ভোরের কাগজ শুরুর দিনগুলোর টুকরো ছবি : প্রশান্ত মৃধা

বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

যতদূর মনে পড়ে, ১৯৯২-এর জানুয়ারির একেবারে শেষ দিকে আজকের কাগজ ভাঙে। ভিতরের ভাঙন হয়তো আরও কিছু আগেই ধরেছিল, কিন্তু ওই সে সময়ে একেবারে পাকাপাকি। তখনও দৈনিকটির বয়েস বছর ছোঁয়নি। ডিসেম্বরে আজকের কাগজে লিখেছিলাম ‘হৃদয়ে বাংলাদেশ’ নামের ধারাবাহিক আয়োজনের কয়েকটি লেখা। ফরিদ কবির আর মাসুদুজ্জামান মাঝের সেই পৃষ্ঠা দুটো দেখতেন। জানুয়ারির শেষ দিকে ওই লেখাগুলোর বিল আনতে গিয়ে শুনি, পরে দেয়া হবে। গোটা আজকের কাগজ অফিস একেবারে থমথমে। পরিচিত কেউ নেই।

এটুকু জানানো দরকার, আজকের কাগজের সাংবাদিকেরা তখন আমার পরিচিত এই জন্যে, কখনও কখনও আমি সেখানে লিখি অথবা সেখানে আমার লেখা প্রকাশিত হয়েছে। সদ্য এইচএসসি পাস করে ঢাকায় এসেছি। শাহবাগ তখন সবে আড্ডার জায়গা হয়ে উঠছে। সেখানে আজকের কাগজের অনেকেও আড্ডা দেন। ঢাকায় এসে আমি উঠেছি মামার বাসায়, জিগাতলা কাঁচাবাজারের কাছে। আজকের কাগজ অফিস জিগাতলা বাসস্ট্যান্ডের সঙ্গেই একটা দেড়তলা বাড়িতে। এর কিছুদিন পর থেকে আমি বন্ধুদের সঙ্গে কাঁটাবন ঢালে থাকি, সেটাও শাহবাগ আজিজ মার্কেটের কাছে। ফলে দিনে রাতে দুই জায়গায়ই তাঁদের সঙ্গে দেখা হয়। লেখা যা চার-ছয়টি প্রকাশিত হয়েছে, তার চেয়ে এই নতুন আঙ্গিকের কাগজের সাংবাদিকদের সঙ্গে আড্ডাই হয়েছে বেশি। সেই পরিচয় এখনও আছে। কখনও দেখা হলে কথা হয়। কিন্তু প্রায় আগন্তুক হিসেবে ওই কাগজের সবার সঙ্গে- এখানে সবার বলতে সম্পাদকীয় মফস্বল আর সাহিত্যপাতার (যদিও সাহিত্যপাতা শেষ মাস ছয়েক ধরে বেরুচ্ছিল না; আবু হাসান শাহরিয়ার চাকরি ছাড়ার পরে আর সাহিত্যপাতা প্রকাশিত হয়নি) সঙ্গে যাঁরা যুক্ত, তাঁদের সঙ্গেই মূলত আলাপ পরিচয়। তাঁরা একটা রুমে বসতেন। এর বাইরে, একটু পিছনের দিকে দোতলায়, মনে হয় গ্যারেজের উপরের একটি অপরিসর রুমে অনুবাদ বিভাগ। সেখানে আদিত্য কবির, সঞ্জীব চৌধুরী আর সাজ্জাদ শরিফ। ওই আলাপ-আড্ডার সূত্রে ভিতরের ভাঙনের খবর আমার কোনওভাবেই জানার কথা নয়। তা জানতে হলে কম হোক বেশি হোক একটু ভিতরের জন হতে হয়।

এক সকালে হিসাব শাখায় গিয়ে বিল আপাতত পাওয়া যাবে না শোনার পরে, তখনও আমি বুঝে উঠতে পারিনি, আজকের কাগজ নামের কাগজটি ভেঙে একটি নতুন কাগজের জন্ম হতে যাচ্ছে। তা জানতে পারলাম, সেদিনই সুশান্ত মজুমদারের নয়াপল্টনস্থ অফিসে গিয়ে। এখান থেকে এক সময়ে সচিত্র সন্ধানী বেরুত, তখন আর বের হয় না। সুশান্তদা গাজীভবনেই অন্য কাজে যুক্ত। তিনি ও তাঁর কাছে আসা অন্য সাহিত্যিক ও সাংবাদিকেরা ইতোমধ্যে ভিতরের সব খবর জেনে গেছেন। তাঁর কাছে থেকে প্রায় সবই জানলাম। এমনকি এটাও জানলাম, শাহবাগেই, পিজির পিছনের দিকে একটা বাড়িতে নতুন অফিসও নেয়া হয়েছে। সুশান্তদা এ-ও বললেন, শাহবাগে গেলে ওঁদের কাউকে পাওয়া যাবে, তখন নিশ্চয়ই সব জানতে পারবে।

এখন যত অনায়াসে এইসব কথা লিখছি, তখন বিষয়টা এরচেয়ে অনেক অনিশ্চয়তার ছিল, অন্তত আমার কাছে। সামনা-সামনি দেখা না-হলে তো কোনও বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে কিছু জানার সুযোগও ছিল না। কাঁটাবনে থাকার ফলে নিজের ডেরায় ফেরার আগে আজিজ সুপার মার্কেটের ফুটপাতে আড্ডা দেয়া ছিল অবধারিত। তাই এক কি দুই দিনের ভিতরে জানলাম, সামনে কী ঘটতে চলছে। কয়েকটি নাম দিয়ে ডিকলারেশন চাওয়া হয়েছে। তাও গেল, দিন কয়েকের ভিতরে জানলাম, বেরুচ্ছে নতুন কাগজ, নাম ভোরের কাগজ। প্রকাশের সম্ভাব্য তারিখ পনেরোই ফেব্রুয়ারি! পিজি আর আজিজ মার্কেটের মাঝখান দিয়ে যে রাস্তাটা গেছে, ওই রাস্তায় কিছুটা এগোলে হাসপাতালের ভবনগুলো শেষ হওয়ার পরে ডান দিকের প্রথম বাড়িতে ভোরের কাগজের অফিস। অফিসের সামনে পুলিশ। পরিচয় দিয়ে ঢুকতে হয়। খাতায় নাম ঠিকানা লিখে কার কাছে কী প্রয়োজনে এসেছি সেখানে জানাতে হয়। এ অভিজ্ঞতা আজকের কাগজ-পর্বে ছিল না। যদিও এর কদিন পরে আজকের কাগজের অফিসের সামনেও পুলিশ দেখেছি। তখন এসব বিষয়ে কোনও ধারণা ছিল না যে কেন ও কী জন্যে পুলিশ? মালিকানার দ্ব›দ্ব-সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে স্পষ্ট কোনও ধারণা ছিল না। শুধু পাশ থেকে শোনা। আমার তুলনায় বয়েসিরা বলেন। সমবয়েসি আদিত্য কবিরের সঙ্গেও এ বিষয়ে কোনও কথা হয় না। আজিজ মার্কেট, শাহবাগ, কাঁটাবন- এই পথে না-বের হওয়া ভোরের কাগজের অফিসও আমার গন্তব্য। আগে একটু অগ্রজদের ভিতরে ইমতিয়ার শামীম, রমেন বিশ্বাসের সঙ্গেও বিভিন্ন বিভিন্ন বিষয়ে কথা হত, তাঁরাও এখানে বসেন। ইমতিয়ার শামীমের ‘অচরিতার্থ পুনর্জন্ম’ নামের একটি গল্প প্রকাশিত হয়েছিল আজকের কাগজের সাময়িকীতে, সেটি পড়ার মুগ্ধতা কাটে না। নিজে দুই চার লাইন গল্প লেখার চেষ্টায় দিনমান কাটিয়ে দিই, গল্প নিয়ে ইমতিয়ার শামীমের সঙ্গে আলাপ করি। তিনি নীচুকণ্ঠ। কথা সব সময়েই খুব কম বলেন, শোনেন বেশি। আমার প্রায় উলটো ধরন। প্রশ্ন আর জিজ্ঞাসার কোনও শেষ নেই। আসতেন আজফার হোসেন। প্রচুর লিখতেন তখন তিনি। আজিজের সামনে ও ভোরের কাগজ অফিসে তার সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে কথা হত। দেখতাম, কথা বলতে বলতে তিনি নিউজপ্রিন্টের খাতায় ছোটো ছোটো মাত্রাঅলা অক্ষরে লিখে চলেছেন কলাম কিংবা সাহিত্যপাতার জন্যে কোনও লেখা।

একটু জানানো দরকার, আজকের কাগজের তখন আরও তিনটি সহযোগী প্রকাশনা ছিল। তিনটিই সাপ্তাহিক : খবরের কাগজ, সময় আর তারকা কাগজ। খবরের কাগজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আনিসুল হক। ভোরের কাগজ শুরু হলে বের হয় কাগজ নামে। সময় বেরুত সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সম্পাদনায়। ওই দুটোসহ তারকা কাগজ ভোড়ের কাগজের নতুন অফিসের কাছাকাছি একই রাস্তার সোজা বাড়িটাতে চলে এল।

ভোরের কাগজ অচিরেই বেরুবে। ঢাকাসহ বাংলাদেশের সবখানে তখন ইত্তেফাক, সংবাদ আর ইনকিলাবের বহুল প্রচার। তরুণদের কাছে নতুন আঙ্গিকের দৈনিক আজকের কাগজ বেশ প্রিয় হয়ে উঠেছিল। সেখানকার অভ্যন্তরীণ সংকটে নতুন আর একটি দৈনিকের পুনর্জন্মের সংবাদে অনেকেই অপেক্ষমান যে ভোরের কাগজ নামের দৈনিকটা যথাসময়ে বেরুবে তো। ডাবলুভাইকে দেখি একটার পর একটা মাস্টহেড করছেন, মাস্টহেড অর্থাৎ কাগজের নামের লোগো; তা ঠিক হলে লিফলেট-পোস্টার ছাপা হবে। তাও হল। উপরে আজকের কাগজ কথাটা সাধারণ টাইপে লিখে, নীচে ভোরের কাগজ। অর্থাৎ, আজকের কাগজ এখন ভোরের কাগজ। নগরের রাস্তায় বিজ্ঞাপনটি বেশ আকর্ষণীয় হয়েছিল।

একটি নতুন দৈনিক বেরুতে অনেক দিনের প্রস্তুতি লাগে, কিন্তু ভোরের কাগজ প্রকাশের প্রস্তুতির জন্যে খুব কম সময়। কিন্তু তাদের জানা আছে, তাঁরা কী করতে চান। কদিন আগে এই সেট-আপই আজকের কাগজ প্রকাশ করেছেন; ওদিকে ভিতরে ভিতরে সবার শঙ্কাও, মাত্র পনেরো দিনের ভিতরে একটি সম্পূর্ণ দৈনিক বের করা সম্ভব কি না!

একদিন, যখন ডামি এডিশন হিসেবে ভোরের কাগজ বেরুতে শুরু করেছে, সে সময়ে মাসুদুজ্জামান লেখা দিতে বললেন। আজকের কাগজে ফরিদ কবির আর মাসুদুজ্জামান উপসম্পাদকীয় পাতায় আমার কয়েকটি লেখা ছেপেছিলেন। যদিও আজ অনেকগুলো দিন দূরে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারি সে-গুলো লেখা হিসেবে আহামরি কিছু ছিল না। তবে একজন তরুণের সামান্য মতামতকে তাঁরা হয়তো গুরুত্ব দিয়েছেন। সে জন্যেই তাঁরা লেখা দিতে বলেছেন। যদিও নিজের ভিতরের ইচ্ছে হিসেবে জানি, আমি সাহিত্যপাতায় লিখতে চাই। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর প্রয়াণে সেখানে একটি স্মৃতিকথা লিখেছিলাম। আবু হাসান শাহরিয়ার বলেছিলেন লিখতে। তিনি কথা প্রসঙ্গে জেনেছিলেন রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহকে আমি চিনতাম। তিনি বাগেরহাটে রুদ্রদাকে যেমন দেখেছি, তাই লিখতে বলেছিলেন। তারপরই আজকের কাগজের সাহিত্য পাতা বন্ধ হয়ে যায়।

ভোরের কাগজের সাহিত্য পাতার দায়িত্ব নিলেন সাজ্জাদ শরিফ। প্রায় একই সময়ে তিনি জানালেন সাহিত্যপাতায় লিখতে হবে। বই আলোচনা, যদি প্রবন্ধ লিখতে পারি তাই আর গল্পও। যাক, দিনক্ষণ জানা গেছে, একটি পত্রিকা যা এখনও প্রকাশিত হয়নি, তার সম্পাদকীয় ও সাহিত্য পাতার দায়িত্বপ্রাপ্ত সম্পাদকেরা লেখা চাইলেন। বেশ ডগমগ হয়ে কাঁটাবনের বন্ধুদের সঙ্গে যে মেসে থাকি, সেখানে এসে সাহিত্য, সাহিত্যের বাজার ইত্যাদি নিয়ে একটা লেখা তৈরি করলাম। আর রাজনৈতিক ধারার গল্প নামের তখন বেশ সাড়া জাগানো গল্প সংকলনের একটি আলোচনা লিখলাম অনেকটা প্রবন্ধের আদলে।

পনেরোই ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ ভোরের কাগজ প্রকাশিত হল। তখনকার তরুণপ্রজন্মের পাঠকেরা এই কাগজকেও সাদরে গ্রহণ করেছিলেন। কদিন বাদে সাহিত্য পাতা বেরুল। সে পাতার সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ অঙ্গসজ্জায় নতুনত্ব আনলেন। তখন বাংলাদেশে দৈনিকের সাহিত্য পাতার ভিতরে মানের দিক থেকে সংবাদের সাহিত্যপাতাই ছিল সবচেয়ে মানসম্পন্ন। ভোরের কাগজের সাহিত্য পাতাও তখনকার সাহিত্য অনুরাগীদের আকর্ষণ করল। একই সঙ্গে সংবাদের তুলনায় ভোরের কাগজের সাহিত্যপাতা তরুণ্য-নির্ভর। এখনকার তুলনায় বাংলাদেশের সাহিত্যজগৎ বেশ ছোটো। ভালো লেখা তো ভালো, মুদ্রণযোগ্য লেখারই অভাব। ফলে সংবাদ আর ভোরের কাগজ দুজায়গাতেই একই লেখকের উপস্থিতি ছিল খুবই স্বাভাবিক। শামসুর রাহমান ও সৈয়দ শামসুল হক দু-কাগজেই লিখতেন। ভোরের কাগজে শামসুর রাহমান অনেকদিন ধরে ‘অন্যের মানসে বসবাস’ নামের একটি সাহিত্যিক কলাম লিখেছিলেন। সেখানে বাংলাদেশের লেখকদের বইয়ের আলোচনাই পাশাপাশি স্বল্প পরিচিত কবিদের তিনি এই কলামে পরিচিত করাতেন। প্রথম দিকে ভোরের কাগজের সাহিত্যপাতায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল, হুমায়ুন আজাদের একটি সাক্ষাৎকার অথবা লেখা (সম্ভবত হিŸদ্গেনস্টাইন প্রসঙ্গে) নিয়ে আজফার হোসেনের সঙ্গে কয়েক সপ্তাহব্যাপী মসিযুদ্ধ! এ সপ্তাহে একজন যে যেন তো পরের সপ্তাহে অন্যজন। এখনও মনে আছে, শেষ দিন হুমায়ুন আজাদ আজফার হোসেনকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করেছিলেন।

ভোরের কাগজের সে সময়ের সাহিত্যপাতায় একেবারে সা¤প্রতিক কবিদের কবিতা ও গল্প প্রকাশিত হত। যাদের কিছুদিন আগেও গায়ে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার তক্মা ছিল, সেই তকমা সাজ্জাদ শরিফ খুলে দেন। তিনি নিজেও অমন সাহিত্যকর্মী ছিলেন কিছুদিন আগে, লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, স্বাভাবিকভাবেই তাঁর প্রতিষ্ঠানবিরোধী সাহিত্যবিশ্বাসসম্পন্ন বন্ধু ও সহযাত্রী থাকাই স্বাভাবিক। তাঁদের অনেকের লেখাই তখন দৈনিকে প্রথম প্রকাশিত হয়। এমনকি কোনও একটি সংখ্যায় সেলিম মোরশেদেরও একটি গল্প প্রকাশিত হয়েছিল। এ ছাড়া পারভেজ হোসেন, নাসরীন জাহান, ইমতিয়ার শামীমের গল্প এ সময়ে ভোরের কাগজে বেরুত; ওয়াহিদ রেজার একটি নিরীক্ষাপ্রবণ গল্পও পড়েছিলাম, কমলকুমার মজুমদারের লেখার বেশ কিছু উদ্ধৃতি সেখানে ছিল। সাক্ষাৎকার দিয়েছেন অনিন্দ্য-সম্পাদক ওয়াহিদ হাবিব। এছাড়া অনুবাদ বেরুত বিদেশি লেখকের লেখার। মূলত স্পেনিশ সাহিত্যের। আজকের কাগজে আদিত্য কবির প্রতিদিন বের্হেসের ছোটো ছোটো লেখা অনুবাদ করত। ভোরের কাগজে সেটি আর চালু হয়নি। তবে সাহিত্য পাতায় অনেক ধরনের লেখার অনুবাদ প্রকাশিত হত।

শুরুতে আজকের কাগজের থেকে ভোরের কাগজ যে খুব পৃথক হয়েছিল তা হয়তো নয়, কিন্তু ধীরে ধীরে একটি কাগজ যখন নিজের চরিত্র অর্জন করে, সেটি করতে সময়ও নেয়, তা হচ্ছিল। তখন মফস্বল পাতার দায়িত্বে ইমতিয়ার শামীম। নিজের জেলা শহরে গেলে বুঝতে পরতাম, সেখানের মফস্বল সংবাদদাতাকে বিশেষ বিশেষ নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। আগে যে-কোনও দৈনিকেই মফস্বল সংবাদদাতারা নিজের ইচ্ছেমাফিক সংবাদ পাঠাতেন, অর্থাৎ কোনও ঘটনা ঘটলে তারপর তাই সংবাদ হত; ভোরের কাগজে সে বিষয়টি একটু পরিবর্তিত হতে শুরু করে। হত্যা, আত্মহত্যা থেকে কোনও এলাকার অনুষ্ঠান আয়োজন, এগুলো বিভিন্ন স্থানে সবকটি একই শিরোনামের নীচে ভিন্ন ভিন্ন উপশিরোনামে ছাপা হতে শুরু করে। অর্থাৎ একটি দিনে দেশের যে সমস্ত জায়গায় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো একই জায়গাই একবারে দেখার সুযোগ পাওয়া গেল। আর মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সংবাদের পরে ভোরের কাগজ দৃঢ় অবস্থান নেয়। ইনকিলাব বিরোধীপক্ষ, ইত্তেফাকের অবস্থান অনেকাংশেই সুবিধাবাদি। এর আগে আজকের কাগজে ‘তুই রাজাকার’ শিরোনামে একটি শিশির ভট্টাচার্যের স্বেচসহ ঘাতকদের ছবি বেশ আলোড়ন তুলেছিল। ভোরের কাগজে মার্চ ও ডিসেম্বরে বিশেষ প্রতিবেদন ছাপা হত। রমেন বিশ্বাস আজকের কাগজে নিয়মিত লিখতেন ঘাতকের দিনলিপি, এখানে মুক্তিযোদ্ধার দিনলিপি শুরু করেছিলেন মাসুদ্দুজ্জামান। এ ছাড়া সংবাদ প্রতিবেদনেও কিছু কিছু পরিবর্তন ধীরে ধীরে শুরু হয়।

ভোরের কাগজ অফিস শাহবাগ আর আজিজ মার্কেটের কাছে হওয়ায় এখানে অনেক লেখক আড্ডা দিতেন। আজিজ মার্কেট তখন বেড়ে উঠছে। পাঠক সমাবেশের পাশে সন্দেশ, এদিকে প্রাকৃতজন, পিছনে ঘাসফুলনদী হয়তো তখনও হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও কাছে, সাংবাদিকতায় আগ্রহী অনেকেই আসতেন। কাঁটাবনে থাকায় আমার পক্ষে এখন বিকেল হলেই যাওয়াটা বেশ সহজ। শাহবাগ এখনকার মতো তখনও ঢাকা শহরের কেন্দ্রগুলোর একটি। সেখানে অফিস হওয়ায় সাহিত্যকদের আগমন ঘটত। হুমায়ুন আজাদ এলে ভোরের কাগজের নীচতলায় বেশ আড্ডা বসত। তিনি তার তীর্যক ও সরস মন্তব্য করতেন যে-কোনও বিষয়ে। একটি মনে আছে। বেনসন সিগারেট নিয়ে। বেনসনের দাম হঠাৎ বেড়ে গেছে। সম্ভবত পাঁচ টাকা থেকে সাত টাকা। তিনি অফিসের একজন পিওনকে দশ টাকা বের করে বললেন, এই টাকায় একটা বা অর্ধেকটাই হোক বেনসন নিয়ে এসো।

তাঁর নারী (সম্ভবত) সে বছর বইমেলায় বেরিয়েছে। প্রকাশ মাত্রই বইটার কাটতি বেশ। তিনি একই সঙ্গে এ কাগজে কলাম লিখতেন, খবরের কাগজের কলাম নতুন সাপ্তাহিক কাগজে লিখতে শুরু করেন। প্রতিটি পাঠকপ্রিয় ছিল। সাহিত্য পাতায় তাঁর নিজস্ব গদ্যের ধরনে একটি গল্পও লেখেন। এখানেই আমার পরিচয় হয়েছিল হায়াৎ মামুদের সঙ্গে; হয়তো লেখা দিতে এসেছিলেন। মাসুদুজ্জামান তাকে বলেছিলেন, ও জাহাঙ্গীরনগরে বাংলা বিভাগে ভর্তি হয়েছে। হায়াৎ স্যার বলেছিলেন, আচ্ছা, তাহলে ক্লাস শুরু হলে দেখা হবে। কখনো আসতেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, শফি আহমেদ, আবুল কাসেম ফজলুল হক। সেই আলাপে-আড্ডায় তাঁদের কথা শোনাই ওই উপস্থিতিতে আমার কাজ। আজফার হোসেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সময়-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, বিশ^বিদ্যালয় থেকে ফিরে বিকালের দিকে তিনি এখানে আড্ডা দিতেন।

সমবয়সীদের ভিতরে আদিত্য এখানে থাকায় রাইসু আসত, সঙ্গে কখনও তীব্র আলী থাকত। সেই সময়ে তীব্রর সঙ্গে পরিচয়। রাইসুর সঙ্গে আজকের কাগজের সময়ে আলাপ হয়েছিল। রূপম-কিছুধ্বনি সম্পাদক ও কবি আন্ওয়ার আহমদ আসতেন লেখা দিতে আর প্রত্যেকের কাছে তার কাগজের জন্য লেখা চাইতেন। লেখা চাওয়ার ব্যাপারে আন্ওয়ার ভাইয়ের মতো উদার আর একনিষ্ঠ মানুষ খুবই কম দেখেছি। দোতলায় ইমতিয়ার শামীমের কাছে গল্প চেয়ে নিচতলায় সাজ্জাদ শরিফ, ফরিদ কবির আর মাসুদুজ্জামানের কাছে কবিতা চাইতেন। তারপর আমাকে আর রাইসুকে সঙ্গে করে আজিজের ফুটপাতে গিয়ে এক কাপ চা খাওয়ার পরে একটা রিকশা ডেকে চলে যেতেন। সম্ভবত অন্য কোনো আড্ডায়।

ভোরের কাগজের সার্কুলেশন বাড়ছে। লেখকসম্মানী নিয়মিত। সাহিত্যপাতায় প্রায় নিয়মিত নামে ও বেনামে বই ও পত্রপত্রিকার আলোচনা লিখি। আর এর ভিতরেও টের পাই এখানেও প্রায় ভাঙনের সুর। একদিন গিয়ে দেখি অফিস রাতারাতি নয়া পল্টনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সে সময়ে জাহাঙ্গীরনগর পড়তে চলে যাওয়ায় আমারও আসা-যাওয়া কমেছে।

২৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj