতর প্রধান দুটি পার্থক্য রয়ে গেছে যেগুলো এ দুই মাধ্যমের প্রভাব বিচারে গুরুত্বপূর্ণ : ক. টেলিভিশনের স¤প্রচার/প্রচার হচ্ছে ক্রমিক বা ক্রমাগত (ঈড়হঃরহঁড়ঁং), যেখানে চলচ্চিত্রের ব্যাপ্তিকাল সীমিত। খ. টেলিভিশন এক সন্ধ্যায় বহু বিচিত্র বিষয় উপস্থাপিত করতে পারে, যেখানে চলচ্চিত্র বিষয় নির্দিষ্ট; মানুষের চেতনায় দীর্ঘমেয়াদি ওলট-পালট সৃষ্টি শক্তিটি চলচ্চিত্রের নেই, যা আছে টেলিভিশনের। তবে চলচ্চিত্র যদি একটি বিষয় নিয়ে ক্রমাগত উৎপাদন করে যায়, একটি বিষয়কে প্রধান করে নির্মিত হয় অসংখ্য চলচ্চিত্র, তবে একটি ‘সিরিয়াল’ বা ক্রমিক প্রভাব তার তৈরি হতে পারে, যেমন সহিংসতা ও নগ্নতাকে উপজীব্য করে তৈরি চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে হচ্ছে। কিন্তু টেলিভিশন চলচ্চিত্র থেকে অনেক বেশি সুলভ, ভোক্তাবান্ধব এবং অন্তরহ। এ কারণে মার্টিন এসলিন যেমন বলেছেন, টেলিভিশন হয়ে দাঁড়িয়েছে “এক বিকল্প সম্মিলিত চেতনা”।

আমাদের দেশে টেলিভিশনের আগমন হয়েছে এমন এক সময় যখন দৃশ্যমাধ্যমে বৃহৎ পুঁজির বিনিয়োগ ঘটছে। টেলিভিশন উৎপাদন প্রযুক্তি জাপান ও পশ্চিমের কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানি এমনভাবে উন্নত করছিল যে অচিরেই এশিয়ার মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে টেলিভিশন ও তার আনুষঙ্গিক ও সহায়ক যন্ত্রপাতি (যথা ভিসিআর/ভিসিপি, ভিডিও ক্যাসেট) চলে আসার কথা। কিন্তু তার আগে এই নিশ্চয়তাও চাই যে এসবের চাহিদা বাড়বে অব্যাহতভাবে। কাজেই টেলিভিশন শুরু থেকেই বিনোদনের দিকে ঝুঁকল, পণ্যপ্রবাহে তা গা ভাসাল। শুধু অনুষ্ঠানের পণ্যমূল্য নির্ধারণ ছাড়াও পণ্য প্রচারের একটি কার্যকর কেন্দ্র হয়ে দাঁড়াল টেলিভিশন। কাজেই পশ্চিমে ষাটের দশক থেকে যা ঘটছিল টেলিভিশনের ক্ষেত্রে, আমাদের দেশেও তা ঘটতে থাকল। অর্থাৎ টেলিভিশনজ্জ

– নিয়মিত এবং ক্রমাগত এবং বহুবিচিত্র বিনোদনের প্রধান মাধ্যম হয়ে দাঁড়াল।

– অন্যান্য বিনোদন মাধ্যম থেকে তা সহজলভ্য হলো।

– অনেক ক্ষেত্রে ছাপা মাধ্যমের অভাব পূরণ করল/ছাপা মাধ্যমের প্রতিদ্ব›দ্বী হয়ে দাঁড়াল।

– সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একদিকে নতুন নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করল, কিন্তু একই সঙ্গে, বিশেষ করে ছকে বাঁধা ফমুর্লা উৎপাদনের ক্ষেত্রে এবং নিয়ন্ত্রিত তথ্য প্রবাহের প্রচার মাধ্যম হিসেবে এবং বিশেষ করে পশ্চিমা অপসংস্কৃতির অনুকরণে এবং ওই সংস্কৃতির প্রচার বাহন হিসেবে একটা সাংস্কৃতিক সংকটও সৃষ্টি করল। বর্তমানে আকাশ সংস্কৃতির যুগে এই সংকটটি তীব্রতর হয়েছে। এই প্রসঙ্গে ফ্রান্সিস ম্যুলহার্নের একটি উক্তি স্মরণ করা যায়। এই সংস্কৃতি বিশ্লেষক তাঁর কালচার/মেটাকালচার গ্রন্থে (লন্ডন : রুটলেজ, ২০০০:১১১) বলেছেন, টেলিভিশন মধ্য কুড়ি শতকে এর সামগ্রিক বিকাশের পর সাংস্কৃতিক গোলযোগের একটি উৎপত্তিস্থল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার এই উক্তির যথার্থতা সম্পর্কে একটু পরেই আলোচনা করছি।

– অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক আচার, রুচি ও মূল্যবোধেও নেতিবাচক প্রভাব রাখল।

– তবে, সর্বোপরি, ইমেজ ও উপরিতল সর্বস্ব, তাৎক্ষণিক এবং আকর্ষণীয় বিকল্প বাস্তবের সৃষ্টি করল। এই বাস্তব সাহিত্যের বিকল্প বাস্তব নয়, যেখানে গভীরতা আছে, চিন্তার স্বাধীনতা আছে, বই বা লেখকের সঙ্গে একটি পারস্পরিক সংলাপ ও বোঝাপড়ার ব্যাপার আছে। টেলিভিশনের সিংহভাগ অনুষ্ঠান চিন্তাহীন, বুদ্ধিহীন আবেগ বা চমকনির্ভর প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। বাংলাদেশের টেলিভিশনে শতকরা ষাটভাগ অনুষ্ঠান এখন নাটক নির্ভর। কিন্তু এত নাটক যে লিখবে, কে জোগান দেবে কলাকুশলী? কোত্থেকে আসবে প্রযুক্তিওলারা? ফলে, নাটকের জীবনটি সীমাবদ্ধ, ছাঁচে ঢালা এবং আরোপিত। অথচ এই জীবন এখন বাস্তব জীবনের বিকল্প হয়ে দেখা দিচ্ছে। এক সিরিয়াল নাটকে একটি চরিত্রের ফাঁসি হলে কেন তার ফাঁসি হলো, সেই ক্ষোভ জানিয়ে মিছিল বেরিয়েছে সারা দেশে। উত্তর আধুনিক পরিভাষায় একেই হয়তো বলে ংরসঁষধপৎঁস. টেলিভিশন যে জীবন ফুটিয়ে তোলে সেটি একটি নকল বা পড়ঢ়ু হলেও মূল বা ড়ৎরমরহধষ বলে যা থাকার কথা, তা নেই। মূল ছাড়া নকল- এ হচ্ছে টেলিভিশনের অবস্থা।

তবে এ কথা না উল্লেখ করাটা অনুচিৎ হবে যে, পশ্চিমা বিশ্বে টেলিভিশন জ্ঞান-বিজ্ঞানকে সকল ক্ষেত্রে পণ্যে পরিণত করতে পারেনি, অথবা করেনি। এখনও ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, ডিসকোভারি বা পিবিএস চ্যানেলের মতো পশ্চিমা বিশ্বে অনেক চ্যানেল প্রচুর আকাশ সময় দিচ্ছে জ্ঞানের সেবায়। কিন্তু সেখানেও বৃহৎ পুঁজি অপেক্ষা সরকারের ও নানা এনডাওমেন্ট ফান্ড বেশি সক্রিয়। বৃহৎ পুঁজি অনুষ্ঠান স্পন্সর করে। অনেক ক্ষেত্রে এটি কর্পোরেট দর্শনের একটি অংশ যাতে সংস্কৃতি ও জ্ঞান সেবক হিসেবে কোম্পানিগুলোর সুনাম হয়। সিগারেটের কোম্পানি অনেক দেশে টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন দিতে পারে না। কিন্তু বিজ্ঞাপনের জন্য নির্দিষ্ট অর্থে তারা পরিবেশবান্ধব কর্মকাণ্ড করছে। অনেকটা সেরকম ব্যাপার টেলিভিশনে জ্ঞান-বিজ্ঞান উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে।

পশ্চিমে এখন টেলিভিশন একটি বড় ব্যবসা। আকাশ সংস্কৃতির সূত্রপাতে এই বাজার এখন বৈশ্বিক। কাজেই বৃহৎ পুঁজি একে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করবেই। একই সঙ্গে নানা দেশের সরকারগুলোও নিয়ন্ত্রণের জন্য হাত বাড়িয়েছে। ফলে বর্তমান বিশ্বে টেলিভিশনের মতাদর্শেও ঘটেছে পরিবর্তন। এখন পুরনো মতাদর্শ আছে তত্ত্ব হিসেবে, তত্ত্বের জায়গায়। বাস্তবে তার প্রভাব সামান্যই। আমরা যদি এই মতাদর্শকে বা তার উপাদানগুলোকে চিহ্নিত করতে চাই, তাহলে এরকম কিছু বিষয় চোখে পড়বেজ্জ

– পুঁজি ও সংস্কৃতিগত আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠার প্রয়াস

– বিনোদনের সুস্পষ্ট প্রাধান্য

– তথ্যপ্রবাহে পশ্চিমের নিজস্ব ধ্যান-ধারণার প্রতিফলন নিশ্চিতকরণ

– পণ্যের অবারিত বিকাশ ও প্রচার নিশ্চিতকরণ

– নতুন নতুন চাহিদা ও আগ্রহ সৃষ্টি করা; এক অর্থে নতুন বাজার সৃষ্টি করা; অন্য অর্থে (যা গৌণ বিবেচনা) জানার পরিধি বিস্তৃত করা

– দর্শকের চেতনার রাজ্যটি অধিকার করে নেয়া

এ তো গেল পশ্চিমের কথা। আমাদের দেশে কী হচ্ছে? বাঙালির টিভি মতাদর্শ কী? আগেই বলেছি, টেলিভিশন আমাদের আমদানি মাত্র, এর প্রযুক্তি মালিকানা আমাদের নয়। আমরা এই প্রযুক্তি আত্মস্থ করে যেদিন হার্ডওয়্যারের মালিক হলাম, দেখা গেল প্রযুক্তির নতুন নতুন উদ্ভাবনে আমাদের কোনো ভূমিকা নেই। অর্থাৎ পশ্চিমে উদ্ভাবিত বস্তুর আমরা সংযোজন করলাম মাত্র। সেজন্য আমাদের মতাদর্শ পশ্চিম প্রভাবিতই হলো। তবুও, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বাঙালিরা বরাবরই অভিমানী। আমরা ভাবলাম, টেলিভিশন প্রযুক্তিকে আমরা নিজের মতো করে গড়ে নেব, সাজিয়ে নেব, বিন্যাস করে নেব। যদি ষাটের দশকের শেষদিনের এবং সত্তরের শুরুর টেলিভিশন অনুষ্ঠান পরিকল্পনাকারী, নির্মাতা, প্রযোজক, কলাকুশলী এবং মিডিয়া বিশেষজ্ঞদের মতামত আমরা নিই (যা বিভিন্নভাবে তারা প্রকাশ করেছেন), তাহলে দেখা যাবে, তাদের উদ্দেশ্য ছিল।

– টেলিভিশনকে বাঙালি সংস্কৃতির বাহন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে।

– লোকায়ত জীবন, চিরায়ত সংস্কৃতি- এসব হবে সৃষ্টির অনুপ্রেরণা।

– শুধু বিনোদন নয়, শিক্ষাকেও দেয়া হবে সমান গুরুত্ব।

– মানুষের জানার অধিকার রক্ষা করা হবে, জানার পরিধি বাড়ানো হবে, তথ্যপ্রবাহ অবাধ করা হবে।

– অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে একটি প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য টেলিভিশনকে ব্যবহার করা হবে। ইত্যাদি।

এর কিছু যে অর্জিত হয়নি, তা নয়। বস্তুত টেলিভিশন মানেই ছিল একটি নতুন এবং চমকপ্রদ শিল্প মাধ্যম, যা অন্তরঙ্গ যাতে আনন্দ এবং কৌত‚হলের সংমিশ্রণ আছে। বাঙালি সংস্কৃতির অনেক অবহেলিত দিক উঠে এসেছে টেলিভিশনে, লোকায়ত জীবনের ছায়া পড়েছে এর অনুষ্ঠানে, জ্ঞানের ও শিক্ষার বিস্তারে একটা ভূমিকা রেখেছে এই মাধ্যম। কিন্তু একদিকে বৃহৎ পুঁজির প্রভাব যত শক্তিশালী হয়েছে, সরকারি তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ জোরদার হয়েছে, তত ব্যাহত হয়েছে এই উদ্দেশ্যগুলো। বর্তমান চিত্রটি অনেকটাই হতাশাজনক।

কিন্তু পশ্চিমী বা বৈশ্বিক হয়ে ওঠার মধ্যে, পূর্ব-পশ্চিম মিলিয়ে একটা খিচুড়ি পাকিয়ে ফেলার মধ্যে, বিনোদনকে একটা আদর্র্শ হিসেবে ধরে নেয়ার মধ্যে একটা জিনিস সবাই ভুলে যাচ্ছেন, সেটি হচ্ছে আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা। একটি উত্তর-উপনিবেশী সমাজে একটি প্রদান কাজ অনেকদিন পর্যন্ত থেকেই যায়, তা হচ্ছে মনের উপনিবেশ মুক্তি। সেটি করতে হলে দৃষ্টি ফেরাতে হবে নিজের মাটিতে, গ্রাম, সাধারণ মানুষ বলে যাদের আমরা দূরে সরিয়ে রাখি তাদের দিকে। গ্রামীণ দরিদ্র নিরসন না করলে কোনো বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব নয় সমাজে, রাষ্ট্রে- এ কথাটি বোঝার জন্য অমর্ত্য সেনের মতো মেধাবী হতে হয় না। একইভাবে শিক্ষাকে সর্বজনীন ও সহজলভ্য না করলে দেশ যেমন এগুবে না, সংস্কৃতিও তেমন এগুবে না, কারণ সংস্কৃতির মূলে আছে শিক্ষা। আমাদের শাসন ব্যবস্থা, প্রশাসন ব্যবস্থা- এগুলোকেও উপনিবেশী ছাঁচ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কিন্তু উপনিবেশী শক্তি চলে গেলেও তাদের রেখে যাওয়া প্রশাসন, আইন ও বিচার, ও শিক্ষাব্যবস্থা এখনো তাদের দাওয়াই মতো চলছে। সেজন্য আমাদের নিজস্ব চাহিদা, আমাদের নিজস্ব জীবনযাত্রা, দৃষ্টিভঙ্গি, সংস্কৃতি, সমাজভাবনা ইত্যাদিকে তুলে ধরতে পারে এরকম কোনো শিক্ষানীতি নেই, সংস্কৃতি ভাবনাও নেই। ফলে কোনো সুস্পষ্ট আদর্শও নেই আমাদের সামনে। টেলিভিশনের ক্ষেত্রে আর উল্টোটি কেন হবে। বরং প্রশাসন, বিচার ও শিক্ষার মতো মিডিয়াতেও যুক্ত হয়েছে উপনিবেশী মনোভঙ্গি। এখন অবশ্য কোনো রাষ্ট্র উপনিবেশ সৃষ্টি করে না, অথবা করতে পারে না।

ভৌগোলিক উপনিবেশের দিন শেষ। এর জায়গায় অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উপনিবেশ সৃষ্টি বরং সহজতর। সেজন্য আকাশ থেকে আসছে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, বাজার থেকে আসছে পুঁজির আগ্রাসন। আর সকল সংস্কৃতির উৎপাদনকে ভোগ্যপণ্যে পরিণত করার জন্য আসছে পুঁজিময়ী সার্সির প্রলোভন। এবং আমরা নিজেদের ভূমি আগলে রাখার পরিবর্তে সবটাই ছেড়ে দিচ্ছি উদার বাণিজ্যের নামে, গোকায়নের নামে, সংস্কৃতিক বহুত্ববাদের নামে। টেলিভিশন এবং দৃশ্যমাধ্যমে পশ্চিমা পুঁজি ও সংস্কৃতির আগ্রাসন ঠেকানো কোনোদিন সম্ভব হবে কিনা জানি না, কিন্তু উদ্যোগটা নিতে হবে। কম্পিউটারের ক্ষেত্রে যেমন আমাদের করণীয় তেমন কিছু নেই, সাইবার বিশ্বের সবগুলো দ্বার উন্মুক্ত এবং সেখানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাও অসম্ভব, অনাকাক্সিক্ষতও বটে। আমি নিয়ন্ত্রণের অথবা সেন্সরশিপের পক্ষে নেই। কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ তা বোঝার বয়স পার হয়েছে, সে নিজ থেকেই বেছে নিক সে কোন ওয়েব ঠিকানায় ঢুকবে, কোনটায় ঢুকবে না, একেবারে জাতি বা ধর্ম/বর্ণবিদ্বেষী কোনো বিষয় অথবা নগ্নতার নামে চূড়ান্ত অশ্লীলতা, এগুলোর ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনই যথেষ্ট। ইন্টারনেট বাহিত হয়ে যা আসে, তাকে ঠেকাতে বিকল্প যা দিতে হবে তা আমাদের সামর্থ্যে নেই। টেলিভিশনে স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে যা আসছে, তা ঠোকাবার শক্তি কিন্তু আমাদের সংস্কৃতিতে আছে এবং তা জোগান দেয়াটা আমাদের সামর্থ্যরে মধ্যেই রয়েছে। এখন দরকার একটা মতাদর্শ। মতাদর্শ কথাটা একটু কঠিন এবং উদ্দেশ্যপ্রবণ হয়ে যায়- তার জায়গায় বরং বলা যায় একটা পরিচ্ছন্ন মিডিয়া ভাবনা। সেই ভাবনায় উত্তর-উপনিবেশী বাস্তবতা, সংস্কৃতির কিছু দাবি, এটি জাতির কিছু চাওয়া পাওয়া প্রতিফলিত হবে। এত বিনোদন কেন প্রয়োজন আমাদের? আমরা কি একটি স্থ‚ল জাতি যে আটঘণ্টা অফিসে কারখানায় কাটিয়ে ঘরে এসে আয়েশ করে বিনোদন খেতে হবে? আর টিভিতে যে শহুরে-গ্রামীণ, লিট-ব্রাত্য-বিভাজন, তা কেন থাকবে? বাংলাদেশের একটি টিভি চ্যানেল দিনে একটি দুটি ছবি দেখায়- ‘গ্রামের দর্শকদের’ জন্য। আমরা কেন ধরে নেব গ্রামের লোক সিনেমা দেখে পুলকিত হবে, আর শহরের লোক দেখবে ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান, তরুণেরা পপ কাউন্ট ডাউন এবং ব্যান্ড শো?

টেলিভিশন অপার সম্ভাবনার একটি মাধ্যম। একে যারা নিয়ন্ত্রণ করছে, তাদের চিন্তাটা পরিচ্ছন্ন নয়। চিন্তা পরিচ্ছন্ন হয় যদি অনুষ্ঠানকে শুধু পণ্য বলে ভাবা না হয়। অনুষ্ঠানকে সাংস্কৃতিক উৎপাদন হিসেবে দেখতে হবে।

অর্থাৎ শুরুতে যে মতাদর্শ ছিল, সেটিকে ফিরিয়ে আনতে হবে, সময়ের প্রয়োজনে কিছু পরিবর্তন পরিবর্ধন করে। কিন্তু টিভিকে কিছুতেই ঘোলাটে চোখ, বুদ্ধিহীন কিন্তু প্রবলভাবে আমোদিত জনগোষ্ঠী তৈরির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেয়া যায় না।

২. ভোরের কাগজ যদি আমাদের দৃশ্যমাধ্যমকে সত্যিকার গণমুখী এবং রুচিশীল একটি মাধ্যম হয়ে ওঠার পেছনে কিছুটা অবদান রাখতে পারে তাহলে এর সামাজিক দায়বদ্ধতার ঐতিহ্যটি আরেকটু সমৃদ্ধ হবে।

ভোরের কাগজ-কে অভিনন্দন। পত্রিকাটি এগিয়ে যাক, সময়ের সঙ্গে, অনেক দূরের গন্তব্যে।

২৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj