উন্নয়ন ও সংস্কৃতি : মুনতাসীর মামুন

বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

সব সরকারই উন্নয়নের কথা বলে, মেয়াদ পূর্তির পর আর হিসাব মেলানো হয় না। সেগুলো যে খুব দৃশ্যমান তাও নয়। সাধারণ মানুষ তাই উন্নয়নকে কথার কথা বা রাজনৈতিক কথা হিসেবেই নেয়। ভিন্ন প্রসঙ্গ হলেও বলি, রাজনৈতিক কথাটি কী? রাজনীতিবিদ হলেই কি যে কোনো বিষয়ে অসত্য কথা বলতে পারেন, প্রতিশ্রæতি দিতে পারেন? পারেন না। কিন্তু রাজনৈতিক কথা হিসেবে এগুলো বিবেচনা করা হয়, কেউ আমলে নেয় না। এটি রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব বা মোড়লি রাজনীতি বা গ্রাম্য রাজনীতি বলা যেতে পারে। উচ্চ আদালত, নিম্ন আদালত- সব ধরনের আদালত নিয়েই খালেদা জিয়া চরম সব অবমাননাকর উক্তি করেছেন কিন্তু প্রবল পরাক্রমী দেশে ফিরে না আসা প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা পর্যন্ত তা আমলে নেননি, কিন্তু আমাদের মতো পাবলিক বা সাংবাদিককে স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে আদালত অবমাননা মামলায় কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর ঘটনা কম নয়।

উন্নয়নের কথায় ফিরে যাই। বঙ্গবন্ধু আমল থেকে এ আমল পর্যন্ত সব আমলেই কিছু না কিছু উন্নয়ন হয়েছে। আমরা প্রায়ই বলি শাসক হিসেবে বঙ্গবন্ধু ব্যর্থ, রাজনীতিক হিসেবে শ্রেষ্ঠ। এটি সঠিক নয়। এ কথা যখন আমরা বলি তখন ১৯৭২-৭৩ সালের কথা ভুলে যাই। সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত ছিল বাংলাদেশ। খাদ্য আশ্রয় সবকিছুরই অভাব ছিল। আমেরিকা, চীন, তথাকথিত ইসলামী জোট সব ছিল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। অভ্যন্তরে অতি বাম ও অতি ডান মিলে অসহনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল। বঙ্গবন্ধুকে এসবই সামাল দিতে হয়েছে। একই সঙ্গে আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তি গড়তে হয়েছে। ‘বঙ্গবন্ধুপিডিয়া’ করতে গিয়ে লক্ষ করি, আধুনিক রাষ্ট্র গড়ার সব আইনি অবকাঠামো বঙ্গবন্ধুর আমলেই করা হয়েছিল। এসব কিছুর সুফল পাওয়ার আগেই তাকে হত্যা করা হয়। জিয়াউর রহমান সেই সুফল ভোগ করেন। খালেদা জিয়া সরকারও উন্নয়নের চেষ্টা করেছেন। এরশাদ উপজেলা করে বিকেন্দ্রীকরণ করেছেন, ফলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে। সব আমলেই কিছু উন্নয়ন হয়েছে যার ফলে এ বাংলাদেশ আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথমবার ক্ষমতায় এসে উন্নয়ন করেননি তা নয়, করেছেন এবং একটি হিসাবে দেখা গেছে, তার ক্ষমতা গ্রহণের আগে যারা ক্ষমতায় ছিলেন তাদের চেয়ে তার আমলে অগ্রগতি বেশি হয়েছে। ২০০৮ ও ২০১৪ সালে তিনি উন্নয়নকে প্রধান এজেন্ডা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এ ক্ষেত্রে বাজেটের চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করেছেন। কোনো বাধাকে গ্রাহ্য করেননি এবং তার আমলে যে বাংলাদেশে ‘সর্বগ্রাসী’ উন্নয়ন হয়েছে তা এখন দৃশ্যমান। এটি ঠিক, ওপরের দিকে পাকিস্তান আমলের ২২ পরিবারের মতো এখানেও ২২ না হোক ৫০ পরিবারের মধ্যে সম্পদ ও ব্যাংক ঋণ কেন্দ্রীভূত হয়ে যাচ্ছে যার ফলে এরা যে কোনো সময় সরকারকে ব্যর্থ পরিণত করতে অথবা উৎখাত করতে পারবে। আমেরিকার এটিটি ক্যারিবিয়ানকে তা করেছিল। পুঁজিবাদে এর বিকল্প পথ বের করা সমুচিত। মধ্যবিত্তের ব্যপ্তি বেড়েছে। দারিদ্র্যের বৃত্ত ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। স্বল্পোন্নত দেশের সংজ্ঞা থেকে এ ভূখণ্ড ৭০ বছর পর মুক্তি পাচ্ছে। আমার জীবদ্দশায় এ বাংলাদেশ দেখে যেতে পারব তা ভাবিনি। সঙ্গে সঙ্গে এ কথাও বলব, দুর্নীতির এমন মহোৎসব আর দেখিনি। প্রতিটি ব্যাংকে যোগসাজশে লুট চলছে। পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হতে চলছে। দুঃখজনক যে প্রতিটি আইন শক্তিশালী বা ধনীদের পক্ষে। ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে খড়গ নেমে আসছে সাধারণ কর্মচারীদের (ম্যানেজার, সহকারী প্রভৃতি) প্রতি কিন্তু চেয়ারম্যান বা পরিচালকরা সব সময় দায়মুক্ত থাকছে। ব্যাংক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার এটিও একটি কারণ। পরিচালকদের মধ্যে স্বাধীন পরিচালকের সংখ্যা বৃদ্ধি না পেলে এ ব্যবস্থা বৃদ্ধি পাবে। অন্তিমে পুরো উন্নয়নের বিষয়টিই ভঙ্গুর হয়ে যাবে। রাজনৈতিকভাবেও সরকার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতিদিন প্রশ্ন ফাঁস না শিক্ষামন্ত্রী না প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে যাচ্ছে।

উন্নয়নের ভঙ্গুরতার কথা উল্লেখ করছিলাম। একজন উন্নয়ন করে যেতে পারেন, সেটি দৃশ্যমানও হতে পারে কিন্তু সে উন্নয়ন ধরে রাখার জন্য কতগুলো উপাদান দরকার সেটি একই সঙ্গে সমান্তরালে বৃদ্ধি না করলে এই উন্নয়ন হবে ক্ষণস্থায়ী এবং ভঙ্গুর। এই উপাদান এক কথায় হচ্ছে দক্ষ ও সংস্কৃতিবান জনশক্তি। দক্ষ জনসংস্কৃতি তৈরি করতে হলে শিক্ষার বুনিয়াদ শক্ত করতে হবে। প্রগতিশীল সংস্কৃতি জীবনযাপনের অঙ্গ করতে হবে।

শিক্ষিত জনশক্তি সব দেশেরই শক্তি। আমাদের দেশে শিক্ষিতের হার বেড়েছে, শিক্ষায় বিনিয়োগ বেড়েছে [প্রতিরক্ষা থেকে নয়] কিন্তু যথার্থ দক্ষ মানবশক্তি গড়ে উঠছে না। প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী এ বিষয়ে একমত নন। না হতে পারেন, তাতে সত্য বদলাবে না। শিক্ষাব্যবস্থা এখন ক্ষয়ের পথে। এক দেশে ১২ রকমের শিক্ষাব্যবস্থা চালু থাকতে পারে না; পরীক্ষার চাপে শিক্ষার্থীদের কাবু করে ফেলা হয় না; শিক্ষাক্রমে এত ত্রুটি থাকে না; পরীক্ষা ব্যবস্থাও এমন হয় না। আমরা এর কোনো দিকেই নজর দিচ্ছি না। এমপিওভুক্তি ব্যবস্থায় রাজনৈতিক ও শিক্ষার কোনো লাভ হয়নি। যেসব কলেজে ভালো পড়াশোনা হচ্ছিল সেসব কলেজকে সরকারিকরণের সঙ্গে সঙ্গে তার অবনতি হচ্ছে। পৃথিবীর আর কোনো দেশে বাংলাদেশের মতো পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়? সরকারিভাবে কেন ক্যাডেট কলেজ থাকবে? সরকার মধ্যযুগীয় মাদ্রাসা ব্যবস্থাকে কেন সেক্যুলার শিক্ষা থেকে বেশি প্রশ্রয় দেবে? উচ্চশিক্ষাও অবনতির দিকে। স্বয়ংক্রিয় প্রমোশন পদ্ধতি ও অতি দলীয়করণ শিক্ষার পরিবেশ উজ্জ্বল করছে এমন বলা যাবে না। কোনো সরকারই শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট কার্যকর করেনি। অন্যদিকে মধ্যযুগীয় মাদ্রাসা ও প্রতিরক্ষার পেছনে অত্যধিক ব্যয়ের তুলনায় শিক্ষা-সংস্কৃতিতে কম ব্যয় সিভিল সরকারকে আত্মঘাতী করে তুলছে। সমালোচনা কোনো সরকারই পছন্দ করে না। বর্তমান সরকারও করবে না। কিন্তু সত্যের মুখোমুখি হতেই হবে। নাইজেরিয়ার কথা ধরা যাক। তেল পাওয়ার পর আফ্রিকার সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুর্নীতি ও প্রতিরক্ষায় অত্যধিক ব্যয় নাইজেরিয়াকে শুধু দরিদ্র নয়, সহিংস দেশে পরিণত করছে।

পাকিস্তান আমলেও যে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল গড়ে উঠেছিল তা এখন বিনষ্ট। ফ্রান্সে সংস্কৃতি ক্ষেত্রে বিনিয়োগ শিক্ষা থেকে কম নয়। ত্রিপুরা রাজ্যে দেখেছি শিক্ষা-সংস্কৃতিতে যে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে অন্য কিছুতেই নয়। প্রগতিশীল ও মুক্তিযুদ্ধের মতাদর্শ আমরা সংস্কৃতির মাধ্যমেই পৌঁছে দিতে পারি এবং মানস জগতে আধিপত্য সৃষ্টির জন্য এর চেয়ে বড় হাতিয়ার কিছু নেই।

আজ ঔপনিবেশিক আমলে সৃষ্টি বলে অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা ভেঙে ফেলা হচ্ছে, প্রতœতাত্তি¡ক খনন ও সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না অর্থাভাবে, মফস্বলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য হলের অভাব, গ্রন্থাগার পরিবৃদ্ধি না করা, অনেক কিছু বলা যেতে পারে। বাংলা ভাষাকে হেয় করা হচ্ছে সব পর্যায়ে যা দেশবিরোধী মনোভাব। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়ানো হয় না। তারপরও সরকার আমাদের কাছে দেশপ্রেম আশা করে। এর সঙ্গে হচ্ছে পরিবার পরিকল্পনায় গুরুত্ব হ্রাস। এ জনসংখ্যা উন্নয়ন কেন সব কিছুর জন্য হুমকি হয়ে উঠবে। দেশের আয়তন অনুযায়ী জনসংখ্যার অনুপাত বাঞ্ছনীয়।

সংস্কৃতি না থাকলে একটি দেশ কী ধরনের দেশে পরিণত হতে পারে তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্য। তাদের চেয়ে উন্নয়ন কেউ বেশি করেছে তা তো নয় কিন্তু দেশের মানুষকে সংস্কৃতিবান হিসেবে কেউ গ্রহণ করে না। যে কারণে, আজ আবুধাবিতে দ্বিতীয় ল্যুভর সৃষ্টি করা হচ্ছে। দুবাই থেকে কাতার সবখানে সংস্কৃতির ওপর, শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। কেননা এ কথাটি তারা বুঝেছে উন্নয়নে স্থায়িত্ব দিতে হলে শিক্ষা-সংস্কৃতিতে গুরুত্ব দিতে হবে।

শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে আজ যে পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন তারপর থেকে এর উন্নয়ন অব্যাহতই থাকবে কখনো হয়তো শ্লথ হবে। কিন্তু এটিকে স্থায়িত্ব দিতে হলে, পরিবৃদ্ধি করতে হলে অন্যদিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থাৎ উন্নয়নের জিডিপি বৃদ্ধির জন্য যে গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে একই সঙ্গে শিক্ষা-সংস্কৃতির জিডিপিও বৃদ্ধি করতে হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়নে যেমন অনেক সংস্কার করা হয়েছে, অনেক সাহসী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, তেমনি শিক্ষা-সংস্কৃতির জিডিপি বৃদ্ধিতেও অনেক সাহসী ও দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে।

২৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj