বাংলা জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হওয়া উচিত : ফজলুল হক খান

বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

বিশ্বের জাতিসমূহের সংগঠনের নাম জাতিসংঘ- যার লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আইন, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক অগ্রগতি এবং মানবাধিকার বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি করা। ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত লীগ অব নেশন’স, ১৯৪৫ সালে ৫১টি রাষ্ট্র কর্তৃক জাতিসংঘের সনদ স্বাক্ষর করার মাধ্যমে পরিবর্তিত রূপ নেয় বর্তমান জাতিসংঘ। ২০১৬ সালের তথ্যানুসারে জাতিসংঘের সদস্য সংখ্যা ১৯৩। বিশ্বের প্রায় সব স্বীকৃত রাষ্ট্রই এর সদস্য। তবে উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম হলো তাইওয়ান ও ভ্যাটিকান সিটি। অন্যান্য কিছু অস্বীকৃত এলাকার মধ্যে রয়েছে ট্রান্সনিস্ট্রিয়া ও উত্তর সাইপ্রাসের তুর্কি প্রজাতন্ত্র। সর্বশেষ সদস্য রাষ্ট্র হলো দক্ষিণ সুদান। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য পদ লাভ করে ১৭.০৯.১৯৭৪ সালে।

জাতিসংঘের সদর দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে অবস্থিত। সাংগঠনিকভাবে জাতিসংঘের প্রধান অঙ্গ সংস্থাগুলো হলো সাধারণ পরিষদ, নিরাপত্তা পরিষদ, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ, সচিবালয়, ট্রাস্টিশিপ কাউন্সিল এবং আন্তর্জাতিক আদালত। এ ছাড়াও রয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ইত্যাদি। জাতিসংঘের প্রধান নির্বাহী হলেন মহাসচিব। জাতিসংঘের সদর দপ্তর নিউইয়র্কে হলেও এর বেশ কিছু অঙ্গ সংগঠনের প্রধান কার্যালয় সুইজারল্যান্ডের জেনেভা, নেদারল্যান্ডের দ্য হেগ, অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা, কানাডার মন্টিল, ডেনমার্কের কোপেনহ্যাগেন, জার্মানির বন ও অন্যত্র অবস্থিত।

জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হলো ৬টি। এগুলো হলো ইংরেজি, ফরাসি, চীনা, আরবি, রুশ এবং স্প্যানিশ ভাষা। জাতিসংঘের সচিবালয়ে যে দুটি ভাষা ব্যবহৃত হয় তা হলো ইংরেজি ও ফরাসি। জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষাগুলোর মধ্যে ইংরেজি ৫২টি সদস্য দেশের সরকারি ভাষা, ২৯টি সদস্য দেশের সরকারি ভাষা হলো ফরাসি, আরবি ২৪টি, স্প্যানিশ ২০টি, রুশ ৪টি এবং চীনা ভাষা ২টি দেশের সরকারি ভাষা।

জনসংখ্যার ভিত্তিতে বিবেচনা করলে বাংলা ভাষাভাষিরা পৃথিবীর মধ্যে ৮ম স্থানের অধিকারী। সেটি বড় কথা নয়, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভাণ্ডার পৃথিবীর অনেক ভাষা থেকেই প্রাচীনতম এবং সমৃদ্ধ। বাংলা ভাষায় রচিত সাহিত্যের আদিতম নিদর্শন হলো চর্যাপদ। আধুনিক ভাষাতাত্তি¡কগণ বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রমাণের সাহায্যে প্রমাণ করেছেন যে, চর্যার ভাষা প্রকৃতপক্ষে হাজার বছর আগের বাংলাভাষা। সমকালীন বাংলার সামাজিক ও প্রাকৃতিক চিত্র এই পদগুলোতে প্রতিফলিত হয়েছে। সাহিত্যমূল্যের বিচারে কয়েকটি পদ কালজয়ী। মধ্যযুগকে যদিও বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগ বলা হয় তথাপি এ সময়ের সাহিত্য নিদর্শন কম নয়। প্রাকৃত ভাষায় গীতি কবিতার সংকলিত গ্রন্থ প্রাকৃত পৈঙ্গল, রামাই পণ্ডিত রচিত শূন্য পুরাণ, চণ্ডীদাসের বৈষ্ণবপদাবলি, শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন, হলায়েধ মিশ্র রচিত সেক শুভোদয়া। এ ছাড়াও রয়েছে ডাক ও খনার বচন ইত্যাদি। এগুলো চর্যাপদের পরে বাংলা সাহিত্যের দ্বিতীয় প্রাচীনতম কাজ বলে বিবেচিত হয়। সে যুগেও গীতি কবিতা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে মানবতার পরিচয় পাওয়া যায়। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’ চণ্ডীদাসের এই উক্তি যুগ যুগ ধরে অমীয় বাণী হিসেবে বাংলা সাহিত্যে স্থান দখল করে আছে।

মূলত বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগ নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও মোটামুটিভাবে ১৭৬০ খ্রি. পর থেকেই বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগের সূত্রপাত বলে নানা সমালোচক মত প্রকাশ করেছেন। কালের দিক থেকে আধুনিক যুগকে কয়েকটি ধাপে ভাগ করা যায়। ১৭৬০ থেকে ১৭৯৯ আধুনিক যুগের প্রথম পর্ব, ১৮০০ থেকে ১৮৫৮ দ্বিতীয় পর্ব, ১৮৫৯-১৯০০ তৃতীয়পর্ব, ১৯০১-১৯৪৭ চতুর্থপর্ব, ১৯৪৮-২০০০ পঞ্চমপর্ব, ২০০১ থেকে বর্তমান অর্থাৎ ৬ষ্ঠ পর্বের সূচনা। আধুনিক যুগের সব পর্বেই, বাংলা সাহিত্যের সব শাখায় যেমন সাহিত্য, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ছোটগল্প, বাউল সাহিত্য, লোকসাহিত্য, কবিতা, গান, নাটকের ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়। বাংলা সাহিত্যে এই অভাবনীয় উন্নতির পিছনে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, প্যারিচাঁদ, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপধ্যায়, শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপধ্যায়, জীবনানন্দ দাস, সুকুমার রায়, উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী, সৈয়দ মুজতবা আলী, সুকান্ত ভট্টাচার্য প্রমুখের অবদান উল্লেখযোগ্য। শুধু তাই নয়, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাংলা সাহিত্যে নোবেল অর্জন বাংলাভাষা ও সাহিত্যকে করেছেন আরও সমৃদ্ধ।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্তৃক রচিত আমাদের জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’- এমন অর্থবহ, কাব্যিক ছন্দময়, হৃদয়গ্রাহী, মাতৃভূমির প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা, শ্রæতিমধুর জাতীয় সঙ্গীত পৃথিবীর আর কোনো ভাষায় রচিত হয়েছে কি না আমার জানা নেই। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম কর্তৃক রচিত আমাদের রণসঙ্গীত ‘চল্ চল্ চল্ ,উর্ধ গগনে বাজে মাদল’ এমন সুন্দর উদ্দীপনাময় তাল-লয় সুর ও ছন্দে সমৃদ্ধ রণসঙ্গীত পৃথিবীর আর কেউ রচনা করতে পেরেছে কিনা সন্দেহ রয়েছে। এগুলো বাংলা সাহিত্যের তথ্য ভাণ্ডারকে করেছে সমৃদ্ধ। ২৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৪ সালে আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলা ভাষায় ভাষণদান করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন, আমাদের মাতৃভাষার মর্যাদাকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছেন।

বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। আমাদের মাতৃভাষার রয়েছে এক অনন্য ইতিহাস। পৃথিবীর কোনো জাতি মাতৃভাষার জন্য রক্ত দেয়নি, জীবন দেয়নি। অথচ আমাদের মাতৃভাষা সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারের রক্ত দিয়ে কেনা। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণে তাঁরা শহীদ হন। সেদিন থেকেই দিনটি ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী রচিত এবং আলতাফ মাহমুদের সুরে একুশের মর্মস্পর্শী কালজয়ী গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি’ বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছে এবং বাংলা ভাষা, বাঙালি জাতি যতদিন পৃথিবীর বুকে থাকবে ততদিন এ কালজয়ী গান অমর হয়ে থাকবে।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি যে চেতনায় উদ্দীপিত হয়ে বাঙালি জাতি রক্ত দিয়ে মাতৃভাষাকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে আজ তা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে স্বীকৃতি লাভ করেছে। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে দিবসটি জাতিসংঘের সদস্য দেশসমূহে যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের প্রস্তাবটি সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে উত্থাপন করে বাংলাদেশ। উক্ত অধিবেশনে ‘এখন থেকে প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করবে’- এ প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। এটা বাঙালি জাতি, বাংলা ভাষার প্রতি বিশ্ববাসীর অকুণ্ঠ সমর্থন এবং সম্মান প্রদর্শনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

১৯৭১-এর অগ্নিঝরা ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। যে ভাষণের হাত ধরে বিশ্বমানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ। ভাষণটি ছিল বাংলায়, কাব্যিক এবং ছন্দময়। ভাষণটির কাব্যিকতা বিশ্লেষণ করে মার্কিন ম্যাগাজিন নিউজ উইক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘রাজনৈতিক কবি উপাধি দিয়েছে। ভাষণটি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে ইতিহাসে ঠাঁই করে নিয়েছে। সম্প্রতি ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ বিশ্ব ঐতিহ্য্যের অংশ হিসেবে ইউনেসকোর মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড রেজিস্টারে অন্তভুক্ত হয়েছে। ইউনেসকো কর্তৃক এই কার্যক্রম আন্তর্জাতিকভাবে বঙ্গবন্ধুকে যেমন সম্মানিত করা হয়েছে তেমনি বাংলা ভাষাকেও অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে মর্যাদা দেয়া হয়েছে। এসব আন্তর্জাতিক অর্জন সম্ভব হয়েছে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার যোগ্য এবং দূরদর্শী নতৃত্বের কারণে।

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভাণ্ডার অত্যন্ত সমৃদ্ধ। জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে যে ছয়টি ভাষা স্থান পেয়েছে সাহিত্য ও সংস্কৃতিক অঙ্গনে সৃজনশীলতার বিবেচনায় বাংলা ভাষাকে ছাপিয়ে যেতে পারবে বলে আমাদের মনে হয় না। এ ছাড়াও জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ বাংলাভাষা ও ঐতিহ্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল। এমতাবস্থায়, বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করলে অতীতের সফলতার ন্যায় এবারও সফল হবেন বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।

২৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj